বাঘ যদি এসেই যায় তখন কী হবে?

Send
রেজানুর রহমান
প্রকাশিত : ১৫:০০, মার্চ ১৬, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১৫:০১, মার্চ ১৬, ২০২০

রেজানুর রহমানবাঘ এলো, বাঘ এলো... টাইপের বহুল প্রচারিত একটি গল্প আছে। নীতিকথা শেখানোর গল্প। এক রাখাল বালক হঠাৎ একদিন বাঘ এলো বাঘ এলো... বলে চিৎকার, চেঁচামেচি শুরু করে দিলো। তার চিৎকার শুনে ভয়ে অস্থির গ্রামবাসী জোটবদ্ধভাবে তাকে বাঁচানোর জন্য ছুটে এলো। বাস্তবে দেখা গেলো বাঘ আসেনি! রাখাল বালক মজা করার জন্য এভাবে চিৎকার দিয়ে লোক জড়ো করেছে। অবস্থা বুঝতে পেরে লোকজন ক্ষুব্ধ হয়ে যার যার বাড়ি ফিরে গেলো। হঠাৎ আরেকদিন ওই বালক বাঘ এলো, বাঘ এলো বলে আবারও চিৎকার-চেঁচামেচি শুরু করে দিলো। গ্রামের কিছু লোক আবারও দৌড়ে এলো তাকে বিপদ থেকে উদ্ধার করার জন্য। কিন্তু এবারও বাঘ আসেনি। গ্রামবাসীকে দৌড়ে আসতে দেখে বালক খিলখিল করে হাসছে। যেন এর চেয়ে মজার ও কৌতুকপ্রদ বিষয় আর হয় না।
দিন যায়, মাস যায়, বালকটি এভাবে আরও কয়েকবার চিৎকার দিয়ে লোকজন জড়ো করে। একটা সময় গ্রামের লোকজন রাখাল বালকের প্রতি দারুণ ক্ষুব্ধ ও অতিষ্ঠ হয়ে উঠলো এবং সিদ্ধান্ত নিলো তার কথাকে আর কেউ গুরুত্ব দেবে না।

একদিন সত্যি সত্যি গ্রামে বাঘ এলো। রাখাল বালকটি ভয়ে অন্যান্যবারের চেয়ে দ্বিগুণ শক্তিতে চিৎকার চেঁচামেচি শুরু করে দিলো। কিন্তু গ্রামবাসী তার কথায় মোটেই গুরুত্ব দিলো না। ফলে যা হওয়ার তা-ই হলো। বাঘের থাবায় প্রাণ গেলো রাখাল বালকের।

এই গল্পের সঙ্গে বর্তমান সময়ের কোথায় যেন একটা মিল খুঁজে পাচ্ছি। বিশ্বব্যাপী করোনা ভাইরাস তার থাবা বিস্তার করেছে। বিশ্বের ১৫০টি দেশ করোনা ভাইরাসের থাবায় আক্রান্ত, পর্যুদস্ত, বিধ্বস্তও বটে। আকাশ পথে বহির্বিশ্বের যোগাযোগ বন্ধ। ভাগ্য ভালো, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এখনও টিকে আছে। তা না হলে বিশ্বব্যাপী যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যেত। দৈবাৎ কোনও কারণে হঠাৎ করে যদি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ক্ষেত্রে কখনও কোনও কারণে বিপর্যয় ঘটে তাহলে বিশ্ব পরিস্থিতি কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে বলা মুশকিল। করোনা ভাইরাস গোটা বিশ্বকে অসহায় করে তুলেছে। আমাদের দেশে সেই অর্থে এখনও পরিস্থিতি স্বাভাবিক থাকলেও বিশ্ব পরিস্থিতির কারণে জনমনে ব্যাপক আতঙ্ক বিরাজ করছে। জনমনে একটাই ভয় আর আতঙ্ক দেখা দিয়েছে যে পর্যাপ্ত আধুনিক স্বাস্থ্য চিকিৎসার ক্ষেত্রে বিশ্বের উন্নত দেশগুলো যেখানে করোনার বিস্তার রোধে হিমশিম খাচ্ছে সেখানে বাংলাদেশের মতো স্বাস্থ্য চিকিৎসায় অনুন্নত দেশ কীভাবে পরিস্থিতি মোকাবিলা করবে? যদিও সরকার বলছে দুশ্চিন্তার কোনও কারণ নেই। করোনা মোকাবিলায় সরকার ব্যাপক কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। তবু দুশ্চিন্তা কমছে না। বরং সীমাহীন আশঙ্কা ছড়িয়ে পড়েছে এই ভেবে যে- পাছে না পরিস্থিতি বাঘ এলো, বাঘ এলো’র মতো হয়ে যায়। করোনা যদি শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশে ছড়িয়ে পড়ে তখন পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা কি আদৌ সম্ভব হবে?

তাহলে আমাদের করণীয় কী? করণীয় হলো আগাম সতর্কতা। যদিও এক্ষেত্রে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ দেশের প্রচার মাধ্যমসমূহে ব্যাপক প্রচারণা শুরু হয়েছে। তবু উদ্বেগ উৎকণ্ঠা কমছে না। বরং দিনে দিনে করোনা সম্পর্কে উদ্বেগ, উৎকণ্ঠা বৃদ্ধি পাচ্ছে। সরকারিভাবে বলা হয়েছে, করোনা যেহেতু ছোঁয়াছে রোগ, কাজেই অত্যধিক জনসমাগম পরিহার করতে হবে। অর্থাৎ অধিক মানুষের ভিড় এড়িয়ে চলতে হবে। অথচ স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়গুলো ঠিকই খোলা রাখা হয়েছে আজ পর্যন্ত। ফলে অভিভাবকদের মধ্যে বাড়তি আতঙ্ক বাড়ছিল। যদিও আজ ঘোষণা হয়েছে আগামী ৩১ মার্চ পর্যন্ত সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ। আমাদের মনে রাখতে হবে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো মূলত বড় জনসমাবেশের জায়গা। ৬১টি দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এখন বন্ধ। অথচ বাংলাদেশে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলা ছিল এতদিন। যদিও অধিকাংশ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থী উপস্থিতির হার খুবই কম। বিভিন্ন মহল থেকে দাবি ছিল করোনার ব্যাপারে আগাম সতর্কতা হিসেবে অবিলম্বে দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কিছুদিনের জন্য হলেও বন্ধ রাখা হোক। শেষ পর্যন্ত আজ ঘোষণা এলো।

প্রসঙ্গক্রমে আরেকটি জরুরি প্রসঙ্গ তুলে ধরতে চাই। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ঢুকলে অসংখ্য করোনা বিশেষজ্ঞের সাক্ষাৎ মিলবে। অনেকে এমন কিছু তথ্য ও পরামর্শ দিচ্ছেন, যা শুনে শুধু অবাক নয়, ভয়ও পাচ্ছি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেই একজনকে বলতে শুনলাম করোনায় নাকি শিশু ও যুবকদের স্বাস্থ্যঝুঁকি কম। যারা বৃদ্ধ অর্থাৎ ৫০-এর ওপরে বয়স তাদের ক্ষেত্রে স্বাস্থ্যঝুঁকি বেশি। একজন তো হাসতে হাসতেই বললেন, আমাদের দেশের জনসংখ্যার বেশিরভাগই তরুণ। কাজেই আমাদের ভয়ের কোনও কারণ নেই। তার কথা শুনে হাসবো নাকি কাঁদবো বুঝতে পারছিলাম না। ধরা যাক, করোনায় তরুণদের স্বাস্থ্যঝুঁকি কম, বৃদ্ধদের বেশি। কিন্তু একথা হাসতে হাসতে বলার কী হলো? তার মানে আমরা কি চাচ্ছি আমাদের ওল্ড জেনারেশন মরে যাক? কী মূর্খের মতো কথাবার্তা!

করোনায় আক্রান্ত দেশগুলোর মধ্যে ইতালির অবস্থা খুবই খারাপ। প্রতিদিন উদ্বেগজনক হারে করোনায় আক্রান্ত মানুষের মৃত্যু হচ্ছে ইতালিতে। করোনা থেকে বাঁচতে ইতালি প্রবাসী ১৫০ জন মানুষ অনেক কষ্টে নিজ দেশ বাংলাদেশে এসেছে! এ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কত ধরনের কথা যে প্রকাশ হচ্ছে। একজন লিখেছেন, ওদের দেশে ঢুকতে দেওয়া ঠিক হবে না। আরেকজন লিখেছেন, ওদের বয়কট করা হোক! কিন্তু প্রশ্ন হলো, ওরা তো এই দেশেরই মানুষ। দেশের মানুষ দেশে ফিরে এসেছেন। কাজেই তাদের নিরাপত্তা দেওয়া সবার দায়িত্ব। একথা বোধকরি ভুলে গেলে চলবে না, কিছু দিন আগেও ওদের পাঠানো অর্থে দেশের অর্থনীতি সচল ছিল। ওরা বিপদে পড়ে দেশে এসেছে। কাজেই ওদের দেখভাল করার দায়িত্ব রাষ্ট্রকেই নিতে হবে। তবে যারা করোনায় আক্রান্ত দেশ থেকে স্বদেশে ফিরে আসছেন তাদের উচিত সরকারের নির্দেশনা মেনে চলা। বহুদিন পর বাবা-মা আত্মীয়-স্বজনের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। অনেকেই আবেগ সামলাতে না পেরে বাবা-মা, আত্মীয়-স্বজনকে জড়িয়ে ধরছেন। এটা মোটেই ঠিক হচ্ছে না। সরকারের নির্দেশনা অনুযায়ী কমপক্ষে ১৪ দিন নিজ বাসা-বাড়িতে কোয়ারেন্টাইনে থাকার ব্যাপারে সর্বাত্মক সহযোগিতা করুন। অভিযোগ উঠেছে, বিদেশ ফেরত কেউ কেউ নাকি সরকারের পরামর্শ মানছেন না। অভিযোগ সত্যি হলে তা হবে খুবই দুশ্চিন্তার। যারা বিদেশ থেকে ফিরছেন তারা নিশ্চয়ই চাইবেন না আপনার কারণে পরিবারের অন্য সদস্য করোনায় আক্রান্ত হোক। যা হবে শুধু আপনার পরিবারের জন্য নয়, সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্য ব্যাপক ক্ষতির কারণ।

প্রচারমাধ্যমে দেখলাম ইতালি ফেরত ১৫০ জন প্রবাসীকে আশকোনা হজ ক্যাম্পে নেওয়া হয়েছিল। ধরা যাক, তাদের কারও কারও দেহে করোনার জীবাণু রয়েছে। তাহলে তো অধিক সতর্কতা জরুরি। অথচ অভিযোগ পাওয়া গেছে, আশকোনা হজ ক্যাম্পে নাকি করোনা থেকে সতর্ক থাকার মতো কোনও পরিবেশই তৈরি করা হয়নি। যদি অভিযোগ সত্য হয় তাহলে তা হবে দুশ্চিন্তার বড় কারণ। কেন একথা বলছি? আসুন বুঝিয়ে বলছি। মাত্র ১৫০ জন মানুষের স্বাস্থ্য সতর্কতায় আমরা যদি কার্যকর ভূমিকা নিতে না পারি তাহলে এই দেশে যদি করোনা মহামারি হিসেবে দেখা দেয় তখন পরিস্থিতি কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে?

লেখক: কথাসাহিত্যিক, নাট্যকার, সম্পাদক: আনন্দ আলো

/এসএএস/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ