নারী প্রগতি: ঢাকা টু নোয়াখালী, যোজন যোজন দূর

Send
প্রভাষ আমিন
প্রকাশিত : ১৫:৪৬, ডিসেম্বর ০৮, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৫:৪৮, ডিসেম্বর ০৮, ২০১৯

প্রভাষ আমিনআমরা আদর করে প্রাচ্যের অক্সফোর্ড বলি বটে, কিন্তু বিশ্ব পরিসরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থান নেই বললেই চলে। বিশ্ব র‌্যাংকিংয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থান বরাবরই তলানিতে। গবেষণায়ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনও সুনাম নেই। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উৎকর্ষ মাপি আমরা সমুচার দাম আর  হলের সিট ভাড়া দিয়ে। অ্যাকাডেমিক কারণে কখনও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় জাতীয় বা আন্তর্জাতিক শিরোনাম হয়নি। তবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বরাবরই মানুষের আগ্রহের কেন্দ্রে থাকে, বারবার শিরোনামও হয়। এসবই রাজনৈতিক কারণে।
গবেষণা, অ্যাকাডেমিক উৎকর্ষ বা র‌্যাংকিং যাই হোক; ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আমাদের গভীর আবেগের জায়গা। অ্যাকাডেমিক কারণে না হলেও রাজনৈতিক কারণে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আমার কাছে তো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসকে রীতিমতো জাদুঘর মনে হয়। যেদিক দিয়ে হেঁটে যাই, সেখানেই কোনও না কোনও ঐতিহাসিক ঘটনার সাক্ষী। ’৫২-এর ভাষা আন্দোলন, ’৬২-এর শিক্ষা আন্দোলন, ’৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান, ’৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ, ’৯০-এর স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন—বাংলাদেশের জন্মের আঁতুর ঘর যেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। সব গণতান্ত্রিক ও প্রগতিশীল আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। সবসময়ই শাসকদের আতঙ্কের নাম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। যে কোনও অন্যায়ের সোচ্চার প্রতিবাদ হয় এই বিশ্ববিদ্যালয় থেকেই। এমনকি ১/১১ সরকারের প্রতিবাদও উঠেছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকেই। তবে স্বৈরাচার এরশাদের পতনের মধ্য দিয়ে গণতন্ত্রের নবযাত্রায় পাল্টে গেছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চিত্র। এখন যে দল যখন ক্ষমতায়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থাকে সেই দলের নিয়ন্ত্রণে। ১/১১-এর দুই বছর বাদ দিলে ’৯১‌ সাল থেকেই এই প্রবণতা চলে আসছে। ক্ষমতাসীনরাও তাই নিশ্চিন্তে দেশ শাসন করে। গবেষণায়ও নেই, প্রতিবাদেও নেই; তাহলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রইলো কী? প্রতিবাদহীনতার, নির্বিকারত্বের এই সময় আমাদের মন খারাপ করে দেয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে গৌরবের জায়গাটা ধাক্কা খায়। কিন্তু সেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ই আবার আমাদের সাহসী করে। বুঝিয়ে দেয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ই মুক্তচিন্তার, প্রগতিশীল ভাবনার বাতিঘর। যতই আঁধার আসুক, আলো আসবেই। পথ দেখাবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ই।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ ডাকসুর একটি ছোট্ট উদ্যোগই আমাকে এতটা আশাবাদী করেছে। উদ্যোগটা ছোট হতে পারে, কিন্তু এর প্রভাব সুদূরপ্রসারী। একসময় যে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রীরা ছাত্রদের সঙ্গে কথা বলতে পারতো না, সূর্যাস্তের আগেই যেখানে ছাত্রীদের হলে ঢুকে পড়তে হতো; সেই বিশ্ববিদ্যালয়ে স্থাপন করা হয়েছে ‘স্যানিটারি ন্যাপকিন ভেন্ডিং মেশিন’। আপনাদের কাছে ছোট মনে হতে পারে, কিন্তু আমার বিবেচনায় এটা নারীর ক্ষমতায়ন, নারী মুক্তি, নারী প্রগতির প্রশ্নে একটা বিশাল অগ্রগতি। নানা ট্যাবু আমাদের সমাজকে পেছনে টানে। বেশিরভাগ ট্যাবুই নারীদের চলার পথে, এগিয়ে যাওয়ার পথে বাধা হয়ে আসে। ধর্ম নিয়ে, পোশাক নিয়ে, গায়ের রং নিয়ে নানারকম কথা শুনতে হয় নারীদের। কোনও দম্পতির সন্তান না হলে, কোনও পরীক্ষা ছাড়াই সব দায় নারীর কাঁধে দেওয়া হয়। আবার নারীর সবচেয়ে গৌরবের যে ঘটনা, সেই গর্ভধারণকেও বিবেচনা করা হয় নারীর অসুস্থতা হিসেবে। তবে যে ট্যাবু নারীকে প্রতিমাসে আটকে রাখে, তা হলো তাদের মাসিক। মাসের একটা নির্দিষ্ট সময়ে নারীদের ঋতুস্রাব একটি স্বাভাবিক প্রাকৃতিক ঘটনা। কিন্তু স্বাভাবিক ঘটনাকে যুগের পর যুগ অস্বাভাবিক হিসেবে দেখানো হয়েছে, চেষ্টা হয়েছে মাসের এই সময়টায় নারীদের আটকে রাখার। যেন এটা লজ্জার, তাই কেউ এটা নিয়ে মুখ খুলতেন না, কথা বলতেন না। ট্যাবুটা এতই প্রবল, আমরা আমাদের কন্যাশিশুকেও বিষয়টি সম্পর্কে কিছু জানাই না। তাই সে যখন প্রথম এমন অভিজ্ঞতার মুখে পড়ে, ঘাবড়ে যায়, ভয় পায়। মনে করে এটা বুঝি খুব খারাপ কিছু, সে বুঝি নোংরা হয়ে গেলো। মেয়েদের এই বিষয়টি নিয়ে বখাটেরা তাদের উত্ত্যক্ত করে, এমনকি কাছের ছেলেবন্ধুরাও বাঁকা চোখে তাকায়, মুচকি মুচকি হাসে। আচ্ছা, তুই তো এ ক’দিন পারবি না; বলে নারীদের পেছনে ফেলে দেয়। এটা যে একটা স্বাভাবিক প্রাকৃতিক বিষয়, সবাই সেটা জানে, কিন্তু মানে না। আর মাসের এই কয়টা দিন অস্বাস্থ্যকর থাকার কারণে ডেকে আনে আরও নানা রোগব্যাধি। নারীরা বিষয়টি স্বাস্থ্যকরভাবে মোকাবিলা করলেই সব সমস্যা মিটে যায়। এই সমস্যা সমাধানেই এসেছে স্যানিটারি ন্যাপকিন। একটা ভালো ন্যাপকিন মেয়েদের সব দুঃশ্চিন্তা, ভয়, জড়তা, আত্মবিশ্বাসহীনতা দূর করে দিতে পারে। ‘তুই পারবি না’ বলা বন্ধুটির মুখে চপেটাঘাত করে নারী এগিয়ে যেতে পারে সমানতালে। কিন্তু এই এগিয়ে যা‌ওয়ার ক্ষেত্রেও বাধা সমাজ। একজন নারীর দোকানে স্যানিটারি ন্যাপকিন কিনতে যাওয়ার চেয়ে বিড়ম্বনা আর কিছুতে নেই। সেই বিড়ম্বনা থেকে নারীকে মুক্তি দিতে এগিয়ে এসেছে ডাকসু। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে মোট ১০টি স্থানে স্যানিটারি ন্যাপকিন ভেন্ডিং মেশিন বসানো হয়েছে। যেখানে মেয়েরা মাত্র ১০ টাকা দিয়ে ২৪ ঘণ্টাই ন্যাপকিন সংগ্রহ করতে পারবে।

ডাকসু সদস্য তিলোত্তমা শিকদার এই উদ্যোগ নিয়েছেন। তাকে অভিনন্দন। তবে এই উদ্যোগটি ডাকসুর কোনও পুরুষ সদস্য নিলে আমি আরও খুশি হতাম। নারীর সমস্যাটা যদি পুরুষ অন্তর দিয়ে না বোঝে, তাহলে নারী-পুরুষ মিলে দেশটা এগিয়ে নেবে কীভাবে? নারীদের ওপর কোনও অন্যায় হলে নারীরাই মাঠে নামবে। সংখ্যালঘুরা নির্যাতিত হলে সংখ্যালঘুরাই শুধু প্রতিবাদ করবে। ডাক্তাররা আক্রান্ত হলে তারাই শুধু প্রতিবাদ করবে। এটাকে আমার কাছে খুব নোংরা লাগে।

কোথাও কোনও অন্যায় হলে, ধর্ম-বর্ণ-লিঙ্গ নির্বিশেষে সবারই তো মাঠে নামার কথা। আমরা ন্যায্যতার প্রশ্নে কেন ভাগ হবো। তাই নারীদের এই সমস্যা সমাধানে ডাকসুর কোনও পুরুষ সদস্য এগিয়ে এলে আমি বেশি খুশি হতাম। তবুও নারীদের অত্যন্ত স্বাভাবিক কিন্তু জটিল সমস্যার এই সহজ সমাধানের বিষয়টি ভাবার জন্য তিলোত্তমা শিকদারকে অভিবাদন। এই তিলোত্তমারাই আমাদের পথ দেখাবে। তিলোত্তমার এই উদ্যোগ আমাদের নারীদের সাহসী করবে, আত্মবিশ্বাসী করবে, সমাজের যুগ যুগ ধরে চলে আসা ট্যাবুতে কঠিন আঘাত হানবে।

কিন্তু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্যানিটারি ন্যাপকিন ভেন্ডিং মেশিন স্থাপন আমাকে যতটা আশাবাদী করেছে, ততটাই হতাশ হয়েছি একই দিনে নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের একটি সিদ্ধান্তে। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ধূমপানের অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় দুই ছাত্রীর সিট স্থায়ীভাবে বাতিল করেছে। প্রথম কথা হলো, আমি মোটেই ধূমপানের পক্ষের মানুষ নই। পুরোপুরি নন স্মোকার না হলেও আমি প্রবলভাবে এন্টি স্মোকার মানুষ। একসময় ছেলেরা নিজেদের স্মার্ট প্রমাণ করতে ধূমপান করতো। কিন্তু এখন ধারণা বদলে গেছে, স্মার্ট মানুষ আর সিগারেট খায় না। ধূমপান স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর। ধূমপান ক্যানসারের কারণ। তবে আমার সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো, শ্বাসকষ্ট। সিগারেট একবার ধরলে ছাড়া কঠিন। তবে আমি চাই না, কেউ ধূমপান শুরু করুক। ধূমপান স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর বটে, কিন্তু শাস্তিযোগ্য অপরাধ নয়। স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর আরও অনেক কিছু যেমন পান, জর্দা, ভাত, গরুর মাংস, চর্বি, চিনি, লবণ আমরা অবলীলায় সবার সামনে খাই। ধূমপান নিরুৎসাহিত করতে নানান চেষ্টা হয়। অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, অফিস, বিমানবন্দর, স্টেডিয়াম এখন ধূমপানমুক্ত। এসব এলাকায় ধূমপানের জন্য ধূমপায়ীদের অনেক দূর হেঁটে স্মোকিং কর্নারে যেতে হয়। নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস কি ধূমপানমুক্ত? তেমনটি হলে, অভিযুক্ত দুই ছাত্রীকে সতর্ক করে দেওয়া যেতো। কিন্তু ধূমপানের অপরাধে যারা দুই ছাত্রীর সিট বাতিল করেছেন, তারা অন্যায় করেছেন। সেই দুই ছাত্রী চাইলে হাইকোর্টে রিট করতে পারেন। আমার মনে হয় না, নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস ধূমপানমুক্ত। তেমন হলে তো অধিকাংশ ছাত্রেরই সিট বাতিল হওয়ার কথা। কিন্তু ধূমপান করার অপরাধে কোনও ছাত্রের সিট বাতিল হয়েছে এমন কোনও খবর পাইনি আমরা। তার মানে সেই বিশ্ববিদ্যালয়ে শুধু মেয়েদের ধূমপান করা অপরাধ, ছেলেদের নয়। এই বৈষম্যমূলক সিদ্ধান্ত নিয়ে কর্তৃপক্ষ প্রমাণ করলো, নামের সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয় শব্দটি থাকলেও, আসলে সেটি বিশ্ববিদ্যালয় নয়। বিশ্ববিদ্যালয় মানেই উদার, মুক্তচিন্তার বিকাশের ক্ষেত্র; যেখানে নারী-পুরুষে কোনও বৈষম্য থাকবে না। কাউকেই ধর্ম-বর্ণ-লিঙ্গ দিয়ে বিচার করা হবে না। কিন্তু শুধু নোয়াখালী বিশ্ববিদ্যালয় নয়; নারী পুরুষের এই বৈষম্য আমাদের সমাজের পদে পদে। ছেলেরা যে কাজ করতে পারবে, মেয়েদেরও তাই করতে পারা উচিত। কিন্তু আমরা ছেলেবেলাতেই ছেলে আর মেয়েতে বৈষম্যের দেয়াল তুলে দেই। মেয়েরো এটা করতে পারবে না, সেটা করতে পারবে না; এমন হাজারটা বাধা। ধর্ষণের জন্য দায়ী করা হয় মেয়েদের পোশাককে, বাইরে যাওয়াকে। নোয়াখালী বিশ্ববিদ্যালয় বুঝিয়ে দিলো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে তাদের ভৌগোলিক দূরত্ব ২০০ কিলোমিটার হলেও চিন্তার দূরত্ব অলঙ্ঘনীয়।

তবে সমাজকে এগিয়ে নিতে হলে আমাদের আরও অনেক তিলোত্তমা শিকদার লাগবে। তাদের পাশে দাঁড়াতে হবে আরও অনেক পুরুষকে, নারীকে, মানুষকে। সব ধরনের বৈষম্যের দেয়াল ভেঙে এগিয়ে নিতে হবে দেশকে-সমাজকে। আর সেই লড়াইটা করতে হবে নারী-পুরুষকে কাঁধে কাঁধ মিলিয়েই।

লেখক: হেড অব নিউজ, এটিএন নিউজ

/এসএএস/এমএমজে/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ