সংকটে ভারত

Send
বখতিয়ার উদ্দীন চৌধুরী
প্রকাশিত : ১৩:৩৩, ডিসেম্বর ১৯, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৩:৩৪, ডিসেম্বর ১৯, ২০১৯

বখতিয়ার উদ্দীন চৌধুরীবড় উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনা নিয়ে অগ্রসর হতে হলে শক্ত সহযোগী প্রয়োজন হয়। অমিত শাহ ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির হাতের শক্ত খুঁটি। নরেন্দ্র মোদি যখন গুজরাট রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন তখনও অমিত শাহ তার মন্ত্রিসভায় স্বরাষ্ট্র দফতরের মন্ত্রী ছিলেন। এখনও দেশের প্রধানমন্ত্রী হয়ে তিনি তাকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্ব দিয়েছেন। নরেন্দ্র মোদির মন্ত্রিসভায় দুইজন বিজ্ঞ ও আধুনিক দৃষ্টিভঙ্গির মন্ত্রী ছিলেন। একজন সুষমা স্বরাজ, অন্যজন ছিলেন অরুণ জেটলি। দু’জনই উচ্চশিক্ষিত। অরুণ জেটলি খ্যাতনামা আইনজীবীও ছিলেন। আর অবশিষ্ট মন্ত্রীরা প্রায় সবাই ফ্যানাটিক।
এখন সুষমা স্বরাজ আর অরুণ জেটলি প্রয়াত। সুতরাং মন্ত্রিসভায় ভিন্নমত পোষণ করে ভিন্ন পরামর্শ দেওয়ার লোক নেই। সবাই এখন ভারতকে নরেন্দ্র মোদির পরিকল্পনা মতো হিন্দু রিপাবলিক বানানোর কাজে আত্মমগ্ন। মন্ত্রিসভায় নরেন্দ্র মোদি, অমিত শাহসহ অনেক মন্ত্রী রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের ক্যাডার হিসেবে তাদের রাজনৈতিক জীবন আরম্ভ করেছিলেন। তারা তাদের সব শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ পেয়েছেন স্বয়ংসেবক সংঘের রাজনৈতিক আদর্শ বাস্তবায়নের শিক্ষা। রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের কর্মসূচির ব্যাপারে নরেন্দ্র মোদি ও অমিত শাহ একনিষ্ঠ।

রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের আদিগুরু হচ্ছেন সাভারকার আর গোলওয়ালকার। তারা ভারত রাষ্ট্রে মুসলমানদের অস্তিত্ব স্বীকার করতে আগ্রহী ছিলেন না। এম এস গোলওয়ালকার তার ‘উই অর আওয়ার নেশনহুড ডিফাইন্ড’ বইতে লিখেছেন, ‘ভারতবর্ষের মুসলমানেরা সসম্মানে বাস করতে পারবেন যদি তারা মোটামুটি হিন্দু হয়ে যায়। হিন্দু দূরে থাক যেন কোনও সাংস্কৃতিক পার্থক্য পর্যন্ত তাদের মাঝে না থাকে। এছাড়া তারা হিন্দু জাতির অধীনস্থ হয়ে থাকবে, কোনও কিছু দাবি করতে পারবে না। এমনকি কোনও নাগরিক অধিকারও না।’ (পৃষ্ঠা ৫৫-৫৬)।

নরেন্দ্র মোদি আর অমিত শাহ’র নাগরিক খোঁজার প্রকল্প কি সত্যিই যথার্থ প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নাকি আরএসএসের পরিকল্পনা বাস্তবায়নের কৌশল- সে প্রশ্ন এখন জোরেশারে উঠছে। এনআরসি থেকে নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন (সিএএ)নিয়ে সারা ভারত উত্তপ্ত। রাজপথে নেমেছে ছাত্ররা। তাদের সমর্থনে এগিয়ে এসেছে নাগরিক সমাজ। মমতাসহ অনেক মুখ্যমন্ত্রী এনআরসি এবং সিএএ বাস্তবায়নের বিরুদ্ধে।

আসামে নাগরিক পঞ্জির ক্লান্তিকর কর্মসূচি চলছে চার বছর। ১৯ লক্ষ নাগরিক চিহ্নিত করতে খরচ হয়েছে প্রায় ১৬ হাজার কোটি রুপি। উদ্যোক্তারা সন্তুষ্ট নন। কারণ, তাতে মুসলিমদের চেয়ে অমুসলিম বেশি। তারা এনআরসির বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টে নারাজি পেশ করেছেন আর সুপ্রিম কোর্ট আবেদন খারিজ করে দিয়েছেন। আসামে এনআরসিতে হাত পুড়ে যাওয়ার পরও অমিত শাহরা সারা দেশে এনআরসি বাস্তবায়নের কথা কেন বলছেন? এর একটাই জবাব- নাগপুরের গুরুজিদেবের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে হলে মুসলিম সম্প্রদায়কে ডিমোরালাইজ করে ফেলা দরকার। কারণ, কোনও জাতি তার নৈতিক বল হারিয়ে ফেললে অর্ধমৃত হয়ে যায়।

ভারতীয় মুসলমানরা নৈতিক বল এখনও হারায়নি। কারণ, আন্তর্জাতিক পরিসরে তাদের ধর্মাবলম্বীদের ৫৭টি রাষ্ট্র রয়েছে। যেখানে ১১ লাখ রোহিঙ্গার জন্য গাম্বিয়া ওআইসির পরামর্শ মতো আন্তর্জাতিক আদালতে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে মামলা রুজু করেছে সেখানে আন্তর্জাতিক মুসলিম সম্প্রদায় কি ভারতের ৩০ কোটি মুসলমানের দুঃখ-দুর্দশাকে উপেক্ষা করবে! কখনও নয়। আর মুসলিম ছাড়াও দুনিয়ায় অন্য সম্প্রদায়ের লোকেরাও নাগপুরের গুরুদেব শিষ্য নন। আসামের এনআরসি সম্পর্কে এরইমধ্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ কয়েকটি আন্তর্জাতিক সংস্থা তাদের তীব্র প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছে। সবাই এক সুরে বলছে, এনআরসি এবং সিএএ’র মাধ্যমে মুসলিম সংখ্যালঘুদের লক্ষ্যবস্তু বানানো হয়েছে, যার মাধ্যমে মুসলমানদের দেশছাড়া করার পরিকল্পনা রয়েছে মোদি সরকারের।

অমিত শাহের স্মরণে রাখা উচিত, শুধু মানুষ হত্যা করলে গণহত্যা হয় না, পরিকল্পিতভাবে মানুষকে বাস্তুত্যাগী করার উদ্যোগও গণহত্যার শামিল। গণহত্যা প্রতিরোধ ও বন্ধে আন্তর্জাতিক সংস্থা জেনোসাইড ওয়াচের প্রতিষ্ঠাতা যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রতিরক্ষা কর্মকর্তা ড. গ্রেগরি স্ট্যানটন সম্প্রতি ওয়াশিংটন ডিসিতে অনুষ্ঠিত মার্কিন কংগ্রেসের সদস্য ও দেশটির সরকারি কর্মকর্তাদের এক অনুষ্ঠানে অংশ নিয়ে ভারতের চলমান অস্থিরতা নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে বলেছেন, ‘ভারতে গণহত্যার প্রস্তুতি প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। আসাম এবং কাশ্মিরে মুসলিমদের বিরুদ্ধে নিপীড়ন গণহত্যার আগের পর্যায়ে রয়েছে। এর পরের পর্ব হলো নির্মূলকরণ, আমরা যেটাকে গণহত্যা বলে থাকি।’ তিনি গণহত্যার দশটি ধাপের উল্লেখ করেছেন, পাঠকের জানার জন্য আমি তা হুবহু তুলে দিচ্ছি:

প্রথম ধাপ: সমাজে বিভাজন তৈরি করা। এই বিভাজন ‘আমরা’ বনাম ‘তারা’।

দ্বিতীয় ধাপ: একটি প্রতীক দাঁড় করানো, ভুক্তভোগীদের ‘বিদেশি’ হিসেবে ডাকা।

তৃতীয় ধাপ: বৈষম্য। একটি শ্রেণিকে নাগরিকত্বের বাইরে রাখা। বৈষ্যমের আইনি বৈধতা তৈরি করা; যাতে ওই শ্রেণির মানুষের কোনও নাগরিক বা মানবিক অধিকার না থাকে।

চতুর্থ ধাপ: অমানবিকীকরণ করা; যখন গণহত্যার বিষয়টি অগ্রসর হতে থাকে। যেকোনোভাবে ভিকটিমকে নিকৃষ্ট হিসেবে তুলে ধরা। তাদের সন্ত্রাসী কিংবা অন্য কোনও জন্তুর সঙ্গে তুলনা করা। অথবা ক্যান্সারের মতো রোগের সঙ্গে টার্গেট জনগোষ্ঠীকে তুলনা করা; যাতে তাদের সমাজের কাছে বালাই হিসেবে উপস্থাপন করা যায় এবং এর চিকিৎসা জরুরি।

পঞ্চম ধাপ: গণহত্যা সংঘটনের জন্য একটি সংস্থা তৈরি করা। কাশ্মিরে এই ভূমিকা পালন করেছে ইন্ডিয়ান আর্মি। অন্যদিক আসামে এনআরসি বাস্তবায়নকারীরা।

ষষ্ঠ ধাপ: মেরুকরণ; যা প্রচারণার মাধ্যমে করা হয়।

সপ্তম ধাপ: প্রস্তুতি।

অষ্টম ধাপ: নিপীড়ন। বর্তমানে আসাম ও কাশ্মির এই ধাপে রয়েছে।

নবম ধাপ: নির্মূলকরণ।

দশম ধাপ: অস্বীকার করা।

আসামের এনআরসি বাস্তবায়ন করতে গিয়ে সরকারের ১৬ হাজার কোটি রুপি খরচ হয়েছে আর আসামের গণমানুষ নাগরিকত্ব হারানোর ঠিকুজি-কুষ্ঠি এবং অন্যান্য প্রমাণাদি জোগাড় করতে গিয়ে ১০ হাজার কোটি রুপি খরচ করেছে। যাদের নুন আনতে পান্তা ফুরায় তাদের জন্য তো এটি অনেক বড় অঙ্কের খরচ। এখন নাগরিকত্ব হারাদের ক্যাম্পে পাঠানো হয়েছে। গণমাধ্যমে দেখেছি, ক্যাম্পে দুই জন হিন্দু ভদ্রলোক মারা গেছেন। তাদের  পরিজনদের সরকার বলেছে মৃতদেহ নিয়ে সৎকার করার জন্য। কিন্তু মৃত ব্যক্তিদের পরিজনেরা সৎকারের জন্য মৃতদেহ নেয়নি। তারা সরকারকে বলেছে মৃতদেহ সৎকারের জন্য বাংলাদেশে পাঠিয়ে দিতে।

বিজেপির আগের নাম জনসংঘ পরিবর্তন করে হয়েছে বিজেপি। এ দলটি সম্পর্কে ঐতিহাসিক অশীন দাশগুপ্ত লিখেছেন, ‘প্রকৃত সমস্যার কোনও সমাধানই যখন এই দলটির পক্ষে সম্ভব নয় তখন ঝোঁক হবে ভুয়া সমস্যাগুলোকে বড় করে তোলার। যুক্তিগ্রাহ্য সর্বপ্রকার আলোচনা বন্ধ করে দেওয়ার। দুশ্চিন্তাটা এখানেই।’ (স্বাধীনতা ও অন্যান্য বিষয়, পৃষ্ঠা ১৩৭)।

অশীন দাশগুপ্তর কথাটা বর্তমান বিজেপি সরকারের জন্য শতাংশ সত্য। ভারতীয় অর্থনীতির এখন কাহিল অবস্থা। তার উন্নয়নে তাদের কোনও মাথাব্যথা নেই অথচ ভুয়া সমস্যাগুলো নিয়ে সরকার মশগুল। তারা চেষ্টা করছে মানুষ শিকারে ভারতীয় জনগোষ্ঠীকে উদ্বুদ্ধ করতে। আর শিকারের জন্য ঠিক করেছে তার মুসলিম নাগরিকদের। একবার যদি কোনও জাতিকে শিকারে লাগিয়ে দেওয়া যায় তবে সমাজের প্রকৃত দুঃস্বপ্নগুলো মানুষ আর মনে রাখে না। নরেন্দ্র মোদি-অমিত শাহরা যা করছে তা হচ্ছে দুনিয়ার এক প্রাচীন জনগোষ্ঠীকে ধর্মের নামে কলহের মধ্যে নিমগ্ন করে বিনাশ করে দেওয়ার।

লোকসভায় ভারতের শাসনতন্ত্র প্রণয়ন করেছেন ছয়শত বিখ্যাত আইনজীবী আম্বেদকরের নেতৃত্বে। এখানে রাজেন্দ্র প্রসাদের মতো  আইনজীবী ছিলেন। পালকিওয়ালার মতো আইনজীবী ছিলেন। রাজেন্দ্র প্রসাদ, পালকিওয়ালা ধার্মিক ছিলেন। রাজেন্দ্র প্রসাদ যখন রাষ্ট্রপতি ছিলেন তখন রাষ্ট্রপতির ভবনে পূজা-পার্বণ লেগেই থাকতো।

এমন ধার্মিক লোকের সভাপতিত্বে ভারতের গণপরিষদে শাসনতন্ত্র পাস হয়েছিল কিন্তু রাজেন্দ্র প্রসাদ কখনও ধর্মকে শাসনতন্ত্র প্রণয়নে টেনে আনেননি। কারণ, তারা চিন্তা করেছিলেন ধর্মকে রাষ্ট্র কাঠামোয় টেনে আনলে রাষ্ট্র স্থায়ী হবে না। অথচ গান্ধী, নেহরু, বল্লভ ভাই প্যাটেল, মাওলানা আবুল কালাম আজাদ, কৃপালিনী, রফি আহমেদ কিদোয়াই প্রমুখের মতো জ্ঞান-গরিমায় পারদর্শী লোক তখনও ভারতে ছিল না, এখনও নেই। তাদের সামনে নরেন্দ্র মোদি ও অমিত শাহকে শিশু বলেই মনে হয়।

প্রতিষ্ঠাতারা সিদ্ধান্ত নিয়েছেন ভারতের বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্য সাধন করে ভারতকে রাষ্ট্র হিসেবে টিকাতে হবে। আর নরেন্দ্র মোদি, অমিত শাহরা চাচ্ছেন ভারতকে হিন্দু রিপাবলিক বানাতে। ভারত সাতটি মূল ধর্মের দেশ। সে দেশের মানুষ ১২২টি ভাষায় কথা বলেন, আবার উপভাষা আছে ১ হাজার ৬০০টি। এমন একটি দেশকে কেউ শক্তভাবে বাঁধতে চাইলে বন্ধন কখনও টিকবে না।

একটা উদাহরণ দিই। উত্তর-পূর্ব ভারতের লোক এনআরসি মানে কিন্তু নাগরিকত্ব সংশোধনী বিল মানে না। এরকম হওয়া আশ্চর্যের কিছু নয়, কারণ গোটা বিষয়টি অত্যন্ত জটিল, এ কারণেই শাসনতন্ত্র রচনা করতে স্থপতিদের দীর্ঘ চার বছর (৪৭-৫১ সাল) লেগেছিল। সব জটিলতা সমন্বয় করে সমাধান বের করেছিলেন তারা। সে কারণে শাসনতন্ত্র এখনও বিতর্কের ঊর্ধ্বে। নরেন্দ্র মোদি আর অমিত শাহের যশ থাকতে কীর্তন শেষ করাই উত্তম হবে।

লেখক: রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও কলাম লেখক

[email protected]

 

/এসএএস/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ