বিচারের করুণ আকুতি

Send
সাকিব রহমান
প্রকাশিত : ১২:১১, ফেব্রুয়ারি ২৫, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৫:৫৫, ডিসেম্বর ১৮, ২০১৯

সাকিব রহমানদশ বছর আগে জীবনের গভীরতম আঘাতের পর, অনেক কষ্ট নিয়ে আমি এটা লিখছি। প্রায়ই জাতীয় দৈনিকে আমি আমার শহীদ বাবা কর্নেল কুদরত ইলাহীর অর্জনের কথা লিখি, যিনি বেঁচে আজ থাকলে তার পেশাগত জীবনের শিখরে পৌঁছে যেতে পারতেন।  তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইবিএ থেকে চূড়ান্ত সম্মাননা নিয়ে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেছিলেন এবং জাতিসংঘের সেক্রেটারি জেনারেল বান-কি মুনের কাছ থেকে তাঁর অসাধারণ বীরত্বের জন্য মেডেল পেয়েছিলেন। কিন্তু বিধাতার ইচ্ছায় তিনি অকালেই আমাদের ছেড়ে চলে গেলেন। তবে এবারের লেখায় আমি আমার বাবার করুণ হত্যাকাণ্ডের বিভিন্ন দিক নিয়ে আমার কিছু পর্যবেক্ষণ তুলে ধরবো।  

বিডিআর বিদ্রোহ এবং এর বিচার

সীমান্ত সুরক্ষা বাহিনীর সূচনা থেকেই বাংলাদেশ সেনা কর্মকর্তাদের ক্যারিয়ারের বিভিন্ন পর্যায়ে সীমান্ত সুরক্ষা ব্যাটেলিয়নে ডেপুটেশনে পাঠানো হয়। কিন্তু ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০০৯-এর এক সকালে, বিডিআর সেনারা তাদের নিজেদের কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে ঢাকার পিলখানায় দরবার হলে ডাক্তারসহ প্রায় ৫৭ জনকে হত্যা করে। এই নৃশংসতার পেছনের কারণটা স্পষ্ট ছিল না।

তারপর এই বাহিনীর নাম পরিবর্তন করে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) হয়, এবং আগস্ট ২০১১ সালে বিচার প্রক্রিয়া শুরু হয়। দুই বছর পর নিম্ন আদালত ১৫২ জনকে মৃত্যুদণ্ড এবং ১৬১ জনকে আমৃত্যু কারাদণ্ড প্রদান করেন। ২৭ নভেম্বর ২০১৭ উচ্চ আদালতের আপিলের রায়ের ভিত্তিতে যখন ১২৯ জন ফাঁসির কাঠগড়ায় পৌঁছায়, তখন সাংবাদিক এবং আমার বন্ধুদের মুখে একই প্রশ্ন ছিল, একজন দুর্ভাগা পরিবারের সদস্য হিসেবে কি আমি সঠিক বিচার পেয়েছি? আমি চিন্তা করলাম, এর উত্তর হিসেবে আমার কিছু বলা উচিত, যার জন্য আমার এই নিবন্ধের অবতারণা, যা এই হত্যাকাণ্ড, বিচার প্রক্রিয়া এবং ন্যায়কে ঘিরে এত বছর ধরে বেড়ে উঠেছে।   

বাংলাদেশ বনাম আন্তর্জাতিক মানবাধিকার

প্রথমত, বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা, যেমন- হিউম্যান রাইটস ওয়াচ এবং অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের মতামতের সঙ্গে আমাদের মধ্য কতজন একমত হবেন সে ব্যাপারে আমি অনিশ্চিত।

যদিও মৃত্যুদণ্ড তাদের মতে মানবাধিকার বিরোধী এবং তারা বিদ্রোহী জওয়ানদের বিচার নিয়ে ক্রমাগত সমালোচনা করে যাচ্ছেন, কিন্তু তারা এ ব্যাপারে কোনও সমাধান দিতে পারেনি যে তাদের মতের ভিত্তিতে কীভাবে সঠিক পন্থায় বিচার হলে সেটি গ্রহণযোগ্য হতে পারে।

বিদেশি অর্থায়নে চলমান দেশীয় অধিকার সংরক্ষণ সংস্থাগুলো শুরু থেকেই জেলে বিডিআর সিপাহীদের ওপরে করা নির্যাতনের প্রচারণা করতেই ব্যস্ত ছিল, কিন্তু আমার মনে হয় না তারা কখনও প্রকাশ্যে সাধারণ বাংলাদেশিদের সঙ্গে মতবিরোধিতা করবে, যেহেতু এখনও সাধারণ মানুষ মৃত্যুদণ্ডের পক্ষে বলে আমার মনে হয়। কারণ, এ দেশে ক্ষমতাবানদের দায়মুক্তির একটা সংস্কৃতি রয়েছে। যেভাবেই আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো মানবাধিকারের পুস্তকীয় সংজ্ঞায়ন করুক না কেন, বাংলাদেশি করদাতা নাগরিকরা তাদের ৫৭ জন নিহত বাংলাদেশ সেনা কর্মকর্তা হত্যাকাণ্ডের সর্বোচ্চ শাস্তি চায়। এজন্য আমার বিশ্বাস গোটা বাংলাদেশ এখানে একমত।  

আওয়ামী বিরোধী

যখনই বহু বছর পুরনো আওয়ামী লীগ বনাম বিএনপি রাজনৈতিক মতভেদ নিয়ে দেশের মানুষ বিভক্ত হয়ে যায়, তখনই সমস্যার সূচনা হয়। প্রায় সবাই বিরোধী দলগুলো (বিএনপির নেতৃত্বে), বিদ্রোহের জন্য ঘটনার এক মাস আগে ক্ষমতায় আসা আওয়ামী লীগের ওপর দোষারোপ করে।

ভারতের সঙ্গে তাদের ঐতিহাসিক সম্পর্কের কারণে সরকারের সমালোচকরা অত্যন্ত স্পষ্টভাবে আওয়ামী লীগকে দায়ী করে। কারণ, আমাদের দুর্বল সীমানা ভারতের জন্য লাভজনক প্রমাণিত হতে পারে। ইতিহাস সচেতনরা ৭১-এর সময়কার এবং পরবর্তী আওয়ামী লীগ এবং বাংলাদেশ সামরিক বাহিনীর মধ্যকার ক্ষমতার দ্বন্দ্ব নিয়ে আলোচনা করে। তাদের আলোচনায় ওঠে আসে অতীতে সেনাবাহিনী (বা তার অংশবিশেষ) দ্বারা পরিচালিত ঘটনাগুলো, যা আওয়ামী লীগের ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল এবং এর মাধ্যমে তারা প্রতিষ্ঠিত করতে চায় যে আওয়ামী লীগ বহুদিন ধরে সামরিক বাহিনীর প্রতি ক্ষতিকর এবং প্রতিশোধপরায়ণ চিন্তা ধারণ করছে। প্রতিটি সম্ভাব্যভাবে প্রমাণ করা যে রক্তাক্ত পিলখানা হত্যাকাণ্ডে আওয়ামী লীগ জড়িত ছিল, এই চিন্তাধারার মানুষের রাজনৈতিক হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে। অতীতের সফল সামরিক অভিযানগুলোকে উল্লেখ করে বারবার প্রশ্ন করা হয়, কেন পিলখানা প্রাঙ্গণে সময় মতো সামরিক বাহিনীকে প্রবেশ করতে দেওয়া হয়নি?

তাদের অনেকের মনে হয় যে বিচারগুলো শুধুই প্রহসন, কিন্তু প্রমাণের অভাবে অথবা আদালত অবমাননার ভয়ে তারা প্রকাশ্যে এমন কিছু বলে না, যাতে বিচার প্রক্রিয়ার দুর্নাম হয়।

সরকার

তাদের পক্ষ থেকে যুক্তির অভাব নেই। পক্ষে বললে তাদের মনোযোগ প্রধানত দুইদিকে।

প্রথমত, তাদের ধারণা, বিদ্রোহের দিন সামরিক বাহিনীকে হস্তক্ষেপ করতে না দেওয়াটা অত্যন্ত বুদ্ধিদীপ্ত পদক্ষেপ ছিল। কারণ, এতে পিলখানার ভেতরে এবং বাহিরে সাধারণ নাগরিক হতাহত হওয়ার সম্ভাবনা কমেছে।  

দ্বিতীয়ত, পৃথিবীর ইতিহাসের সর্ববৃহৎ ফৌজদারি বিচার “সফলভাবে” পরিচালনা করা নিয়ে আওয়ামী সরকার গর্ব করে। তারা বিরোধী দলের যুক্তি প্রত্যাখ্যান করে বলে, এ গণহত্যা সরকারকে অস্থিতিশীল করার একটি ষড়যন্ত্র ছিল। আওয়ামী লীগ নেতা তরাব আলি ষড়যন্ত্রে জড়িত ছিল বলে নিম্ন আদালতে দোষী সাব্যস্ত হওয়ার পর উচ্চ আদালতে ছাড়া পেয়ে যাওয়ায় আওয়ামী লীগের হাত এখন পরিষ্কার। উচ্চ আদালতের রায়ের পূর্ণ কপি পাওয়া গেলে তার মুক্তিলাভের কারণ আরও ভালোভাবে ব্যাখ্যা করা যাবে। এ বিচার সুষ্ঠু হয়েছে বলে সরকার সমর্থকরা গর্ব করে।

যদিও বিচার বিভাগ স্বাধীন, তাদের শাসন আমলে বিচার প্রক্রিয়া এবং রায় প্রণয়ন হওয়াকে তারা নিজেদের কৃতিত্ব মনে করে।  

প্রশ্নের উত্তর

অন্যান্য মধ্যবিত্তের সন্তানের মতোই, রাজনীতি থেকে আমি কিছু উপার্জন করি না। কীভাবে বিদ্রোহটা আরও ভালোভাবে মোকাবিলা করা যেত অথবা এখন সমাধান কী হতে পারে তা নিয়ে মন্তব্য করার মতো দক্ষতা আমার মতো সাধারণ ব্যক্তির নেই। বিচারের বিষয়ে এটা বলা অন্যায় হবে যে, দুর্ভাগা পরিবারগুলো কোনও বিচারই পায়নি। কিন্তু এই বর্বর হত্যাকাণ্ডের জন্য অপরাধীদের বিচার করা হচ্ছে, এটা উল্লসিত হওয়ার কোনও বিষয় নয়। তাদের শাস্তি হবে এবং যখন প্রযোজ্য, তখন সর্বোচ্চ শাস্তি হবে, এটাই তো স্বাভাবিক। তবে এটা লক্ষণীয় যে, উভয় আদালতের রায়েই যত প্রতিক্রিয়া তৈরি হওয়া প্রত্যাশিত, তা কিছুটা অনুপস্থিত ছিল।

ওপরে উল্লেখিত দুই চিন্তাধারার মানুষ ব্যতীত জনসাধারণকে কিছুটা উদাসীন বলে মনে হয়েছে। এর কারণ বলে আমি মনে করি, জনগণের চিন্তা যে বন্দুকের পেছনে আরও মানুষ ছিল, যাদের চেহারা আজও উন্মোচিত হয়নি। তারা কারা এবং এ রক্তপাত করার পেছনে তাদের উদ্দেশ্য কী হতে পারে সেটা বলা কঠিন। তবে, এটা নিশ্চিত যে তারা শুধু বিডিআর সিপাহী ছিল না। অতএব, আমার উত্তর হবে, হ্যাঁ আমি বিচার পেয়েছি, কিন্তু আংশিকভাবে।  

এখন আমি ক্লান্ত। আমি মনে করি ষড়যন্ত্রকারীদের বিচার চাওয়া এখন অরণ্যে রোদন। একমাত্র আশার আলো এই যে, ভুক্তভোগীদের পরিবারের সমুদ্রতুল্য অশ্রু ষড়যন্ত্রকারীদের ভাগ্যে পতিত হবে। পৃথিবীতে এই বিচার না পেলেও, আজ না হয় কাল বিধাতার বিচার থেকে তারা রেহাই পাবে না।

 

লেখক: আইনজীবী এবং শহীদ কর্নেল কুদরত ইলাহী রাহমান শাফিকের পুত্র

/এসএএস/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ