ঢাকা শহরের জলাবদ্ধতার স্থায়ী ডিজিটাল সমাধান

Send
মো. আনোয়ার হোসেন
প্রকাশিত : ১৮:১২, অক্টোবর ০২, ২০১৮ | সর্বশেষ আপডেট : ১৮:১৬, অক্টোবর ০২, ২০১৮

মো. আনোয়ার হোসেনশিরোনাম দেখে চমকে যেতে পারেন! ডিজিটাল পদ্ধতি আবার কীভাবে জলাবদ্ধতা দূর করতে পারে? আসলে এই দীর্ঘ সমস্যাটির সমাধান ডিজিটাল প্রযুক্তিতেই সম্ভব। যাই হোক, পদ্ধতিটি কিছুটা ব্যয়বহুল। তবে বর্তমান ঢাকার অবস্থা ও স্থায়ী সমাধানের জন্য পদ্ধতিটি ব্যয় বহুল হলেও প্রয়োগ করা অসম্ভব নয়। পদ্ধতিটি সঠিকভাবে পরিকল্পনা, ডিজাইন ও প্রয়োগ করতে পারলে ঢাকা শহরের জলাবদ্ধতার স্থায়ী ও দীর্ঘমেয়াদি সমাধান সম্ভব। শুধু ঢাকা নয়, দেশের সব মেট্রোপলিটন সিটিতে পদ্ধতিটি প্রয়োগ করা যাবে।
বেলজিয়ামের গেন্ট বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিবেশের স্যানিটেশান বিষয়ে উচ্চ শিক্ষার সময় পানি পরিশোধনের জন্য স্যুয়ারেজ ওয়াটার ও বৃষ্টির পানির রানঅফ সংগ্রহের পদ্ধতির ওপর প্র্যাকটিক্যাল করার সময় আমাদের একটি বিশেষ ধরনের পদ্ধতি হাতে-কলমে শেখানো হয়। একজন কৃষি ও পরিবেশ প্রকৌশল বিশেষজ্ঞ হিসেবে আমি ওই শেখানো পদ্ধতির আদলে কিছুটা পরিবর্তন, পরিবর্ধন ও যোজন-বিয়োজন করে এই পদ্ধতিটির প্রস্তাব করছি। 
বছর ঘুরে বর্ষা আসছে-যাচ্ছে। যথারীতি ঢাকা শহর বৃষ্টির পানিতে জলমগ্ন হচ্ছে। জনগণ সীমাহীন দুর্ভোগের শিকার হচ্ছে। জনপ্রতিনিধিরা পানিতে নেমে প্রতিশ্রুতির দিচ্ছেন,  ছবিসহ খবরের কাগজ ও টেলিভিশন জলাবদ্ধতার কথা ফলাও করে প্রচার করছে। এই চিত্রটি আমাদের গা-সওয়া হয়ে গেছে। বিভিন্ন বিশেষজ্ঞরা ঢাকা শহরের জলাবদ্ধতার জন্য নিষ্কাশন খাল ভরাট ও খাল দখল হওয়া, জলাশয় বা পুকুর ভরাট হয়ে যাওয়া, নদীর গভীরতা কমে যাওয়া, নদী দখল হওয়া ইত্যাদি কারণগুলোকে দায়ী করছেন। সমাধানের জন্য দখল হওয়া খাল দখলমুক্ত করে খননের কথা বলছেন। দখলমুক্ত করার পর আবার দখল হয়ে যাচ্ছে। সিটি করপোরেশান বা সরকার সার্বক্ষণিক তদারকি করে খাল দখলমুক্ত রাখতে পারছে না। জলাশয় বা পুকুর ভরাট করে আবাসিক এলাকা বা শপিংমল করা হচ্ছে, যা পরিবর্তন করে বা ভেঙে ফেলে পুনরায় জলাশয়ে রূপান্তর করা কার্যত অসম্ভব। নদী খনন করে নাব্যতা রক্ষা করার সংস্কৃতি আমাদের দেশে এখনও নগণ্য। এসব কারণেই প্রচলিত প্রাকৃতিক পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা ব্যর্থ হচ্ছে। ভবিষ্যতে এই ব্যবস্থা আরও ব্যর্থ হবে। কারণ জলবায়ুর পরিবর্তনের ফলে অতিরিক্ত বৃষ্টিপাত হবে এবং সঙ্গে-সঙ্গে অনিয়ন্ত্রিত জনসংখ্যার বৃদ্ধির জন্য গৃহস্থালী কাজে বেশি পানি ব্যবহারের ফলে বর্জ্যপানি বাড়বে। প্রচলিত পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা ওই বিপুল পানি পরিবহন করে কুলিয়ে উঠতে পারবে না। নদীগুলো ভরে থাকবে। ফলে নদীতে পানি যেতে পারবে না। প্রচলিত নিষ্কাশন ব্যবস্থার ব্যর্থতা অর্থাৎ নিষ্কাশন খাল হয়ে পানি নদী বা কোনও জলাশয়ে যাওয়ার প্রতিবন্ধকতার জন্য ঢাকা শহরে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হচ্ছে।

আমার প্রস্তাবিত ব্যবস্থাটি প্রাকৃতিক বা প্রচলিত পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থার ওপর খুব একটা নির্ভর করবে না। তাই নির্বিঘ্নে কাজ করতে পারবে।

আমার প্রস্তাবিত পদ্ধতিটি তিনটি প্রধান অংশ নিয়ে গঠিত– প্রথমত, পানি সংগ্রহকারী নালা ও পাইপলাইন, দ্বিতীয়ত, ভূগর্ভস্থ সঞ্চয় ট্যাংক বা জলাধার এবং তৃতীয়ত, ফোর্স পাম্পিং। পদ্ধতিটি একটু পরিষ্কারভাবে আলোচনা করা যাক। বিশেষ এলাকা অনুযায়ী মাটির নিচে বিশাল জলাধার তৈরি করতে হবে এবং সংগ্রহকারী ড্রেনের সঙ্গে পাইপের মাধ্যমে সংযোগ তৈরি করতে হবে। ফলে ওই এলাকার পানি দ্রুত  সরে গিয়ে জলাধারে জমতে থাকবে। পরবর্তী সময়ে সুযোগমতো জলাধারে রক্ষিত পানি পম্পিং করে পাইপের ভেতর দিয়ে ঢাকার পাশের নদীতে বের করে দিতে হবে। একটি উদাহরণের মাধ্যমে বিষয়টি পরিষ্কার করা যাক। ধরা যাক মিরপুরের পল্লবী এলাকার জলাবদ্ধতার উন্নয়ন করতে হবে। এই এলাকার বিশেষ কোনও জায়গার ৫০/৬০ মিটার মাটির গভীরে ডিজাইনমতো কয়েক কোটি লিটার পানি ধারণ ক্ষমতার জলাধার তৈরি করতে হবে এবং পাইপের মাধ্যমে পানি সংগ্রহ নালার সঙ্গে যুক্ত করে দিতে হবে। পানি দ্রুত পরিবাহিত হয়ে জলাধারে জমা হবে এবং এলাকাটি আর জলমগ্ন থাকবে না। জলাধারটির সঙ্গে সংযুক্ত থাকবে সেন্সর, অটোমেটিক পাম্প ও ভূগর্ভস্থ পাইপের নেটওয়ার্ক। জলাধারের পানির উচ্চতা নির্দিষ্ট মাত্রায় পৌঁছানোর সঙ্গে সঙ্গে পাম্প চালু হবে এবং নিকটতম নদী তুরাগে ডিসচার্জ করে দেবে। প্রয়োজন হলে পানি পার্শ্ববর্তী এলাকার জলাধারে ট্রান্সফার করতে পারবে, যদি সেখানে পানির পরিমাণ কম থাকে এবং পানি জমিয়ে রেখে শুষ্ক মৌসুমেও নদীতে বের করে দিতে পারবে। এই প্রক্রিয়া মাটির নিচে কোনও বাধাবিঘ্ন ছাড়াই সার্বক্ষণিক চলতে পারবে। ফলে পানি তাড়াতাড়ি সরে গিয়ে জলাবদ্ধতা থেকে সংশ্লিষ্ট এলাকাকে রক্ষা করবে। এছাড়া সঞ্চিত পানি শুষ্ক মৌসুমে সামান্য পরিশোধনের মাধ্যমে বা পরিশোধন ছাড়া সেচ, শৌচকর্ম ও গৃহস্থালীর বিভিন্নকাজে ব্যবহার করার সুযোগ রয়েছে।

এই পদ্ধতিটি প্রয়োগ করতে হলে উচ্চ প্রকৌশল জ্ঞান, পরিবেশ ও পানি ব্যবস্থাপনা অভিজ্ঞতা এবং সার্বক্ষণিক তদারকির জন্য উচ্চ প্রযুক্তির ও টেকনিক্যাল জ্ঞানের লজিংস্টিক সাপোর্ট প্রয়োজন হবে। প্রকল্প আকারে কাজটি শুরু করতে হলে প্রথমে ঢাকা শহরকে বিশেষ এলাকা অনুযায়ী ভাগ করতে হবে। সে অনুযায়ী ভূগর্ভস্থ জলাধারের স্থান নির্বাচন করতে হবে। দ্বিতীয় ধাপে পানি সংগ্রহ নালার সঙ্গে জলাধারের সংযোগ করার জন্য পাইপলাইন স্থাপনের জন্য জায়গা নির্বাচন করতে হবে, যেন পানি দ্রুত সময়ে সংগ্রহ নালা থেকে জলাধারে প্রবেশ করতে পারে। তারপর প্রতিটি এলাকার জলাধারের মধ্যে ইন্টারকানেকটিং পাইপের মাধ্যমে সংযোগের পথ নির্বাচন করতে হবে। শেষে ঢাকার চারিপাশের নদীতে পাম্প করে পানি বের করে দেওয়ার জন্য পাইপলাইন স্থাপনের পথ চিহ্নিত করতে হবে। প্রতিটি জলাধার ও পাম্পিং সিস্টেম ডিজিটাল সিস্টেমের মাধ্যমে একটিমাত্র নিয়ন্ত্রণ কক্ষের সঙ্গে যুক্ত থাকবে। সেখান থেকে পর্যবেক্ষণ ও নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। সিস্টেমে কোনও সমস্যা হলে লজিস্টিক সাপোর্ট দ্রুততার সঙ্গে সমাধান করবে।

ভূগর্ভস্থ জলাধারগুলো সঠিকভাবে ডিজাইন ও কনস্ট্রাকশান করা অনেক গুরুত্বপূর্ণ। কারণ মাটির অনেক গভীরে অর্থাৎ ৫০/৬০ মিটার নিচে জলাধারগুলো নির্মাণ করতে হবে। মাটির নিচে চাপ ও তাপমাত্রা অনেক বেশি। তাই ডিজাইন ও কনস্ট্রাকশান পারফেক্ট হতে হবে। নিম্নমানের নির্মাণ হলে জলাধারগুলো দীর্ঘস্থায়ী হবে না। সেজন্য পারফেক্ট ফার্স্ট গ্রেডের কনস্ট্রাকশান ওয়ার্ক হতে হবে, যেন পানি চুইয়ে ভূগর্ভস্থ পানি দূষিত করতে না পারে। এছাড়া বর্জ্যমিশ্রিত পানি কোরোসিভ বা ক্ষয়কারী হবে এবং জলাধারকে ক্ষয় করতে চাইবে। তাই কোরোসিভ বা ক্ষয় প্রতিরোধী জলাধার নির্মাণ করতে হবে। ঢাকার বর্তমান অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে ড্রেনের পানিতে প্রচুর কাদামাটি ও বালি থাকে। এছাড়া ভাসমান থেকে ডুবন্ত নানা ধরনের আবর্জনাও থাকে। এগুলো স্ক্রিনের মাধ্যমে পৃথক করার ব্যবস্থা রাখতে হবে। জলাধারে পানি আসার পর বালি ও কাদামাটি তলানি হিসেবে নিচে জমবে। তাই এগুলোকে সংগ্রহ করে কম্পোস্ট হিসেবে ব্যবহার করার ব্যবস্থা করতে হবে। সর্বোপরি তদারকির জন্য প্রবেশ ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা রাখতে হবে।

উল্লেখ্য, এই পদ্ধতিতে যে পানি নদীতে বের করে দেওয়া হবে, তা অনেক পরিষ্কার ও দূষণমুক্ত হবে। ফলে নদী দূষণের মাত্রা কমবে।

 পদ্ধতিটি ভালোভাবে কার্যকর করতে হলে ঢাকা শহরের গৃহ/দোকান/বাজারের বর্জ্য ব্যবস্থাপনার পরিবর্তন করতে হবে অর্থাৎ সোর্স সেপারেশান ও প্রাথমিক কালেকশান সম্পন্ন বর্জ্য ব্যবস্থাপনা প্রবর্তন করতে হবে।  রাস্তা ও দোকান বা রাস্তা ও বাসাবাড়ি বা রাস্তা ও ফুটপাথের মাঝে উন্মুক্ত মাটির অবস্থান রাখা যাবে না। কারণ, মাটি বৃষ্টির পানিতে ধুয়ে ড্রেনেজ লাইন বা পাইপ বন্ধ করে দেয়। রাস্তার ডিভাইডারের মাঝে সৌন্দর্য্য বর্ধক গাছ লাগানোর জন্য যে মাটি ব্যবহার করা হয়, তা ডিভাইডারের সাইড ওয়ালের চেয়ে নিচুতে রাখতে হবে। কারণ, বৃষ্টির পানিতে মাটি ধুয়ে ড্রেনজে পাইপ ব্লক করে দেয়। দোকান বা বাজার ঝাড় দিয়ে ময়লা রাস্তায় বা ড্রেনে ফেলা বন্ধ করতে হবে। ওই বিষয়গুলো নিয়ন্ত্রণ করা গেলে ভূগর্ভস্থ ট্যাংকে তলানিরূপে জমা বালি/পলি বা হিউমাসের পরিমাণ খুবই কম হবে। ফলে রক্ষণাবেক্ষণ ও ব্যবস্থাপনার ব্যয় বহুল অংশে কম হবে।

বর্তমানে জলাবদ্ধতার ইস্যুটি ঢাকার প্রধান সমস্যা হওয়ায় স্থায়ী সমাধানের ব্যবস্থা গ্রহণ করা যুগোপযোগী ও কার্যকরী পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। সরকার, বর্তমান মেয়রদ্বয় জলাবদ্ধতার স্থায়ী ও দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের জন্য প্রস্তাবিত পদ্ধতিটি পর্যালোচনা ও সম্ভাব্যতা যাচাই করতে পারেন। সম্ভব হলে পর্যায়ক্রমে বাস্তবায়ন ও প্রয়োগের ব্যবস্থা করতে পারেন। একটি কথা জানানো উচিত, ঢাকায় ভবিষ্যতে ভূমিতে বা সারফেসে কোনও বড় ড্রেন ও জলাশয় তৈরি করা সম্ভব হবে না। তাই ভবিষ্যতে জলাবদ্ধতা নিরসনে ভূগর্ভস্থ সিস্টেম ছাড়া কোনও বিকল্প নেই বলে মনে করি। সেক্ষেত্রে আমার প্রস্তাবিত পদ্ধতিটি উপযুক্ত ও যুগোপযোগী হবে বলে আমি বিশ্বাস করি।

লেখক: অধ্যাপক, ফার্ম স্ট্রাকচার অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, ময়মনসিংহ।

 

/এসএএস/এমএনএইচ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ