বাড়ছে ডিভোর্সের সংখ্যা: আতঙ্ক নয়, প্রয়োজন অনুধাবন

Send
লীনা পারভীন
প্রকাশিত : ১৫:০০, আগস্ট ৩১, ২০১৮ | সর্বশেষ আপডেট : ১৫:০৭, আগস্ট ৩১, ২০১৮




লীনা পারভীন‘ডিভোর্স’ শব্দটি আমাদের জন্য নানামাত্রার আলোচনার সূত্রপাত করে। সমাজের মধ্যে চলমান পরিবর্তনের ইঙ্গিতও বহন করে। আমরা প্রতিটি ব্যক্তি কতটা সচেতন ডিভোর্স সম্পর্কে? আমাদের দেশ ও সমাজ কতটা ওয়াকিবহাল এবং এ নিয়ে প্রস্তুতিইবা কী?

ডিভোর্স একটি স্বাভাবিক বিষয়। এটা এমন কোনও জটিল বা নিষিদ্ধ বিষয় নয়। প্রতিটা ঘটনারই একটি কারণ থাকে। ডিভোর্স বেড়ে যাচ্ছে বলে যেমন বুক ফাটিয়ে কান্নার বা হতাশ হয়ে যাওয়ার কিছু নেই ঠিক, তেমন বিষয়টিকে ছোট বলেও উপেক্ষা করার কিছু নেই। এ নিয়ে যত আলোচনা হবে ততই আমাদের সবার মাঝে সচেতনতা বাড়বে, কারণ ও প্রতিকার নিয়ে আমরা কাজ করতে পারবো। এখানে মনে রাখা দরকার, বিয়ে হচ্ছে দুটি সুস্থ, সবল ও সচেতন মানুষের একসঙ্গে থাকার আইনগত ও সামাজিক প্রক্রিয়া। এর বাইরে আর অন্য কিছু না। তবে আমাদের সমাজে বিয়েকে একটি প্রতিষ্ঠান হিসাবে মানা হয়। আর এ কারণেই কেন এই প্রতিষ্ঠানটি দিনে দিনে প্রশ্নের সম্মুখীন হয়ে পড়ছে সেটিও পরিষ্কার থাকা এবং সমাজকে প্রস্তুত রাখাটা জরুরি।

সম্প্রতি একটি দৈনিক পত্রিকায় প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, বিবাহ বিচ্ছেদের ক্ষেত্রে নারীর সংখ্যাটাই বেশি। আমাদের পারিবারিক কাঠামোর দিকে নজর দিলেই বুঝা যাবে নারীরা সেখানে কতটা নিষ্পেষিত থাকে। বাস্তব কারণেই যৌথ পরিবার ভেঙে আমরা পেলাম একক পরিবার, যাকে ইংরেজিতে নাম দেওয়া হয়েছে ‘নিউক্লিয়ার ফ্যামিলি’। এই যে যৌথ পরিবার থেকে একক পরিবারের বিবর্তন, এর পেছনের কারণ সম্পর্কে আমরা কতটা সচেতন? আমরা এখন বৈশ্বিক যুগে বাস করি। পরিবারের ঠিকানাও হয়ে গেছে গ্লোবাল। যেখানে অর্থনীতি থেকে রাজনীতি, সমাজ সবকিছুই প্রভাবিত হচ্ছে বৈশ্বিক আবহাওয়ার দ্বারা।

আধুনিক যুগের বাবা-মায়েরা দুজনেই কর্মজীবী। জীবন ও জীবিকার তাগিদে তারা সদা ব্যস্ত থাকেন। আমার পরিবারের মায়ের মূল ভূমিকা ছিল সন্তান মানুষ করা আর কেমন করে সংসার নামক এই বস্তুটির ভেতরে থেকে সবাইকে খুশি করা যায়। কিন্তু দিন পাল্টেছে। ৬০-এর দশকের একজন নারীর সঙ্গে একবিংশ শতকের নারীর তুলনা করে তার ভূমিকাকে মাপতে যাওয়াটা বোকামি। যুগের হাওয়ায় এখন আমাদের সমাজের নারীরা অনেক বেশি সচেতন, নাগরিক ও বৈশ্বিক। তারা এখন কেবল সন্তান জন্ম দেওয়া এবং তাকে মানুষ করার মধ্যেই নিজের জীবনকে উৎসর্গ করতে রাজি না। আমার বাবাকে দেখেছি সংসারের কর্তা হিসেবে তিনি যা বলতেন সেটাই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত বলে মেনে নিতে হতো। আমার মায়ের কিছু বলার থাকলেও বলার জন্য অনুমতি পাননি। একদিকে স্বামীর রাজত্ব আরেক দিকে যৌথ সংসারের অন্যদের মতকে প্রাধান্য দিতে গিয়ে তিনি হয়ে যেতেন মূক ও বধির। নারীদের শেখানো হয় বিয়ের পর স্বামী হচ্ছে মেয়েদের আসল পরিচয় এবং তিনি হচ্ছেন হুকুমদাতা। তার মুখের ওপর কোনও কথা বলা মানে ‘বেয়াড়া নারী’ হয়ে যাওয়া।

সেদিনের সমাপ্তি হয়েছে, কথায় কথায় নারীকে দোষারোপ করা। পুরুষের কর্মের জন্যও নারীকে গালিগালাজ করার দিন এখন আর নেই। যে নারী দিনের পর দিন পরিবারের সবার অত্যাচার সহ্য করতো নীরবে, তারা এখন প্রতিবাদ করতে শিখেছে। নিজের অস্তিত্ব ও সম্মান রক্ষায় যথেষ্ট শক্ত। পরনির্ভরশীলতার চিন্তা বাদ দিয়ে নিজের ইনকামের ওপর নির্ভর করতে চায়। আমার মা চাচিদের একটা সামান্য ব্লাউজের জন্যও অন্যের মুখাপেক্ষী হতে হতো, আর আমি নিজেই নিজের চাহিদা পূরণ করছি। এই যে বেসিক পার্থক্য এই বিষয়টিকে উপেক্ষা করার বাস্তবতা আছে কি?

একদিকে নারীদের সচেতনতা, গোটা বিশ্বজুড়ে পরিবর্তনের হাওয়া আর অন্যদিকে অর্থনৈতিক পটপরিবর্তনের মাঝে প্রতিটা মানুষের মাঝে ব্যক্তিবাদের যে ঊর্ধ্বগতি সেটিকেওবা অস্বীকার কেন করবো? আমরা একেক সময় একেক বিষয় নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে উঠি। প্রতিটাতেই এক ধরনের সামাজিক অবক্ষয়কে কারণ হিসাবে দেখি। কিন্তু বিবাহ বিচ্ছেদ কি আমরা সামাজিক মূল্যবোধের অবক্ষয় হিসাবে বলতে পারি? উত্তরটি একদম পরিষ্কার। আমাদের সমাজে পরিবার প্রথা থেকে প্রতিটা জায়গায় নীরবে পরিবর্তনের হাওয়া বয়ে যাচ্ছে কিন্তু সেই হাওয়ার সঙ্গে তাল মিলাতে প্রস্তুত নয় আমাদের মেধা, মনন ও পরিবেশ।

‘সংসার’ হচ্ছে যৌথতার ভিত্তিতে গড়ে ওঠা প্রতিষ্ঠান যেখানে একজন নারী ও পুরুষের সমান ভূমিকা থাকা জরুরি। এখানে কেউ কারও স্বামী নয় বা অধীনে নয়। এর ভালো বা মন্দের ভাগ দুজনকেই নিতে হয়। একজন পুরুষকে যেমন ভাবতে হবে শিক্ষিত, সচেতন ও সম ক্ষমতাসম্পন্ন নারীর সঙ্গে কেমন ব্যবহার করতে হবে ঠিক একজন নারীকেও ভাবতে হবে তিনি নিজের অবস্থানকে তুলে ধরতে কী কী ইতিবাচক ভূমিকা রেখেছেন। কিন্তু বিষয়গুলো কি সেভাবে ডিল করা হচ্ছে? একটি পরিবারে একজন নারীর মত প্রকাশের স্বাধীনতা কতটা? তার স্বাধীনভাবে চলাফেরার স্বাধীনতাকে কতটা স্বীকৃতি দেওয়া হচ্ছে? একজন নারীর যে সামগ্রিক চাহিদা সেগুলোকে স্বীকৃতি দেওয়া হয় কি? বা যিনি জীবনসঙ্গী হিসাবে আছেন তিনি কতটা গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করছেন? চাহিদাকে অবদমিত করে নয় বরং চাহিদাকে সঠিকভাবে উপলব্ধি করে সহায়তার হাত বাড়িয়ে না দিলে সেখানে মনকষাকষি আসবেই।

আগেই বলেছি আমরা এখন গ্লোবাল পরিবার ধারণার মধ্যে আছি। সেখানে প্রতিনিয়ত প্রতিটি মানুষের চাহিদার পরিবর্তন আসছে। আর এই চাহিদার পরিবর্তনকেই যদি দুটি একত্রে থাকা মানুষ চিনতে না পারে তখন সেখানে বিশ্বাস, অবিশ্বাসের বিষয় আসে। আরেকটি বিষয়, একসঙ্গে থাকা মানেই কিন্তু একে অন্যের সবকিছুতেই প্রাধান্য বিস্তার করবে এটাও এখন আর বাস্তবতা নয়। প্রতিটা মানুষেরই একান্ত নিজস্ব বলে কিছু বিষয় থাকে। সে জায়গাটিকে স্বীকৃতি দিতেই হবে। নিজেদের মধ্যে যদি এই স্পেস না দেওয়া যায় তাহলে সমস্যা ছোট থেকে বড় হতে থাকে। কম্প্রোমাইজ করতে হলে দুজনকেই বাস্তবতার নিরিখে করতে হবে। দুজন মানুষের মধ্যে যদি রুচি, সংস্কৃতি, আস্থা ও বিশ্বাসের সংকটের মাত্রা তীব্র হয়ে যায় তখন সম্মানের সঙ্গে নিজেদের আলাদা করে ফেলাটাই হচ্ছে বুদ্ধিমানের কাজ। দিনের পর দিন তিক্ততা বিতৃষ্ণা আর অশ্রদ্ধার সম্পর্ক টেনে নিয়ে চলার মতো বড় শাস্তি ও অযৌক্তিকতা কিছু হয় না।

একটি সংসার ভেঙে গেলে আঘাতটি বড় হয়ে আসে সন্তানদের ওপর। প্রতিবেদনে সেটিও এসেছে। আর তাই বিষয়টি নিয়ে আরও গভীরভাবে ভাবতে হবে নারী ও পুরুষ দুজনকেই। অশ্রদ্ধার সম্পর্ক যেমন টেনে নিয়ে যাওয়া যায় না আবার কেবল স্বেচ্ছাচারিতা বা একান্তই নিজের ভালো লাগা মন্দ লাগা দিয়ে পরিচালিত হয়ে অন্যান্য দায়িত্বের বিষয়টিকে উপেক্ষা করাটাও বিপজ্জনক। সন্তানের দায় কেবল একা নারীর নয়। বিবাহিত সম্পর্ক ভেঙে যাওয়ার ক্ষেত্রে যেমন বাস্তব কারণ নিহিত, তেমনি প্রস্তুতি নিতে না পারার মতো কারণও বর্তমান। নিজেদের আগে বুঝতে হবে, জানতে হবে এবং প্রতি মুহূর্তের অ্যানালাইসিস করেই সন্তানের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। এই বিষয়ে আমাদের সামাজিক প্রতিষ্ঠানগুলো ভূমিকা রাখতে পারে। নারী পুরুষ কারও কিন্তু কথা বলার মতো জায়গা নেই আমাদের দেশে। এই দমবন্ধ করা পরিবেশ থেকে তাই অস্থির মন মুক্তি পেতে চায়। কেবল ডিভোর্সেই কাঙ্ক্ষিত মুক্তি আসছে না। তাই ডিভোর্সের কারণগুলো যেমন পুঙ্খানুপুঙ্খ বিশ্লেষণ করতে হবে, ঠিক তেমনি পরিবর্তিত পরিবেশ ও প্রতিবেশকে মাথায় নিয়ে নিতে হবে সঠিক ও সময়োপযোগী প্রস্তুতিমূলক কার্যক্রম।

 

/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ