জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনায় জন-যোগাযোগ

Send
সৈয়দ ইশতিয়াক রেজা
প্রকাশিত : ১৬:১৭, জুন ১৭, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১৬:১৯, জুন ১৭, ২০২০

সৈয়দ ইশতিয়াক রেজালাল, হলুদ আর সবুজ এলাকা নির্ধারণ করে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ঠেকানোর বিষয়টি অনেকদিন ধরে আলোচিত। তবে তা এখনও সেভাবে চিহ্নিত করা যায়নি। কিন্তু ঢাকা ও চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন এলাকাসহ বেশকিছু জায়গা যে সংক্রমণ বিচারে লকডাউন করা হবে সেটা নিশ্চিত হওয়া গেছে। জেলায় জেলায় কিছু কিছু এলাকায় স্থানীয় প্রশাসনের উদ্যোগে লকডাউন করা হচ্ছে। 
গণমাধ্যমে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের ৪৫টি এলাকাকে রেড জোন বলে প্রচার করলেও শেষ পর্যন্ত জানা গেলো এখনও বাকি আছে এই বিষয়টি চূড়ান্ত করতে। তবে একটা বিষয় নিশ্চিত হওয়া গেছে, সরকার চাচ্ছে যেসব এলাকা বেশি সংক্রমিত শুধু সেসব এলাকা লকডাউনের আওতায় আসবে। বাকি এলাকাগুলোতে জীবন ও জীবিকা যাতে স্বাভাবিকভাবে চলতে পারে সেটা নিশ্চিত করা হবে।
যেহেতু সময় নিচ্ছে সরকার, প্রত্যাশার জায়গাটা বাড়ছে। যেরকম জোনই হোক, বেশি প্রয়োজন একটা বড় পাবলিক হেল্থ কমিউনিকেশন নিয়ে ভাবা; যাকে বলা যায় জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনায় জন-যোগাযোগ। রেড জোন বা অরেঞ্জ জোনে যারা পড়বেন সেইসব বাসিন্দার মাঝে বড় প্রচারণা চালাতে হবে। সেখানে লকডাউনের মাত্রা কী হবে, বিধিনিষেধ কী হবে, সে নিয়ে যেন জনমনে কোনও সংশয় না থাকে।

করোনাভাইরাসের সংক্রমণ এবং একইসঙ্গে রেড জোন বা ইয়েলো জোন নিয়ে সংবাদমাধ্যম যা করেছে কয়েকদিন এতে করে বিভ্রান্তি অনেক বেড়েছে। এ রোগ সম্পর্কে মানুষের জানা না জানা, বিভ্রান্ত হওয়া থেকে আতঙ্কিত হওয়া সবক্ষেত্রেই একটা বিষয় পরিষ্কার, কোনও জরুরি পরিস্থিতিকেই মোকাবিলা করা সম্ভব হয় না সামগ্রিক পরিকল্পনা বা ব্যবস্থাপনায় জনগণকে সম্পৃক্ত করতে না পারলে। এখানেই পাবলিক হেল্থ কমিউনিকেশনের গুরুত্ব।

সার্বিকভাবে করোনা সংক্রমণ এবং তাকে কেন্দ্র করে সংগঠিত অর্থনৈতিক, সামাজিকসহ সব ক্ষেত্রেই বড় ভাবনা চিন্তা করতে পেরেছি কিনা সেই প্রশ্ন নিয়ে বিস্তর বিতর্ক আছে। তবে একটা বিষয় নিশ্চিত, সরকারের, বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রীর ভাবনায় ছিল করোনা থেকে বাঁচতে সামাজিক সুরক্ষা থেকে অর্থনৈতিক সুরক্ষা দুটো বিষয়ের মাঝে একা ভারসাম্য আনা। প্রধানমন্ত্রীর ভাবনায় বারবার যে বিষয়টি দেখা গেছে সেটি হলো, তার সরকারের গৃহীত পদক্ষেপ যেন মানুষের জীবনধারণের মৌলিক উপায়গুলো সচল থাকে।

লক আর আনলকের খেলায় বেশি ভুগেছে পোশাক খাতের কর্মীরা। তাদের নিয়ে যে টানা হেঁচড়াটা করেছেন পোশাক কারখানার মালিকরা তা যেকোনও মূল্যবোধসম্পন্ন মানুষকে ভাবিয়েছে। পোশাক কারখানার মালিকরা সরকারি প্রণোদনা পেয়েও তাদের কর্মীদের এমন বিপদে ধাক্কা দিয়ে নামিয়ে নিজেরা নিরাপদ দূরত্বে কী করে থেকেছেন সে নিয়ে প্রশ্ন উঠবেই।

সারা বিশ্বের মানুষের জীবন এক নতুন বাঁকে দাঁড়িয়ে। অদ্ভুত এক সময় অতিক্রম করছি আমরা। প্রায় সবাই আমরা আতঙ্কিত, সন্ত্রস্ত। সবাই কেমন যেন বিভ্রান্ত, দিশাহারা। বাঁচার তাগিদে আমরা নিজেদের রাখতে চাই চার দেয়ালের ভেতরে, আবার সেই আমরাই বেরিয়ে আসতে চাই বন্দিত্ব থেকে। জীবনকে স্তব্ধ করে রাখতে পারি না, জীবনকে ছন্দময় রাখতে চাই এই আমরাই। এখানেই সাহস, সতর্কতা, সচেতনতার প্রশ্ন। গত ১৩ এপ্রিল বাংলা নববর্ষের প্রাক্কালে জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে প্রধানমন্ত্রী বলেছিলেন, ‘সাহস নিয়ে দাঁড়ান, আঁধার কেটে যাবে।’ এক মাসেরও বেশি সময় পরে, গত সোমবার স্পেশাল সিকিউরিটি ফোর্স (এসএসএফ)-এর ৩৩তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতেও এ কথা তিনি আরেকবার উচ্চারণ করেছেন।

যারা নতুন করে লকডাউনের আওতায় আসবেন তাদের জন্য নির্ধারিত বিধি বিধান আছে। তাদের জন্য করোনা পরীক্ষার সুব্যবস্থা আছে, নির্ধারিত জীবন-যাপনের রুটিন করে দেওয়া হবে, সেনা ও পুলিশ টহল থাকবে সেইসব এলাকায়। কিন্তু যারা আনলক থাকবেন তারা কি মুক্ত বাতাসে ঘুরে বেড়াবেন? বিষয়টি ঠিক তেমন নয়। আনলকের জীবন আসলে এতটা সহজ নয়। মনে রাখতে হবে দেশে প্রতিদিন করোনা সংক্রমণের সংখ্যা বাড়ছে।

এই বাস্তবতায় সবথেকে বেশি প্রয়োজন নিজেদের মধ্যে সচেতনতা। এটি হতে হবে পাড়ায়, পাড়ায়, বাড়িতে, বাড়িতে, অফিসে অফিসে। একটা কথা মানতেই হবে, মানুষের সংখ্যা আর আক্রান্তের বিচারে যে অবকাঠামো আমাদের আছে, সেটা অপ্রতুল। তাই প্রতিটি হাসপাতালে মানুষ চূড়ান্ত দুর্ভোগের শিকার হচ্ছে। রিপোর্ট আসার আগেই অনেকে মারা যাচ্ছে। রিপোর্ট দেরিতে আসায় মানুষ তার করণীয় বুঝতে পারছে না। করোনা রোগের প্রতি সামাজিক ঘৃণার কারণে বহু মানুষকে সহ্য করতে হচ্ছে অসহনীয় মানসিক যন্ত্রণা।

দিন যত যাবে, সঙ্কট আরও ঘনীভূত হবে। প্রধানমন্ত্রীর কথাকেই প্রণিধানযোগ্য ধরে নিয়ে বলবো, ভয় পেলে চলবে না। আতঙ্কিত না হয়ে নিতে হবে পরিকল্পনা। এই পরিকল্পনা যেমন ব্যক্তি মানুষের, তেমনি সরকারেরও। করোনার মোকাবিলা করতে গেলে সবচেয়ে বেশি দরকার জনগণের সহযোগিতা। সরকারের দিকটাই বড়। মানুষকে তার ঘরে আটকাতে হবে যেখানে সংক্রমণ বেশি এবং সেটা করতে গেলে প্রয়োজন পাবলিক হেল্থ কমিউনিকেশনের বাস্তব প্রয়োগ। মানুষকে ঠিকমতো বোঝাতে পারলেই আসবে সাফল্য। পুলিশ, স্বাস্থ্য দফতর ও প্রশাসনকে এক ছাতার নিচে এনে মানুষকে একটা একক বার্তা দিতে হবে যে, করোনাকালে কী তার করণীয়।

দেশজুড়ে করোনার তাণ্ডবলীলা থামাতে হলে সুচিন্তিত পরিকল্পনার বিকল্প নেই। আমাদেরও বুঝতে হবে, রাতারাতি আগের জীবন ফিরে পাওয়ার চেষ্টা করলে শুধু ভুলই হবে না, আমরা বিপদ ডেকে আনবো। সরকারের প্রতিটি অঙ্গকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে যেন কোথাও বড় ভুল হয়ে না যায়। আমাদের হতে হবে অনেক বেশি সংযমী, হিসেবি এবং সতর্ক। 

লেখক: সাংবাদিক

 

/এসএএস/এমএমজে/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ