ফ্ল্যাশব্যাক: আবরার

Send
সারওয়ার-উল-ইসলাম
প্রকাশিত : ১৮:০৯, নভেম্বর ২৪, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৮:১১, নভেম্বর ২৪, ২০১৯

সারওয়ার-উল-ইসলাম‘আহারে আমি ভালো ছেলেকে নিজে হাতে বুয়েটে রেখে এসেছিলাম। ওরা ১১ জন মিলে মারইলো। আমারে বললে ছেলেকে না পড়িয়ে বাড়িতে নিয়ে আসতাম। জমি চাষ, ব্যবসা করিয়ে ছেলেকে কাছে আগলে রাখতাম। ওরা কেন মাইরলো?’
পাঠক, এই আহাজারি একজন মা রোকেয়া খাতুনের। তাঁর বাড়ি কুষ্টিয়ায়। বুয়েট ছাত্র আবরার ফাহাদের মা তিনি।
গত ১৩ নভেম্বর দেশের প্রায় সব টেলিভিশনে প্রচারিত হয় আবরার হত্যা মামলায় ২৫ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ জমা দেওয়ার সংবাদ। সেই সংবাদ প্রচারিত হওয়ার সময় সিসি ক্যামেরায় ধরা পড়া ফাইল ফুটেজে দেখানো হয় কীভাবে আবরারকে পিটিয়ে মারার পর চ্যাংদোলা করে নিয়ে যাচ্ছিল ঘাতকেরা। ছেলের সেই নিথর দেহটি টেলিভিশনে দেখে কুষ্টিয়ার আঞ্চলিক ভাষায় আহাজারি করছিলেন মা।
কোনও মা-ই ওই রকম একটি দৃশ্য দেখে ঠিক থাকতে পারবেন না। খুব জানতে ইচ্ছে করছে যে ঘাতকেরা আবরারকে সেই রাতে পিটিয়ে মেরেছে তাদের মায়েরা নিশ্চয়ই ওই সিসি ক্যামেরার ফুটেজ দেখেছেন কেউ কেউ, তাদের বুকটা কি হাহাকার করে ওঠেনি?

সেই সংবাদে প্রচারিত হয়, ১১ জন আসামি সরাসরি হত্যায় অংশ নেয়। ঠিক তখনই মা রোকেয়া খাতুন দু’হাতে বুক চাপড়ে কাঁদতে কাঁদতে ওই আহাজারি করতে থাকেন।

কতটা কষ্টে একজন মা বলেন, ছেলের দোষের কথা তাকে যদি জানানো হতো তাহলে বুয়েটে না পড়িয়ে বাড়ি নিয়ে যেতেন। জমি চাষ নইলে ব্যবসা-বাণিজ্যে লাগিয়ে দিতেন। কেন ওকে মারলো?

হত্যাকাণ্ডে সরাসরি অংশ নেওয়া ১১ জনসহ ২৫ আসামির মায়েদের এখন কী অবস্থা হবে, সেটা জাতি দেখার অপেক্ষায় আছে। তাদের সবার যেন ফাঁসি হয় আবরারের মা সে কথা বলেছেন সাংবাদিকদের।

আবরারের ছোট ভাই বলেছেন, মামলাটির যেন দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে বিচার করা হয়।

আর বাবা বলেছেন, আসামিরা যেন রায় ঘোষণার আগ পর্যন্ত কারাগারে থাকে, সেটা নিশ্চিত করতে হবে।

আবরারের পরিবারের দাবির সঙ্গে দেশের মানুষ একমত, কোনও সন্দেহ নেই। কারণ, ঘাতকেরা যে কাজটি করেছে তা কোনও সভ্য সমাজেই গ্রহণযোগ্য নয়। তাদের অবশ্যই দেশের আইন অনুযায়ী শাস্তি হতে হবে। কোনও প্রভাব যেন খাটানো না হয় এই মামলার রায়ে। দয়া-মায়ার ঊর্ধ্বে থেকে, ওরা মেধাবী ছাত্র বলে কোনও অনুকম্পা না দেখিয়েই শাস্তি দিতে হবে ওই ঘাতকদের, এটা প্রত্যেক বিবেকবান মানুষই চান।

আবরারের মায়ের মতো ওই ২৫ ঘাতকের মায়েরাও অনুতপ্ত হোক, এটা আমরা চেয়েছিলাম। কিন্তু আমরা আজ পর্যন্ত কোনও সংবাদমাধ্যম বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কি দেখেছি আবরারের পরিবারের পাশে এসে অনুতপ্ত হয়েছেন কোনও ঘাতকের মা বা বাবা? হননি সম্ভবত। হলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে টের পাওয়া যেত।

আমাদের সমাজে এ সংস্কৃতি চালু হয়নি এখনও। আজ পর্যন্ত কোনও ভিকটিমের পরিবারের কাছে এসে নিপীড়কের পরিবার সান্ত্বনা দিয়েছে, এ রকম নজির নেই। আমরা এ সংস্কৃতি দেখতে চাই।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে, কেন এই হত্যাকাণ্ড ঘটলো? কী এমন দোষ ছিল আবরারের?
দোষ ছিল স্বাধীন মত প্রকাশ করা। কিংবা যারা আবরারকে মেরেছে তাদের কাছে আবরারের মত পছন্দ হয়নি, এই তো? এই ভিন্নমতকে মেনে না নেওয়ার সংস্কৃতি তো আমাদের দেশে আছেই। হুমায়ুন আজাদ তার বড় সাক্ষী। শুধু বাংলাদেশ কেন, এই উপমহাদেশের অনেক দেশে উগ্রপন্থী আছে। তারা হত্যা করতে দ্বিধাবোধ করে না। তারা মনে করে হত্যার মাধ্যমে একটি পুণ্যের কাজই করলো।

তাহলে কি আবরার হত্যায় জড়িত ২৫ আসামি সবাই ওই উগ্রপন্থীদের সহযাত্রী? প্রশ্নটা আসাই স্বাভাবিক। কিন্তু এরা তো সবাই আওয়ামী লীগের ভাবাদর্শে বিশ্বাসী। কেউ কেউ ছাত্রলীগের নেতাও। তারা কীভাবে উগ্রপন্থী হয়ে উঠলো? আদতেই কি তারা কোনও রাজনৈতিক আদর্শে বিশ্বাসী? নাকি শুধু একটু হিরোইজম থেকে অন্ধকার পথে আগমন ওদের?

এই হিরোইজম ভাবাদর্শের সংখ্যাই বেশি। দেশের সবক’টি বিশ্ববিদ্যালয়ে কমবেশি যে র‌্যাগিং কালচার বিস্তার লাভ করেছে তার পেছনে এই হিরোইজমই প্রধান। এরা কোনও রাজনৈতিক আদর্শে বিশ্বাসী নয়। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছে, দু’বছর বা তিন বছর পর সিনিয়র হয়ে গেছে, এখন একটু বড় হয়ে যাওয়ার ভাব না দেখালে কি চলে? একটু ‘নেশাপানি’ করে রাতেরবেলা জুনিয়রদের ডেকে এনে চড়-থাপ্পড় মেরে ভয়ভীতি দেখিয়ে নিয়মিত সালাম-আদাব আদায় করার অপচেষ্টা আর কী। এমন না যে এরা জুনিয়রদের কাছ থেকে চাঁদাবাজি করে হাজার হাজার টাকা কামাই করছে। শুধু জুনিয়রদের ডমিনেট করে রাখায় যত আনন্দে এদের। যা একটা বেনসন নিয়ে আয়, যা একটা জর্দা দিয়ে পান নিয়ে আয়, এই ধরনের মাস্তানি ফলানোর মাধ্যমে এরা বাহাদুরি দেখাতে চায়। আর তারা এ সুযোগটা বেশি পেয়ে থাকে রাজনীতির সঙ্গে নিজেকে একটু জড়িয়ে রেখে। সরকারি দলের অঙ্গসংগঠনের কমিটিতে কোনও একটা পদ বাগিয়ে নিতে পারলেই হলো, আর কে পায়?

আর যখনই সরকারদলীয় সংগঠনের পদ পেয়ে যায়, তখন মেরুদণ্ডহীন শিক্ষকরা এদের সঙ্গে হিসাব করে কথা বলে। অনেক কিছু দেখেও না দেখার ভান করে। আর দুর্ঘটনাগুলো তখনই ঘটে। যেমনটা ঘটেছে আবরারের ক্ষেত্রে। এ ঘটনায় পুলিশ মন্তব্য করেছে, বুয়েট প্রশাসনের গাফিলতির কারণে এ ধরনের ঘটনা ঘটেছে। অর্থাৎ রাজনীতি যখন বাহাদুরি করার হাতিয়ার হয়ে যায়, তখনই ঘটে যত অঘটন।

আমরা তো এ রকম রাজনীতি থেকে মেধাবী ছাত্রদের দূরে রাখতে চাইবোই। ছাত্র রাজনীতি হবে শিক্ষার্থীদের স্বার্থরক্ষার রাজনীতি। শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা কীভাবে ভালো হবে, শিক্ষা উপকরণের দাম কমানো থেকে শুরু করে সুন্দর পড়াশোনার পরিবেশ তৈরি করাই ছাত্র রাজনীতির মূলমন্ত্র। সেখান থেকে বিচ্যুতি ঘটেছে। ছাত্র রাজনীতি হয়েছে ব্যক্তিস্বার্থ উদ্ধারের হাতিয়ার।

এ বিচ্যুতি ঘটালো কারা? কাদের স্বার্থে এখন ছাত্র রাজনীতি ব্যবহার হচ্ছে? সেটা অনেক বিবেকবান মানুষেরই প্রশ্ন।

আমরা চাই আবরারের মায়ের মনে একটু যেন শান্তি আসে সে রকম রায় আসবে দেশের সর্বোচ্চ আদালত থেকে। যেন আর কোনও আবরারের মাকে বুক চাপড়াতে না হয়। এই ২৫ ঘাতকের পরিবারের সদস্যরাও যেন উপলব্ধি করতে পারে আবরারের মায়ের বুকের ক্ষতটা কত গভীর!

কোনও নতজানু রাজনীতির কাছে প্রশ্রয় বা আশকারা পেয়ে বিচারকাজ দ্বিধান্বিত হোক বা বিচারক বিব্রত হোক- দেশবাসী সে রকম রায় চান না।

আমাদের আশা, আবরারের মায়ের আহাজারির মূল্য কিছুটা হলেও আদালত দেবেন। কারণ, বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা আবরারের মায়ের কষ্টের কথা শুনেছেন, বেদনাহতও হয়েছেন।

লেখক: সাংবাদিক ও ছড়াকার

/এসএএস/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ