রাষ্ট্র সহায়তা দেবে সমতা ও মর্যাদার ভিত্তিতে

Send
শাহানা হুদা রঞ্জনা
প্রকাশিত : ১৬:৪৪, মে ১১, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১৬:৪৬, মে ১১, ২০২০

শাহানা হুদা রঞ্জনাসেলিনার আসল পরিচয় সে দুটি ছোট শিশুর মা। সেলিনার ভাষায়, ‘মানুষ ভুইলা যায় যে একজন যৌনকর্মী শুধু দেহ ব্যবসাই করে না। তাগো পরিবার থাকে, হেই পরিবারকে হেগোরই চালাইতে হয়। আমরা যারা পরিবার চালাই, বাচ্চা ও বাবা-মায়ের মুখে খাবার তুইলা দেই, আমরা সবাই আমাগো কাজের জায়গার কথা গুপন করি। সমাজের চক্ষে আমরা অচ্ছুৎ হইলেও আমাগো টাকা কিন্তু পরিষ্কার।’ সেলিনার ধারণা, অচ্ছুৎ বলেই সরকারি কোনও সাহায্য তারা সহজে পাবেন না।
লাইলির কাঁধে নির্ভর করে আছে ওর পুরো পরিবার। লাইলির বয়স কম এবং চেহারা ভালো বলে প্রতিদিন তার খদ্দেরের অভাব থাকতো না। মাসে অনায়াসেই ১৫/১৬ হাজার টাকা বাড়িতে পাঠাতে পারতো। এই টাকা দিয়েই বাবা মায়ের চিকিৎসা চলে, ছোট ভাইবোন দুইটার পড়াশোনা চলে। লাইলি নিজেকে দেখে টাকা আয়ের যন্ত্র হিসেবে, আর কিছু না।

কিন্তু করোনা নামে একটি রোগ এসে সেই যন্ত্রের চাকাটা বন্ধ করে দিয়েছে। করোনা সম্পর্কে খুব ভালো করে কিছু জানে না লাইলি এবং তার পল্লীর মেয়েরা। শুধু একদিন দেখলো কর্তৃপক্ষ এসে তাদের ব্যবসা বন্ধ করে দিলো। খদ্দের আসাও বন্ধ হয়ে গেল। এরপর তাদের আয় বন্ধ। হাতে তেমন কোন জমানো টাকা না থাকায় এখন তাদের না খেয়ে থাকার অবস্থা। বাড়িতে কী পাঠাবে তা ভেবেও কূল পাচ্ছে না।

শুধু লাইলি নয়, অঘোষিত লকডাউন হওয়ার পর ওর মতো অবস্থা সবারই। ওদের সরকার থেকে যা দেওয়া হয়েছে, তাতে নিজেদেরই চলা সম্ভব নয়, সেখানে তাদের পরিবার পরিজনের কী অবস্থা হচ্ছে তা ভেবেই পাচ্ছে না দৌলতদিয়া যৌনপল্লীতে থাকা প্রায় হাজারখানেক মেয়ে। মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের প্রোগ্রাম কো-অর্ডিনেটর মহুয়া লেয়া জানালেন, শুধু কি যৌনকর্মীরা, এখানে থাকে তাদের অনেকেরই বাচ্চারা। যৌনকর্মীদের বাচ্চাদের খাওয়ার কিছু  নেই। শিশুদের যে হোমে রাখা হয়, সেখানেও ঠিকমতো সাপ্লাই চেইন রক্ষা করা সম্ভব হচ্ছে না করোনার কারণে।

জীবন ও জীবিকার প্রয়োজনে বিশ্বের বহু নারী এই যৌনপল্লিভিত্তিক যৌন পেশার সঙ্গে জড়িত। বাংলাদেশে এখন হোটেল, পথ, বাসা ও যৌনপল্লি মিলিয়ে মোট যৌনকর্মীর সংখ্যা ১ লাখ ২ হাজার ২৬০ জন (সূত্র: ন্যাশনাল এইডস/এসটিডি প্রোগ্রাম এবং ডিরেক্টরেট জেনারেল অব হেলথ সার্ভিসেস)। আমাদের সামাজিক অবস্থার প্রেক্ষিতে যৌনকর্মীদের প্রতি অনেক মানুষেরই ঘৃণা ও বিদ্বেষ কাজ করে। স্টিগমার কারণে এ রকম আপৎকালীন অবস্থায় এটা যেন আরও বেড়ে গেছে। যৌনকর্মীদের না খেয়ে থাকাটা মানুষের কাছে গুরুত্বপূর্ণ কিছু মনে হয় না।

মানবাধিকার সংগঠন মুক্তি মহিলা সমিতির কো-অর্ডিনেটর আতাউর রহমান মঞ্জু গণমাধ্যমকে বলেছেন, দৌলতদিয়ায় খুব বেশি হলে ২০০ জন যৌনকর্মীর হাতে সামান্য কিছু টাকা থাকতে পারে। বাকিরা দিন এনে দিন খায়। তাদের এক মাসের রুম ভাড়া মাফ করে দিলেও খাওয়ার খরচ কিছুই নেই হাতে। যৌনকর্মীদের ধারদেনা করে চলতে হচ্ছে। এই ধার কীভাবে, কবে শেষ হবে তারা জানেন না ।

শুধু বাংলাদেশ নয়, সারা বিশ্বেই যৌনকর্মীদের অবস্থা একই রকম। করোনার কারণে তাদের ব্যবসা বন্ধ, আয় বন্ধ। অথচ সবাইকেই সংসার চালাতে হয়। সবখানেই সরকারি ত্রাণের কোটায় তারা পড়েন না। ফলে তাদের কাছে প্রতিটি দিনই বিভীষিকার মতো। সবচেয়ে রূঢ় শোনালো লাইলির কথা, ‘‘আমাদের রাস্তায় খদ্দের নেই, ঘরে খাবার নেই। এটাই একজন যৌনকর্মীর জীবন”।

যৌনকর্মীদের জন্য সবচেয়ে ভয়াবহ ব্যাপার হচ্ছে, তারা কাজের সময় মানুষের সংস্পর্শে আসতে বাধ্য। এমনিতেই তাদের শরীরে নানা ধরনের রোগ বাসা বাধে খুব সহজে। এইচআইভি সংক্রমণের ভয়তো আছেই। এখন আবার এর পাশাপাশি করোনার ভয়। এদের অনেকেরই করোনা সম্পর্কে পরিষ্কার কোনও ধারণা নেই। শুধু ভাবছে অসুখের চেয়ে অনেক বেশি জরুরি খাদ্য। টাকার অভাবে স্বাস্থ্যসম্মত থাকা-খাওয়া কিছুই পায় না তারা। বরং কেউ কেউ নানা ধরনের নেশাও গ্রহণ করে হতাশার কারণে। যৌনকর্মীদের চিকিৎসা সুবিধা খুবই সীমাবদ্ধ। তাদের চিকিৎসা সবাই দেয় না, সব ডাক্তারের কাছে তারা যেতেও পারেন না।

কমলা বললেন, ‘‘সরকার বা এনজিও থেকে কতদিন আর কতইবা সাহায্য দেবে? এরপর যখন ব্যবসা খুলে দেওয়া হবে, তখনও এই করোনা রোগ সংক্রমণের ভয় কিন্তু আমাদের থেকেই যাবে। শুনেছি এই রোগটা খুবই ছোঁয়াচে। আবার এইডাও ঠিক, আমরা পেটে খিদা নিয়া আটকা আছি। করোনায় না মরলেও আমরা খিদায় মরমু।”

ইউএনএইড মনে করে, এই মহামারি, অন্য আরও সব স্বাস্থ্য ঝুঁকির সঙ্গে এক হয়ে বিরাজমান বৈষম্য অনানুপাতিক হারে সেসব মানুষকে বেশি হারে আক্রান্ত করছে, যারা ইতোমধ্যেই প্রান্তিক, অপরাধ জগতের সঙ্গে জড়িত এবং অনিশ্চিত ও আশঙ্কাজনক আর্থিক ও স্বাস্থ্য পরিস্থিতির শিকার। সেই সঙ্গে এরা সবসময়ই সামাজিক নিরাপত্তার বাইরে থাকে। সারা বিশ্বেই যৌনকর্মীরা করোনা চলাকালে সরকারি সাহায্য-সহযোগিতা পাওয়ার ক্ষেত্রে অবহেলিত এবং তাদের কথা কেউ মনেও রাখে না। যৌনকর্মীরা তাদের ক্রমশ নিরাপত্তাহীন, অরক্ষিত বলে মনে করছে।

অনেকেই মনে করে যে যৌনকর্মীরা বিভিন্ন ধরনের অপরাধের সঙ্গে জড়িত এবং সে কারণে তাদের ওপর পুলিশের নজরদারি থাকে চড়া। সরকারি সাহায্য কম পাওয়া মানে নিরাপত্তার অভাব। এই পেশা বাংলাদেশে বৈধ হলেও একে আনুষ্ঠানিক বা অনানুষ্ঠানিক কাজ বলে মনে করা হয় না। এই মহামারির সময়ে বিশ্বজুড়েই যৌনকর্মীদের সংগঠনগুলো আয় এবং স্বাস্থ্য সহায়তা আইনের আওতায় সমান নিরাপত্তা দাবি করছে তাদের সরকারের কাছে। কারণ, সব দেশের সরকার আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন অনুযায়ী এই সহায়তা দিতে বাধ্য।

যৌনকর্মীদের মধ্যে অনেকেই আছেন তৃতীয় লিঙ্গের মানুষ। তাদের অবস্থা আরও করুণ। সামাজিক স্টিগমার কারণে এমনিতেই তাদের আয়ের স্বাভাবিক পথ রুদ্ধ। এদের থাকার জায়গা খুব অস্বাস্থ্যকর এবং এরা গাদাগাদি করে থাকে। সাধারণ অবস্থাতেই এরা চিকিৎসা সুবিধা পায় না, এর ওপর এই লকডাউন তাদের পরিস্থিতি আরও খারাপ করে তুলেছে।

সমাজকল্যাণ অধিদফতর ঢাকা ট্রিবিউনকে জানিয়েছে হিজড়াদের সংখ্যা ১০ হাজার। অথচ এক লাখেরও ওপরে তৃতীয় লিঙ্গের মানুষ আছে বলে জানিয়েছেন হিজড়া নেত্রী জয়া। ন্যাশনাল এইডস/এসটিডি প্রোগ্রাম সূত্র অনুযায়ী হিজড়াদের সংখ্যা  ১ লাখ ১৯৯ জন। যেখানে সংখ্যা নিয়েই এত ধরনের তথ্য, সেখানে বোঝা যাচ্ছে কয়জন, কতটা সাহায্য পাবেন। হিজড়া বলে পরিচিত এই মানুষগুলোর অবস্থান প্রান্তিকদের মধ্যে প্রান্তিক। জয়া বলেছেন, ‘‘হিজড়াদের পুরোটা জীবনই নানা ধরনের জটিলতায় পূর্ণ। এমনকি এই মহামারিতেও আমাদের কথা কেউ আলাদা করে ভাবে না।” পত্রিকাটি একটি গবেষণা প্রতিবেদনের কথা উল্লেখ করে বলেছে, যদি হিজড়া সম্প্রদায়ের কারও করোনা হয়, তাহলে তাতে এদের মৃত্যু অনিবার্য। কারণ, তারা তাদের কাজকর্মের ধরন ও জীবনযাপন পদ্ধতির জন্য এমনই নানা ধরনের ভাইরাস বহন করে।

বিভিন্ন কারণে হিজড়াদের প্রতি সমাজের অধিকাংশ মানুষেরই নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি আছে। সরকারের ত্রাণ তৎপরতার মধ্যে হিজড়া জনগোষ্ঠীর নাম আলাদা করে থাকে না বললেই চলে। এদের চলাফেরা, কাজকর্ম সবকিছু খুব সীমাবদ্ধ হওয়ায় আয়ও থাকে খুব কম। এরা অন্যান্য সাধারণ শ্রমজীবী মানুষের মতো চাইলেও সব ধরনের কাজ করার সুযোগ পায় না।

বিরাজমান সামাজিক স্টিগমার কারণে এরা সমাজের বিত্তশালী মানুষ, মোড়ল, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান এবং রাজনৈতিক নেতা কারও কাছ থেকেই সাহায্য সহযোগিতা পায় না বললেই চলে। অধিকাংশ তৃতীয় লিঙ্গের মানুষ অচ্ছুৎ অবস্থায় মানবেতর জীবনযাপন করেন। সেখানে মহামারি তাদের হাত-পা একেবারে বেঁধে ফেলেছে। খুব অল্প কিছু বেসরকারি সংস্থা হিজড়াদের সাহায্যে এগিয়ে এসেছে, যদিও প্রয়োজনের তুলনায় তা খুবই সামান্য।

রাষ্ট্র তার নাগরিকদের সহায়তা দেবে, সহানুভূতি দেখাবে সমতা ও মর্যাদার ভিত্তিতে। তাদের জাত, ধর্ম, বর্ণ, লিঙ্গ বা পেশা দেখে নয়। সরকার হিজড়া ও যৌনকর্মীদের তাদের লিঙ্গ পরিচিতি ও যৌন পেশার কারণে বিভেদ করতে পারে না। যদি করে তাহলে তা হবে মানবাধিকার সনদের স্পষ্ট লঙ্ঘন।

আমরা বারবার বলতে চাই, হিজড়া ও যৌনকর্মীদের মানুষ হিসেবে বিবেচনা করে তাদের দিকে সরকারকেই হাত বাড়িয়ে দিতে হবে। কারণ, তারা এই বাংলাদেশের নাগরিক। সমাজ যেহেতু তাদের বিভিন্ন স্টিগমার কারণে এড়িয়ে চলে, তাই রাষ্ট্রেরই বড় দায়িত্ব মহামারি ও মহামারি-পরবর্তী সময়ে এই প্রান্তিক মানুষগুলোর প্রতি বেশি নজর দেওয়া। সেই সঙ্গে চাই গণমাধ্যমে এদের না পাওয়ার খবর আরও উঠে আসুক।

লেখক: সিনিয়র কো-অর্ডিনেটর, মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন

/এসএএস/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ