করোনায় কৃষি ও দরিদ্রদের সহায়তা

Send
মামুন রশীদ
প্রকাশিত : ১৪:৫৬, এপ্রিল ১২, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১৪:৫৮, এপ্রিল ১২, ২০২০

মামুন রশীদকরোনা অভিঘাত মোকাবিলায় অর্থনীতিতে কর্মচাঞ্চল্য সৃষ্টি এবং দরিদ্র-ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য সরকার ইতিমধ্যে পাঁচটি প্রণোদনা বা সহায়তা প্যাকেজ ঘোষণা করেছেন। তবে ঘোষিত প্যাকেজগুলোর প্রায় কোনোটাই সমাজের দুস্থ ও পিছিয়ে থাকা জনগোষ্ঠীকে খুব একটা সুবিধা দেবে না বলে অনেকে এখনও বলছেন। রবিবার প্রধানমন্ত্রী শুধু কৃষি ও কৃষকের জন্য ষষ্ঠ একটি প্রণোদনা প্যাকেজের ঘোষণা দিয়েছেন।
সরকার ইতোমধ্যে প্রণোদনা হিসেবে প্রথম পাঁচ হাজার কোটি টাকা এবং পরে ৬৭ হাজার ৭৫০ কোটি টাকা সম্বলিত পাঁচটি প্যাকেজের ঘোষণা দিয়েছে। তার দ্বিতীয় ঘোষণায় ছিল চারটি প্যাকেজ। আগেই বলেছি, এসব প্রণোদনা প্যাকেজের আকার বড় হলেও তা দরিদ্র ও নিম্ন মধ্যবিত্তদের কোনও রকম সাহায্যে আসবে না বলে অনেকেই সন্দেহ প্রকাশ করেছেন। প্রথম প্যাকেজে রফতানি তথা তৈরি পোশাক খাতের শ্রমিকদের সাহায্য করার কথা বলা হয়েছে। তবে ইতিমধ্যে এই নিয়ে মালিকরা এবং সরকার এক ধরনের অচলাবস্থার মধ্যে আছে; আর তার ফাঁকে অনেক গার্মেন্টস ফ্যাক্টরি থেকেই শ্রমিকদের ছাঁটাই করার খবরও বেরিয়েছে। কবে নাগাদ এই বিষয়ে সুস্পষ্ট পদক্ষেপ দেখা যাবে এবং কবে নাগাদ শ্রমিকরা তাদের বেতন পাবেন, তা এখনও স্পষ্ট নয়। শ্রমিকদের চাকরি সুরক্ষারও কোনও ব্যবস্থা নেই। অন্য প্যাকেজগুলো নিয়ে ইতিমধ্যে যথেষ্ট আলোচনা হয়েছে, যেখানে বলা হয়েছে এগুলো মূলত অপেক্ষাকৃত সচ্ছল শ্রেণিরই সুবিধায় আসবে।

এই প্রেক্ষাপটে সরকারের পক্ষ থেকে কৃষকের জন্য নতুন প্যাকেজ ঘোষণাকে সুবিবেচনাপ্রসূতই মনে হয়। জানা গেছে এই প্যাকেজে ক্ষুদ্র ও মাঝারি কৃষকদের ৫ শতাংশ সুদে ৫ হাজার কোটি টাকা, সারে ভর্তুকি বাবদ ৯ হাজার কোটি টাকা, কৃষি যান্ত্রিকীকরণ, বীজ এবং অন্যান্য ক্ষেত্রে আরও ৪৫০ কোটি টাকা দেওয়া হবে। ক্ষুদ্র ও মাঝারি খাতের জন্য ঋণ পোল্ট্রি, মৎস্য ইত্যাদি খাতেও যাবে। 

পত্রিকায় দেখেছি, নোবেল বিজয়ী দুই অর্থনীতিবিদ অভিজিৎ ব্যানার্জি এবং তার সহযোগী এস্থার দুফলো বর্তমান প্রেক্ষাপটে বৈশ্বিকভাবেই দরিদ্র ও নিম্নবিত্তদের হাতে নগদ অর্থ দেওয়াকেই যথাযথ পদক্ষেপ বলে অভিমত দিয়েছেন। আমাদের দেশেও দুয়েকজন একই কথা বলছেন। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে আমাদের মতো উন্নয়নশীল দেশে এই ধরনের কর্মসূচির স্বচ্ছতা বজায় রাখা এবং যথোপযুক্ত লোকদের হাতে তা পৌঁছানোর নিশ্চয়তা বিধান। গত কয়েক দিনে ক্ষমতাসীন দল-সংশ্লিষ্টদের সরকারি ত্রাণ চুরির যে খবর এসেছে এবং কেবলমাত্র সরকারি দলের লোকজন বা তাদের সঙ্গে যুক্তরাই ত্রাণ পাচ্ছেন বলে তথ্য মিলেছে, তাতে এই নিয়ে আশঙ্কা থাকতেই পারে। খোদ দুর্নীতি দমন কমিশন প্রধানকেও দেখলাম এই নিয়ে কথা বলতে। আর প্রধানমন্ত্রী তো শুরুতেই এই ব্যাপারে সাবধান করে দিয়েছেন।

আগের পাঁচটি প্যাকেজে যে চারটি খাতের দিকে সরকার নজর দেয়নি বলে কেউ কেউ উল্লেখ করেছেন, তার মধ্যে কৃষি খাত একটি। তবে সরকার অন্যান্য খাতের মতোই এখানেও ঋণ দেওয়ার কথাই বিবেচনা করেছে বলে কেউ কেউ নাখোশ। তাদের মতে, যেখানে লকডাউন এবং বাজারে চাহিদা হ্রাসের কারণে কৃষকরা বড় ধরনের সমস্যায় পড়তে শুরু করেছেন এবং তাদের ওপরে দেশের খাদ্য নিরাপত্তার প্রশ্নটি ওতপ্রোতভাবে জড়িত, সেখানে কৃষকদের জন্য অন্যান্য শিল্পের মতো ঋণের ব্যাপারটি যথোপযুক্ত বলে তারা মনে করেন না। ছোট ও মাঝারি কৃষকরা এ থেকে লাভবান হবেন নাকি আরও বেশি ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়বেন, সেটা তাদের মতে ভাবা দরকার। তাদের আশঙ্কা, বাংলাদেশে বড় আকারের শিল্প ঋণ গ্রহীতারা আইনের ঊর্ধ্বেই থাকেন, তারা ঋণ খেলাপি হলেও তাদের তেমন অসুবিধা হয় না; তাদের ঋণ বেশিরভাগ সময় অবলোপনও হয়। অন্যদিকে সামান্য কৃষি ঋণের কিস্তি না দিতে পারলে কৃষকদের কোমরে দড়ি বেঁধে দেওয়ার উদাহরণ আমাদের অজানা নয়। ফলে কৃষকদের ঋণের বদলে এককালীন বা নির্দিষ্ট সময়ভিত্তিক সাহায্য দেওয়া যায় কিনা, সেটা বিবেচনা করা দরকার ছিল বলে অনেকেই বলছেন।
আমরা জেনেছি, সরকার এসব প্যাকেজের জন্য বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক, ইসলামিক উন্নয়ন ব্যাংক, এশিয়ান ইনফ্রাস্টাকচার ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংকসহ বিভিন্ন বিদেশি সূত্র থেকে অর্থ ধার বা অনুদান গ্রহণের চেষ্টা করছেন। সেইজন্যেই অনেকে বলছেন, নাগরিকদের জানা দরকার কীভাবে এসব অর্থ ব্যয় হবে, কীভাবে পুরো ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা তৈরি করা হবে। সরকার যেমন এসব প্যাকেজ ঘোষণা করছে, তেমনি তার স্বচ্ছতা নিশ্চিত করাও তাদের দায়িত্ব। নাগরিক সমাজের অনেকে মনে করছেন, সেটা নিয়ে বিশদ আলোচনা করা দরকার। তাদের অনেকেরই বিশ্বাস, অন্য যে কোনও সময়ে সরকারের যে কাঠামো আছে, তা এই সময়ের জন্য যথেষ্ট নয়। কেননা এটি একটি বিশেষ সময়। বিশেষ সময় তাই বিশেষ নজরদারির দাবি রাখে।

সাধারণ হিসাবে বাংলাদেশে প্রায় ৩ কোটি দরিদ্র। বিশেষ সময়ে বা আপৎকালে এ সংখ্যা ১৫-২৫ শতাংশ বেড়ে যায়। সনাতনি কায়দায় তাদের বিশেষ করে অতিদরিদ্রদের সহায়তার জন্য সামাজিক সুরক্ষা বেষ্টনীকে কাজে লাগানো হয়। এতে করে আমরা অতীতে রংপুরে মঙ্গা মোকাবিলা, বিশেষ এলাকায় বা সময়ে সাময়িক বেকারত্ব হ্রাসসহ অনেক উপকারও পেয়েছি।

সরকার ২০১৫ সালে সামাজিক সুরক্ষা কৌশলপত্র তৈরি করেছিল। সেই অনুসারে বাংলাদেশ পরিসখ্যান ব্যুরো বা বিবিএসকে সম্ভাব্য সুবিধাভোগীদের একটি তালিকা হালনাগাদের দায়িত্বও দেওয়া হয়। সেই রিপোর্ট আগস্টে বের হওয়ার কথা। তাছাড়া চলতি বাজেটে ৮৮ লাখ লোকের জন্য ৭৪ হাজার কোটি টাকা এই কাজে বরাদ্দ আছে। সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি বাস্তবায়নের দায়িত্বে রয়েছে মূলত সমাজকল্যাণ আর ত্রাণ মন্ত্রণালয়সহ ১০টি মন্ত্রণালয়। সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের রয়েছে অধিকন্তু ‘ডাইরেক্ট বেনিফিট ট্রান্সফার’। বাংলাদেশে বিভিন্ন আপদ মোকাবিলা অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, এখানে টাকার জোগান নয়, যথাক্ষেত্রে বা প্রকৃতজনদের মধ্যে টাকার বণ্টনই বড় সমস্যা। ত্রাণ মন্ত্রণালয় যদিও উপজেলা প্রশাসনকে গ্রামে কর্মরত এনজিওদের সঙ্গে প্রচলিত তালিকা যাচাই-বাছাই করে নিতে বলেছে, তবে এই পর্যায়ে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের কাছ থেকে প্রায়ই বাধা আসে। অবশ্য সরকার চাইলে এবারও অন্যান্যবারের মতো পিকেএসএফের সঙ্গে নিবন্ধিত ২০২টি বা বিশেষ বিশেষ কিছু এনজিওকে ব্যবহার করতে পারে। এতে ভালো উপকার হবে বলে আমি মনে করি। ২০০৭ সালে সিডরের পর ব্র্যাক, টিএমএমএস, আশা, ব্যুরোসহ ছয়টি সংস্থা দেশের দক্ষিণাঞ্চলে ক্ষুদ্র-মাঝারি উদ্যোক্তা এবং দরিদ্রদের সহায়তায় বিরাট ভূমিকা রেখেছিল। এবারও ব্র্যাক ইতোমধ্যে শহুরে দরিদ্রদের ওপর তাদের তালিকাকে হালনাগাদ করেছে বলে খবর বেরিয়েছে। এক্ষেত্রে আবার ‘মোবাইল ট্র্যাকিং’য়ে প্রাপ্ত তথ্য এমনকি এমএফএস বা মোবাইল ব্যাংকিংসহ কৃষকের জন্য ১০ টাকায় অ্যাকাউন্ট ডাটাবেজও যাচাই-বাছাই করে ব্যবহার করা যেতে পারে।

কৃষির ব্যাপারে আমাদের দেশে কিছু ভুল ধারণা আছে। আমাদের কৃষি এমনিতেই বিভিন্ন ক্ষেত্রে ৩০ থেকে ৭০ ভাগ ভর্তুকি পায়। তদুপরি সময় পরম্পরায় বাংলাদেশের কৃষি অনেকটা সারপ্লাস বা উদ্বৃত্ত কৃষিতে রূপান্তরিত হয়েছে। ইতোমধ্যে সরকার সঠিক সময়ে কৃষককে সার-বীজ-সেচসহ সকল উপাদান সরবরাহের মোটামুটি নিশ্চয়তা বিধান করেছে। কৃষির সমস্যা অনেকটা তাই আপৎকালে চাহিদা হ্রাস। সেই সঙ্গে রয়েছে পণ্য পরিবহনে জটিলতা এবং উৎপাদিত পণ্যের দাম না পাওয়া। বিভিন্ন দেশে তাই স্থানীয় উৎপাদিত পণ্যের চাহিদা ধরে রাখার জন্য পণ্য সহায়তা বা সাহায্যের প্যাকেজে সবাইকে ডিম, দুধ আর অন্যান্য কৃষিপণ্য দেওয়া হয়। বোরো মৌসুম শুরু হলেই সরকারের ধান-চাল ক্রয়কে চাঙ্গা করে কৃষকের পক্ষে ‘প্রাইস ট্রান্সফার’ করতে হবে। ২০০৭-৮ সালে সিডর ও আইলা পরবর্তীতে তৎকালীন সরকার এটা করে অনেক উপকার পেয়েছিল।

আনন্দের বিষয়, প্রধানমন্ত্রী একই ধারায় এবারও অতিরিক্ত ২ লাখ টন ধান-চাল কেনার সিদ্ধান্ত জানিয়েছেন। এটি অবশ্যই একটি ভালো সিদ্ধান্ত। তবে বাংলাদেশের মতো দুর্বল জবাবদিহির দেশে আমাদের অবশ্যই চূড়ান্ত ফলাফলের দিকে তাকিয়ে থাকতে হয়।     

লেখক: অর্থনীতি বিশ্লেষক।

 

/এসএএস/এমএমজে/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ