আওয়ামী লীগের উন্নয়ন চিন্তা

Send
সৈয়দ ইশতিয়াক রেজা
প্রকাশিত : ১৪:৪৪, জুন ২৪, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১৪:৪৬, জুন ২৪, ২০২০

সৈয়দ ইশতিয়াক রেজাগতকাল ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের ৭১ বছর পূর্তি উদযাপিত হয়েছে বেশ নীরবেই। করোনা মহামারির দাপটে দেশ যখন অনেকটা পর্যুদস্ত, তখন স্বাভাবিক কারণে কারও ভাবনায় আনেনি যে সাড়ম্বরে এই প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী পালন করতে হবে।
প্রতিষ্ঠার লগ্ন থেকে বড় সময় গেছে লড়াই সংগ্রামে। হত্যা, ক্যু, ষড়যন্ত্র, সামরিক ও আধা সামরিকতন্ত্রকে মোকাবিলা করে এই দলেরই নেতৃত্বে স্বাধীন হওয়া দেশে আওয়ামী লীগ এখন টানা তৃতীয় মেয়াদে শাসক দলের ভূমিকায়। এখন আরেক লড়াই চলছে করোনা মহামারির বিরুদ্ধে।
আওয়ামী মুসলিম লীগ থেকে আরও অসাম্প্রদায়িক হওয়ার জন্য মুসলিম শব্দটি বাদ দেওয়া, ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে বাংলাদেশের বাঙালির সব আন্দোলন, সংগ্রামে নেতৃত্ব দেওয়া, মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্ব দেওয়া, স্বাধীন দেশ পরিচালনা, ১৯৭৫-এ জাতির পিতার হত্যা পরবর্তী দুঃসময় এবং তারই কন্যা শেখ হাসিনার হাত ধরে আবার রাষ্ট্রক্ষমতায় ফিরে আসা, সবই নানা স্তরে বিশ্লেষিত হয়েছে।

শেখ হাসিনার নেতৃত্বে চারবার ক্ষমতায় এসেছে দলটি। এবার টানা তৃতীয় মেয়াদে আছে রাষ্ট্র ও সরকার পরিচালনায়। এই তিন মেয়াদে সবচেয়ে বেশি উচ্চারিত শব্দ ‘উন্নয়ন’। বাংলাদেশের মতো দারিদ্র্যপীড়িত ও ভঙ্গুর গণতান্ত্রিক একটি দেশকে উন্নয়নের পথে নিয়ে যাওয়া, আবার মুক্তিযুদ্ধের রাজনৈতিক অঙ্গীকার বাস্তবায়ন করা – এ দুয়ের এক সমন্বয় করতে গিয়ে কঠিন বাস্তবতার ভেতর দিয়ে ২০০৯ সাল থেকে পথ চলছেন শেখ হাসিনা। রাজনৈতিক অঙ্গীকার হিসেবে যুদ্ধাপরাধের বিচার করতে গিয়ে সহিংস ও জঙ্গি পরিস্থিতি মোকাবিলা করেও তার সাফল্য ছিল উচ্চ প্রবৃদ্ধি অর্জনের পথে দেশকে নিয়ে যাওয়া।  

বাংলাদেশের অর্থনীতি সংক্রান্ত ভাবনাটি কী হবে তার কোনও সুস্পষ্ট ধারণা রাজনৈতিক নেতৃত্ব থেকে পাওয়া বেশ কঠিন ছিল। একটা অংশ মনে করতো দেশ স্বাধীন হলে আধুনিক শিল্প নিয়ে মাথা না ঘামিয়ে গ্রামীণ অর্থনীতির উন্নয়নের ওপর জোর দিতে হবে। আরেকটি অংশ মনে করতেন, শিল্পায়নের পথই উন্নয়নের পথ। নতুন দেশে বাঙালি উদ্যোক্তা হাতো গোনা, আবার রাষ্ট্র ভাবনায় সমাজতন্ত্র। বঙ্গবন্ধু সব শিল্প ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান রাষ্ট্রায়ত্ত করেছিলেন মানুষের কল্যাণের কথা ভেবে। শিল্পের পথে এগোতে গেলে যে পরিকল্পিতভাবে যেতে হবে, রাষ্ট্রকে দায়িত্ব নিতে হবে, এই ধারণাটি বঙ্গবন্ধুর ছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত অনিয়ম, দুর্নীতি আর অদক্ষতায় এই রাষ্ট্রায়ত্তকরণ আমাদের সফলতা দেয়নি।

১৯৭৫-এর পর ব্যক্তিখাতের বিকাশ হয়েছে প্রথমে সামরিক শাসকদের নেতৃত্বে, পরবর্তী সময়ে আধা-সামরিক নেতৃত্বে এবং সেই পথ চলায় দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি সবই প্রাতিষ্ঠানিকতা পেয়েছে ক্ষমতার কেন্দ্র থেকে। আমরা কি মিশ্র অর্থনীতির পথে চলব, নাকি কঠোরভাবে বাজারের দর্শনে এগিয়ে যাব সে নিয়ে সংশয় সবসময়ই ছিল। এমন বাস্তবতায় বর্তমান সরকার বড় অবকাঠামো প্রকল্পের ভাবনা যেমন ভেবেছে, তেমনি স্বয়ম্ভর গ্রামীণ অর্থনীতি, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পই যে আমাদের যথার্থ ভবিষ্যৎ, সে ভাবনায়ও চলার চেষ্টা করছে।

২০০৯ সালে বড় বিজয় নিয়ে সরকার গঠন করার সময় থেকে শেখ হাসিনা দারিদ্র্য থেকে মুক্তির সমাধানসূত্র খুঁজেছিলেন বড় উন্নয়ন ভাবনার মাধ্যমে। যারা শিল্প ও বাণিজ্যের সম্প্রসারণ করতে চান তাদের জন্য প্রধান অন্তরায় ছিল বিদ্যুৎ। দিনে ১২ ঘণ্টার বেশি লোডশেডিং নিয়ে আর যাই হোক, অর্থনীতি এগোতে পারবে না। শেখ হাসিনা এটা বুঝতে পেরে প্রথম নজর দেন সেই পথে এবং আজ বিদ্যুতে স্বয়ংসম্পূর্ণ। সাপ্লায়ার্স ক্রেডিট, উৎপাদন ও বিপণন ব্যবস্থায় খরচ নিয়ে এখন প্রশ্ন উঠলেও শুরুতে ব্যবসায়ীদের চাওয়া ছিল যেকোনও মূল্যে বিদ্যুৎ পাওয়া। রাস্তাঘাট, ব্রিজ, ফ্লাইওভার সবই হয়েছে ব্যবসাকে সম্প্রসারণের জন্য। কৃষির ক্ষেত্রেও প্রচলিত পথ ছেড়ে আধুনিকায়ন করতে চেয়েছেন। দেশে সবুজ বিপ্লব হয়েছে এটা বলা সম্ভব না হলেও ধান উৎপাদনে, পোল্ট্রিতে, মাছ উৎপাদনে, প্রাণিসম্পদের বিকাশ মনে করিয়ে দেয় যে, উন্নয়নকে তিনি একটা আধুনিক চেহারায় দেখার পাশাপাশি দেশীয় প্রেক্ষাপটে দেখার সংকল্প তার ছিল।

এই উন্নয়ন মানুষের আয় ও ব্যয় সক্ষমতা বাড়িয়েছে, মানুষকে বড় ভাবনা ভাবতে সহায়তা করেছে। কিন্তু উন্নয়নের সঙ্গে দুর্নীতিও ব্যাপকভাবে আলোচিত শব্দ এখন বাংলাদেশে। এখানেই আমাদের চ্যালেঞ্জ। যে দেশগুলো উন্নত, তাদের বেশিরভাগই তুলনামূলকভাবে দুর্নীতিমুক্ত।

অনেকে বলতে চান, দুর্নীতি আর উন্নয়নের মধ্যে একটা পরিষ্কার সম্পর্ক আছে। উন্নয়ন হলে দুর্নীতি কিছুটা হবেই, এমন একটা কথা বলার অর্থ হলো দুর্নীতিকে কিছুটা হলেও মেনে নেওয়া। এ ধরনের বক্তব্য গ্রহণযোগ্য নয়। তাই আমরা চাই দুর্নীতির বিরুদ্ধে আরও সক্রিয় উদ্যোগ নেওয়া হোক। উন্নয়ন আর দুর্নীতি হাতে হাত ধরে চলতে পারে না। চলতে দিলে দুর্নীতি সম্পর্কে সমাজের নৈতিক অবস্থানকে ভঙ্গুর করে দেওয়া হয়। উন্নয়ন হলে কিছু দুর্নীতি মেনে নিতে হবে, এটা বলে একটি মহল আসলে দুর্নীতির বিরুদ্ধে মূল্যবোধ তৈরির ব্যাপারে আমাদের সামাজিক অনীহা সৃষ্টির চেষ্টা করে। 

করোনা মোকাবিলায় সরকার যখন সীমিত সম্পদ নিয়ে তার সর্বোচ্চটা দিতে সচেষ্ট তখনও বেশ কিছু দুর্নীতি বা অনিয়মের খবর এসেছে। এগুলো সুশাসনের পথকে দুর্গম করে।

২০১৮-এর নির্বাচনের পর তৃতীয় মেয়াদে আবার সরকার গঠন করে জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে প্রধানমন্ত্রী বলেছিলেন, ‘দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে অভিযান অব্যাহত থাকবে। দুর্নীতিবাজ যে-ই হোক, যত শক্তিশালীই হোক না কেন, তাদের ছাড় দেওয়া হবে না। মানুষের কল্যাণের জন্য আমি যেকোনও পদক্ষেপ গ্রহণ করতে দ্বিধা করবো না।’ দুর্নীতি কমাতে প্রধানমন্ত্রীর যে প্রচেষ্টা আছে, তার সঙ্গে পুরো দল ও প্রশাসনকে আসতে হবে। কারণ উন্নয়নের জন্য বা দরিদ্র মানুষের জন্য দেওয়া বরাদ্দ সম্পদ দুর্নীতির কারণে বিপথে চালিত হলে দরিদ্র মানুষের বিপুল ক্ষতি হয়।

আর দুর্নীতি বলতে যদি আমরা কেবল বুঝি সরকারি সেবা পরিষেবায় ও উন্নয়ন প্রকল্পে দুর্নীতি, তাহলেও ভুল হবে, কিন্তু এই করোনাকালে বড় দুই শহর–ঢাকা ও চট্টগ্রামে বেসরকারি হাসপাতালগুলোর যে চরিত্র আমরা দেখলাম তাতে বুঝতে পারছি ব্যক্তিখাতের পরিসরেও বেআইনি দুর্নীতির দাপট কতটা প্রবল।

লেখক: সাংবাদিক

 

/এসএএস/এমএমজে/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ