করোনার করুণায় অর্থনীতি

Send
সৈয়দ ইশতিয়াক রেজা
প্রকাশিত : ১৪:২৮, মার্চ ১৮, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১৪:৩০, মার্চ ১৮, ২০২০

সৈয়দ ইশতিয়াক রেজাবিশ্বব্যাপী মহামারি। একের পর এক দেশ সংক্রমিত করোনা ভাইরাস ফ্লুতে। এই লেখাটি যখন লিখছি তখন পর্যন্ত আক্রান্ত এক লাখ ৯৮ হাজার ৩৪৮ জন। মৃত্যু হয়েছে ৭ হাজার ৯৭৯ জনের। অন্যদিকে সুস্থ হয়ে ঘরে ফিরেছেন ৬৭ হাজার ৩ জন। এই ভাইরাস সারা বিশ্বে এক ভয়াবহ আতঙ্ক ছড়িয়েছে। বিশ্ব দীর্ঘদিন এমনভাবে আতঙ্কে কেঁপে ওঠেনি।
বলতে গেলে পুরো স্তব্ধ এখন বিশ্ব। শুরু হয়েছিল চীনে এবং ধারণা করা হচ্ছে, করোনা ভাইরাসের কারণে চীনের প্রবৃদ্ধির হার কমে যাবে অনেকখানি। চীন যেহেতু সারা বিশ্বের ব্যবসা বাণিজ্যের কেন্দ্র সেহেতু স্বাভাবিকভাবেই বৈশ্বিক জিডিপিতেও এর প্রভাব পড়বে। বর্তমানে বিশ্বের মোট উৎপাদনের এক-পঞ্চমাংশ আসে চীন থেকে। 
বিশ্ব অর্থনীতির জন্য করোনা ভাইরাস ইতিমধ্যে মারাত্মক উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। নানা মাধ্যমে যেসব তথ্য আসছে তাতে দেখা যাচ্ছে, এই ভাইরাস চীন ও বৈশ্বিক অর্থনীতিতে চরম বিপর্যয় ডেকে এনেছে। চলতি বছর বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধি ২ দশমিক ৫ শতাংশ থেকে ২ দশমিক ৩ শতাংশে নেমে আসবে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে আন্তর্জাতিক সংস্থা, যা হবে ২০০৮ সালের অর্থনৈতিক মন্দার পর সর্বনিম্ন বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধি। বিশ্ব অর্থনীতিতে ক্ষতির পরিমাণ ১৫ হাজার কোটি মার্কিন ডলার ছাড়িয়ে যাওয়ার শঙ্কাও করা হচ্ছে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) ব্যবস্থাপনা পরিচালক ক্রিস্টালিনা জর্জিয়েভা জানিয়েছেন, চীনের করোনা ভাইরাস বৈশ্বিক অর্থনীতিকে হুমকির মুখে ঠেলে দিয়েছে। এতে পণ্যের সরবরাহ ব্যবস্থা বিঘ্নিত হচ্ছে এবং পর্যটন খাতেও প্রভাব পড়ছে। আইএমএফ  প্রধান বিশ্বকে সতর্ক করে দিয়ে বলেন, স্বল্পমেয়াদে হলেও করোনা ভাইরাস বিশ্ব অর্থনীতির গতি মন্থর করতে পারে। তবে দীর্ঘমেয়াদে কী হবে, তা এখন বলা কঠিন। যত দ্রুত সম্ভব এই ভাইরাস মোকাবিলায় কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।

করোনা আতঙ্কে দরপতন হচ্ছে বাংলাদেশের শেয়ারবাজারেও। বিনিয়োগকারীরা বিশ্বব্যাপী করোনা ভাইরাসের প্রভাব নিয়ে আতঙ্কিত। ঢাকার শেয়ারবাজারের একজন সক্রিয় ব্রোকার বললেন, ‘আমাদের পুঁজিবাজার এমনিতেই ধসের মধ্যে বিচরণ করে, করোনার প্রভাবে একদমই শুয়ে পড়েছে।’ 

অর্থনীতি করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত। তাৎক্ষণিকভাবে বড়ভাবে আক্রান্ত হয়েছে পর্যটন, হোটেল, মোটেল ও ট্রাভেল ব্যবসা। কিন্তু অর্থনীতির সব শাখাতেই আঘাত ব্যাপক। পোশাক খাত চীননির্ভর, সেই চীন থেকে মূলধন যন্ত্র ও কাঁচামাল আসা প্রায় বন্ধ। ইউরোপ পোশাকের অন্যতম বাজার, সেখানে এখন লকডাউন। 

অর্থনীতি নিয়ে চিন্তার কারণ আছে। এই মহামারির প্রসার রুখতে কী করণীয়, সেটা এখনও পরিষ্কার নয়। বিশ্ব অর্থনীতিতে কী ধরনের প্রভাব পড়ছে, তার তথ্য কিছু কিছু আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে আসছে। আমরা স্থানীয়ভাবে বিস্তারিত তথ্য এখনও পাচ্ছি না। শুধু দেখছি প্রভাব পড়ছে। বাইরে কম মানুষ বের হচ্ছে, তাই পরিবহনের ওপর প্রভাব পড়ছে। দোকান-বাজারে লোক কম। কলকারখানায় তালা পড়েনি এখনও, তবে পড়তে পারে। পর্যটক নাই, একের পর এক বিমান বাতিল হচ্ছে, দেশের দরজা বন্ধ হচ্ছে বিদেশিদের জন্য। 

যে খাতগুলোর ওপর ভর করে অর্থনীতির চাকা চলে, করোনা ভাইরাসের দাপটে সেগুলো অচল হয়ে গেছে এবং আরও যাচ্ছে। অর্থনীতির যদি এমন দশা হয়, তাহলে তার প্রভাব বড় আকারে পড়বে বাজেট ব্যবস্থাপনার ওপর। এমনিতেই চলতি অর্থবছরে রাজস্ব আদায় পরিস্থিতি সুখকর নয়, তার ওপর করোনা ভাইরাসের প্রভাবে কর আদায়ের পরিমাণ আরও কমবে বলেই আশঙ্কা আবার স্ব-স্থানে ফিরতে পারবে, সেই নিশ্চয়তাও নেই। 

অনেক ব্যবসা বন্ধ হয়ে যাবে, কোনও কোনও ব্যবসায়ী হয়তো আর ব্যবসাতেই ফিরতে পারবেন না। এই অনিবার্য পরিণতির দাওয়াই কী, সেটা সরকারের ভাবনায় এখনই আসা প্রয়োজন। 

প্রথমত, দরকার অপ্রয়োজনীয় খরচ কমিয়ে করোনা ভাইরাস পরিস্থিতি মোকাবিলায় ব্যয় বরাদ্দ বাড়ানো। অনেক বিলাসিতা কমিয়ে টাকা খরচ করা উচিত ভাইরাস মোকাবিলায় এবং অর্থনীতিকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য। যদিও ব্যাংক ও আর্থিক খাত খুব ভালো নয় নানাবিধ কারণে, তারপরও সরকার চিন্তা করতে পারে। মুশকিলে পড়া অতি জরুরি ব্যবসায়ীদের ধাক্কা সামলাতে সাহায্য করা, তাদের জন্য ঋণ পুনর্গঠনের কথা ভাবা যেতে পারে। 

বাজার বন্ধ হলে বহু শিল্প ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান কর্মীদের বেতন দিতে সমস্যায় পড়বে। ফলে অনেকেরই প্রাত্যহিক সংসার খরচটুকুর সংস্থান না হলে সামাজিক অস্থিরতা সৃষ্টি হতে পারে। আর্থিক অবস্থা সবল থাকলে যেকোনও পরিস্থিতি মোকাবিলা করা সহজ হয়। আমাদের প্রবৃদ্ধি ভালো হলেও সব ক্ষেত্রে শক্তিশালী অবস্থান নেই। বাজারে যদি চাহিদা কমে, যদি ব্যবসা বাণিজ্যে আঘাতের কারণে কর্মসংস্থান ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তাহলে এর একটা দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়বে। 

আমরা সামলাতে পারবো, এমন প্রতিজ্ঞা যেমন ভালো তেমনি তার জন্য প্রস্তুতি ও ব্যবস্থাপনাও গুরুত্বপূর্ণ। আমরা বারবারই দেখেছি বিপদে মানুষের বোধের জাগরণ ঘটে। নজরে রাখা দরকার, ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব যেন ভোগ্যপণ্যের বাজারে আগুন লাগাতে না পারে।

লেখক: সাংবাদিক 

 

/এসএএস/এমএমজে/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ