‘৯৯ বনাম ১-এর বাজেট’

Send
রুমিন ফারহানা
প্রকাশিত : ১৮:২২, জুলাই ১০, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১০:১৪, জুলাই ১১, ২০১৯

রুমিন ফারহানাগত ১৩ জুন, ২০১৯ সংসদে পেশ করা হলো ২০১৯-২০ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট। কারও মতে বাজেটটি উচ্চাভিলাষী, কেউ বললেন গতানুগতিক, আবার কারও চোখে এটি ধনী তোষণকারী বাজেট। অর্থনীতিবিদ বা রাজনীতিকদের কাছে যে নামেই অভিহিত হোক না কেন, সাধারণ মানুষের কাছে বাজেট নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিসের দাম বাড়া-কমার বেশি অন্য কোনও অর্থ বহন করে না। কিন্তু আমার মতে, বাজেটের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক হলো– তা যে কোনও সরকারের চরিত্র বুঝতে সাহায্য করে।
কেন এদেশে কমপক্ষে আড়াইশো কোটি টাকার মালিক অতি ধনী বৃদ্ধির হার পৃথিবীতে সর্বোচ্চ এবং ৮ কোটি থেকে ২৫০ কোটি টাকার মালিক ধনী বৃদ্ধির হার পৃথিবীতে তৃতীয় সর্বোচ্চ? আবার এই দেশেই কেন চার কোটি মানুষ দরিদ্র আর দুই কোটি মানুষ হতদরিদ্র? কেন দরিদ্র মানুষের সংখ্যায় বাংলাদেশ পৃথিবীতে পঞ্চম?
দেশের সবচেয়ে দারিদ্র্যপ্রবণ ১০টি জেলায় মোট উন্নয়ন বাজেটের শূন্য দশমিক ৯৮ শতাংশ বরাদ্দ করা হলেও এক গোপালগঞ্জ জেলায়ই কীভাবে এই দশ জেলার মোট বরাদ্দের ৫ গুণের বেশি বরাদ্দ হয়? কেন এই দেশে ধনী-দরিদ্র্যের বৈষম্য প্রতিদিন বাড়ছে, সেটার জবাব পাওয়া যায় বাজেট থেকেই।

সরকারের বারবার বলা জিডিপির প্রবৃদ্ধি আর মাথাপিছু আয় বৃদ্ধির পরও কেন এই দেশে ৪ কোটি ৮২ লাখ কর্মহীন মানুষ? কেন দেশে উপযুক্ত কাজ না পেয়ে এদেশের তরুণরা মধ্যপ্রাচ্যে মানবেতর জীবনযাপন করে? কেন ইউরোপে যাওয়ার স্বপ্নে বিভোর তরুণদের সলিল সমাধি ঘটে ভূমধ্যসাগরে? কেন এদেশের কৃষক ধানের ন্যায্যমূল্য না পেয়ে ধানের ক্ষেতে আগুন লাগিয়ে দেয়? কেন প্রাপ্য মজুরি পেতে পাটকল শ্রমিকদের রাস্তায় অবস্থান নিতে হয়, কেন অভাবের তাড়নায় নিজ সন্তানকে বিক্রি করেন বাবা-মা–সেসব প্রশ্নের জবাব পাওয়া যাবে বাজেট দেখলেই।

২০০১ সাল থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত যে দারিদ্র্য কমার হার ১ দশমিক ৮ শতাংশ ছিল, সেটা ২০১০-এরপর থেকে নেমে এসেছে ১ দশমিক ২ শতাংশে। ২০০৫ সালের তুলনায় ২০১৬ সালে সবচেয়ে কম উপার্জনকারী ৫ শতাংশ মানুষের আয় তিন ভাগের এক ভাগ কমে গেছে।  ২০১০ সালে সবচেয়ে গরিব ৫ শতাংশ মানুষ যখন জাতীয় আয়ে শূন্য দশমিক ৭৪ শতাংশ অবদান রাখতো, সেটা ২০১৬ সালে শূন্য দশমিক ২৩ শতাংশে এসে দাঁড়িয়েছে। এসব প্রশ্ন আর পরিসংখ্যান খুব স্পষ্টভাবে জানান দেয় বৈষম্য বাড়ছে। 

সোয়া পাঁচ লাখ কোটি টাকার এই বাজেটে ঘাটতির পরিমাণ ১ লাখ ৪৫ হাজার কোটি টাকা। এই ঘাটতি মেটাতে দেশীয় ব্যাংক থেকে ঋণ নেওয়া হবে ৪৭ হাজার কোটি টাকা। যেখানে ব্যাংকগুলো নিজেরাই দেড় লাখ কোটি টাকার বেশি মন্দ ঋণের কল্যাণে তারল্য সংকটে আছে। সেখানে এই বিপুল পরিমাণ ঋণ বেসরকারি বিনিয়োগকে নিঃসন্দেহে বাধাগ্রস্ত করবে। এই ফাঁকে বলে নেই, গত এক দশক ধরে বেসরকারি বিনিয়োগ আটকে আছে জিডিপি’র ২২ শতাংশে; বেসরকারি বিনিয়োগের এই স্থবিরতা বেকারত্বের একটা বড় কারণ। বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে কম ঋণ নিয়ে সরকার যদি বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে ঋণ নেয় তাহলে সেটা মূল্যস্ফীতি তৈরি করবে। এছাড়া এই ঘাটতির প্রায় ৬৪ হাজার কোটি টাকা মেটানো হবে বিদেশি ঋণ থেকে। এটা এর মধ্যেই ঋণাত্মক ব্যালেন্স অব পেমেন্টকে আরও চাপে ফেলবে। সার্বিকভাবে এই ঘাটতি মেটানোর মাশুল দিতে হবে সমাজের মধ্যবিত্ত থেকে নিচের দিকের মানুষদের।  

আগের বছরগুলোতে প্রত্যক্ষ করের হিস্যা মোট রাজস্বের ৩৫ শতাংশের আশপাশে থাকলেও এবারের বাজেটে এটা ৩২ শতাংশের কিছুটা বেশি। মানে ভ্যাট, সম্পূরক শুল্ক ও আমদানি শুল্কের মতো পরোক্ষ কর যেটা মধ্যবিত্ত থেকে নিম্নবিত্ত সকলের ওপর প্রভাব ফেলে, তার ওপরে সরকারের নির্ভরতা না কমে বরং আগের চাইতে আরও বেড়েছে। খুব সহজ একটা উদাহরণ হলো বর্তমান বাজার দরে এক কেজি চিনির মূল্য ২৮ টাকার মতো; নানা রকম পরোক্ষ কর যুক্ত হয়ে এর মূল্য দাঁড়াচ্ছে ৪৯ টাকা। ব্যাংক লুটেরা থেকে ভিক্ষুক—সবাইকেই এই দামে চিনি কিনতে হবে।

মজার বিষয় হলো, যে সব খাতে ব্যয় মধ্য থেকে নিম্ন আয়ের মানুষের জীবনকে কিছুটা সহজ করে সেই খাতগুলোতে এই বাজেটে চরম উদাসীনতা দেখানো হয়েছে। যেমন বাজেটে শিক্ষায় প্রকৃতপক্ষে বরাদ্দ রাখা হয়েছে জিডিপি’র ২ দশমিক ১ শতাংশ, যেটা দক্ষিণ এশিয়া তো বটেই বিশ্বের সব দেশের মধ্যেও সর্বনিম্ন হারগুলোর একটি। অথচ ডাকার ডিক্লারেশন এবং অন্যান্য আন্তর্জাতিক সম্মেলনের সিদ্ধান্তের স্বীকৃতিদাতা দেশ হিসাবে এটা হওয়ার কথা ছিলো জিডিপি’র অন্তত ৬ শতাংশ অথবা মোট বাজেটের ২০ শতাংশ। এই ধরনের বরাদ্দের পরে যখন বাংলাদেশের একটা বিশ্ববিদ্যালয়ও এশিয়ার সেরা বিশ্ববিদ্যালয়ের র‍্যাংকিং-এ স্থান পায় না, তখন অবাক হওয়ার কিছু থাকে না।

একইভাবে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা কর্তৃক প্রস্তাবিত স্বাস্থ্য খাতে কমপক্ষে জিডিপির ৫ শতাংশ বরাদ্দকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে এই খাতে বরাদ্দ রাখা হয়েছে এক শতাংশ–যা দক্ষিণ এশিয়ায় সর্বনিম্ন। যে কারণে চিকিৎসা বাবদ ব্যক্তির নিজ পকেট থেকে ব্যয় ৬৭ শতাংশ থেকে বেড়ে হয়েছে ৭২ শতাংশ। প্রতি বছর চিকিৎসা ব্যয় মেটাতে গিয়ে দারিদ্র্যসীমার নিচে নামে ৬৬ লাখ মানুষ।

সব মন্ত্রণালয় মিলিয়ে সামাজিক খাতে মোট বরাদ্দ দেখানো হয়েছে জিডিপির ১ শতাংশের মতো। একটা দেশ যেখানে এখনও চার কোটি দরিদ্র আর দুই কোটি হত দরিদ্রের বাস সেখানে কীভাবে জিডিপির ১ শতাংশের কম সামাজিক নিরাপত্তায় বরাদ্দ হতে পারে সেটা অবিশ্বাস্য।

বর্তমানেই ৪ কোটি ৮২ লাখ বেকারের এই দেশে বাজেট বলছে ২০৩০ সালের মধ্যে তিন কোটি কর্মসংস্থান তৈরি করা হবে। এটা এই বিপুল বেকার জনগোষ্ঠীর সঙ্গে তামাশা ছাড়া আর কিছু নয়। শুধুমাত্র সরকারের উদাসীনতা আর ভ্রান্ত নীতির কারণে ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ডের এই স্বর্ণসময়টা আমরা হেলায় হারাচ্ছি।

এই বাজেট যে বৈষম্যকে লালন করে তার একটি বড় উদাহরণ হলো করমুক্ত আয়ের সীমা গত ৫ বছর ধরে আড়াই লাখ টাকায় আটকে থাকলেও ধনীদের আয়করের ওপর সারচার্জ প্রযোজ্য হওয়ার ক্ষেত্রে সম্পদের মূল্যসীমা ২ কোটি ২৫ লাখ থেকে বেড়ে হয়েছে ৩ কোটি। এছাড়া, গত কয়েক বছরে ঋণ খেলাপিদের পক্ষে আইন পরিবর্তন করে এই সংস্কৃতি আরও ভয়ঙ্কর অবস্থায় নিয়ে যাওয়ার বন্দোবস্ত পাকা করা হলেও এর সমাধানকল্পে কোনও দিক নির্দেশনা বাজেটে নেই।
একদিকে ধানের দাম না পেয়ে পাকা ধানে আগুন দিয়ে, আত্মহত্যা করে প্রতিবাদ করছে কৃষক, অন্যদিকে বাজেটে কৃষি ভর্তুকি গত কয়েক বছরের মতো একেবারে স্থির অংকে রেখে কৃষকদের সঙ্গে তামাশা করেছে সরকার। এছাড়া, মধ্যবিত্ত ও নিম্ন মধ্যবিত্তের আয়ের অন্যতম উৎস সঞ্চয়পত্রের ওপর করের হার দ্বিগুণ করে–স্মার্ট ফোন, মোবাইলে কথা বলা, তেল-চিনি-গুঁড়া দুধের মতো সাধারণ মানুষের ব্যবহার্য জিনিসের ওপর কর বাড়িয়ে সরকার প্রমাণ করেছে, তারা দিন শেষে এই বাজেট দিয়ে বৈষম্যকে না কমিয়ে বাড়াচ্ছে।

রাষ্ট্রের প্রধান জনগোষ্ঠী কখন একটা রাজনৈতিক দলের কাছে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে? এমনকি জনগোষ্ঠীর প্রতি কোনও মমত্ববোধ না থাকলেও একটা রাজনৈতিক দল বৃহত্তর জনগোষ্ঠীকে সম্মান করে কিংবা ভয় পায় যদি প্রতি পাঁচ বছর পর ওই দলকে জনগণের ম্যান্ডেটের জন্য জনগণের কাছে যেতে হয়। তাই এমনকি জনগণের মঙ্গল সাধনের আন্তরিক ইচ্ছে না থাকলেও অন্তত ভোট পাওয়ার জন্য হলেও সাধারণ মানুষের কল্যাণের কথা তাদের চিন্তা করতে হয়। 

কিন্তু কোনও দেশে যদি এমন হয়, জনগণের ভোট ছাড়া ক্ষমতায় থাকা যায়, সে ক্ষেত্রে সেই দেশের সরকারটিকে ক্ষমতার জন্য নির্ভর করতে হয় রাষ্ট্রে নানাভাবে ক্ষমতাশীল মানুষদের ওপর। সেই সরকারের দায়বদ্ধতা তখন থাকে শুধু হাতেগোনা অল্প কিছু মানুষের কাছে। সেই দেশের সরকার তখন একটা ‘হোয়াই ন্যাশন্স ফেইল’ গ্রন্থে উল্লিখিত ‘এক্সট্র্যাক্টিভ ইকনোমি’ চালু রাখবে যার মাধ্যমে রাষ্ট্রের প্রায় সব মানুষের কাছ থেকে সম্পদ তুলে এনে অল্প কিছু মানুষের হাতে পুঞ্জিভূত করবে। কারণ এই হাতে গোনা কিছু মানুষের সেই সরকারকে ক্ষমতায় রাখে। ভোটাধিকার প্রয়োগ করে সরকার নির্ধারণ করার ক্ষমতাহীন সাধারণ জনগণ তখন জাস্ট একটা সংখ্যায় পরিণত হয়। 

এই সরকারের অধীনে ভবিষ্যতের সব বাজেটে এবারের মতো ধনীদের তোষণ করা হবে এবং মধ্যবিত্ত থেকে শুরু করে নিচের দিকের মানুষের ওপর নানাভাবে আর্থিক চাপ তৈরি করা হবে কারণ এই সরকার ক্ষমতায় থাকতে জনগণের ভোটের কোনও প্রয়োজন হচ্ছে না। ২০১৪ সালে একটিমাত্র ভোট পড়ার আগেই সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে একটা সরকার গঠিত হয়ে গিয়েছিল, যা সংবিধানের প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচিত হওয়ার শর্তের সঙ্গে সুস্পষ্টভাবে সাংঘর্ষিক। এরপর ২০১৮ সালের নির্বাচনের আগের দিন রাতে ব্যালট বাক্স ভর্তি করে সরকার আরও ন্যাক্কারজনকভাবে ক্ষমতায় থেকে গেছে। 

এই দেশের জনগণের জনগণের প্রতিনিধিত্বহীন এরকম একটি সরকারের হাতে তৈরি করা বাজেট এমনই হবে। একটা অংশগ্রহণমূলক গ্রহণযোগ্য নির্বাচন করে সেখানে নির্বাচিত হওয়ার ভীতি যতদিন একটা দলের মধ্যে তৈরি হবে না সেই দলটি কখনও জনগণের কল্যাণে কাজ করবে না। 

আমি ও এই দেশের জনগণ বিশ্বাস করে গ্রহণযোগ্য একটি নির্বাচন অচিরেই যদি বাংলাদেশ না হয়, তাহলে আমাদের অর্থনৈতিক ব্যবস্থা তো বটেই সব রাজনৈতিক এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান পুরোপুরি ভেঙে পড়বে। আর দ্রুত বাংলাদেশ একটি ব্যর্থ রাষ্ট্রে পরিণত হবে।

লেখক: আইনজীবী, সুপ্রিম কোর্ট। জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত আসনে বিএনপির দলীয় সংসদ সদস্য

 

/এসএএস/এমএনএইচ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ