সড়কে শৃঙ্খলা

Send
আহমেদ সাগর
প্রকাশিত : ১৬:৩৪, আগস্ট ২৬, ২০১৮ | সর্বশেষ আপডেট : ১৬:২১, ডিসেম্বর ১৮, ২০১৯

আহমেদ সাগররাজধানীর রাস্তায় বাসচাপায় দুই কলেজ শিক্ষার্থী নিহত হওয়ার পর দেশজুড়ে শুরু হয় প্রতিবাদ বিক্ষোভ। রাস্তায় নেমে আসেন কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। তাদের সঙ্গে যোগ দেয় স্কুলের ছোট ছোট ছেলেমেয়েরাও। পাশে থেকে সমর্থন জোগায় সমাজের নানা শ্রেণি পেশার মানুষ। সহপাঠীর হত্যাকারীদের শাস্তির দাবিতে তারা রাস্তায় দিনভর কেবল প্রতিবাদই করেনি, সেই সঙ্গে যান চলাচলে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে নানা কিছু করেছে। রাস্তায় গাড়ি থামিয়ে চালকের বয়স এবং ড্রাইভিং লাইসেন্স পরীক্ষা করেছে। ফিটনেস সার্টিফিকেট আছে কিনা সেটা নিশ্চিত হয়ে তবেই সেই গাড়ি রাস্তায় চলতে দিয়েছে। এমন না যে দেশে সড়ক দুর্ঘটনায় শিক্ষার্থী নিহত হওয়ার ঘটনা এটাই প্রথম। বরং প্রতিদিনই সারাদেশে ছোট বড় অসংখ্য সড়ক দুর্ঘটনা ঘটছে।
সেন্টার ফর ইনজুরি প্রিভেনশন অ্যান্ড রিসার্চের মতে, সারাদেশে প্রতিদিন সড়ক দুর্ঘটনার শিকার হচ্ছেন অন্তত ৬৪ জন। যার মধ্যে শিশুর সংখ্যা ১৪। বছরে এসব দুর্ঘটনায় হতাহতের সংখ্যা প্রায় ২৩ হাজার। দিন দিন এ সংখ্যা বেড়েই চলেছে। নানা গবেষণা ও জরিপ অনুযায়ী সড়ক দুর্ঘটনায় বছরে দেশে নিহতের সংখ্যা প্রায় চার হাজার।

দেশে পরিবহন খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে প্রণয়ন করা হয়েছিল স্ট্র্যাটিজিক ট্রান্সপোর্ট প্ল্যান বা এসটিপি। সেখানে যে সুপারিশগুলো করা হয়েছিল তার পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন আজও হয়নি। বরং বলা ভালো, এসটিপি বাস্তবায়ন পরিত্যক্ত হয়েছে। সড়ক দুর্ঘটনা, গাড়ির ফিটনেস, চালকের ড্রাইভিং লাইসেন্স, বেপরোয়া গতি, অতিরিক্ত ভাড়া আদায় এসব নিয়ে সব সময় আমরা শোরগোল থাকলেও শুরুর কথাটাই প্রায় কেউই বলি না। আমাদের সড়ক ব্যবস্থাপনা ও পরিকল্পনাকারীরা ভাবেন না দেশের সড়কগুলোতে হেঁটে চলা মানুষের সংখ্যাই সবচেয়ে বেশি। যেকোনও পরিকল্পনায় সবার আগে ভাবা উচিত পথচারীদের কথা। পথচারীদের চলাচল নিরাপদ করতে পারলেই ঢাকা শহরে পরিবহন ব্যবস্থাপনার কাজ অনেকটা হয়ে যায়। অথচ এই কাজটাই করার কোনও উদ্যোগ নাই। সিটি করপোরেশনের তথ্য অনুযায়ী রাজধানীতে গাড়ি চলতে পারে এমন সড়ক আছে প্রায় আড়াই হাজার কিলোমিটার। বিপরীতে ফুটপাত আছে এমন রাস্তার দৈর্ঘ্য মাত্র ৪০০ কিলোমিটারের মতো। অর্থাৎ ৮০ শতাংশেরও বেশি রাস্তায় কোনও ফুটপাতই নেই। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে খিলগাঁও, শ্যামলী, আগারগাঁও এবং লালমাটিয়ার মতো কয়েকটি এলাকায় নতুন করে ফুটপাত নির্মাণ করা হলেও মিরপুর, রামপুরা, বনশ্রী কিংবা উত্তরার মতো মডেল টাউনেও অধিকাংশ সড়কে এখনও ফুটপাত নেই। আর যেসব সড়কে ফুটপাত আছে সেগুলোও ব্যবহার অযোগ্য অধিকাংশ ক্ষেত্রেই। ফুটপাতগুলোর অধিকাংশই সরু। ফলে শিশু ও বয়স্কদের পাশাপাশি অসুস্থ বা গর্ভবতীদের জন্য এসব ফুটপাত ব্যবহার ঝুঁকিপূর্ণ। সেই সঙ্গে রয়েছে ‍ফুটপাত দখলের প্রতিযোগিতা। দোকানের মালামাল, নির্মাণ সামগ্রী, গাড়ি পার্কিং, হকার, এমনকি সরকারি কাজেও (রাজধানীর অনেক পুলিশ বক্স ফুটপাতের ওপর নির্মাণ করা হয়েছে) ফুটপাত দখল করে রাখা হয়। ফলে যেসব রাস্তায় ফুটপাত আছে সেটাও যেন না থাকার মতই।

একটি গাড়ি যেমন এক স্থান থেকে অন্য স্থানে যাওয়াকে ট্রিপ বলে, তেমনি একজন মানুষেরও এক স্থান থেকে অন্য স্থানে যাওয়াকে একেকটি ট্রিপ ধরা হয় পরিবহন প্রকৌশলের ভাষায়। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়-বুয়েটের জরিপ অনুযায়ী, রাজধানীতে প্রতিদিন মানুষের যত ট্রিপ হয় তার প্রায় ৭০ শতাংশই শর্ট বা ছোট দৈর্ঘ্যের- এক থেকে তিন কিলোমিটারের মধ্যে। আর এসব ট্রিপের কিছু রিকশা বা বাসে হলেও দুই-তৃতীয়াংশই হয় পায়ে হেঁটে। সব মিলিয়ে রাজধানীতে পরিবহন ব্যবহারের চেয়ে পায়ে হাঁটা মানুষের সংখ্যা অনেক বেশি। তাই পরিবহন ব্যবস্থাপনায় পথচারীদের ব্যবস্থাপনা একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। অথচ বরাবরই এদেশে পথচারীরা উপেক্ষিত। তাদের জন্য আলাদা কোনও প্রকল্প নেওয়া হয় না। ভাবা হয় না তাদের নিরাপত্তার কথা। প্রায় সব সিদ্ধান্তই নেওয়া হয় যানবাহন চলচলের কথা ভেবে। ফলে হেঁটে চলা মানুষ প্রতিনিয়ত নানা বাধার মুখে পড়েন। বুয়েটের এক্সিডেন্ট রিসার্চ ইনস্টিটিউট-এর মতে, রাজধানীতে সবচেয়ে বেশি দুর্ঘটনার শিকারও হয় পথচারীরা। তাদের সাম্প্রতিক গবেষণা বলছে, ঢাকায় যত সড়ক দুর্ঘটনা হয় তার ৬০ শতাংশেরই শিকার হয় পথচারীরা। ১৯৮৬ সালে এই হার ছিল ৪৩ শতাংশ। অর্থাৎ সড়ক দুর্ঘটনায় পথচারীদের শিকার হওয়ার হার বাড়ছে। অথচ তাদের জন্য পদচারী সেতু নির্মাণ ছাড়া আর কোনও পদক্ষেপ নেই। যদিও দুনিয়ার সভ্য শহরগুলোতে মানুষ ফুট ওভারব্রিজ দিয়ে রাস্তা পার হয় না। আসলে ফুট ওভারব্রিজই নেই সভ্য শহরগুলোতে। যুক্তরাষ্ট্রের মতো দেশে কেবল লাসভেগাস (মাতালরা যাতে দুর্ঘটনার শিকার না হয় সেজন্য লাসভেগাসে কয়েকটি ফুট ওভারব্রিজ নির্মাণ করা হয়েছে। যেগুলো আবার এসক্যালেটর বা এলিভেটর যুক্ত) ছাড়া অন্য শহরগুলোতে কোনও ফুট ওভারব্রিজ নেই। এশিয়া বা ইউরোপের উন্নত শহরগুলোতেও ফুট ওভারব্রিজ থাকে না। কারণ, পথচারীদের অনেকের জন্যই এটা ব্যবহার উপযোগী না। বিশেষ করে বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল কোনও দেশের শহরে যেখানে মানুষের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্য মানসম্মত নয়। দেশে মোট জনসংখ্যার প্রায় ১০ শতাংশ প্রতিবন্ধী। এর সঙ্গে পাঁচ বছরের কম বয়সের শিশু এবং ৬০ বছরের বেশি বয়সী প্রবীণ, হৃদরোগসহ নানা কারণে অসুস্থ, গর্ভবতী এদের সবাইকে বিবেচনায় নিলে সংখ্যাটা মোট জনসংখ্যার প্রায় ৩০ শতাংশ। তার মানে হলো, ১৬ কোটি মানুষের দেশে এমন একটি ব্যবস্থা চালু আছে যার থেকে প্রায় ৫ কোটি মানুষ কোনও সুবিধাই পায় না। অথচ এমন পদ্ধতি আমরা ব্যবহার করে চলেছি বছরের পর বছর ধরে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ফুট ওভারব্রিজ নিয়ে বুয়েটের কয়েকটি জরিপে দেখা গেছে, অধিকাংশ মানুষই ফুট ওভারব্রিজ ব্যবহার করতে চায় না। তেমনি পথচারীদের অনীহা আন্ডারপাস ব্যবহারেও। রাজধানীতে ৫০টির বেশি ফুট ওভারব্রিজের পাশাপাশি রয়েছে ৪টি আন্ডারপাস। ১২ আগস্ট আরেকটি আন্ডারপাস নির্মাণকাজের উদ্বোধন করা হয়েছে। যদি অধিকাংশ মানুষ এসব ব্যবহার করতে না চায় তাহলে কেন কোটি কোটি টাকা খরচ করে এসব নির্মাণ করা হয়। আর ফুট ওভারব্রিজ এবং আন্ডারপাস যে রাস্তা পারাপারের কার্যকর কোনও পদ্ধতি নয় তার প্রমাণ ক্রমবর্ধমান হারে পথচারীদের সড়ক দুর্ঘটনার শিকার হওয়া। সারা পৃথিবীতেই পথচারীরা এড-গ্রেড বা ভূতলের রাস্তা ব্যবহার করে পারাপার হয়। কোথাও তাদের মাটির নিচে বা শূন্য তুলে দেওয়া হয় না।

প্রতিটি সিগন্যালে গাড়ি দাঁড়ানোর সময়টুকু সুযোগ দিলে পথচারীরা অনায়াসে রাস্তা পার হয়ে যেতে পারেন। কিন্তু তাদের সে ‍সুযোগ দেওয়া হয় না। পথচারীদের রাস্তা পার হওয়ার জায়গাটুকু দখল করে দাঁড়িয়ে থাকে নানা ধরনের যানবাহন। পথচারীরা যে জেব্রা ক্রসিং দিয়ে রাস্তা পার হবেন সেগুলোও প্রায় বিলুপ্তির পথে। ট্রাফিক বিভাগের মনোভাব অনেকটা এমন, যেহেতু নিচ দিয়ে রাস্তা পারই হওয়া যাবে না তাই জেব্রা ক্রসিংয়ের আর দারকার  নেই।

রাজধানীতে রাস্তা পারাপারের ক্ষেত্রে পথচারীরা কতটা অসুবিধায় পড়েন তার একটা উদাহরণ দেওয়া যাক। গাবতলী বাস টার্মিনাল থেকে কলাবাগান বাসস্ট্যান্ডের দূরত্ব প্রায় ছয় কিলোমিটার। পুরো পথে ফুট ওভারব্রিজ আছে সাতটি এবং আন্ডারপাস একটি। অর্থাৎ একজন মানুষকে রাস্তা পার হতে হলে প্রায় এক কিলোমিটার পথ হেঁটে পার হতে হবে। স্বাভাবিকভাবেই সেটা মানুষ করবে না। এছাড়া এই ছয় কিলোমিটার পথে রিকশা করে রাস্তার এক পাশ থেকে অন্য পাশে যাওয়া যায় না। এই পথটির দুই পাশে বসবাসরত লাখ লাখ মানুষ তাদের দৈনন্দিন প্রয়োজনে কীভাবে রাস্তার এক পাশ থেকে অন্য পাশে যাবেন সেটা ভেবে দেখেননি আমাদের সড়ক ব্যবহারের পরিকল্পনা ও ব্যবস্থাপনায় জড়িত বিজ্ঞজনেরা। ফলে অনির্ধারিত জায়গা দিয়ে রাস্তা পার হতে গিয়ে মানুষ দুর্ঘটনার শিকার হন। রাস্তায় গাড়ির গতি কমে যায়। ক্ষেত্রবিশেষে যানজটও তৈরি হয়।

রাস্তায় পথচারীদের চলাচল বাধাহীন করতে অথবা দুর্ঘটনা থেকে পথচারীদের মুক্তি দিতে খুব বেশি কসরত করার প্রয়োজন নেই। প্রথমত, শহরের রাস্তা বিশেষ করে প্রধান সড়কগুলোতে ফুটপাত নির্মাণ করতে হবে। একই সঙ্গে এসব ফুটপাত যাতে ব্যবহার উপযোগী থাকে সে ব্যবস্থা নিতে হবে। ফুটপাত দিতে হাঁটতে গেলে কোনও পার্ক করা দামি গাড়ি কিংবা পুলিশ বক্স যেন পথচারীর গতি রোধ করে না দাঁড়ায়। দ্বিতীয়ত, পর্যাপ্ত জেব্রাক্রসিং-এর ব্যবস্থা করতে হবে এবং ভূতলের রাস্তা দিয়ে একপাশ থেকে অন্যপাশে যাতায়াতের সুযোগ পথচারীকে দিতে হবে। এর সঙ্গে আমাদের ফুটপাত দিয়ে হাঁটতে হবে এবং নির্ধারিত জেব্রাক্রসিং দিয়ে রাস্তা পার হতে হবে। কেউ যাতে ইচ্ছেমতো যেকোনও জায়গা দিয়ে রাস্তা পারাপার হতে না পারে সেজন্য ফুটপাত অথবা সড়ক বিভাজনে গ্রিল লাগাতে হবে। সামান্য এ কাজটুকু করতে পারলেই সড়কে শৃঙ্খলা ফিরে আসবে অন্তত পঞ্চাশ শতাংশ। আর এ কাজে খরচ সবচেয়ে কম। বড় বড় ফ্লাইওভার-মেট্রোর তুলনায় প্রায় কিছুই না।

লেখক: সাংবাদিক

/এসএএস/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ
X