সংলাপ (নৈশভোজ): আরও এক ধাপ নামিয়ে দিলো বিএনপিকে

Send
স্বদেশ রায়
প্রকাশিত : ১৫:৩২, অক্টোবর ৩০, ২০১৮ | সর্বশেষ আপডেট : ১৫:৩৪, অক্টোবর ৩০, ২০১৮

স্বদেশ রায়ড. কামাল হোসেনের মতো কয়েকজন ঝরে পড়া নেতার একটি নামসর্বস্ব জোটের কাছে ছুটে গিয়েছিল বিএনপি। আর সেদিনই বিএনপি প্রমাণ করে তাদের পৃথিবী ছোট হয়ে গেছে। সেই ছোট হয়ে যাওয়া পৃথিবী থেকেও আরও একধাপ নামিয়ে দিলেন শেখ হাসিনা ড. কামালের সঙ্গে সংলাপে রাজি হয়ে। এতদিন বিএনপি কতবার সংলাপের কথা বলেছে, তাতে এক তিলও সাড়া দেননি শেখ হাসিনা। এবার ড. কামালের মতো একজন নামসর্বস্ব নেতার লেজ ধরে বিএনপিকে যেতে হচ্ছে শেখ হাসিনার সঙ্গে সংলাপ করতে। তাতে করে এখন তারা কোনও মাথা নয়, কেবল একটি লেজ।
সংলাপের জন্যে ড. কামাল বেশ চালাকি করেছেন। তিনি ঐক্যফ্রন্টের নেতাদের ব্যবহার না করে তার গণফোরামকে ব্যবহার করেছেন। চিঠি দিয়েছেন তিনি ও তার সেক্রেটারি। এখানে ড. কামালের কী খেলা তা অবশ্য এখনও পরিষ্কার হয়নি। তবে শেখ হাসিনা চমৎকার বলেছেন, তিনি বলেছেন, একজন আমার বাড়ি আসতে চাচ্ছেন– আমি তাকে না বলি কীভাবে? শেখ হাসিনা তাই দাওয়াত দিয়েছেন নৈশভোজের। বিএনপি নেতারাও যাবেন শেখ হাসিনার দেওয়া এই নৈশভোজে। বিএনপি নেতারা আসবে এটা শেখ হাসিনার মন্ত্রীদের ভেতরও আলোচনা হয়েছিল। তার ভেতর একজন বলেছিলেন, বিএনপি যে নৈশভোজে আসবে, তারা কি ফিরিয়ে দিতে পারবে টঙ্গীতে বাবার সামনে যে কিশোর মনিরকে পেট্রোলে পুড়িয়ে হত্যা করা হয়েছিল তাকে? ফিরে পাবে কি আর ওই বাপ তার প্রাণের ধন মনিরকে।

তবে আমাদের সমাজে একশ্রেণির মধ্যবিত্ত আছে তাদের এ ধরনের নিহত মনিরদের নিয়ে কখনই কোনও মাথাব্যথা নেই। তারা ড. কামাল হোসেনের মতো। তারা মনির হত্যকারীদের সাত খুন মাফ করে দেয়। মাফ করে না শেখ হাসিনাকে কোনও ক্ষেত্রে। এখানেও শেখ হাসিনা যদি এই চিঠির পরে তাদের নৈশভোজে দাওয়াত না দিতেন তাহলে ওই মধ্যবিত্ত শিক্ষিতজনেরা শেখ হাসিনার চৌদ্দগোষ্ঠী উদ্ধার করতেন। শেখ হাসিনা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের মেয়ে। ১৯৭০-এর নির্বাচনের বিজয় যখন তার হাতের মুঠোয়, তখনও নির্বাচনে যাওয়ার আগে ইয়াহিয়ার সঙ্গে আলোচনায় বসেন বঙ্গবন্ধু। তাই আলোচনার রাজনীতি দিয়ে শেখ হাসিনাকে হারানোর উপায় আসলে নেই বললে চলে। এবার তো ড. কামাল তাকে চিঠি দিয়েছেন, ২০১৩ সালে তিনিই খালেদা জিয়াকে ফোন করেছিলেন। একবার নয়। তিনবার ফোন করেছিলেন। খালেদা জিয়ার রেড টেলিফোন থেকে পুরুষ কণ্ঠ ভেসে এসেছিলো– তারপরেও তিনি আবার ওই ফোনে কিছুক্ষণ পরে ফোন করেন। ফোন করেন তার মোবাইলে। সেই ফোনের প্রত্যুত্তরে খালেদা জিয়া শেখ হাসিনাকে যে ধমকের সুরে কথা বলেছেন– তা দেশবাসী পরবর্তীতে টেকনোলজির কল্যাণে শুনেছিলেন। শুধু তা-ই নয়, খালেদা জিয়ার ছেলে মারা গেলে তার সঙ্গে দেখা করতে গেলে তার বাড়ির দরজা বন্ধ করে দেয় শেখ হাসিনার মুখের ওপর। দেশের প্রধানমন্ত্রী, তারপরেও দাঁড়িয়ে থেকে ফিরে আসেন। তাই গত নির্বাচনের পরে দেশবাসী ও বিশ্ববাসী একটা কথা বলতে পারেনি যে শেখ হাসিনা আলাপ আলোচনার কোনও উদ্যোগ নেননি।

এবার শেখ হাসিনার বিএনপির প্রতি কঠোর মনোভাব দেখে ড.কামাল তার ওকলাতির রাজনীতি করতে গিয়েছিলেন। তিনি জোট করে প্রথমেই বিদেশি রাষ্ট্রদূতদের কাছে যান। তাদের জানান, তিনি আলাপ আলোচনা চান। ড. কামাল মনে করেছিলেন শেখ হাসিনা তার এই ফাঁদে পা দেবেন। অর্থাৎ তিনি আলোচনার জন্যে চিঠি দিলে শেখ হাসিনা সেটা বাতিল করে দেবেন আর অমনি ড. কামাল বিদেশিদের কাছে গিয়ে বলবেন, শেখ হাসিনা সমঝোতার রাজনীতি করেন না। তিনি আলাপ আলোচনায় বসেন না। সে পথ শেখ হাসিনা বন্ধ করে দিয়েছেন।

তবে সংলাপ যে শর্ত দিয়ে হবে না সেটা শেখ হাসিনার ‘লেফটেন্যান্ট’ ওবায়দুল কাদের বলে দিয়েছেন। কোনও শর্ত দিয়ে সংলাপ নয়, কোনও নতিস্বীকার নয়– একথা জানিয়ে দিয়েছেন ওবায়দুল কাদের। তিনি বলেছেন, প্রধানমন্ত্রীর দরজা সবার জন্যে খোলা। যে কেউ তার সঙ্গে সংলাপে বসতে পারেন।  তাই মনে হচ্ছে শেখ হাসিনা হয়তো ঐক্যজোটের পরে বিকল্পধারা, বাম জোটসহ অন্য যারা আছেন তাদের সঙ্গেও বসতে পারেন। বসতে পারেন এলডিপিসহ অন্যদের সঙ্গে। কারণ, আতিথেয়তায় শেখ হাসিনার জুড়ি নেই। ঐক্যজোটের জন্যে যে ভূরিভোজ হবে তাতে কোনও সন্দেহ নেই। ভূরিভোজ ও আলোচনা হবে। ঐক্যজোট আদায় করবে কী? তাদের পাঁচ দফায় সংসদ ভেঙে দেওয়ার দাবি আছে নির্বাচনের আগে। শেখ হাসিনার পক্ষে এটা মানার কোনও সুযোগ নেই। কারণ, সংবিধানে সে সুযোগ নেই। আর শেখ হাসিনা আগেই বলে দিয়েছেন, নির্বাচন হবে সংবিধান অনুযায়ী। আর নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ সরকারের বিধানও সংবিধানে নেই। তাই সেটাও মানার কোনও সুযোগ শেখ হাসিনার নেই। অন্যদিকে বলা হয়েছে সরকারে দায়িত্বপ্রাপ্তরা নির্বাচন করতে পারবে না। পৃথিবীর সব সংসদীয় গণতান্ত্রিক দেশে সরকারের দায়িত্বপ্রাপ্তরা নির্বাচন করেন। তাই এ দাবির কোনও ভিত্তি নেই। অন্যদিকে তারা নির্বাচন কমিশনের পুনর্গঠন চান। সার্চ কমিটির মাধ্যমে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন কমিশন গঠন করেছেন। এখানে বিএনপি, গণফোরাম বা আওয়ামী লীগ কারও কিছু করার নেই। এটা সম্পূর্ণ রাষ্ট্রপতির এখতিয়ার। এছাড়া তাদের আরও একটি দাবি আছে নির্বাচনের আগে ও পরে ১০ দিন সেনাবাহিনীকে নিয়োজিত রাখা নির্বাচনি কাজে। এই দাবি মানতে হলে সংসদে নতুন করে আইন প্রণয়ন করতে হবে। এটা তাই আগামী সংসদে আলাপ-আলোচনা হতে পারে। আর সিভিল সরকার গঠনের জন্যে সামরিক বাহিনীর প্রয়োজনীয়তা ড. কামাল ও বিএনপি কেন দেখে তাও ভেবে দেখার বিষয়। বিএনপি সামরিক সরকারের উত্তরাধিকার আর ড. কামাল ১৯৭১-এ মুক্তিবাহিনীর সঙ্গে না গিয়ে পাকিস্তান সেনাবাহিনীকে নিরাপদ স্থান মনে করেছিলেন। তাই সিভিল সরকার প্রতিষ্ঠায় তিনি সেনাবাহিনীর প্রয়োজনীয়তা খোঁজেন। যেমন তিনি অলিখিত উপদেষ্টা হয়েছিলেন ১/১১-এর সেনা সমর্থিত সরকারের।

বাস্তবে ড. কামালের এই চার নম্বর দাবি অর্থাৎ সেনা নিয়োগ করার দাবি থেকে বোঝা যায় তার মূল ষড়যন্ত্রটা এখানেই। তিনি তার দোসর জামায়াত ও বিএনপিকে দিয়ে দেশে অরাজকতা সৃষ্টি করে আবার একটি ১/১১-এর স্বপ্ন দেখে ৫ দফার এই চতুর্থ দফা প্রণয়ন করেছেন। আর এটা বুঝতে পেরেই শেখ হাসিনা প্রথমে এই শান্তিপূর্ণ পথ নিয়েছেন। তিনি চাচ্ছেন সহিষ্ণুতার রাজনীতি, সংলাপের রাজনীতির ভেতর ড. কামালকে বেঁধে ফেলতে। যাতে তিনি নতুন করে কোনও ১/১১-এর  পথে না হাঁটেন। তবে ড. কামাল একটা ভুল করছেন। তিনি মনে করছেন, ২০০৭ আর ২০১৮ এক। মোটেই তা নয়। ২০১৮ সালে ১/১১-এর স্বপ্ন দেখা সত্যিই বড় আকারের খোয়াব দেখাই হবে। বাস্তবে রূপ নেবে না। দেশ সে পথে যাবে না। তবে শেখ হাসিনার জন্যে নয়, দেশের মানুষের জন্যে দুঃখের হলো ১৯৭০-এ নির্বাচনের বিজয় হাতের মুঠোয় নিয়ে বঙ্গবন্ধুকে সংলাপ করতে হয়েছিল পাকিস্তানি সামরিক জান্তা ইয়াহিয়ার সঙ্গে। আর ২০১৮ সালে শেখ হাসিনাকে নির্বাচনি বিজয় হাতের মুঠোয় নিয়ে সংলাপ করতে হচ্ছে পাকিস্তানি প্রেতাত্মা বিএনপি ও ড. কামালের সঙ্গে। সেবারও ইয়াহিয়া নিশ্চিহ্ন হয়েছিল, এবারও বিএনপি ও ড. কামাল নিশ্চিহ্ন হবেন। আর শেখ হাসিনা প্রমাণ করবেন, রাজনীতিতে তিনিও বঙ্গবন্ধুর মতো পাকা প্লেয়ার।

লেখক: সাংবাদিকতায় সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত

/এসএএস/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ