এই শহর নিরাপদ হবে কবে?

Send
প্রভাষ আমিন
প্রকাশিত : ১৬:০৩, জানুয়ারি ০৬, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১৬:০৪, জানুয়ারি ০৬, ২০২০

প্রভাষ আমিনভেবেছিলাম সরকারের বর্ষপূর্তি নিয়ে লিখবো। কিন্তু সকালটাই বদলে দিলো সবকিছু। আগের রাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থী ধর্ষণের শিকার হয়েছেন। তাও হয়েছেন রাজধানীর প্রাণকেন্দ্রে। দেশে যখন পুলিশ সপ্তাহ চলছে, তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থীর ধর্ষণের শিকার হওয়া আমাদের নিরাপত্তা বোধে প্রচণ্ড ধাক্কা দেয়, নাড়িয়ে দেয় আমাদের আস্থা। আমি বলছি না, এই ধর্ষণের জন্য পুলিশ দায়ী, সরকার দায়ী। কিন্তু সামগ্রিকভাবে একটা নিরাপদ শহর গড়তে না পারা অবশ্যই আমাদের ব্যর্থতা। মানুষের মধ্যে, বিশেষ করে নারীদের মধ্যে নিরাপত্তা বোধ সৃষ্টি করতে না পারা অবশ্যই আমাদের চরম ব্যর্থতা। একটা নিরাপদ শহর গড়তে না পারলে আমাদের অনেক উন্নয়নের গল্প অর্থহীন হয়ে যাবে। 

আগে দেশের বাইরে গেলে ব্যাংকক, কুয়ালালামপুর বা নয়াদিল্লিতে গেলে মন ভালো হয়ে যেতো। মেয়েরা সাইকেল বা মোটরসাইকেল নিয়ে হুশ করে চলে যাচ্ছে। মেয়েরা কোনোদিকে না তাকিয়ে ছুটে যাচ্ছে কাজের ব্যস্ততায়। গত কয়েকবছরে ঢাকার রাস্তায়ও বদলটা এসেছে। এখন প্রায়ই সিগন্যালে গাড়ির পাশে এসে দাঁড়ায় কোনও সুন্দরীর বাইক। আমি তাকিয়ে থাকি, আমার মন ভালো হয়ে যায়। আমাদের নারীরাও সাহস নিয়ে বেরিয়ে এসেছে, পুরুষদের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে কাজ করছে। বিভিন্ন পাবলিক পরীক্ষার ফলে মেয়েরা অনেকবছর ধরেই ছেলেদের চেয়ে ভালো করছে। সেই প্রভাব এখন পড়তে শুরু করেছে সমাজের সবক্ষেত্রে। এখন আর মেয়েদের কাজ বলে, ছেলেদের কাজ বলে আলাদা কিছু নেই। মেয়েরা সব কাজ করছে দক্ষতার সঙ্গে, পাল্লা দিয়ে। নারীর ক্ষমতায়নের কথা আমরা বলি বটে। কিন্তু এটা মুখে বলার কথা নয়, কাজে প্রয়োগ করতে হবে। আর নারীর ক্ষমতায়নের সবচেয়ে বড় উপায় হলো, তাদের অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হওয়া, নিজের ক্যারিয়ার গড়ে তোলা। তৈরি পোশাক খাত আগেই তৃণমূলে নারীদের বদলে দিয়েছে। এখন বদলটা দৃশ্যমান হচ্ছে শহরেও, মধ্যবিত্ত সংসারেও। অনেক নারী সংসারের প্রয়োজনে চাকরি করেন। আবার অনেকে টাকার প্রয়োজন না থাকলেও নিজের ক্যারিয়ার গড়েন। কিন্তু নারীদের এই এগিয়ে যাওয়া, কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করার পরিবেশের জন্য বড় ধাক্কা হলো কুর্মিটোলার ধর্ষণের ঘটনা। নারীরা অনেক বাধা ঠেলে এগিয়ে যায়, এমন একেকটি ঘটনা তাদের আবার পিছিয়ে দেয়, ভয় পাইয়ে দেয়। 

আমাদের সমস্যা হলো, কোনও ধর্ষণের ঘটনা ঘটলে প্রতিবাদের প্রাথমিক ধাক্কাটা কাটার পর কিছু লোক ইনিয়ে বিনিয়ে বলার চেষ্টা করে, মেয়েটি অত রাতে ওখানে গেলো কেন, অমন পোশাক পরলো কেন, অমন করে হাসলো কেন ইত্যাদি ইত্যাদি। কিন্তু কে কোন পোশাক পরবে, কে কখন কোথায় যাবে; তা ঠিক করে দেওয়ার আমি-আপনি কে? আর সন্ধ্যা ৭টায় ঢাকার কুর্মিটোলা যদি আমার বোনের জন্য নিরাপদ না হয়, তাহলে তারা কী করবে? তাহলে আমার মা-বোন-স্ত্রী-কন্যারা ঘরে বসেই থাকবে? 

এটা ঠিক কে ধর্ষক আর কে নয়, এটা আগে থেকে বলা মুশকিল। আমি বারবার বলি ধর্ষণ একটি পুরুষালী রোগ। দেখতে সভ্য, শিক্ষিত অনেক পুরুষের মনেও ধর্ষক বাস করে। সুযোগ পেলে সেও হয়ে উঠতে পারে ধর্ষক। ঘরে ঘরে আমাদের কত কন্যা, কত শিশু ঘনিষ্ঠ আত্মীয়ের ধর্ষণের শিকার হয়; তার কোনও ইয়ত্তা নেই, কোনও পরিসংখ্যানেই তার হিসাব নেই। কত মেয়ে ছেলেবেলায় যৌন নিপীড়নের দুঃসহ স্মৃতি সারাজীবন গোপনে বয়ে বেড়ায়, তার খবর কে রাখে। ধর্ষণ একটি সাংঘাতিক পুরুষতান্ত্রিক ভাবনা। ধর্ষক যে সবসময় যৌনতার কারণে ধর্ষণ করে, তা নয়। পুরুষ ধর্ষণের মাধ্যমে নিজের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করতে চায়। প্রেমে ব্যর্থ হয়েও অনেকে ধর্ষণ করে। ভাবটা এমন, যা তোকে নষ্ট করে দিলাম। পুরুষ চাইলেই একজন নারীকে নষ্ট করে দিতে, তাকে ধ্বংস করে দিতে পারে, সমাজচ্যুত করে দিতে পারে। ধর্ষক পুরুষ মনে করে এটাই তার শ্রেষ্ঠত্ব। গ্রামে তো ধর্ষকের সঙ্গে ধর্ষিতার বিয়ে দেওয়ার মতো একটা ভয়ঙ্কর অপরাধ হয়। কারণ ধর্ষিতা তো নষ্ট হয়ে গেছে, তাকে তো আর কেউ নেবে না। ভাবা যায়, একটা মেয়েকে জেনেশুনে সারাজীবন একটা ধর্ষকের সঙ্গে সংসার করতে হয়। 

ব্যাপারটা এমন নয়, কেবল বাংলাদেশে বা কেবল ঢাকায়ই ধর্ষণের ঘটনা ঘটে। পাশের দেশ ভারত মাঝে মধ্যেই ধর্ষণের প্রতিবাদে উত্তাল হয়। কিন্তু অন্য কোনও দেশের, কোনও শহরের তুলনায় নয়; আমরা চাই একটি নিরাপদ দেশ, নিরাপদ শহর। আর একজন নারী কতটা নিরাপদ, সেটিই শহরের নিরাপত্তার মানদণ্ড। সেই নিরাপদ করার উপায় কী? উপায় হলো, কঠোর নজরদারি, আইনের কঠোর প্রয়োগ, দৃষ্টান্তমূলক সাজা। মনে মনে অনেক ধর্ষক আছে আমাদের, যারা সাজার ভয়ে ধর্ষণ করে না। সেই ভয়টা ঢুকিয়ে দিতে হবে সকল সম্ভাব্য ধর্ষকের মনে। বোঝাতে হবে, তুমি যাই করো, পুলিশ নজর রাখছে। পুলিশ ধরবে এবং কঠোর সাজা  পেতে হবে। 

কিন্তু এই ভয়টা তারা পায় না। আর পায় না বলেই ধর্ষণের ঘটনা বাড়ছে। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের হিসাবে ২০১৮ সালের তুলনায় ২০১৯ সালে ধর্ষণ ও গণধর্ষণের ঘটনা দ্বিগুণ হয়েছে। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের বার্ষিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০১৯ সালে দেশে এক হাজার ৪১৩ জন নারী ধর্ষিত হয়েছেন। এর মধ্যে ধর্ষণের পর হত্যার শিকার হয়েছেন ৭৬ জন এবং আত্মহত্যা করেছেন ১০ জন। ২০১৮ সালে ধর্ষণের শিকার হয়েছিলেন ৭৩২ নারী এবং ২০১৭ সালে এ সংখ্যা ছিল ৮১৮। তবে আমার ধারণা এই সংখ্যাটা আরও বেশি। ধর্ষণের অনেক ঘটনা সামাজিক কারণে আড়ালেই থেকে যায়। 

এই পরিসংখ্যান আমাদের মনে ভয় ধরিয়ে দেয়। তার মানে আমরা অপরাধীদের ভয় ধরাতে চরমভাবে ব্যর্থ হয়েছি। তারা জানে, ধর্ষণ করে পালাতে পারলেই হলো। আর ধরা পড়বে না, বিচার হবে না। আর ধর্ষণের তো কোনও সাক্ষী থাকে না। মামলা চলবে, অপরাধ প্রমাণ হবে না। বরং ধর্ষিতাকেই হাসপাতালে, পুলিশের প্রশ্নে, আদালতে উকিলের জেরায় বারবার অপমানিত হতে হবে। অনেকে তাই আদালত পর্যন্ত যেতেই চান না। একটা দুইটা ঘটনা নিয়ে আলোচনা হয়, হইচই হয়। তাও কদিন পর আমরা ভুলে যাই। যেমন ২০১৯ সালে যে এক হাজার ৪১৩ জন নারী ধর্ষণের শিকার হলেন, তারা কজন বিচার পেয়েছেন, কজন ধর্ষকের সাজা হয়েছে। তাই বিচার প্রক্রিয়াটা নিয়ে ভাবতে হবে। সঠিক তদন্ত, দ্রুত বিচার নিশ্চিত করতে হবে। 

কুর্মিটোলার ঘটনার পর অনেকে ধর্ষকের ক্রসফায়ার চাইছেন, অনেকে পাথর ছুড়ে মারতে চাইছেন। আইনের ওপর, প্রচলিত বিচার ব্যবস্থার ওপর আস্থাহীনতার কারণেই আমরা বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের দাবি করছি। ক্রসফায়ার দিয়ে একটা দুই ঘটনার ক্ষোভের সাময়িক প্রশমন সম্ভব হতো; কিন্তু সামগ্রিকভাবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর মানুষের আস্থা তৈরি করতে না পারলে কোনও সমস্যারই সমাধান হবে না। ২০১৯ সালে এক হাজার ৪১৩টি ঘটনায় এক হাজার ৪১৩ জনকে তো আর ক্রসফায়ার দেওয়া সম্ভব হয়নি নিশ্চয়ই। শেষ পর্যন্ত আইনের কাছেই আমাদের আশ্রয় নিতে হবে। 

আরেকটা কথা বলি, পুরুষদের মনের গহিনে লুকিয়ে থাকা ধর্ষকটাকে মারতে না পারলে আইনশৃঙ্খলা দিয়েও ধর্ষণ পুরোপুরি বন্ধ করা যাবে না। সুযোগ পেলে আপনার পাশের বন্ধুটি, আপনার প্রেমিকটি, এমনকি আপনার স্বামীও ধর্ষক হয়ে উঠতে পারে। আপনার ছেলে সন্তানকে ছেলেবেলাতেই নারীকে সম্মান করতে শেখান। নারী সম্পর্কে তার ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি সৃষ্টি করার চেষ্টা করুন। 

তবে ধর্ষকের মানসিকতা বদলানোর আশায় বসে থাকলে পুলিশের চলবে না। সরকারকে-পুলিশকে তার দায়িত্ব পালন করতে হবে। যাতে আমাদের বোনেরা, কন্যারা নির্ভয়ে কাজে যেতে পারে, বেড়াতে যেতে পারে; তা নিশ্চিত করতে হবে। আমরা কিছু বুঝতে চাই না, হাজার কোটি টাকার উন্নয়ন করলে হবে না। আমাদের বোনের, কন্যার নিরাপত্তা দিতে হবে। শুধু এই প্রতিবাদ, এই বিক্ষোভ করে লাভ নেই। কদিন পরই আমরা ভুলে যাবো। আমরা তনুকে ভুলে গেছি। বা অনেক বিক্ষোভ করে হয়তো আমরা একটি ঘটনার বিচার পাবো, ধর্ষণ তো কমবে না। আগামী বছর হয়তো আইন ও সালিশ কেন্দ্র আবার রিপোর্ট দেবে, ধর্ষণ আরও বেড়েছে। এমন রিপোর্ট আমরা চাই না। 

লেখক: হেড অব নিউজ, এটিএন নিউজ

/এমএমজে/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ