ঐক্যের বিভ্রান্তি

Send
সৈয়দ ইশতিয়াক রেজা
প্রকাশিত : ১৪:১৯, অক্টোবর ০৩, ২০১৮ | সর্বশেষ আপডেট : ১৪:২২, অক্টোবর ০৩, ২০১৮

সৈয়দ ইশতিয়াক রেজানির্বাচন আসছে, জোট জোট খেলা বাড়ছে। যেহেতু নির্বাচনের সময়কার জোট বা ঐক্য, তাতে বোঝাই যাচ্ছে এগুলো সুবিধাবাদের জোট, আদর্শের নয়। এই ঐক্য প্রক্রিয়ার সৈনিকেরা যেসব দাবি-দাওয়া পেশ করছেন, সেসবের কোনও লক্ষ্য নেই। তবে এসবকে যদি লড়াই ধরি, তবে তার মূল নিশানা আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে।
তারা বলছেন শুদ্ধ নির্বাচন চান। এটি সবাই চায়। তবে তারা তারচেয়ে বেশি করে সামনে আনছেন মহাজোট সরকারের ‘গণবিরোধী নীতি ও পাহাড়প্রমাণ দুর্নীতির প্রসঙ্গকে। তবে যাদের সঙ্গে ঐক্য সেই দলের দুর্নীতির কথাও বহুলভাবে আগেই উচ্চারিত। বিএনপির সঙ্গে সমঝোতার প্রশ্নে জামায়াতের মতো সাম্প্রদায়িক ও স্বাধীনতাবিরোধী দলের বিরোধিতা করছেন ড. কামাল হোসেন ও সাবেক রাষ্ট্রপতি অধ্যাপক বি. চৌধুরী। আবার একথাও সত্য এই ঐক্য প্রক্রিয়ায় এমন নেতাও আছেন, যারা বিএনপির সঙ্গে নির্বাচনি বোঝাপড়ার ইঙ্গিত দিতে গিয়ে জামায়াত প্রশ্নে কৌশলগত ‘নমনীয়তা’ দেখাতে প্রস্তুত।
সরকার বা সরকারি দল উন্নয়নের কথাই বেশি বলছে। তাদের ভাষায় বাংলাদেশ উন্নয়ন মহাসড়কে তার দৃপ্ত পদচারণা ঘোষণা করেছে। সাত শতাংশ প্রবৃদ্ধি, মেগা প্রকল্প নিজস্ব অর্থায়নে বাস্তবায়ন করার সময় সামাজিক অগ্রগতির প্রতিটি সূচকে দক্ষিণ এশিয়ার সেরা বাংলাদেশ। সরকার মনে করে এই উন্নয়নের গতিকে টেনে ধরতেই এই ঐক্য বা জোট।
দেশে এই সময় নির্বাচন হবে এবং সেখানে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকারকে উৎখাত করার জন্য লড়াই হবে, এমন একটা ধারণা বা ভাবনা ঠিক স্বাভাবিক নয়। কারণ জানা দরকার হয়– আগে যারা ছিল জনবিরোধী, দুর্নীতিগ্রস্ত, তারাই ১০ বছর পর কী করে মিত্রশক্তি হয়ে যায়? তথাকথিত উদারপন্থীদের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, আওয়ামী লীগ প্রশ্নে সব দলের একক অবস্থান নেওয়া। তাদের ভাবনা আওয়ামী লীগবিরোধী সব ভোট একত্রিত  করতে পারলে বঙ্গবন্ধুর দলটিকে অপ্রাসঙ্গিক করে ফেলা সম্ভব হবে।
এই ভাবনা কতটা বাস্তব সে এক বড় জিজ্ঞাসা। দেশের মানুষ আওয়ামী লীগের ১০ বছরের শাসনের অনেক সমালোচনা করবে, এটা ঠিক। করার সুযোগও আছে। কিন্তু একথাও ভাবা দরকার অধিকাংশ মানুষই যেকোনও নীতিহীন, জগাখিচুড়ি বিকল্প মেনে নেবে? সরকার পরিবর্তনের নামে যদি দিনশেষে মানুষের সঙ্গে প্রতারণা করা হয়, তাহলে তা জনগণ গ্রহণ করবে? ব্যাংকিং কেলেঙ্কারির মতো বড় আকারের দুর্নীতি, বেকারদের চাকরির সুযোগ বড় আকারে তৈরি করতে না পারা সবই সত্য। একথাও সত্য যে আর্থসামাজিক উন্নয়নের জায়গা নিয়েছে সরকারি পয়সায় দেদার মচ্ছব। কিন্তু আমরা শাসক দলের এসবের বিরুদ্ধে সময় মতো একটা বড়সড় আন্দোলন খাড়া করতে ব্যর্থ হতে দেখেছি এসব রাজনীতিককে। তাই প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক, শুধু নির্বাচনের সময় সুবিধা নেওয়া কতটা যৌক্তিক?
এদেশের রাজনীতিতে বিভিন্ন দল ও আদর্শের প্রতিযোগিতামূলক দ্বন্দ্ব ক্রমেই বাড়ছে। ক্ষমতার দ্বন্দ্ব আছে, আছে আদর্শের দ্বন্দ্বও। রক্ত দিয়ে কেনা স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালে বাংলাদেশের প্রথম সংবিধানে ধর্মনিরপেক্ষতার পক্ষে আর ধর্মীয় রাজনীতির বিরুদ্ধে স্পষ্ট অবস্থান নেওয়া হয়। কিন্তু সে অবস্থান টেকেনি। বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যার মধ্য দিয়ে উল্টোপথে যাত্রা করে দেশ। হয়ে উঠতে থাকে এক নতুন পাকিস্তান। পাকিস্তানপন্থীদের সামরিক অভ্যুত্থানের পর সংবিধান সংশোধন করে ধর্মকেই করা হলো সবকিছুর অভিজ্ঞান। অথচ এদেশের শান্তিপ্রিয় মানুষ অসাম্প্রদায়িক থেকেও প্রকৃত ধার্মিক থেকেছে যুগের পর যুগ। ঘোষিত হলো ইসলাম রাষ্ট্রধর্ম। রাষ্ট্রের কোনও ধর্ম থাকে না, তবু বাংলাদেশ নামের সেক্যুলার রাষ্ট্রটির ওপর একটি নির্দিষ্ট ধর্মকে আরোপ করতে হয়েছিল একটি বিশেষ রাজনৈতিক মতাদর্শের চাপে।
বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর থেকে রাজনীতির নামে দেশব্যাপী লক্ষাধিক শুধু মাদ্রাসা হয়েছে, এখনো হচ্ছে। স্কুল হয়েছে বা হচ্ছে খুব কম। দীর্ঘ সময় ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা হলো সরকারি ও বিদেশি পৃষ্ঠপোষকতায়, ধর্মভিত্তিক এক অসম শিক্ষাব্যবস্থার ডালপালাও বিস্তারের সুযোগ করে দেওয়া হলো দেশব্যাপী। ধর্মনিপেক্ষ মুক্তচিন্তার সব পথ দ্রুত রুদ্ধ করে এক পশ্চাৎপদ দেশ হলো বাংলাদেশ।
বাংলাদেশের নতুন করে আবার উদারতার পথে যাত্রা, তাই বারবার আক্রমণের শিকার। দেশীয় প্রতিক্রিয়াশীলচক্র যেমন, তেমনি তাদের সঙ্গে পরিকল্পনামাফিক যোগ দিয়েছে সেসব আন্তর্জাতিক শক্তি, যারা ১৯৭১ সালে আমাদের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছিল।
বিদেশিদের তৎপরতাও লক্ষণীয়। বাংলাদেশের সমস্যা বাংলাদেশই সমাধান করবে। কারও সাহায্য নামক উৎপাতের প্রয়োজন নেই। অতীতে বাংলাদেশ এর চেয়ে বড় সমস্যা মোকাবিলা করে সফল হয়েছে।
তাই ঘোলাটে চিন্তাভাবনা থেকে ঐক্য হলে তা সম্পূর্ণ বিভ্রান্তিতে রূপান্তরিত হবে। ধর্মীয় শক্তিকে কাজে লাগিয়ে ক্ষমতায় যেতে চাওয়া দলের সঙ্গে উদারবাদীদের জোট হয় কী করে? এই নীতিগত বিভেদের মীমাংসা না করে ঐক্য নিয়ে বেশিদূর এগুনো যাবে বলে ধারণা করা যায় না। এরকম একটি বিকল্প দিয়ে মানুষের, বিশেষত খেটে খাওয়া মানুষের কী লাভ হবে, এমন প্রশ্ন নিশ্চয়ই করা যায়। অপশাসনের থেকে মুক্তির পথ কোনও শর্টকাট ধরে আসবে না। শ্রমজীবী মানুষের দাবি-দাওয়ার ভিত্তিতে সংগঠিত গণআন্দোলনের মধ্য দিয়ে, বিকল্প নীতির ভিত্তিতে একটি উদারপন্থীদের জোট গঠন করেই তা সম্ভব। শুধুমাত্র নির্বাচনকালীন যেনতেন ঐক্য করে বড় কিছু আদায় হবে না।

লেখক: প্রধান সম্পাদক, জিটিভি ও সারাবাংলা

/এসএএস/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ