শ্রীলঙ্কায় হামলাকারী কোন আইএস?

Send
কামরান রেজা চৌধুরী
প্রকাশিত : ১৬:১৬, এপ্রিল ২৯, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৫:৪৭, ডিসেম্বর ১৮, ২০১৯

কামরান রেজা চৌধুরীআমাদের দক্ষিণ এশিয়ার দ্বীপরাষ্ট্র শ্রীলঙ্কায় কয়েকটি চার্চ এবং হোটেলে সিরিজ বোমা হামলায় প্রাণ হারিয়েছেন কমপক্ষে ২৫০ জনের বেশি নিরীহ মানুষ। মা-বাবার সঙ্গে বেড়াতে যাওয়া বাংলাদেশি এক নিষ্পাপ শিশু জায়ান চৌধুরীও রয়েছে মৃতের তালিকায়।
প্রতিটি বোমা হামলার পর যে প্রশ্নটি স্বাভাবিকভাবে সামনে আসে সেটি হলো, কারা এই হামলা করলো এবং কেন করলো?
হামলার দিন সম্ভাব্য হামলাকারীদের ব্যাপারে কোনও মন্তব্য করেনি শ্রীলঙ্কা সরকার। মিডিয়ায় বিভিন্নভাবে ইসলামি জঙ্গিদের দায়ী করা হয়। তবে, শ্রীলঙ্কার সরকার জানানোর আগেই ইসরায়েলি একটি প্রত্রিকায় প্রথম জানায়, ইসলামি জঙ্গিরা এই আক্রমণ চালিয়েছে।
শ্রীলঙ্কায় হামলার কয়েক ঘণ্টা পরই ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু ঘটনার জন্য দুঃখ প্রকাশ করে শ্রীলঙ্কা সরকারকে সহায়তার আগ্রহের কথা জানিয়ে টুইট করেন বলে জেরুজালেম পোস্টের খবরে বলা হয়।

ঘটনার দু’দিন পর জানা গেলো শ্রীলঙ্কার অখ্যাত একটি কট্টর ইসলামি সংগঠনের সহায়তায় মধ্যপ্রাচ্যের জঙ্গি সংগঠন আইএস  এই হামলা চালিয়েছে।

আইএস  মুখপাত্র আমাক-এর মাধ্যমে হামলার দায়-দায়িত্ব স্বীকার করে জানায়, তারা নিউজিল্যান্ডের ক্রাইস্টচার্চের আল-নূর মসজিদে একজন খ্রিস্টানের চালানো হামলার প্রতিশোধ নিতে এই হামলা করেছে।

হামলা সম্পর্কে আগাম তথ্য প্রেসিডেন্ট মাইথ্রিপালা সিরিসেনাকে জানান সেদেশের পুলিশ প্রধান। কিন্তু হামলা প্রতিরোধে কোনও ব্যবস্থা নেয়নি সরকার। দেশের প্রধানমন্ত্রী বিক্রমাসিংহেকে এ ব্যাপারে কিছু জানাননি রাষ্ট্রপতি সিনিসেনা বলে খবর বেরিয়েছে।

শ্রীলঙ্কার সরকার বলছে, বিদেশি সহায়তা ছাড়া এ ধরনের বড় মাত্রার হামলা পরিচালনা করা ন্যাশনাল তাওহিদ জামাতের (এনটিজে) পক্ষে সম্ভব নয়। আইএসের সহায়তায় এই হামলা চালিয়েছে।

প্রকৃতপক্ষে আইএস  ভাবধারায় উজ্জীবিত এনটিজে শ্রীলঙ্কায় এই সিরিজ হামলা চালিয়েছে। আমাদের দেশেও আইএস  আদর্শে অনুপ্রাণিত নব্য-জেএমবি হলি আর্টিজান হামলা চালিয়েছিল।

হলি আর্টিজান হামলার পরও আইএস  হামলাকারীদের পরিচয় প্রকাশ করে এবং তারা হামলার দায় স্বীকার করেছিল। দেখা গেলো হামলাকারীরা সবাই আমাদের স্থানীয়। কিন্তু বর্তমান অবস্থায় আইএস  কি এমন হামলা চালাতে সক্ষম?

ইরাক থেকে আগেই বিতাড়িত হয়েছে আইএস। দায়েশ নামে আইএসের সর্বশেষ ঘাঁটি সিরিয়ার বাঘুস থেকে তাদের উচ্ছেদ করেছে সিরিয়ান ডেমোক্র্যাটিক ফোর্স (এসডিএফ)।

পশ্চিমারা ঘোষণা করেছে আইএসের খেলাফত শেষ। এসডিএফ এখন কয়েক হাজার আইএস  বন্দিকে নিয়ে বিপদে পড়েছে। ওইসব জঙ্গি যেসব দেশের নাগরিক সেই দেশগুলো তাদের ফেরত নিতে চায় না। এদের খাওয়ার দায়িত্ব নেবে কে?

এখন প্রশ্ন হলো, যেই আইএসের হাতে কোনও ভূমি নেই, সাংগঠনিক নেতৃত্ব নেই, নেটওয়ার্ক বলতে কিছু নেই। তারা কীভাবে মধ্যপ্রাচ্য থেকে এসে দ্বীপরাষ্ট্র শ্রীলঙ্কায় আক্রমণ করলো?

আর শ্রীলঙ্কা এমন একটি দেশ যার সঙ্গে কোনও দেশের ভূমি সীমান্ত নেই। সুতরাং, জঙ্গিরা লুকিয়ে প্রবেশ করেছে এমন কথা গ্রহণযোগ্য হবে না। শ্রীলঙ্কার সামরিক বাহিনী অত্যন্ত দক্ষ। তামিল টাইগারদের পরাজিত করার মধ্য দিয়ে তারা সন্ত্রাস দমনে দক্ষ হয়েছে।

তাহলে কেন আইএসের নাম আসছে?

কারণ সমকালীন আন্তর্জাতিক রাজনীতি যার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে মুসলিমবিরোধী কার্যক্রম। ২০০১ সালে টুইন টাওয়ার হামলার পর থেকে শুরু হওয়া এই ইসলামবিদ্বেষী রাজনীতির মাধ্যমে সারা বিশ্বে সব মুসলমানকে সন্ত্রাসী হিসাবে চিহ্নিত করা হচ্ছে।

বাংলাদেশেও যখন জঙ্গি আক্রমণ হতো তখনও দেখা যেতো রিতা কাটসের প্রাইভেট সাইট ইন্টিলিজেন্স আইএসের সম্পৃক্ততা জানাত।

ইসরায়েল সরকার এবং সেদেশের সংবাদপত্রগুলো কেন সবসময় আইএসের আক্রমণের খবর সবার আগে পায় সেটি একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।

২০১৪-১৫ সালে যখন আইএস যোদ্ধারা মধ্যপ্রাচ্য হিসাবে পরিচিত পুরো পশ্চিম এশিয়ার দেশ ইরাক ও সিরিয়ায় নির্বিচার হত্যাকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছিল, সারাবিশ্ব তাদের যোদ্ধাদের ভয়ে তটস্থ থাকলেও আইএস  ইসরায়েলে হামলা চালিয়েছে এমন খবর পাওয়া যায়নি।

শিয়া, খ্রিস্টান, ইয়াজেদি, কুর্দি ও অন্যান্য মুসলিম গ্রুপের সদস্যকে প্রকাশ্যে হত্যা করেছে কট্টর সুন্নি ইসলামি ভাবধারার আইএস যোদ্ধারা।

তারা কয়জন ইহুদিকে হত্যা করেছে? ২০১৬ সালে একবার ‘ভুল করে’ ইসরায়েলি সেনাদের আক্রমণ করে তারা।

টাইমস অব ইসরায়েলে ২০১৭ সালের ২৪ এপ্রিল প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০১৬ সালের নভেম্বরে দখলকৃত গোলান মালভূমিতে ইসরায়েলি সেনাদের ওপর আক্রমণ করার পর ইসরায়েলের কাছে ক্ষমা চেয়েছে আইএস। একথা জানান, ইসরায়েলি সাবেক প্রতিরক্ষামন্ত্রী মোশে ইয়ালন।

আইএসের ক্ষমা চাওয়া একটি বিরল ঘটনা। এবং সেটি তারা করেছে ইসারায়েলের কাছে। সুতরাং, ব্যাপারটি বুঝতে পারা যে কোনও যুক্তিসম্পন্ন মানুষের কাছে কঠিন কিছু নয়।

সুন্নি এই জঙ্গিগোষ্ঠী সৃষ্টির কারণ ‍মূলত শিয়া ইরানের ইসলামপন্থী সরকার উৎখাত করা।

এই পরিকল্পনার অংশ হিসেবে প্রথমেই পশ্চিমাবিরোধী সিরিয়ার রাষ্ট্রপতি বাশার আল আসাদকে সরানোর পরিকল্পনা করা হয়।

শিয়া ভাবধারার আলাউয়িত মুসলিম সম্প্রদায়ের বাশার আল আসাদকে ক্ষমতাচ্যুত করবে এবং ক্ষমতা দখল করবে আইএস। ক্ষমতা দখলের পর তারা খ্রিস্টান-শিয়াসহ অন্যান্য মতের মানুষকে হত্যা করে ভিডিও পোস্ট করবে। বিশ্ব জনমত তাদের বিরুদ্ধে যাবে এবং একপর্যায়ে ‘সন্ত্রাসী’ ওই গোষ্ঠীকে সামরিক অভিযান করে তাড়িয়ে সিরিয়া দখল করা হবে।

যেমনটি করা হয় আফগানিস্তানে। প্রথমে জঙ্গিরা সোভিয়েত বাহিনীকে সরিয়ে নজিবুল্লাহ সরকারের পতন ঘটায়। ক্ষমতায় আসে তালেবান সরকার। এরপর টুইন টাওয়ারে হামলার দায়ে সামরিক অভিযান চালিয়ে আফগানিস্তান দখল করে আমেরিকার নেতৃত্বাধীন মিত্রবাহিনী। আর সিরিয়া দখল করতে পারলেই পাশের দেশ ইরানকে সহজেই ধ্বংস করা যাবে।

২০০৩ সালে ইরাক যুদ্ধের পর পশ্চিমা রাষ্ট্রগুলো আর কোনও সরাসরি সামরিক অভিযান করার পক্ষে নয়। কারণ আফগানিস্তান যুদ্ধে ট্রিলিয়ন ডলার খরচ করেও আফগানিস্তান থেকে বের হতে পারেনি তারা।

সুতরাং মধ্যপ্রাচ্যের শিয়া-সুন্নি বিভেদ এবং জাতিগত দ্বন্দ্বকে কাজে লাগিয়ে নিজেদের স্বার্থ হাসিল সবচাইতে ভালো কৌশল।

মধ্যপ্রাচ্যে পশ্চিমাদের মূল উদ্দেশ্য হলো ইহুদি রাষ্ট্র ইসরায়েলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং সেখানকার তেল সম্পদ গ্রাস করা। ইসরায়েল যতদিন থাকবে ততদিন কোনও অসুবিধা নেই পশ্চিমা রাষ্ট্রগুলোর।

উল্লেখ্য, মধ্যপ্রাচ্যে সিরিয়া এবং ইরান হলো ইসরায়েলের প্রধান দুই শত্রু রাষ্ট্র।

ইহুদি রাষ্ট্র ইসরায়েলের অস্তিত্ব স্বীকার করে না ইরান। দেশটি ইসরায়েলকে পৃথিবীর মানচিত্র থেকে মুছে ফেলার ঘোষণা দেয়।

ইসরায়েল যেমন একটি জঙ্গি ইহুদি রাষ্ট্র, অন্যদিকে ইরানও জঙ্গি ভাবধারার মুসলিম রাষ্ট্র। এ দু’টি রাষ্ট্রর আচরণই মানবতার জন্য বিপজ্জনক।

শ্রীলঙ্কার হামলার ফলাফল কী?

১৫ মার্চ নিউজিল্যান্ডের মসজিদে ৫০ মুসলমানদের হত্যার পর সারা বিশ্ব যেভাবে মুসলমানদের প্রতি সহানুভূতি দেখাতে থাকে তাতে ইসলামবিদ্বেষী রাজনীতি হুমকির মুখে পড়ে। মুসলমানরা সন্ত্রাসী নয়, সন্ত্রাসের শিকার এমন ধারণা জন্মায় সারাবিশ্বে।

তাই আবার সামনে আনা হচ্ছে জঙ্গি আইএসকে। কারণ মুসলমানদের সন্ত্রাসী বানাতে হবে। তাতে পশ্চিমাদেরও লাভ। আবার শ্রীলঙ্কার রাজনীতিকদেরও লাভ।

শ্রীলঙ্কায় মুসলমানরা মোট জনসংখ্যার প্রায় ১০ ভাগ। হিন্দু তামিল টাইগারদের পরাজিত করার পর শ্রীলঙ্কার সংখ্যাগুরু বৌদ্ধদের একটি অংশ যারা জঙ্গি থেরাভেদা বৌদ্ধ আদর্শের অনুসারী। তারা সংখ্যালঘু মুসলমানদের সেদেশ থেকে উৎখাত করার চেষ্টা চালাচ্ছে। গত বছর মুসলমানদের আক্রমণ করে তাদের সেই চেষ্টা সফল হয়নি। এই হামলা তাদের জন্য পোয়াবারো।

থেরাভেদা আদর্শের অনুসারী মিয়ানমারের বৌদ্ধরা এবং সেদেশের সরকার মুসলিমদের ওপর যেমনটি করেছে তেমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি হতে যাচ্ছে? ইতোমধ্যে হামলার ভয়ে শ্রীলঙ্কার মুসলিমরা শহর থেকে পালিয়ে গ্রামে চলে যাচ্ছে।

এবছর ডিসেম্বরে শ্রীলঙ্কায় রাষ্ট্রপতি নির্বাচন। ২০১৫ সালের নির্বাচনে বর্তমান রাষ্ট্রপতি সিরিসেনার কাছে পরাজিত বিশাল পরাক্রমশালী সাবেক রাষ্ট্রপতি মাহিন্দা রাজাপাকশের শাসনামলে ব্যাপক ক্ষমতার অধিকারী ছিলেন তার ভাই গোটাভায়া রাজাপাকশে।

হামলার কয়েকদিন পরেই গোটাভায়া ঘোষণা দিয়েছেন তিনি প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রার্থী হবেন। আর তার নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি হলো, কট্টর ইসলামি জঙ্গিদের নির্মূল করবেন তিনি। শ্রীলঙ্কার আগামী নির্বাচনে এই সিরিজ হামলা একটি বড় ইস্যু হবে সন্দেহ নেই।

আইএস  আসলে ইসলাম ও মানবতার শত্রু। এরা মুসলমানদের কলঙ্কিত করেছে। মানবতাকে কলঙ্কিত করেছে। এদের ধ্বংসের জন্য সকলকে একসঙ্গে কাজ করার বিকল্প নেই। তবে, সকল রাষ্ট্রকে সজাগ থাকতে হবে এই আইএস  যেন আবার মাথা চাড়া না দেয়। এই দায়িত্ব মূলত মুসলিম বিশ্বের। মুসলিম বিশ্বকে কিছু বিষয়ে একমত হতে হবে। অন্যথায় চলবে এই আইএস- আইএস খেলা।

লেখক: সাংবাদিক

 

/এসএএস/এমএমজে/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ