নমুনা পরীক্ষা ভিত্তিক পূর্বাভাস এবং লকডাউন তুলে নেওয়ার প্রভাব

Send
মো. রিজওয়ানুল করিম
প্রকাশিত : ১৪:৫৯, জুন ০১, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১৫:০২, জুন ০১, ২০২০

মো. রিজওয়ানুল করিমযখন লকডাউন ছিল না তখন আমরা করোনাভাইরাস সংক্রমণের কিছু প্রেডিকশন মডেল দেখেছিলাম, যেগুলো পরে ভুল প্রমাণ হয়েছে। লকডাউন থাকা অবস্থায় আমরা ভাইরাসের গতিপথ জানি না, কারণ বাংলাদেশে মহামারি সব অঞ্চলে একই রকম নয়। এখনও দেশের কোথাও গুচ্ছ সংক্রমণ আবার কোথাও বা সামাজিক সংক্রমণ।




আমরা যদি ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ এবং অন্যান্য বড় শহর থেকে পাওয়া নমুনা পরীক্ষা ও শনাক্তের তথ্যগুলো পর্যালোচনা করি তাহলে দেখা যায় সেগুলো জুলাইয়ের শেষে সংক্রমণ শীর্ষে থাকার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। কিন্তু তাই বলে আমরা একদম নিশ্চিত নই।
মূল সমস্যাটা হচ্ছে আমাদের পরীক্ষা এখনও তুলনামূলক কম করা হচ্ছে এবং আমরা সকল সংক্রমিত রোগীকে চিহ্নিত করতে পারছি না।
কেউ কেউ বলেন উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ সমাজভিত্তিক নমুনা পরীক্ষার বদলে কিছু ক্ষেত্রে [সোশ্যাল কানেকশন স্যাম্পল কালেকশন পরিচিতি বা সুযোগভিত্তিক নমুনা সংগ্রহ চলছে। উপরন্তু যে পরীক্ষা আমরা করছি তা বিস্তৃত জনসংখ্যার ওপর নয়, অনেকাংশেই ডিসপ্রপোরশনাল। কতগুলো নির্দিষ্ট এলাকায় পরীক্ষা, বুথ, ল্যাবরেটরি সবই অনেক বেশি।
কিছু ক্ষেত্রে পরীক্ষার গুণগত মান নিয়ে কথা উঠেছে। কোথাও আবার ল্যাবরেটরি কনটামিনাটেড হয়ে নমুনা পরীক্ষায় ব্যাঘাত ঘটিয়েছে।
আমরা এটাও নিশ্চিত করে বলতে পারি না, আমরা যে তথ্যের ভিত্তিতে করোনা রোগে আক্রান্তের সংখ্যা ও মৃতের একটি প্রেডিকশন তৈরি করছি সেই তথ্যগুলোই বা কতটুকু সঠিক।
এই মডেলগুলো নিয়ে আরও একটা ব্যাপার মাথায় রাখতে হবে যে পরে আরও বেশি প্রাপ্ত তথ্যের ওপর ভিত্তি করে, সময়ের সঙ্গে পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে ঢাল গতিপথ পরিবর্তন করতেই পারে। করোনার বৈশ্বিক আচরণ বিবেচনায় এটা প্রমাণিত হয়েছে সাধারণ মানুষের জনস্বাস্থ্যবিধি মানার ওপর এবং স্বাস্থ্যব্যবস্থার প্রস্তুতির ওপর সংক্রমণ ও মৃত্যুর রেখার ঢাল নির্ধারিত হয়।
বাংলাদেশের মতো অধিক জনসংখ্যার দেশে আমরা যদি প্রতিদিন বিশ-ত্রিশ হাজার পরীক্ষাও করি তাও সেটা যথেষ্ট নয়। কারও কারও মতে বাংলাদেশে প্রত্যেকের পরীক্ষা করার প্রয়োজন নেই, কারণ পরীক্ষার হারের সঙ্গে সংক্রমিত রোগীর সংখ্যা খুব বেশি বাড়েনি। এটা আমার মতে ঠিক নয়। কারণ আমরা কেবল নমুনা পরীক্ষার সংখ্যা প্রকাশ করি, কোনটা কোন ধরনের নমুনা সে সংখ্যা প্রকাশ করি না। অর্থাৎ কতগুলো নমুনা পরীক্ষা রোগ শনাক্তের জন্য, আর কতগুলো পরীক্ষা সুস্থ হয়ে বাড়ি ফেরার জন্য হয়েছে, সেটা প্রকাশ করি না।
একত্রে মোট নমুনা পরীক্ষার সংখ্যা প্রকাশ করাতে আমরা বুঝতে পারি না যে তার মধ্যে কতজন বাড়িতে সুস্থ হওয়া রোগীর নমুনা আর কতজন হাসপাতাল থেকে ছাড়া প্রাপ্ত রোগীর নমুনা আছে। তাই যখন অনেক মানুষ সুস্থ হয়ে যাচ্ছে এবং এই সুস্থ ব্যক্তিদের প্রত্যেকের যদি দুইটা করে নমুনা নেওয়া হয় আর সেগুলো নেগেটিভ হয়, তাহলে স্বাভাবিকভাবে আপনার পরীক্ষার সংখ্যা বাড়বেই এবং পরীক্ষার তুলনায় শনাক্তের সংখ্যা কমবেই।
অন্য দেশগুলো যেভাবে পরীক্ষা করছে তা হলো, তারা বিস্তৃত জনসংখ্যার ওপর পরীক্ষা করছে এবং তাদের পজিটিভ রোগীর সংখ্যা তাদের পরীক্ষার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। একথা বলার অপেক্ষা রাখে না যে, আমাদের মতো দেশে প্রতিদিন বিশ ত্রিশ হাজার পরীক্ষা নিয়মিতভাবে করা খুব কঠিন কাজ। রোগতত্ত্ববিদরা মনে করেন, বেশিরভাগ আক্রান্ত-অধ্যুষিত লোকালয় যেমন ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ ইত্যাদি অঞ্চলে নমুনা পরীক্ষার সঙ্গে সঙ্গে রোগের লক্ষণ/উপসর্গ দেখে কঠোর নজরদারি প্রক্রিয়াটি (সিন্ড্রমেটিক সারভিলেন্স) জোরালো করতে হবে। সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণের বিধিগুলো কড়াকড়ি না করতে পারলে গুরুতর বিপদের আশঙ্কা রয়েছে। এছাড়া এসব বেশি আক্রান্ত-অধ্যুষিত শহরাঞ্চল থেকে গ্রামাঞ্চলে রোগের সংক্রমণ প্রতিরোধ করতে অবাধ চলাচল ঠেকাতে হবে, সোজা কথায় বললে একেকটি পকেট অঞ্চল লকডাউনের আওতামুক্ত করে পর্যবেক্ষণ করে পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। মহামারি আইনের আওতায় এ কাজটি স্বাস্থ্য বিভাগ স্থানীয় প্রশাসনের সাহায্য নিয়ে করতে পারে।
লকডাউন ছাড়া কোভিড-১৯ এর সংক্রমণ কেমন হতে পারে সে বিষয়ে ধারণা পেতে প্রয়োজন তিনটি ইনকিউবেশন পিরিয়ড (করোনাভাইরাসের আক্রমণ ঘটার পর থেকে রোগ প্রকাশ পেতে যেই সময় প্রয়োজন) যার সময়কাল দেড় মাস। আর তাই মে মাসের ৩০ তারিখ থেকে যদি লকডাউন তুলে নেওয়া হয় তাহলে আগামী জুলাই মাসের মাঝামাঝি সময়েই এই রোগের সংক্রমণ সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছাবে।
ধারণা করা হচ্ছে যেহেতু মানুষের মধ্যে আক্রান্ত হওয়ার একটি ভীতি কাজ করবে, তাই লকডাউন তুলে নেওয়া হলেও সাধারণ জনগণ এর একটা বড় অংশ সংক্রমণ প্রতিরোধের সামাজিক বিধিনিষেধগুলো মেনে চলা অব্যাহত রাখবে [ধারণা করাই যায় যে বেশ কিছুদিন ধরে এই আচরণগুলো মেনে চলার কারণে তারা অভ্যস্ত হয়ে গেছে], যেমন মানুষ নিজের জীবনের নিরাপত্তার কারণেই সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখবে, মাস্ক ব্যবহার করবে, যার ফলে আক্রান্তের সংখ্যা সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছালেও চূড়াটি খুব বেশি উঁচু হবে না।
আমাদের এসময়ে উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ [রেড জোন] এলাকাগুলোর দিকে বেশি মনোযোগী হয়ে সে সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণের কৌশল নিয়ে ভাবা উচিত এবং সে কারণে, প্রথমত আমাদের পুল হিসেবে পরীক্ষা করে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা গুচ্ছকে [ক্লাস্টার] চিহ্নিত করতে হবে।
দ্বিতীয়ত, প্রত্যেককে পরীক্ষা করে পজিটিভ হলে তাদেরকে কোয়ারেন্টিন করা, যদিও এই প্রক্রিয়ায় কাজ করার সময় চলে গিয়েছে। এছাড়া আমরা আমাদের পরীক্ষা করার ক্ষমতাও দশ হাজার থেকে হঠাৎ বিশ হাজার করতে পারছি না।
আমাদের এখন যেটা করতে হবে তা হলো মৃত্যুর সংখ্যা হ্রাস করা। সেজন্য পঞ্চাশ, ষাটোর্ধ্ব সকলের যাদের উপসর্গ আছে তাদের সকলের পরীক্ষা করতে হবে, কোভিড-১৯ এর চিকিৎসা সুবিধাসম্পন্ন হাসপাতালে ভর্তি করতে হবে এবং প্রথম দিন থেকেই সঠিক চিকিৎসা দেওয়া শুরু করতে হবে, যাতে তারা মৃত্যুবরণ না করেন।
যখন লকডাউন, স্কুল বন্ধ বা সাধারণ ছুটি কিছুই ছিল না, তখন আমরা করোনাভাইরাস সংক্রমণের কিছু প্রেডিকশন মডেল দেখেছিলাম।
নমুনা পরীক্ষার পরিমাণ বা সংখ্যা মহামারির বিস্তৃতি নির্ধারণের জন্য প্রধান পন্থা হবে না। বরং মৃতের সংখ্যা দ্বারা মহামারির গতি-প্রকৃতি ও বিস্তৃতি নির্ধারিত হবে। এপিডেমিওলজিক্যাল মডেলের মাধ্যমে এটি করতে হবে। কিন্তু আমাদের সেই সামর্থ্য এখন নেই। তাই বর্তমান অবস্থা বিবেচনায় আমাদের লক্ষিত/টার্গেটেড জনগোষ্ঠীর শতভাগ নমুনা পরীক্ষার মাধ্যমে মানুষের জীবন বাঁচাতে হবে।
লকডাউন ও সাধারণ ছুটির কারণে মহামারি গতি কিছু কমেছে। কিন্তু মনে রাখবেন, একটা সময়ের পর এটা আর কার্যকরী হবে না। লকডাউন রোগ সারানোর ম্যাজিক বুলেট না, এটা কেবল মহামারির গতিকে আটকে রেখেছে। এ ধরনের সামাজিক জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে রোগের সংখ্যা নিয়ন্ত্রণে রাখা হয় যাতে কিনা দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থা এটা সামাল দিতে পারে। আমরা লকডাউন তুলে নেওয়ার পরপরই করোনা সংক্রমণের পুনরুত্থান দেখতে পাবো, কারণ এটাই এই রোগের ধরন। আপনাকে মনে রাখতে হবে, লকডাউনের উদ্দেশ্য এই নয় যেন মহামারি চলে যায় অথবা সারাজীবন লকডাউন চলবে।
পরিশেষে বলি, এই মহামারি সমুদ্রের ঢেউয়ের মতো। তাই এটি শুধু কতগুলো ঢেউ হবে তার ওপরই নির্ভর করে না, ঢেউ কত উঁচু হবে, জলোচ্ছ্বাস হবে কিনা তার ওপরও নির্ভর করে। যদি খুব দ্রুত সংক্রমণ হয় বা একসঙ্গে বহুলোক আক্রান্ত হয়, তাহলে ঢেউ অনেক বড় হবে। তারপর এটি তীরে সব গুঁড়িয়ে দিয়ে শেষ হয়ে যাবে। এই রোগের ক্ষেত্রেও একটি বড় ঢেউ উঠেছে বা উঠতে যাচ্ছে। একইভাবে যদি সংক্রমণ সংখ্যা বিভিন্ন পর্যায়ে নিয়ন্ত্রণ না করা যায় এবং রোগীর সংখ্যা বাড়ে তাহলে মহামারির একটার পর একটা ঢেউ আরও উঁচু হয়ে আছড়ে পড়বে এবং সমাজ আর অর্থনীতিকে লণ্ডভণ্ড করে ফেলবে।
এই কারণেই আমরা চাচ্ছি সংক্রমণের হার কমিয়ে ফেলতে যাতে করে রোগের পর্যায়ের পরিমাণ বড় না হয়। আপনি যদি এই রকম আরেকটি ছোট পর্যায় পান তাহলে আমরা সেটাকে দ্বিতীয় পর্যায়/ঢেউ বলবো, কারণ এখনও অনেক মানুষ আক্রান্ত হয়নি। আমার মতে একটা বড় পর্যায়ের চেয়ে দুই তিনটা ছোট পর্যায় হওয়া ভালো। আমরা এখনও একটা পর্যায়ের পুরোটা দেখি নাই, একটি পর্যায়ের মধ্যে আছি। এটি এখনও গতি তৈরি করছে। এবং যেহেতু প্রথম পর্যায়টি এখনও শেষ হয়নি, তাই এই বিষয়ে বলার মতো সময় এখনও হয়নি।
লেখক: যুগ্ম সদস্য সচিব, কোভিড-১৯ বিষয়ক সমন্বিত কন্ট্রোল রুম, স্বাস্থ্য অধিদফতর

 

/এমএমজে/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ