সাবালক সংকট

Send
শায়রুল কবির খান
প্রকাশিত : ১০:৫৫, মে ২৫, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১২:১৮, মে ২৫, ২০২০

শায়রুল কবির খানরাষ্ট্র বিজ্ঞানীদের ভাষায় বর্তমান পরিস্থিতি একটি সংকটকাল। এই সংকট মানবজীবনের সঙ্গে সম্পর্কিত যার সমাধান খুব সহজ নয়। বৈশ্বিক মহামারি করোনাভাইরাস সংক্রমণের মধ্যে দিয়ে সৃষ্ট সংকটকে বিশ্বাসী মানুষেরা বিষয়টিকে ‘সৃষ্টিকর্তা প্রদত্ত কতিপয় মানুষের জন্য পরীক্ষা’ বলেই মনে করে। এই সংকটে মানুষের মানবিক গুণাবলি সভ্যতার জীবন যাপন প্রায় অসম্ভব করে তুলেছে। সর্বোপরি মানুষের মানবিক চরিত্রের সংকটও তীব্রভাবে দেখা দিয়েছে।
সরকার দলীয় নেতৃবৃন্দ, মন্ত্রী মহোদয়েরা এই সংকট স্বাভাবিক উপলব্ধির মধ্যে দিয়ে চিনতে পেরেছেন- সাধারণ নাগরিকরা বিশ্বাস করেন না। তবে সংকট নিজ থেকে কাছে গিয়ে চিনিয়ে দিয়েছে। করোনা সংকটের মধ্যেও ক্ষমতাসীনদের শক্তি দিনে-দিনে বৃদ্ধি করে তুলছে। তাদের কর্মকাণ্ড দেখে মনে হয় বিরোধী পক্ষকে নির্মূল না করা পর্যন্ত শক্তি বৃদ্ধি করতে থাকবেন। অর্থনৈতিক লুটপাট, ত্রাণ সামগ্রী লুণ্ঠন, বিচারালয় থেকে ন্যায় বিচার না পাওয়া, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী দিয়ে বিরোধী দলের ওপর দমন-পীড়ন, গণমাধ্যম নিয়ন্ত্রণ, ব্যবসায়ীদেরকে জিম্মি করে ফেলা, নাগরিক সমাজের নেতৃবৃন্দের মুখ বন্ধ রাখবার অপকৌশল অবলম্বন অব্যাহত রেখে। এরকম পরিবেশ-পরিস্থিতিতে ক্ষমতাসীনরা নানা রকম মুখরোচক ওছিলায় দেখিয়ে চলেছেন।
চীনের উহান প্রদেশে করোনাভাইরাস সংক্রমণ প্রকাশের পর শুরুতেই বিএনপি’র ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের নেতৃত্বে স্থায়ী কমিটির বৈঠকের সিদ্ধান্ত মোতাবেক বিএনপি’র মহা-সচিব সরকারের কাছে প্রস্তাব রেখেছিলেন দেশের স্বার্থে দ্রুততার সঙ্গে ঐক্যমতের ভিত্তিতে কার্যকর ব্যবস্থার উদ্যোগ গ্রহণ করা। মন্ত্রী মহোদয়েরা কটাক্ষভাবে বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছেন। কেউ-কেউ ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। সরকারের সামনে বিশেষ অনুষ্ঠানসূচি ছিল। সাধারণ নাগরিকদেরও বুঝতে বাকি ছিল না।
পরিস্থিতি দ্রুত অবনতির দিকে যাচ্ছে। ১৮ মার্চ সরকার ছুটি ঘোষণা করে নাগরিকদের বাসা-বাড়িতে থাকবার আহবান জানিয়েছেন। বাংলাদেশে মাদারীপুর জেলা শিবচর উপজেলায় প্রথম করোনাভাইরাস সংক্রমণের রোগী শনাক্ত হয়েছিল। শিবচরের নাগরিক ও স্থানীয় প্রশাসনের উদ্যোগে লকডাউন ঘোষণা দিয়ে কঠোরভাবে পালন করেছিলেন। তার সুফলও তারা পেয়েছেন। শিবচর উপজেলায় বর্তমানে করোনাভাইরাস সংক্রমণের কোনও রোগী নেই। আলহামদুলিল্লাহ!
করোনাভাইরাস সংক্রমণের কঠিন এক পরিস্থিতির মুখে ২৫ মার্চ রাজনৈতিক হয়রানিমূলক এক মিথ্যা মামলায় সাজা দেওয়া বিএনপির চেয়ারপারসন, সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে শর্ত সাপেক্ষে চিকিৎসার জন্য সরকার ছয় মাসের মুক্তি দেয়। ২৪ মার্চ বিএনপি’র ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান দেশবাসী ও দলীয় নেতাকর্মীদের উদ্দেশ্য বক্তব্যে আহবান জানিয়েছিলেন, শারীরিক দূরত্ব বজায় রেখে ধৈর্যের সাথে পরিস্থিতি মোকাবিলা করে অসহায়দের পাশে দাঁড়ানোর যথাসাধ্য চেষ্টা করা৷
‘ফাঁদে পড়া ইঁদুর’ নড়াচড়া করে শক্ত হয়ে আটকায়, সরকারের অবস্থা ইতোমধ্যে তেমনি হয়েছে রুপকথার দৈত্যের মতো সংকট চোখের সামনে প্রসারিত হয়ে দেখিয়ে দিয়েছে। করোনাভাইরাস সংক্রমণ হয়তো অদূর ভবিষ্যতে চিকিৎসা ব্যবস্থার মধ্য দিয়ে একটা সমাধানের আসবে কিন্তু রাজনৈতিক যে সংকট তৈরি হয়েছে তার সমাধান দৃশ্যমান নেতৃবৃন্দ কতটুকু করবেন কিংবা পারবেন তা বলা মুশকিল।

সরকারের পরিচালনা শক্তি যতই কৌশলী হোক না কেন, সংকট অনিবার্যভাবেই এসেছে। কিছুতেই এড়ানো যায়নি, অনেকটা যৌক্তিক কারণও আছে। ক্ষমতাসীনদের অহমিকা আর দাম্ভিকতায় পেয়ে বসেছিল।

বর্তমানে দেশের সংকট পর্যায়ক্রমে গভীর হয়ে উঠছে পরিস্থিতি হয়তো কিছুটা অনুধাবন করে এখন মন্ত্রীমহোদয়েরা আহবান জানাচ্ছেন সকলেই ধৈর্য ও দেশপ্রেম দিয়ে সংকট মোকাবিলা করার জন্য- তাদের এই আহ্বান শুনে হয়তো ‘সংকটই’ মুচকি হাসে। সংকট ‘সাবালক’ হয়ে চোরাগলি থেকে বেরিয়ে ক্ষমতাসীনদের সামনে এসে দাঁড়িয়ে বলল, এই যে ‘আমরা’।

অর্থনৈতিক সংকট, খাদ্য সংকট, চিকিৎসা সংকট, শিক্ষা সংকট, কর্মসংস্থান সংকট, সর্বোপরি রাজনৈতিক সংকট। আজকের এই সংকট তৈরি ও ঘনীভূত হওয়ার জন্য সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের মধ্যে দিয়ে স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের জন্ম হয়নি।  বাংলাদেশের জন্ম হয়েছিল গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে সাম্য ও ন্যায়পরায়ণ রাজনীতির মধ্যে দিয়ে পরিচালিত হবে।
বর্তমানে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার নামে মুক্তিযুদ্ধের সমস্ত জাতির সংগ্রামী আকাঙ্ক্ষার ভাবনাকে স্তব্ধ করে দেওয়ার চেষ্টা চলছে। এটা হয়তো সম্ভবপর হবে না, তবে তা প্রমাণ করতে নির্ভর করবে আগামী দিনে সামাজিক শক্তিগুলো পারস্পরিক দ্বন্দ্ব সংঘাত ভুলে রাজনৈতিক ঐক্য ও আন্দোলনে দাবি-আদায়ের ঐতিহাসিক অর্জনের মধ্য দিয়ে।

লেখক: সহ-সভাপতি, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী সামাজিক সাংস্কৃতিক সংস্থা- জাসাস         

/এসএএস/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ