অসময়ে মেরুদণ্ড প্রদর্শন

Send
তুষার আবদুল্লাহ
প্রকাশিত : ১৪:৫৬, মার্চ ২১, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১৫:০৯, মার্চ ২১, ২০২০

তুষার আবদুল্লাহনির্বাচন কমিশনের সঙ্গে আমার আত্মিক যোগাযোগ আছে। মাঠের গণমাধ্যমকর্মী হিসেবে এক যুগের বেশি সময় নির্বাচন কমিশনে নিয়মিত যাতায়াত ছিল। অসংখ্য স্থানীয় এবং জাতীয় নির্বাচনে মাঠে ছিলাম। কমিশনের বেশ কয়েকজন প্রধান নির্বাচন কমিশনার, কমিশনার এবং সচিবদের সঙ্গে কাজের সুযোগ হয়েছে। নানা মেয়াদে বিভিন্ন কারণে কেউ কেউ সময়ের দোষে বিতর্কিত হয়েছেন। সরকারের বাইরের দল রাজনৈতিক কারণেই হয়তো তাদের কারও কারও বিষয়ে আপত্তি তুলেছিল। কিন্তু ওই পদগুলোতে এমন অনেকে এসেছেন, তারা তাদের ব্যক্তিত্ব দেখিয়েছেন। চেষ্টা করেছেন প্রকৃত অর্থেই মেরুদণ্ড প্রদর্শনের। রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশ মেলাতে গিয়ে ভোটার বা দেশবাসীর কাছে সেই মেরুদণ্ড স্পষ্টত প্রদর্শিত হয়নি। ঝাপসা হয়ে গেছে। এবার আর ঝাপসা হলো না। ঝিরঝির হলো না। একদম ‘ক্রিস্টাল ক্লিয়ার’ ভাবে প্রদর্শিত হলো নির্বাচন কমিশনের মজবুত মেরুদণ্ড। মহাসমারোহে প্রচারণা ও ভোট চললো তিনটি সংসদীয় আসনে। কভিড-১৯ এ আক্রান্তের সংখ্যা যখন বাড়ছে, কমিউনিটি সংক্রমণের ঝুঁকির মধ্যে পড়তে যাচ্ছে, তখন আয়োজন করা হলো ভোটের। জনসমাগম এড়িয়ে যাওয়ার কথা যখন, তখন ভোটকেন্দ্রে জনসমাগমের আয়োজন করা হলো। চট্টগ্রামেও সিটি করপোরেশন নির্বাচনকে উপলক্ষ করে শুক্রবার চলেছে নির্বাচনি কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণ, যা কভিড-১৯ সংক্রমণের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। উপনির্বাচনে ভোট নেওয়া হলো ইভিএম পদ্ধতিতে। সংক্রমণের জন্য এই পদ্ধতি ঝুঁকিপূর্ণ। ভোটের তারিখ পিছিয়ে নেওয়া যায় কিনা, এনিয়ে গণমাধ্যমে আলোচনা হয়েছে। নির্বাচন কমিশনের দৃষ্টিও আকর্ষণ করা হয়েছে। কিন্তু প্রধান নির্বাচন কমিশন সৃষ্টিকর্তার ওপর ভরসা রাখতে বলেছেন। তাঁর ধারণা—করোনা এমনিতে চলে যাবে। বাস্তবে তা হয়নি। বরং কমিউনিটি সংক্রমণের খবর পাওয়া গেছে। নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে একজন ভোটের সকালে বললেন—অনিরাপদ মনে করলে ভোটকেন্দ্রে আসার প্রয়োজন নেই। তাহলে তারা কার জন্য ভোটগ্রহণের আয়োজন করলেন?

কমিশনের পক্ষ থেকে অজুহাত তোলা হয়েছে, তারা সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতায় ভোটের আয়োজন করেছেন। সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা থাকবেই। কিন্তু জনস্বার্থে বা জননিরাপত্তায় সেই সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতাকে এড়িয়ে যাওয়া যাবে না, এমন নয়। যখন শুধু দেশ নয় পুরো বিশ্ব বিপর্যস্ত, তখন রাষ্ট্রকে সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা এই মুহূর্তে মান্য করতেই হবে, এমন নয়। কারণ প্রজাতন্ত্রের সকল আইন তো জনগণের জন্যই।

যারা ভোটে প্রার্থী হয়েছেন, তারা যে দায়িত্বশীল ভূমিকায় আছেন এমন বলা যাবে না। বিশেষ করে উল্লেখ করতে হচ্ছে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের প্রচারের কথা। প্রার্থীরা দলবল নিয়ে প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছেন। জনসমাগমের বিষয়টিকে হালকাভাবে দেখছেন তারা। ভাবছেন সাবান দিয়ে হাত ধুয়ে নিলেই কভিড-১৯ দৌড়ে পালিয়ে যাচ্ছে। এই অসচেতন নেতারা আবার আমাদের সেবা দেবেন, নিরাপত্তা দেবেন। এই আচরণে ভোটাররা যে তাদের ওপর আশ্বস্ত হতে পারছেন না, এই বোধটুকু প্রার্থী ও তাদের কর্মীদের ওপর অনুপস্থিত।  যদিও এই লেখাটি যখন লিখছি ঠিক তখনই ঘোষণা এলো ২৯ মার্চ অনুষ্ঠিতব্য চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন নির্বাচনের ভোটগ্রহণ স্থগিত করা হয়েছে। একইসঙ্গে ওই দিন অনুষ্ঠেয় বগুড়া-১,  যশোর-৬ আসনের উপনির্বাচন এবং স্থানীয় সরকার পরিষদের আরও কয়েকটি ভোট স্থগিত করা হয়েছে।
রাজনৈতিক দলগুলো এখনও নানা জায়গায় বিভিন্ন ছুঁতোতে জনসমাগম বা ব্রিফিং করছে। এগুলো অপ্রয়োজনীয় বলেই মনে হচ্ছে। আজকালের প্রযুক্তির দুনিয়ায় ঘরে বসে প্রেস রিলিজ বা ভিডিও বার্তা দেওয়া সম্ভব। সুতরাং লোক ডেকে ব্রিফিং করে সরকারের প্রোপাগান্ডা কিংবা সরকারের দোষের ফিরিস্তি তুলে ধরার প্রয়োজন নেই। আমাদের সাধারণ জনগণের সার্বিক যে সচেতনতার ঘাটতি। তারই প্রতিফলন রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যেও বিদ্যমান, যা থেকে হয়তো নিজেদের বাইরে রাখতে পারলো না নির্বাচন কমিশনও। ভুল সময়কে বেচারারা তাদের মেরুদণ্ড প্রদর্শনের সময় বলে বেছে নিলো। তবে তিন উপনির্বাচন করে যে সমালোচনার মুখে পড়েছেন তারা, সেখান থেকে কিছুটা হলেও মুখ বাঁচালেন চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের ভোট স্থগিত করে।  ভবিষ্যতে প্রচারণায়ও কড়াকড়ি আরোপ করতে হবে। অর্থাৎ কভিড-১৯ সংক্রমণের ঝুঁকি আছে এমন কোনও প্রচারণা যেন মেয়র ও কাউন্সিলর প্রার্থীরা না করেন।

লেখক: বার্তা প্রধান, সময় টিভি

/এসএএস/এমএমজে/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ