ওষুধবিষয়ক জটিলতা

Send
মো. সামসুল ইসলাম
প্রকাশিত : ১৫:৪৩, জুলাই ২৪, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৫:৪৪, জুলাই ২৪, ২০১৯

মো. সামসুল ইসলামএমনিতেই দেশের চিকিৎসাব্যবস্থা নিয়ে রয়েছে মানুষের বিস্তর অভিযোগ। এর মধ্যে সম্প্রতি ওষুধ নিয়ে কিছু ঘটনাপ্রবাহ মানুষের অস্বস্তি আর দুশ্চিন্তা বাড়িয়ে দিয়েছে অনেকগুণ।
প্রথম দুশ্চিন্তা হচ্ছে মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ নিয়ে। সাধারণ লোকজন সচরাচর ফার্মেসিতে গিয়ে তারিখ দেখে ওষুধ কেনেন না। সবাই ধরেই নেন, ওষুধের মেয়াদ আছে। অথচ গত ১০ জুন মিডিয়া মারফত সবাই জানল, রাজধানীর ৯৩ শতাংশ ফার্মেসিতে মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ বিক্রি হয়।
এটি নিয়ে বিস্তর হইচই হয়েছে। হাইকোর্টও নির্দেশনা দিয়েছেন। গত ১৮ জুলাই রাষ্ট্রপক্ষ থেকে হাইকোর্টকে জানানো হয়, দেশের বিভিন্ন জায়গায় প্রায় সাড়ে ৩৬ কোটি টাকার মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ জব্দ ও ধ্বংস করা হয়েছে। পাঁচটি ফার্মেসি সিলগালা ও পাঁচ ব্যক্তিকে কারাদণ্ডে দণ্ডিত করা হয়েছে।
আমরা তো আমাদের সাধারণ জ্ঞান দিয়েই বুঝি ফার্মেসিতে ওষুধের রক্ষণাবেক্ষণ খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কোনও কোনও ওষুধ একটি নির্দিষ্ট তাপমাত্রায় বা রেফ্রিজারেটরে সংরক্ষণের নিয়ম থাকলেও সাধারণ ফার্মেসিতে সচরাচর তা করা হয় না। এর মধ্যে যদি ওষুধ মেয়াদবিহীন হয়, তাহলে তো আরও আতঙ্কিত হতে হয়।

শুধু মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ একমাত্র উদ্বেগের বিষয় নয়। মাত্র কয়েকদিন আগে স্বাস্থ্যমন্ত্রী জেলা প্রশাসকদের সম্মেলনে ওষুধ সংক্রান্ত আরও কয়েকটি বিষয় মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে তদারকির নির্দেশ দেন। এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অভিযোগ হলো চিকিৎসক কর্তৃক রোগীকে প্রয়োজনের তুলনায় বেশি ওষুধ প্রদান। অভিযোগ এসেছে অনেক চিকিৎসক নাকি ওষুধ কোম্পানিগুলোর স্বার্থ দেখেন এবং প্রয়োজনের তুলনায় রোগীকে বেশি ওষুধ দেন।

আরো দু’টি বিষয় নিয়ে তো হাইকোর্টের নির্দেশনাও রয়েছে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়কে তদারকি করার জন্য। একটি হচ্ছে চিকিৎসকদের পড়ার উপযোগী ও স্পষ্ট করে প্রেসক্রিপশন লেখার নির্দেশ এবং চিকিৎসকদের প্রেসক্রিপশন ছাড়া অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা। 

এসব বিষয় জনস্বাস্থ্যের জন্য অবশ্যই বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। যদিও কিছু কিছু বিষয়ের জন্য জনসচেতনতাও জরুরি।       

আমি যা লক্ষ্য করেছি তা হচ্ছে আমাদের অনেক শিক্ষিত জনগণ বা ফার্মেসি যারা চালান তাদের অনেকেরই ওষুধ বা চিকিৎসা নিয়ে রয়েছে জ্ঞানের বিস্তর ঘাটতি। আমি অবাক হয়েছি এটা দেখে, অনেক শিক্ষিত লোকও এটা জানেন না মেট্রোনিডাজোল (জনপ্রিয় ব্র্যান্ড মেট্রিল, ফ্লাজিল ইত্যাদি) একটি অ্যান্টিবায়োটিক এবং এটি পুরো কোর্স শেষ করতে হবে। অথচ পেট খারাপ হলে বেশিরভাগ মানুষ ফার্মেসিতে গিয়ে দুই চারটি মেট্রোনিডাজোল নিয়ে এসে বাকি ওষুধ খাওয়া বন্ধ করে দেন। এভাবেই অ্যান্টিবায়োটিকগুলো তাদের কার্যকারিতা হারাচ্ছে। 

একই ঘটনা ঘটে সিপ্রোফ্লক্সাসিনের ক্ষেত্রে। এক ডাক্তার সম্প্রতি আমাকে বলেছেন সিপ্রোফ্লক্সাসিন আর পূর্বের মতো এখানে কাজ করে না। এতো গেলো অ্যান্টিবায়োটিকের কথা। ফার্মেসিতে ওষুধ কিনতে গেলে প্রায়ই দেখি এরকম বুঝে না বুঝে মানুষ প্রচুর ওষুধ কিনছে প্রেসক্রিপশন ছাড়াই। মুড়ি-মুড়কির মতো কিনছে এসিডিটি বা গ্যাস্ট্রিকের ওষুধ। অথচ দীর্ঘমেয়াদি ব্যবহারে এদের রয়েছে ভয়াবহ পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া। 

অভিজাত এলাকা ছাড়া আমি যেটা দেখি তা হলো বেশিরভাগ লোকই তাদের সাধারণ স্বাস্থ্য সমস্যার জন্য এলাকাভিত্তিক ফার্মেসিগুলোর ওপর প্রাথমিকভাবে নির্ভর করেন। ওষুধ যারা বিক্রি করেন বা সাধারণ স্বাস্থ্য সমস্যা প্রদান করেন, তাদের কতটুকু যোগ্যতা আছে তা অবশ্য আমি জানি না। অনেক ফার্মেসিতেই প্রেসার, ডায়াবেটিস মাপা হয় এবং অপেক্ষাকৃত দরিদ্রদের তারাই ওষুধ বাতলে দেন। আর এতে বেশ বিপত্তিও ঘটে।

কয়েকদিন আগে আমি দুপুরের দিকে একটু খারাপ বোধ করছিলাম। আমি প্রেসার দেখতে চাইলাম। বাসায় একটি ডিজিটাল প্রেসার মনিটর আছে। সেটাতে প্রথমে প্রেসার মাপলাম। মেশিনটি বেশ ভালো, কিন্তু পুরনো হয়ে যাওয়ায় আমি ভাবলাম বাসার কাছেই ফার্মেসিতে গিয়ে আরো একটু নিশ্চিত হই। দুপুরে আশেপাশে কোনও ডাক্তারও পাওয়া যাবে না।

যা হোক, আমার বাসার পাশে কয়েক গজের মধ্যে বেশ কয়েকটি ফার্মেসি। আমি প্রথমে একটি ফার্মেসিতে গিয়ে প্রেসার মাপালাম। দেখে তো হতভম্ব হয়ে গেলাম। তারপর একের পর এক পাঁচটি ফার্মেসিতে প্রেসার দেখলাম। সব প্রায় পাশাপাশি দোকান। উদ্ভট সব রিডিং। একটির সঙ্গে আরেকটির কোনও মিল নেই। কোনোটিতে ৯৫/৬৫ কোনোটিতে ১৩৫/৮০ এরকম। একেবারেই পাশাপাশি দোকানে কয়েক মিনিটের ব্যবধানে এরকম হওয়ার কথা নয়। হাস্যকর পার্থক্য। পরে রাতে আমি ডাক্তারের কাছে গিয়ে নিশ্চিত হলাম। 

সমস্যা হচ্ছে অনেক নিম্নবিত্ত রোগী তাদের এসব রিডিংয়ের ওপর ভিত্তি করে ওষুধ খান। একজন উচ্চ রক্তচাপের রোগীকে যদি বলা হয় আপনার নিম্ন রক্তচাপ এবং আপনি স্যালাইন খান, তাহলে কী হতে পারে তা বলাই বাহুল্য।

অথচ এরকমই ঘটছে। একবার আমার এক পরিচিত মহিলাকে উচ্চ রক্তচাপের বিশাল সংখ্যা বলার পর তড়িঘড়ি করে এক বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাওয়া হয়। তিনি দেখলেন তার কিছুই হয়নি। তবে সেই ডাক্তার তাকে ফার্মেসিতে প্রেসার বা ডায়াবেটিস মাপার ক্ষেত্রে সতর্ক করেছেন এবং বলেছেন এককম ভুলভাল রিডিং দেখে এরকম অসংখ্য মানুষ বিপদে পড়ে তাদের কাছে আসেন।

মাঝে মাঝে সকাল বেলায় দেখি লাইন দিয়ে ডায়াবেটিক রোগীরা ফার্মেসিতে বা তাদের হাঁটার জায়গায় গ্লুকোমিটার দিয়ে রক্তে গ্লুকোজ পরীক্ষা করছেন। এমনিতেই এসব মেশিনের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে। তার ওপর একই মেশিন সবাই ব্যবহার করছেন, যেটা মোটেই উচিত নয়। পেনাকৃতির যে যন্ত্রটির মাধ্যমে সুঁচ ফুটিয়ে রক্ত পরীক্ষা করা হয়, সেটি পরিষ্কার বা ডিসইনফেক্ট করা ছাড়া আরেকজনের ক্ষেত্রে ব্যবহার করা অনুচিত। এমনকি একই পরিবারের সদস্যদের ক্ষেত্রেও না। অথচ সবাই একই মেশিন ব্যবহার করছেন। এতে বিভিন্ন রোগ ছড়াতে পারে। কিন্তু এই বিষয়ে কারও কোনও জ্ঞান নেই।

আমাদের দেশের ডাক্তাররা এখন বাংলায় প্রচুর বই লিখছেন। এরকম কিছু বই পড়ে আমি নিজেও অনেক উপকৃত হয়েছি। সবসময় ডাক্তার বা স্বাস্থ্যকর্মীর ওপর নির্ভর না করে আমাদের উচিত নিজে কিছু পড়াশোনা করা। ওষুধ বা চিকিৎসা পদ্ধতি সম্পর্কে সাধারণ জ্ঞান তো মানুষের থাকতে হবে। প্রতিটি ওষুধের ওপর ব্র্যান্ডের পাশাপাশি জেনেরিক নাম দেওয়া থাকে। সেটা দেখে ইন্টারনেটে সার্চ দিলে তো অনেক তথ্য পাওয়া যায়। নিজে যারা ওষুধ কিনে খান, তারা তো অন্তত এ কাজটি করতে পারেন। 

এক্ষেত্রে শুধু সরকারি পদক্ষেপে রাতারাতি পরিস্থিতির উন্নতি হবে না। স্বাস্থ্য বা ওষুধ সম্পর্কিত শিক্ষা এবং একই সঙ্গে জনগণের ব্যক্তিগত পর্যায়েও সচেতনতা জরুরি। দেখা যায় অনেক কমিউনিটি ক্লিনিক বা সরকারি হাসপাতালে ডাক্তাররা বসে থাকেন, কিন্তু লোকজন ফার্মেসির হয়তো অদক্ষ দোকানির কাছ থেকে ওষুধ বা স্বাস্থ্যসেবা নিচ্ছেন। এই মানসিকতার পরিবর্তন ঘটাতে হবে।      

লেখক: কলামিস্ট

[email protected]

         

 

/এসএএস/এমএমজে/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ