সংকট বনাম গণমাধ্যম

Send
কাজী আনিস আহমেদ
প্রকাশিত : ০০:০২, মে ১৩, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৫:১৩, মে ১৩, ২০১৯

কাজী আনিস আহমেদবিভিন্ন আলোচনায় অনেকেই বলেন, গণমাধ্যম সংকটে আছে। আর এই সংকট প্রসঙ্গে বলা হচ্ছে, অনেক প্রতিষ্ঠানে কর্মী ছাঁটাই হচ্ছে কিংবা বেতন বাকিতে পড়েছে। আপনারা অনেকেই জানেন, পারিবারিকভাবে পত্রিকার সঙ্গে আমরা দীর্ঘদিন ধরেই যুক্ত। দৈনিক আজকের কাগজ এ দেশের সংবাদপত্র জগতে যুগান্তকারী একটি অধ্যায়। অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি, অনেক ভালো হাউসকেও অনেক সময় কঠিন সংকটে পড়তে হয়। আমরা সে রকম সংকট মোকাবিলা করেছিলাম সব কর্মীর দেনা-পাওনা শতভাগ মিটিয়ে দিয়েই।
অনেকে সংকটের মুখে এ ধরনের দায়-দেনা এড়ানোর চেষ্টা করেন, যা খুবই দুঃখজনক ও নিন্দনীয়। সফলভাবে চলতে না পারলে কেবল সংবাদ জগৎই কেন, যেকোনও খাতেই প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যেতে বাধ্য। কিন্তু বন্ধ হওয়ার অজুহাতে সংবাদকর্মী ও অন্য সহযোগীদের দেনা-পাওনা আনায়-আনায় বুঝিয়ে না দেওয়া কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। এদিক থেকে অন্য যেকোনও খাতের মতো সংবাদকর্মীদেরও অধিকার রক্ষায় আইনের যথাযথ প্রয়োগ ও সরকারি কর্তৃপক্ষের উদ্যোগী ভূমিকা প্রয়োজন।
তবে সংকট প্রসঙ্গে কেবল কোনও প্রতিষ্ঠানের অব্যবস্থাপনার মধ্যেই আমাদের আলাপ সীমাবদ্ধ থাকলে সমস্যার প্রকৃত সমাধান সম্ভব হবে না। এর জন্য চাই নিবিড় কাঠামোগত বিশ্লেষণ। বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যমে যে আর্থিক সংকট, তার অন্যতম কিছু কারণ তুলে ধরার চেষ্টা করছি।

বিশ্বজুড়েই এখন চলছে সোশ্যাল মিডিয়ার দাপট। সংবাদমাধ্যমের নিজস্ব ওয়েবসাইট (বা প্রিন্ট)-এর বদলে পাঠক এখন ফেসবুক বা অন্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে দিনের খবর পেতে অভ্যস্ত হয়ে গেছেন। এর ফলে কমে যাচ্ছে সংবাদমাধ্যমের পাঠক ও ওয়েব ট্রাফিক। ফলে বিজ্ঞাপনদাতারাও আগ্রহ হারিয়ে ফেলছেন তাদের বিজ্ঞাপন দিতে। কিন্তু যে বিষয়টি পাঠক, বিজ্ঞাপনদাতা সবাই উপেক্ষা করছেন, তা হলো-  মূল সংবাদটি সংগ্রহের কঠিন ও ব্যয়বহুল কাজ কিন্তু এখনও ওই সংবাদমাধ্যমই করে যাচ্ছে।

এই কাঠামোগত অসামঞ্জস্য অনন্তকাল চলতে পারে না। সংবাদের তথ্য সংগ্রহের কঠিন কাজটা করবে একদল আর তাদের প্রাপ্য পারিশ্রমিকের বড় অংশ মেরে দেবে তারা, যারা শুধুই সংবাদ পরিবেশনের কাজ করে। এটা অনৈতিক। রাষ্ট্র ও সমাজ হিসেবে যদি আমরা সত্যি সংবাদমাধ্যমকে একটি গণতান্ত্রিক সমাজের অপরিহার্য অঙ্গ হিসেবে বিবেচনা করি, তাহলে আইনের মাধ্যমে সোশ্যাল মিডিয়া দ্বারা সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে যথাযথ কিছু রেভিনিউ শেয়ারিং অবশ্যই নিশ্চিত করতে হবে।

এই সংকট এখন বিশ্বজুড়ে। এ ধরনের প্রস্তাব উন্নত দেশেও বিতর্কিত হচ্ছে। ডিজিটাল বাংলাদেশের প্রতিশ্রুতির সঙ্গে তাল মিলিয়েই বাংলাদেশ এক্ষেত্রে অগ্রণী ভূমিকা রাখতে পারে।

তবে আমাদের রাষ্ট্রব্যবস্থা সংবাদমাধ্যমের প্রকৃত বিকাশের ব্যাপারে কতটা আন্তরিক এ নিয়েও প্রশ্ন আছে। একদিকে আমাদের প্রিন্ট জগতের ওপর আছে মাত্রাতিরিক্ত ট্যাক্স-ভ্যাট-ডিউটির খড়গ। অন্যদিকে আছে বিতর্কিত ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের মতো বিধান, যেখানে সংবাদমাধ্যম ও সংবাদকর্মীদের মৌলিক অধিকার আদৌ সুরক্ষিত হয়নি। যে দেশের সরকার বা সংসদ থেকে আমরা বহুল আলোচিত এসব সমস্যার কোনও সুরাহা পাইনি, সেখানে নতুন কোনও সমস্যা সমাধানের সম্ভাবনা খুব জোরালো বলা যাবে না।

সংবাদমাধ্যমের নানা সংকট, বিশেষত সংবাদপত্রের স্বাধীনতার প্রসঙ্গ তুললেই, কোন ধরনের মাধ্যম সংখ্যায় কত বেড়েছে, তার খতিয়ান দিতে শুরু করেন আমাদের সরকারি মুখপাত্ররা। আমাদের মনে রাখতে হবে, শুধু ওজন বাড়া দিয়ে যেমন স্বাস্থ্য বিচার করা যায় না, তেমনি কেবল সংখ্যাগত বিস্তার দিয়েও মিডিয়ার প্রকৃত অবস্থা বোঝা সম্ভব নয়!

গত দুই দশকে পাল্লা দিয়ে গণমাধ্যম বেড়েছে। টিভি চ্যানেল, দৈনিক পত্রিকা, অনলাইন মিডিয়া, রেডিওসহ বিভিন্ন ধরনের মাধ্যম বেড়েছে। সোশ্যাল মিডিয়া তো সবাইকেই ভাবিয়ে তুলছে। এই ভিড়ের মধ্যেই বাংলা ট্রিবিউন শুরু করি আমরা। একদল তরুণের সম্মিলিত শ্রমে গড়ে তোলা হয়েছে এই অনলাইন পত্রিকা। তরুণদের বেছে নেওয়ার অন্যতম কারণ হলো, তারা সংকটকে ভয় পায় না। তারা সময়ের সঙ্গে থাকতে পছন্দ করে। তাদের চিন্তা-চেতনা-ভাবনা সবকিছুর মধ্যে থাকে আগুন ঝরানোর শক্তি। আমি মনে করি, ওই শক্তিটার সামনে কোনও সংকট টিকে থাকা সম্ভব নয়।

বাংলা ট্রিবিউন পাঁচ বছর পার করলো। যেকোনও গণমাধ্যমের জন্য এটা খুব অল্প সময়। যদি কেউ প্রশ্ন করেন, এই অল্প সময়ে কী অর্জন করলাম? তখন আমি চোখ বন্ধ করে বলবো, পাঠকের আস্থার চেয়ে বড় কোনও অর্জন হতে পারে না। পত্রিকাটি পাঠকের আস্থা অর্জন করতে পেরেছে। অনলাইন গণমাধ্যমের সংখ্যা তো অনেক। কিন্তু গণমাধ্যম হয়ে উঠতে হলে যে যে গুণ থাকা প্রয়োজন, তার সবকিছুই রয়েছে বাংলা ট্রিবিউনে।

সামনে আরও বড় পরিবর্তন গণমাধ্যমের সামনে হাজির হবে। সংকটকে সম্ভাবনায় রূপান্তরের কঠিন অভিপ্রায় নিয়েই এগিয়ে চলবে বাংলা ট্রিবিউন।

লেখক: প্রকাশক, বাংলা ট্রিবিউন ও ঢাকা ট্রিবিউন

 

/এমএনএইচ/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ