জনস্বাস্থ্য নিয়ে গণস্বাস্থ্যের রাজনীতি

Send
প্রভাষ আমিন
প্রকাশিত : ১৪:৩৩, এপ্রিল ২৭, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১৪:৩৬, এপ্রিল ২৭, ২০২০

প্রভাষ আমিনঅনেক অনেক ভিন্নমত সত্ত্বেও ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরীকে আমার ভালো লাগে। প্রথম কথা হলো তিনি একজন মুক্তিযোদ্ধা। মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য সবসময় আমার সর্বোচ্চ শ্রদ্ধা আছে। তাছাড়া তাকে আমার অকপট মনে হয়। কঠিন কঠিন ন্যায্য কথাও বলে ফেলেন অবলীলায়, নির্ভয়ে। আমি তার  অনেক কাজের সমালোচনা করলেও তার দেশপ্রেম নিয়ে কোনও সংশয় নেই। তিনি গভীরভাবে বাংলাদেশকে ভালোবাসেন। ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ থেকে এমবিবিএস পাস করে লন্ডনে গিয়েছিলেন এফআরসিএস পড়তে। পড়াও প্রায় শেষ। সামনে যখন চূড়ান্ত পরীক্ষা, তখনই শুরু হলো মুক্তিযুদ্ধ। পাকিস্তানি পাসপোর্ট ছিঁড়ে ফেলে ট্রাভেল ডকুমেন্ট নিয়ে জীবনের ঝুঁকি মাথায় করে যেভাবে লন্ডন থেকে দিল্লি পৌঁছেছেন, তা সিনেমার গল্পকেও হার মানায়। বিলাতি ডিগ্রি, নিশ্চিত ক্যারিয়ার, সব পেছনে ফেলে আগরতলার মেলাঘরে প্রতিষ্ঠা করেন ফিল্ড হাসপাতাল, যে হাসপাতাল জীবন বাঁচিয়েছে অসংখ্য মুক্তিযোদ্ধার জীবন। মুক্তিযুদ্ধ শেষে সেই ফিল্ড হাসপাতালটিই ‘গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র’ নামে প্রথমে কুমিল্লা ও পরে সাভারে স্থাপন করেন।

জাফরুল্লাহ চৌধুরী অকপট এবং সৎ। কিন্তু তবুও বর্তমান সরকার ছাড়া আর সব সরকারের সঙ্গেই তার ঘনিষ্ঠতা ছিল। ‘গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র’ নামটি বঙ্গবন্ধুর দেওয়া, আর গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের জমিও দিয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু। দেশের দুই সামরিক শাসক জিয়াউর রহমান এবং এইচএম এরশাদের সঙ্গেও তার ঘনিষ্ঠতা ছিল। মজাটা হলো, জিয়া-এরশাদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা থাকলেও তিনি কোনও সুবিধা নেননি। দুই জেনারেলই তাকে মন্ত্রী বানাতে চেয়েছিলেন, তিনি প্রত্যাখ্যান করেছেন। তবে দুই সামরিক শাসকের বেশকিছু জনবান্ধব পদক্ষেপের পেছনে জাফরুল্লাহ চৌধুরীর হাত আছে। তার সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য কাজ হলো ওষুধনীতি প্রণয়ন। তার এই নীতি সহায়তা দাঁড় করিয়ে দিয়েছিল দেশের ওষুধ শিল্পকে। জাফরুল্লাহর সেই নীতির কারণেই বাংলাদেশ আজ ওষুধ রফতানিকারক দেশ।

জাফরুল্লাহ চৌধুরী একের ভেতরে অনেক। তিনি একজন ডাক্তার। শুধু ডাক্তারি করলে তিনি হতে পারতেন দেশের সেরা ডাক্তারদের একজন। তিনি একজন উদ্যমী সংগঠক, যিনি দাঁড় করিয়েছেন গণস্বাস্থ্যের মতো একটি প্রতিষ্ঠান। তার হাসপাতালে  অল্প পয়সায় চিকিৎসা হয়। মাত্র দুই হাজার টাকায় ডায়ালাইসিস হয়। তিনি একজন একাডেমিশিয়ান, তার লেখা বই বিশ্বের অনেক দেশে এমবিবিএস শিক্ষার্থীদের পড়ানো হয়। তিনি একজন গবেষক, তার গবেষণাকর্ম ছাপা হয়েছে বিশ্বের অনেক নামি জার্নালে। নোবেল ছাড়া বিশ্বের প্রায় সব সম্মানজনক পুরস্কার রয়েছে তার ঝুলিতে। কিন্তু জাফরুল্লাহ চৌধুরীকে কাছ থেকে দেখলে আপনি বিশ্বাসই করবেন না, এই সাদাসিধা, ভোলাভালা, আনস্মার্ট লোকটিরই এত গুণ।

কিন্তু এসব গুণের বাইরে ইদানীং তিনি রাজনৈতিক অ্যাকটিভিস্ট। অন্য সুশীল বুদ্ধিজীবীদের মতো তিনি দূরে থেকে বিবৃতি দিয়ে, কলাম লিখে, টকশো করেই দায়িত্ব শেষ করেননি। বরং রাজনীতির মাঠে দারুণ সক্রিয়। সরকারের কঠোর সমালোচক। আর এই সমালোচনার বেশিরভাগই যৌক্তিক। গত নির্বাচনের আগে সরকারের বিরুদ্ধে গড়ে ওঠা জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের মূল কারিগর তিনি। কোনও দল না থাকলেও ঐক্যফ্রন্টের অন্যতম নীতিনির্ধারক ছিলেন ডা. জাফরুল্লাহ। সরকারের সমালোচনা করেন বলে বিএনপি তাকে আপন ভাবে। আবার মাঝে মাঝে কঠোর ভাষায় বিএনপিরও সমালোচনা করেন। তখন বিএনপির লোকজনই ভ্যবাচ্যাকা খেয়ে যান, তিনি আসলে কোন পক্ষ। তার অনেক অবস্থান বা বক্তব্যে ভিন্নমত থাকলেও তার চাঁছাছোলা স্টাইলটা বেশ ভালো লাগে।

আরও অনেক ইস্যুর মতো করোনার টেস্ট কিট আবিষ্কার নিয়ে ডা. জাফরুল্লাহর রাজনীতিটা ভালো লাগেনি, স্পষ্টতই দ্বিমত জানিয়ে রাখলাম। বিশ্বজুড়ে যখন করোনা আতঙ্ক, তখনই খবর এলো গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের বিজ্ঞানী ড. বিজন কুমার শীলের নেতৃত্বে একটি দল করোনা পরীক্ষার কিট আবিষ্কার করছে। শুনে প্রথমে আমি হতাশ হয়েছি। জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের নেতা ডা. জাফরুল্লাহর প্রতিষ্ঠানের বানানো কিট কতটা নেবে সরকার, তা নিয়ে আমার সংশয় ছিল। কিন্তু আমাকে অবাক করে দিয়ে সরকার খুব আগ্রহের সঙ্গে ড. বিজন কুমার শীলের কাজে সহায়তা করেন। করোনা পরিস্থিতির কারণে সরাসরি সাক্ষাৎ না হলেও প্রধানমন্ত্রী ব্যক্তিগতভাবে বিষয়টি মনিটর করছিলেন। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের চেষ্টায় রিএজেন্ট আমদানির বাধা দূর হয়। এমনকি ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী নিজেও পররাষ্ট্রমন্ত্রী, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন। ড. বিজন কুমার শীল বারবার ওষুধ প্রশাসন অধিদফতরকে ধন্যবাদ জানাচ্ছেন। তাহলে প্যাঁচটা লাগলো কোথায়? প্যাঁচটা লাগিয়েছেন জাফরুল্লাহ চৌধুরী নিজেই। গত শনিবার গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র তাদের আবিষ্কৃত কিট হস্তান্তরের জন্য একটি অনুষ্ঠান আয়োজন করে। অনুষ্ঠানে সরকারের সংশ্লিষ্টদের আমন্ত্রণ জানানো হয়। কিন্তু সে অনুষ্ঠানে সরকারের কেউ আসেননি। ব্যস দেশজুড়ে হাহাকার, দেখেন এই সরকার কত খারাপ। ডা. জাফরুল্লাহর প্রতিষ্ঠান বানিয়েছে বলে সরকারের কেউ কিট নিতেও আসেনি। এই সরকার গুণীর কদর দিতে জানে না। এই দুঃসময়ে সরকার এখানে রাজনীতি না ঢুকালেও পারতো। মানুষের জীবন বাঁচানো আগে না রাজনীতি আগে। ইত্যাদি ইত্যাদি। কিট হস্তান্তর অনুষ্ঠানে সরকারের কেউ যায়নি শুনে প্রথমে আমারও খুব রাগ লেগেছে। কিন্তু খোঁজ নিয়ে জানলাম, সরকারের কেউ যে অনুষ্ঠানে যাবেন না, সেটা আগেই লিখিতভাবে জানিয়ে দেওয়া হয়েছিল। শুধু তাই নয়, এ ধরনের হস্তান্তর অনুষ্ঠান না করার অনুরোধ করা হয়েছিল। কিন্তু জাফরুল্লাহ চৌধুরী সরকারের কারও উপস্থিতি ছাড়াই হস্তান্তর অনুষ্ঠানের নামে একটি নাটক করলেন। পরদিন রবিবার সংবাদ সম্মেলন করে জাফরুল্লাহ চৌধুরী আরও গুরুতর অভিযোগ আনলেন। তিনি বলে দিলেন, ব্যবসায়িক স্বার্থেই ওষুধ প্রশাসন অধিদফতর তাদের কিট নিচ্ছে না। তিনি আরও  বললেন, প্রয়োজনে কিট আনবেন না, তবুও কাউকে এক পয়সাও ঘুষ দেবো না। স্বাস্থ্য অধিদফতর বা ওষুধ প্রশাসন অধিদফতরে দুর্নীতির খবর নতুন নয়। কিন্তু ব্যবসায়িক কারণে গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের করোনা কিট নেওয়া হচ্ছে না বা পরোক্ষভাবে ঘুষ চাওয়া হয়েছে, এটা গুরুতর অভিযোগ। আমি দুর্নীতি দমন কমিশনের প্রতি অভিযোগটি খতিয়ে দেখার অনুরোধ করছি।

তবে মজাটা হলো জাফরুল্লাহ চৌধুরী ওষুধ প্রশাসন অধিদফতরের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনলেও তার গবেষক দল কিন্তু তার সঙ্গে একমত নন। শুরু থেকেই ড. বিজন কুমার শীল সরকার এবং ওষুধ প্রশাসন অধিদফতরের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন। তিনি অসহযোগিতার কোনও অভিযোগ তো আনেনইনি, উল্টো তিনি বারবার প্রশংসা করেছেন।

দেখেশুনে আমার মনে হয়েছে, ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরীই করোনার কিটে ‘রাজনীতির কীট’ ঢুকিয়েছেন। সরকার যদি না চাইতো, তাহলে গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র কিটটি বানাতেই পারতো না। রিএজেন্ট আমদানি থেকে শুরু করে সব ধরনের আমলাতান্ত্রিক জটিলতা আড়াল করে সরকারের চেষ্টাতেই বিষয়টি আজ সাফল্যের দ্বারপ্রান্তে। কিন্তু সবকিছুরই তো একটা নিয়ম আছে। আমার বিশ্বাস জাফরুল্লাহ চৌধুরীও সেটা জানেন। কিন্তু জেনেও সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত করার জন্যই তিনি অভিযোগ করছেন। যে কোনও গবেষণা, আবিষ্কার সভ্যতাকেই এগিয়ে নেয়। কিন্তু কেউ কোনও আবিষ্কারের দাবি করলেই তো আর সেটা গ্রহণ করার সুযোগ নেই। সেটা একটা যথাযথ প্রক্রিয়ায় পরীক্ষা শেষে কার্যকর প্রমাণিত হলেই সেটা গ্রহণ করা হতে পারে। এই যে এখন বিশ্বজুড়ে করোনার টিকা আবিষ্কারের তোড়জোর চলছে। এখন আবিষ্কারের দাবি করলেই তো কোনও দেশ সেটা গ্রহণ করবে না। সেটাকেও একটা প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েই যেতে হবে। সাধারণত একটা আবিষ্কার বছর দেড়েকের প্রক্রিয়া। প্রথমে পশুর শরীরে প্রয়োগ করে তারপর মানুষের শরীরে দেওয়া হয়। এবার সময় কমিয়ে আনতে ঝুঁকি নিয়ে সরাসরি মানুষের শরীরে প্রয়োগ করা হচ্ছে। সফল হলেই সেটা গ্রহণ করা হবে। দাবি আর কার্যকারিতা তো এক নয়। আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা, সাবেক সাংসদ জয়নাল হাজারি ফুসফুস ওপেন করে স্যানিটাইজ করার পরামর্শ দিয়েছিলেন। পরে একই ধরনের পরামর্শ দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও। ময়মনসিংহ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষক ইথানল দিয়ে ভাপ নিতে বলেছিলেন। তাদের সেসব পাগলামি কিন্তু কেউ গ্রহণ করেনি। আমি গণস্বাস্থ্য আবিষ্কৃত করোনা কিটকে তেমন কিছু বলছি না। কারণ গবেষক ড. বিজন কুমার শীলের ওপর আমার পূর্ণ আস্থা আছে, আছে এ ধরনের কাজে তার অতীত সাফল্যও। কিন্তু যত যাই হোক, কার্যকারিতা পরীক্ষিত না হওয়া পর্যন্ত এই কিট গ্রহণ করার কোনও সুযোগ নেই। গণস্বাস্থ্য যেটা আবিষ্কার করেছে, সেটা র‌্যাপিড টেস্টিং কিট, যা রক্ত নিয়ে করা হয়। আর প্রচলিত ব্যবস্থায় সোয়াব নিয়ে করোনা টেস্ট করা হয়।

কিন্তু বিশ্বব্যাপী র‌্যাপিড টেস্টিং কিটের কার্যকারিতা এখনও প্রশ্নাতীত নয়। বাংলাদেশ মাত্র দুই হাজার টেস্টিং কিট নিয়ে ‘নো টেস্ট, নো করোনা’ থিওরিতে করোনার বিরুদ্ধে লড়াইটা শুরু করেছিল। এখন কিছুটা বেড়েছে, তবু টেস্টের ব্যাপারে বাংলাদেশের আগ্রহ সবচেয়ে কম। অথচ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা শুরু থেকেই বলে আসছে, টেস্ট, টেস্ট এবং টেস্ট। সন্দেহভাজনদের টেস্ট করে আলাদা করে ফেলতে পারলেই করোনার বিস্তার ঠেকানো সম্ভব। তাই গণস্বাস্থ্য আবিষ্কৃত কিটটি কার্যকর প্রমাণিত হলে সেটি হবে বিশাল সুখবর। কিন্তু কার্যকারিতা প্রমাণের আগেই যদি সরকার কিটটি গ্রহণ এবং প্রয়োগ করে এবং যদি রিপোর্ট ভুল আসে; তাহলে তা ভয়ঙ্কর পরিণতি ডেকে আনবে। টেস্ট না করার চেয়ে ভুল টেস্ট করা অনেক বেশি বিপজ্জনক। গণস্বাস্থ্যের টেস্টে নেগেটিভ, আসলে পজিটিভ,  কোনও ব্যক্তি যদি নিশ্চিন্ত মনে ঘুরে বেড়ায় তা বড় রকমের স্বাস্থ্য ঝুঁকি তৈরি করবে। তাই সবার আগে যথাযথ প্রক্রিয়া মেনে কার্যকারিতা পরীক্ষিত হওয়ার পরেই কেবল সেটি সরকারের গ্রহণ করা না করার প্রশ্নটি সামনে আসবে। করোনা টিকা আবিষ্কারের ক্ষেত্রে যেমন শর্টকাট রাস্তা খোঁজা হচ্ছে, গণস্বাস্থ্যের করোনা কিট পরীক্ষার ক্ষেত্রেও যেন তেমনটি হয়। কোনও আমলাতান্ত্রিক জটিলতা যেন অগ্রগতির পথে বাধা হয়ে না দাঁড়ায়।

আর দেশ ও বিশ্বের এই দুঃসময়ে করোনা কিট আবিষ্কার করায় গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র, ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী, ড. বিজন কুমার শীলসহ সবাইকে প্রাণঢালা অভিনন্দন। আমরা দিন গুনছি, কবে আমাদের কিটে আমরা টেস্ট করতে পারবো। তবে মুক্তিযোদ্ধা, দেশপ্রেমিক ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরীর প্রতি বিনীত নিবেদন, করোনার কিটে রাজনীতির কীট ঢুকাবেন না। জনস্বাস্থ্য নিয়ে নিয়ে রাজনীতি করার অধিকার কারোরই নেই, গণস্বাস্থ্যেরও না।

লেখক: হেড অব নিউজ, এটিএন নিউজ

 

/এমএমজে/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ