এসএমই ব্যবসা খাতে বিনিয়োগ নিশ্চিত করবে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি

Send
মোহাম্মদ ইমতিয়াজ উদ্দিন
প্রকাশিত : ১৪:১৩, অক্টোবর ২৬, ২০১৮ | সর্বশেষ আপডেট : ১৬:১১, ডিসেম্বর ১৮, ২০১৯

মোহাম্মদ ইমতিয়াজ উদ্দিনসম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংক এসএমই খাতের গুরুত্ব ও পরিধি বিবেচনা করে এসএমই’কে নতুন করে সিএমএসএমই হিসেবে সংজ্ঞায়িত করেছে অতিক্ষুদ্র, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগ।

বাংলাদেশের উন্নয়নশীল রাষ্ট্রের স্বীকৃতি অর্জনে অতিক্ষুদ্র, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের উন্নয়ন এবং কৃষিজ উৎপাদনের সাফল্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনার অংশ হিসেবে এসএমই শিল্পের উন্নয়নের বিষয়টি অধিকতর গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচিত হয়েছিল। তারই ফলে বাংলাদেশ ব্যাংক এসএমই খাতকে সহজ শর্তে ও দ্রুত আর্থিক সেবা প্রদানের লক্ষ্যে ২০১০ সাল থেকে তৎকালীন গভর্নর ড. আতিউর রহমান এবং বর্তমান গভর্নর ফজলে কবিরের সুচিন্তিত দিকনির্দেশনায় সরকারি ও বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকের মাধ্যমে নানা ধরনের আর্থিক সেবা ও সচেতনতা বৃদ্ধিমূলক কর্মসূচি বাস্তবায়ন করে আসছে। তাই গত ১০ বছরে বাংলাদেশ সরকার তথা বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাত এসএমই ব্যবসার উন্নয়নের বিশেষ ভূমিকা রেখেছে। সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দেশজুড়ে ৬০ লাখ সিএমএসএমই ব্যবসা বা উদ্যোক্তা রয়েছে।

সিএমএসএমই ব্যবসার প্রতি জোর দেওয়ার বেশ কিছু কারণ রয়েছে বাংলাদেশ সরকারের। এর অন্যতম প্রধান কারণ হচ্ছে কর্মসংস্থান সৃষ্টি। বাংলাদেশে যে পরিমাণ শিক্ষার হার বাড়ছে, সে দক্ষতা অনুযায়ী একই পরিমাণে কর্মসংস্থানের হার বাড়ছে না। সব উদ্যোক্তার ভারী শিল্পে বিনিয়োগের ক্ষমতাও নেই। সেক্ষেত্রে, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের বিকাশ শুধু উদ্যোক্তাদের সংখ্যাই বাড়াবে না, এর সঙ্গে সম্পৃক্ত কাজে কর্মসংস্থানও সৃষ্টি করবে।

এছাড়াও রয়েছে আরও নানা কারণ। মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হওয়ার পাশাপাশি বাংলাদেশ আমদানিনির্ভর দেশ থেকে রফতানিনির্ভর দেশে পরিণত হচ্ছে। যেসব কাঁচামাল আগে আমদানি করতে হতো, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের বিকাশে সেসব পণ্য দেশের চাহিদা মিটিয়ে রফতানি করা সম্ভব। এর ফলে, জিডিপি’তে অবদান বাড়বে, দারিদ্র্য  হ্রাস পাবে এবং মাথাপিছু আয়ও বৃদ্ধি পাবে। আর সর্বোপরি কারণ হিসেবে থাকছে দেশের জনসাধারণের আর্থিক অন্তর্ভুক্তি। বাংলাদেশ সরকারের এই লক্ষ্য শুধুমাত্র জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রারর সঙ্গে সামঞ্জস্য রাখার জন্যই নয়,বরং মধ্যম আয়ের দেশ হওয়ার লক্ষ্যমাত্রার সঙ্গেও সামঞ্জস্যপূর্ণ। এ পরিবর্তনের আওতায় বাংলাদেশ ব্যাংক এসএমই ব্যবসায়ের সংজ্ঞাও পরিবর্তন করেছে। উৎপাদন শিল্পে যদি জমি ও স্থাপনা ছাড়া সম্পদের পরিমাণ ৫০ কোটি টাকা পর্যন্ত হয় এবং জনবল ৩শ’র মধ্যে থাকে, তাহলে সেই ব্যবসাকে এসএমই ব্যবসা বলা যেতে পারে। তৈরি পোশাক খাতে অবশ্য জনবলের পরিমাণসীমা এক হাজার জন।

সিএমএসএমই ব্যবসাগুলো যেন ব্যাংকগুলো থেকে সহজেই ঋণগ্রহণ করতে পারে এজন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের কিছু দিকনির্দেশনাও দেওয়া হয়েছিল। বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতিমালা অনুযায়ী প্রত্যেকটি ব্যাংকের সার্বিক ঋণ পোর্টফোলিওর ২০ শতাংশ হতে হবে এসএমই ঋণ। এরমধ্যে ৩০ শতাংশ ঋণ উৎপাদন খাতে, ১৫ শতাংশ সেবাভিত্তিক খাতে এবং ৫৫ শতাংশ ঋণ ট্রেডিং খাতে বিতরণ করতে হতো। কিন্তু ইতোমধ্যে বাংলাদেশ ব্যাংক উক্ত হার পরিবর্তন করে ২০২১ সালের মধ্যে ব্যাংকগুলোর জন্য সিএমএসএমই লক্ষ্যমাত্রা সার্বিক ঋণ পোর্টফোলিওর ৩০ শতাংশ নির্ধারণ করেছে, যার মধ্যে ৪০ শতাংশ ঋণ উৎপাদন খাতে, ২৫ শতাংশ সেবাভিত্তিক খাতে এবং ৩৫ শতাংশ ঋণ ট্রেডিং খাতে নতুন লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়।

তবে, আনন্দের বিষয় হচ্ছে প্রিমিয়ার ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের দূরদর্শী পরিকল্পনার অংশ হিসাবে ২০১৬ সাল থেকে সিএমএসএমই ঋণ বিতরণ আস্তে আস্তে বৃদ্ধি করে এবং ব্যাংকটির ইতোমধ্যে সার্বিক ঋণ পোর্টফোলিওর ৩৫ শতাংশ ঋণ সিএমএসএমই খাতে বিতরণ করেছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী ২০২১ সালের মধ্যে সামগ্রিক ঋণের ৬০ শতাংশ সিএমএসএমই খাতে বিতরণের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে, যেখানে বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতিমালায় এই লক্ষ্যমাত্রা হলো ৩০ শতাংশ। বর্তমানে ব্যাংকটির লক্ষ্য হলো সিএমএসএমই ঋণগুলোর মধ্যে খাতভিত্তিক ঋণ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের লক্ষ্য অনুযায়ী এগিয়ে নিয়ে যাওয়া। বর্তমানে সিএমএসএমই ঋণের ৩০ শতাংশ হচ্ছে উৎপাদন খাতে, ৩১ শতাংশ হচ্ছে সেবাভিত্তিক খাতে এবং ৩৯ শতাংশ হচ্ছে ট্রেডিং খাতে।

তাছাড়া, এ খাতের উন্নয়নের লক্ষ্যে বাংলাদেশ সরকার তথা বাংলাদেশ ব্যাংক যতটুকু মনোযোগী হয়েছে, এখানে উন্নতির আরও সুযোগ রয়েছে। তবে সুযোগ থাকা সত্ত্বেও সিএমএসএমই খাতের বিকাশে কিছু প্রতিবন্ধকতা ও সীমাবদ্ধতা রয়েছে:

ক. যথাযথ প্রশিক্ষণ ও অভিজ্ঞতার অভাব: অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সিএমএসএমই শিল্পখাতে উদ্যোক্তারা ব্যবসা আরম্ভ করেন কোনোরকম প্রশিক্ষণ ছাড়াই, তারা পরিচালনার ভিত্তিতে বা অন্যদের দেখে অভিজ্ঞতা লাভ করেন এবং ব্যবসা শুরু করেন, যেখানে এ ব্যাপারে তাদের থাকা উচিত যথাযোগ্য প্রশিক্ষণ।

খ. পরিকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা: যদিও বাংলাদেশ উন্নয়নশীল দেশে উন্নীত হয়েছে তথাপিও নানাবিধ পরিকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা রয়েছে, যেমন- নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ পর্যপ্ত গ্যাস বা পানির সরবরাহ এবং নানাবিধ আমলাতান্ত্রিক জটিলতা তো আছেই।

গ. উৎপাদিত পণ্যসামগ্রীর বাজারজাতকরণ: যেহেতু মার্কেটে প্রতিযোগিতা রয়েছে এবং উদ্যোক্তাদের পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ থাকে না তাই অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সিএমএসএমই শিল্পখাতে উদ্যোক্তারা তাদের উৎপাদিত পণ্যসামগ্রী সঠিকভাবে বাজারজাতকরণ করতে সক্ষম হয় না।

ঘ. ব্যাংকিং মাধ্যম হতে ঋণগ্রহণে সিএমএসএমই উদ্যোক্তাদের অনীহা: অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সিএমএসএমই উদ্যোক্তাদের প্রতিষ্ঠানিক শিক্ষার হার অনেক কম তাই তারা ব্যাংকিং মাধ্যমে তাদের দৈনন্দিন লেনদেন করতে অনীহা প্রকাশ করেন।

ঙ. ঋণের বিপরীতে পর্যাপ্ত জামানতের অভাব: পর্যাপ্ত জামানতের অভাবে সিএমএসএমই উদ্যোক্তারা ব্যবসায়িক মূলধন জোগানের জন্য অনেক ক্ষেত্রে প্রয়োজন অনুযায়ী ঋণ পান না।

তবে, উক্ত প্রতিবন্ধকতা ও সীমাবদ্ধতা উত্তরণেরও রয়েছে নানাবিধ উপায়। যেমন:

১. দেশজুড়ে ইউনিয়ন ডিজিটাল সেন্টারসমূহের মাধ্যমে সিএমএসএমই উদ্যোক্তাদের নিবন্ধনের ব্যবস্থা করলে প্রকৃত উদ্যোক্তার সংখ্যা নির্ধারণ করা যাবে এবং এর সঙ্গে তাদের ব্যবসা সংক্রান্ত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা যাবে, যেন তাদের উদ্যোগগুলো দীর্ঘমেয়াদি  ফল পায়।

২. যেহেতু, বাংলাদেশের পরিকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা ও নানাবিধ আমলাতান্ত্রিক জটিলতা রয়েছে, তাই সিএমএসএমই উদ্যোক্তাদের ব্যবসা শুরু বা ব্যবসার প্রয়োজনে যেকোনও পরিকাঠামোগত সেবা পেতে ইউনিয়ন ডিজিটাল সেন্টারসমূহ ওয়ান স্টপ সেবা প্রদান করতে পারে।

৩. বাংলাদেশের এমন অনেক প্রত্যন্ত এলাকা রয়েছে যেখানে কোনও ব্যাংকের ব্রাঞ্চ চালু করা সম্ভব হয় নাই, সেসব জায়গায় এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কাছে আর্থিক সেবা খুব সহজেই পৌঁছে দেওয়া সম্ভব। আর ব্যাংকগুলো খুব সহজেই এই জনগোষ্ঠীর উদ্যোক্তাদের কাছে ক্ষুদ্রঋণ তুলে দিতে পারে এবং সিএমএসএমই উদ্যোক্তাদের সহজে ব্যাংকিং সেবার আওতায় তাদের দৈনন্দিন লেনদেন করার সুযোগ প্রদান করতে পারে।

৪. বাজার নিয়ন্ত্রণ কমিশন গঠনের মাধ্যমে পণ্য বা সেবার মূল্য নির্ধারণ ও প্রতিনিয়ত তদারকির মাধ্যমে সিএমএসএমই উদ্যোক্তাদের উৎপাদিত পণ্যসামগ্রীর সঠিক মূল্য প্রাপ্তির নিশ্চয়তা বিশেষ ক্ষেত্রে রাষ্ট্র কর্তৃক প্রণোদনার ব্যবস্থা গ্রহণ করলে সিএমএসএমই খাত অধিকতর উন্নতি লাভ করবে।

৫. যেহেতু সিএমএসএমই উদ্যোক্তাদের পর্যাপ্ত জামানত থাকে না তাই তাদের ব্যবসা পরিচালনার জন্য ঋণপ্রাপ্তির ক্ষেত্রে বিভিন্ন প্রতিকূলতার সম্মুখীন হতে হয়, এক্ষেত্রে দেশের সরকার এসএমই খাতে গ্যারান্টি স্কিম প্রদান করেন অর্থাৎ যদি কোনও উদ্যোক্তা বিশেষ কোনও কারণে যেমন প্রাকৃতিক দুর্যোগ, রাজনৈতিক অস্থিরতা বা বৈষয়িক প্রভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হন এবং ব্যাংকের টাকা ফেরত দিতে ব্যর্থ হন তাহলে ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ দায় সরকার বহন করে। বাংলাদেশে এরকম ব্যবস্থা গ্রহণ করলে উভয় পক্ষ অর্থাৎ ব্যাংক ও উদ্যোক্তারা সকলেই উপকৃত হবে।

লেখক: হেড অব এসএমই অ্যান্ড অ্যাগ্রিকালচার ব্যাংকিং ডিভিশন, প্রিমিয়ার ব্যাংক লিমিটেড

 

 

/এমওএফ/আপ-এফএস/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ