করোনার পর

Send
সৈয়দ ইশতিয়াক রেজা
প্রকাশিত : ১৪:৫৮, মার্চ ২৫, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১৫:২৭, মার্চ ২৫, ২০২০

সৈয়দ ইশতিয়াক রেজাসারা বিশ্বের মতো বাংলাদেশ করোনাভাইরাস বা কোভিড-১৯ আতঙ্কে সন্ত্রস্ত। এই মরণব্যাধির প্রকোপে বাংলাদেশ আসন্ন বিপর্যয়ের মুখে। এর মধ্যেই সরকার ২৬ মার্চ থেকে ৪ এপ্রিল পর্যন্ত সাধারণ ছুটি ঘোষণা করেছে। এই ছুটি, কোথাও কোথাও লকডাউনসহ স্থবিরতায় অর্থনৈতিকভাবে আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে পড়েছেন সাধারণ মানুষ। এই অবস্থা দীর্ঘায়িত হলে সবচেয়ে আক্রান্ত হবেন কম আয়ের মানুষ এবং অসংগঠিত ক্ষেত্রের কর্মীরা।
দেশের অর্থনীতির অবস্থা করোনাভাইরাস আসার আগেও সঙ্গীন ছিল। করোনার করাল প্রকোপে সেই অর্থনীতির অবস্থা আরও ঝুঁকির মধ্যে পড়লো। রেমিট্যান্স ছাড়া অর্থনীতির সব সূচকই চ্যালেঞ্জের ভেতর ছিল। পরিকল্পনা কী, কীভাবে সংকট থেকে বের হবেন, সেটা নিশ্চয়ই অর্থমন্ত্রী ও পরিকল্পনামন্ত্রীসহ সংশ্লিষ্টরা ভাবছেন।
তবে কী করণীয় সেটা দৃশ্যমান হওয়া প্রয়োজন। একটি জোরদার অর্থনৈতিক পরিকল্পনা জাতির সামনে উপস্থিত করা প্রয়োজন মানুষের মনোবল ফেরাতে। জরুরি ভিত্তিতে একটা অর্থনৈতিক টাস্কফোর্সের গঠন করা দরকার, যেটি করোনা-উত্তর পরিস্থিতির মোকাবিলা করার দিক নির্দেশনা দেবে।

করোনাভাইরাস এক সময় ঠিকই চলে যাবে। কিন্তু কী রেখে যাবে জানা নেই। তবে আন্দাজ করা যায় ঠিকই। হ্যান্ড স্যানিটাইজার, লিকুইড সোপ, টয়লেট ও টিস্যু পেপারের উৎপাদন ও বাজার চিরস্থায়ী রূপ পাবে। একইভাবে যে আঘাতের মধ্যে পড়েছে এভিয়েশন, পর্যটন ও হোটেল মোটেল ব্যবসা, সেখান থেকে তাদের উঠে দাঁড়ানো কঠিন হবে। এদের অনেকেই হয়তো আর ব্যবসায় ফিরতেই পারবে না।

প্রধান রফতানি খাত পোশাক শিল্পের বিপর্যয় শুরু হয়েছে এবং তা অনেকদিন চলবে। অনেক রফতানি আদেশ বাতিল হয়েছে এবং হতে থাকবে। তেমনি বিপদে পড়বে চামড়াজাত পণ্য রফতানি খাত। ফলে কত কারখানা বন্ধ হবে সেই হিসাব এখন করা যাচ্ছে না। এতে বড় বিপদে পড়বে ব্যাংক খাত। যে রফতানিকারক বড় বিপদে পড়েনি, সেও সুযোগ নেবে ঋণ মওকুফের। আমদানি-রফতানি খাতের বিপদ, সমস্যায় ফেলবে বিমা খাতকেও, কারণ মেরিন ইন্স্যুরেন্সের ওপরই নির্ভর করে সাধারণ বিমা খাতের বড় বাণিজ্য। 

এরপরও এই সংকটেও যে কোম্পানি বা প্রতিষ্ঠান ব্যবসায় ভালো করবে, তাদের কর্মীরা নিশ্চয়ই বীরের উপাধি পাবেন।

এগুলো সবই ব্যবসা-বাণিজ্যের কথা। কিন্তু মানুষের সামাজিক, পারিবারিক ও ব্যক্তিগত জীবনেও বড় পরিবর্তন রেখে যাবে এই করোনাভাইরাস। দীর্ঘসময় ঘরে থাকা, একা থাকার কারণে কিছু কিছু অসুখ যেমন ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, আর্থ্রাইটিসে ভোগা রোগীদের অবস্থা আরও নাজুক হবে। নাজুক হবে মানসিক রোগ বা অবসাদে ভোগা মানুষের অবস্থা। একসঙ্গে থাকার কারণে মানুষে মানুষে, পরিবারের ভেতরের মানুষদের ভেতর সখ্যতা যেমন বাড়তে পারে, আবার দূরত্বও সৃষ্টি হতে পারে ক্ষেত্র বিশেষে। কেউ কেউ হয়তো প্রতিজ্ঞা করবে আর বিলাসিতা করবো না, আর মানুষকে কষ্ট দেবো না ইত্যাদি।

ব্যবসা-বাণিজ্যে মন্দায় অনেকেরই আর্থিক অবস্থা খারাপ হওয়ায় আগামী ঈদের উদযাপনে উৎসব ভাব হয়তো তেমন থাকবে না। একটা বড় পরিবর্তন আসতে পারে ব্যক্তিখাতের উদ্যোক্তাদের অনেকের ভেতর। বাড়ি থেকে অফিস করার পদ্ধতির দোহাই দিয়ে অনেক প্রাইভেট অফিসেই চাকরি চলে যাওয়া শুরু হতে পারে। অজুহাত দেওয়া হবে, এদের ছাড়াওতো চলেছে অফিস বা বলা হবে ব্যবসা হচ্ছে না ঠিকমতো বা লোকসান গুনতে হচ্ছে। আবার অনেক আলোকিত উদ্যোক্তা এটাকে দৃষ্টান্ত হিসেবে নিতে পারেন, তারা হয়তো ভাববেন এর মাধ্যমে কী করে কর্মকর্তাদের বাসা ও অফিসের কাজকে সমন্বয় করা যায়।

এই ভাইরাসের বড় উপকারটি হবে ছোট শিশুরা, তরুণদের জন্য। এমন অভিজ্ঞতার ভেতর দিয়ে যাওয়ায় তারা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার ব্যাপারে অনেক সচেতন হয়ে উঠবে। বলা যায়, একটা নতুন পরিচ্ছন্ন প্রজন্মই গড়ে উঠবে এবার।

কিন্তু যারা হওয়ার নয়, তারা হবেই না। প্রতিটি মহামারি বা দুর্যোগ কিছু মানুষকে আরও অন্ধ ও গোড়া হিসেবে রেখে যায়, এবারও হয়তো তাই হবে। যারা এখনও নিয়মিতভাবে অবৈজ্ঞানিক সব কথা বলছেন, যারা ধর্মান্ধতাতেই আশ্রয় নিচ্ছেন এই দুর্যোগে, তারা আরও বেশি অন্ধত্বের পথে পা বাড়াবেন, সেটা নিশ্চিত করে বলা যায়।

করোনা ভাইরাস বয়স্কদের কাবু করছে বেশি। বয়স্কদের মধ্যে যারা এবারের এই আক্রমণ সামলে উঠবেন, তারা নিশ্চয়ই আরও অনেক আত্মবিশ্বাসী হয়ে উঠবেন আগামী দিনগুলোতে। আর আমরা জানি না, চিকিৎসক, নার্সসহ যেসব স্বাস্থ্যকর্মী জীবন বাজি রেখে চিকিৎসা কার্যক্রম চালিয়ে যাবেন, আমরা জাতি হিসেবে তাদের বীরের মর্যাদা দিতে পারবো কিনা। আমরা জানি না, এরপর রাষ্ট্রীয় ভাবনায় জনস্বাস্থ্যসহ সামগ্রিক স্বাস্থ্যখাত নিয়ে নতুনত্ব আসবে কিনা। বাজেট ব্যবস্থাপনায় স্বাস্থ্য ও শিক্ষাখাতের বরাদ্দে গুণগত ও পরিমাণগত পার্থক্য আসবে কিনা।

আর আমরা এও জানি না এমন এক কঠিন সময় আরেকটু অন্যরকম পরিবর্তন আনবে কিনা আমাদের মনোজগতে। আমরা একে অন্যের জন্য সহায়ক হবো কিনা, আমরা আরও মানবিক হবো কিনা, আমরা সত্যি বিশ্বাস করতে শুরু করবো কিনা ‘মানুষ মানুষের জন্য’। সত্যি জানা নেই যেমনটা জানা নেই কেন আমাদের অনেকেই ভাইরাস আসছে শুনেই ঘর ভর্তি খাবার মজুত করতে বাজার বা সুপারশপ খালি করে ফেলেছি। জানা নেই কেন ভাবতে পারিনি ‘আমার যেমন প্রয়োজন, আরেকজনের ও দরকার আছে, সবটা আমি একা ভোগ করতে পারি না’।

লেখক: সাংবাদিক

/এসএএস/এমএমজে/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ