আনন্দবাজারের ‘খয়রাতি’ সাংবাদিকতা

Send
প্রভাষ আমিন
প্রকাশিত : ১৭:০৬, জুন ২৪, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১৭:১০, জুন ২৪, ২০২০

প্রভাষ আমিনবিশ্বের যেকোনও দুটি দেশের মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্ক থাকে। এটা সাধারণ নিয়ম। তবে সবার সঙ্গে সবার কূটনৈতিক সম্পর্ক থাকতেই হবে, এমনও কোনও কথা নেই। যেমন বাংলাদেশের সঙ্গে ইসরায়েলের কূটনৈতিক সম্পর্ক নেই। বাংলাদেশি পাসপোর্টে ইসরায়েল যাওয়া যায় না। আবার কূটনৈতিক সম্পর্ক থাকা মানেই যে বন্ধুত্ব, তাও নয়। পাকিস্তানের সঙ্গে আমাদের কূটনৈতিক সম্পর্ক আছে, কিন্তু সম্পর্ক ভালো নয়। কূটনৈতিক সম্পর্ক একটি আনুষ্ঠানিকতা মাত্র। বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ককে নিছক কূটনৈতিক মাত্রায় মাপা যাবে না। এই দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের বহুমাত্রিক দিক আছে, আছে বিশাল ঐতিহাসিক, কূটনৈতিক, ইমোশনাল, সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপট। আরেকটু ছোট করে বললে, বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের রাজ্য পশ্চিমবঙ্গের সম্পর্কটা নাড়ির টানের। ১৯৪৭ সালের আগ পর্যন্ত বাংলাদেশ-ভারত-পাকিস্তান একটি অভিন্ন রাষ্ট্র ছিল ভারত নামে। ব্রিটিশরা দুইশ’ বছরের শাসন শেষে ফিরে যেতে বাধ্য হওয়ার আগে দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে ভারতকে ভেঙে দিয়ে যায়। সৃষ্টি হয় পাকিস্তান নামে এক অদ্ভুত রাষ্ট্রের। ধর্মের ভিত্তিতে সৃষ্টি হওয়া পাকিস্তানের দুটি অংশ পূর্ব পাকিস্তান আর পশ্চিম পাকিস্তানে ভৌগোলিক দূরত্ব ছিল ১১০০ মাইল। কিন্তু মানসিক দূরত্ব ছিল হাজার কোটি মাইল। বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে দীর্ঘ মুক্তি সংগ্রাম শেষে একাত্তরে নয়মাসের রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত হয় স্বাধীনতা। এক সময়ের পূর্ববঙ্গ, পরের পূর্ব পাকিস্তান বদলে যায় স্বাধীন বাংলাদেশে। একসময় পাকিস্তানের অংশ থাকলেও তাদের সঙ্গে আমাদের সম্পর্কটা বরাবরই বিদ্বেষের। রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে যাই হোক, জনগণের সঙ্গে জনগণের সম্পর্ক একেবারেই নেই। এই বিচ্ছিন্নতার মূল কারণ পাকিস্তানের সঙ্গে আমাদের ভাষা, সংস্কৃতি, কৃষ্টির কোনও মিল নেই; বিচ্ছিন্নতাটা আসলে মানসিক। কিন্তু ভারতের সঙ্গে আমাদের সম্পর্কটা তেমন নয়। বাংলাদেশ আর ভারতের রাজ্য পশ্চিমবঙ্গ একসময় অভিন্ন বাংলা ছিল। ১৯০৫ সালে প্রথম বঙ্গভঙ্গ হয়। ১৯১১ সালে আবার বঙ্গভঙ্গ রদ হয়। তবে ১৯৪৭ সালে দেশভাগের সময় পুরোপুরি ভেঙে যায় বাংলা। পূর্ব বাংলা থেকে পূর্ব পাকিস্তান হয়ে বাংলাদেশ এখন একটি স্বাধীন রাষ্ট্র। আর পশ্চিমবঙ্গ ভারতের একটি রাজ্য।

তবে পশ্চিমবঙ্গের সঙ্গে আমাদের রক্তের সম্পর্কটা এখনও রয়ে গেছে। দেশভাগের সময় বা পরে ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের সময় এপার বাংলা থেকে সংখ্যালঘুদের অনেকেই ভারতে চলে গিয়েছেন বা চলে যেতে বাধ্য হয়েছেন। যতই বাধ্য হন, তাদের শেকড় তো বাংলাদেশেই। এখনও অনেকে ফেলে যাওয়া ভিটার তুলসীতলা বা গন্ধরাজের জন্য দীর্ঘশ্বাস ফেলেন। অনেকে শেকড়ের খোঁজে বাংলাদেশের পথে-প্রান্তরে ঘুরে বেড়ান। ভারতের জনপ্রিয় শিল্পী নচিকেতা বরিশালে তাদের পৈত্রিক ভিটায় গিয়ে মাটিতে গড়াগড়ি করে কেঁদেছিলেন। শুধু নচিকেতা নয়, বাংলাদেশ থেকে যাওয়া আরও অনেক বাঙালি ভারতের রাজনীতি, শিল্প-সাহিত্যে অনেক উচ্চ আসনে অধিষ্ঠিত হয়েছেন। কিন্তু তারা ভুলে যাননি বাংলাদেশকে। বাংলাদেশের প্রতি তাদের টানটা রয়েই গিয়েছে। বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে এই ‘বাঙাল’রা একটি বড় প্রভাবক। পশ্চিমবঙ্গের সঙ্গে শিল্প-সাহিত্য-সিনেমা-টিভি সিরিয়াল-গানে বাংলাদেশের একটা নিবিড় যোগাযোগ আছে। শুধু বাংলা বলে নয়, বাংলাদেশে হিন্দি সিনেমা-গানেরও বিশাল দর্শক আছে।
তবে দুঃখজনক হলো এই যোগাযোগটা বেশিরভাগ সময়ই একতরফা। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় মারা গেলে বাংলাদেশের সকল গণমাধ্যম লিড করে। আর হুমায়ূন আহমেদের মৃত্যুসংবাদ আনন্দবাজার পত্রিকার ভেতরের পাতার টুকরো খবর। অথচ শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের পর বাংলা কথাসাহিত্যে সবচেয়ে জনপ্রিয় নাম হুমায়ূন আহমেদ।
বাংলাদেশ আর পশ্চিমবঙ্গের মধ্যে হৃদয়ের যে উষ্ণতা, তাতে শীতল জল ঢেলে দেন এই আনন্দবাজারের মতো পত্রিকাগুলোই। বাংলাদেশে যেমন ভারতবিদ্বেষী লোক আছে, ভারতেও নিশ্চয়ই বাংলাদেশবিদ্বেষী লোক আছে। কিন্তু মূলধারার গণমাধ্যমের দায়িত্ব হলো, দুই দেশের সম্পর্ককে যৌক্তিক পর্যায়ে রাখা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বা আমজনতার আবেগ বা উত্তেজনাকে উসকে না দেওয়া। কিন্তু শতবর্ষের ঐতিহ্যের ধারক আনন্দবাজার পত্রিকা যেন ফেসবুকীয় আবেগেই গা ভাসালো। লাদাখ সীমান্তে ভারত-চীনের উত্তেজনার চারদিন পরই বাংলাদেশের ৯৭ ভাগ পণ্যকে চীনে শুল্কমুক্ত রফতানির ঘোষণা যে ভারত ভালোভাবে নেবে না, সেটা তো জানা কথাই।
তবে আনন্দবাজার পত্রিকার শব্দচয়ন দেখে মনে হচ্ছে দাদাদের দিলে চোট একটু বেশিই লেগেছে। তবে এখানে বাংলাদেশের দায়টা কোথায়, তা পরিষ্কার নয়। চীনের ঘোষণার পরদিন, ‘লাদাখের পরে ঢাকাকে পাশে টানছে বেজিং’ শিরোনামে আনন্দবাজারে লেখা হয়, ‘বাণিজ্যিক লগ্নি আর খয়রাতির টাকা ছড়িয়ে বাংলাদেশকে পাশে পাওয়ার চেষ্টা নতুন নয় চিনের।’ বাংলাদেশে বিনিয়োগ যেকোনও দেশের জন্য উন্মুক্ত। চীন যেমন করতে পারে, চাইলে ভারতও করতে পারে। আর দুই দেশের মধ্যে শুল্কমুক্ত, কোটামুক্ত রফতানির সুযোগ শুধু বাংলাদেশ-চীনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, আর এটা নতুনও নয়। বিশ্বের অনেক দেশেই এই সুবিধা আছে, ভারতেও আছে। মানছি এই সময়ে এই সুবিধা বাংলাদেশকে কাছে টানতে চীনের একটা কৌশল, তবে সেটা কোনোভাবেই ‘খয়রাতি’ নয়। শুল্কমুক্ত ও কোটামুক্ত রফতানি একটি বাণিজ্য সুবিধা, এটা ঋণ বা অনুদান নয়; তাই ‘খয়রাতি’ শব্দটি এখানে সঠিক প্রয়োগও নয়। বোঝাই যায়, এটা স্রেফ বাংলাদেশকে হেয় করার জন্যই করা।
আনন্দবাজার শুধু ভারতের নয়, এ অঞ্চলের অন্যতম প্রাচীন পত্রিকা। একসময় বাংলা ভাষার শিল্প, সাহিত্য, লাইফস্টাইল, মানুষের রুচি তৈরির অনেকটা কৃতিত্বই ছিল এই গ্রুপের অন্য প্রকাশনাগুলোর। এখন প্রকাশনা বন্ধ থাকলেও দেশ, সানন্দা সমান জনপ্রিয় ছিল বাংলাদেশেও। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, বাংলাদেশ সম্পর্কে একটা তাচ্ছিল্যের ভাব তাদের চিরদিনের। বাংলাদেশের রাজনৈতিক নেতৃত্ব, শিল্পী, সাহিত্যিক, কবিদের নাম তারা বারবার ভুল ছাপে।
আমার ধারণা এটা তারা ইচ্ছা করেই করে। ইচ্ছা করেই করে, এটা মনে করার যথেষ্ট কারণ আছে। কারণ আনন্দবাজারে চাইলেই যে কেউ যা ইচ্ছা লিখতে পারবেন না। তাদের নিজস্ব বানান রীতি আছে। বানানের ব্যাপারে যারা এতো সচেতন, তারা সম্মানিত মানুষদের নাম দিনের পর দিন ভুল ছাপবে, এটা হতে পারে না। তারা ইচ্ছা করেই বাংলাদেশকে, বাংলাদেশের মানুষদের হেয় করার জন্য, অপমান করার জন্য ছাপে। একজন মানুষের নামের বানান তিনি যেভাবে লিখতে চাইবেন, সেটাই সঠিক। সাধারণত বাংলাদেশের অনেক মানুষের নামের সঙ্গে ‘রহমান’ থাকে। কিন্তু বাংলাদেশের প্রধান কবির নাম শামসুর রাহমান, একজন সম্পাদকের নাম শফিক রেহমান। এখন আমার ইচ্ছা হলেই তাদের শামসুর রহমান এবং শফিক রহমান বানাতে পারবো না। আনন্দবাজার এটা যখন তখন করে। গণতন্ত্রের মানসপুত্র হিসেবে খ্যাত হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর নাম আনন্দবাজার দিনের পর দিন ‘সুরাবর্দী’ লিখে গেছে। ইদানীং কলকাতায় জনপ্রিয় বাংলাদেশের জয়া আহসানের নাম তারা লেখে জয়া এহসান। আমি নিশ্চিত তার নাম যদি সত্যি জয়া এহসান হতো, তাহলে আনন্দবাজার জয় আহসান লিখতো। বাংলাদেশের ক্রিকেটার মাহমুদুল্লাহকে তারা লেখে মামুদুল্লা। এগুলো ভুল নয়, নিজস্বতা নয়; স্রেফ বিকৃতি। বাংলাদেশকে, বাংলাদেশের মানুষদের হেয় করার চেষ্টা। যার সর্বশেষ ঘটনাটি ঘটেছে ২০ জুন, ‘খয়রাতি’ শব্দটি দিয়ে। আমি আগেই বলেছি, সাংবাদিকতার বিবেচনায়ও এখানে এই শব্দটির প্রয়োগ সঠিক হয়নি। এই রিপোর্টের ক্ষেত্রে তারা আরও একটি অপসাংবাদিকতা করেছে। রিপোর্টটি ছাপা হয়েছে ঢাকার বরাত দিয়ে—‘নিজস্ব সংবাদদাতা, ঢাকা’ এই ক্রেডিট লাইনে। বাংলাদেশে আনন্দবাজারে দু’জন প্রতিনিধি আছেন। প্রিন্ট ভার্সনে কুদ্দুস আফ্রাদ আর ডিজিটাল ভার্সনে অঞ্জন রায়। দু’জনেই বাংলাদেশে পরিচিত ও দায়িত্বশীল সাংবাদিক। তারা দু’জনেই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে স্ট্যাটাস দিয়ে দাবি করেছেন, তারা এই রিপোর্ট পাঠাননি। তাহলে কি ঢাকায় আনন্দবাজারের কোনও ‘ঘোস্ট সাংবাদিক’ও আছেন। ইদানীং যেভাবে মাসুদ রানার গল্পের মতো রহস্যজনক ‘ঘোস্ট রাইটা’র নিয়ে কথা হচ্ছে, তাতে ‘ঘোস্ট সাংবাদিক’ও অসম্ভব নয়। আবার এমনও হতে পারে, কলকাতায় বসে লিখে ঢাকার ডেটলাইন বসিয়েছে। আর ‘খয়রাতি’ শব্দটি যিনি লিখেছেন, তিনি যে কট্টর বাংলাদেশবিদ্বেষী তাতে কোনও সন্দেহ নেই। বিদ্বেষ আপনার থাকতেই পারে। কিন্তু সাংবাদিকতা করার সময় তো বস্তুনিষ্ঠ থাকতে হবে। বিদ্বেষ থেকে আপনি বড় জোর অনুদানকে খয়রাতি লিখতে পারেন, শুল্কমুক্ত সুবিধাকে নয়। তাছাড়া কলকাতায় ডেস্কে বসে বানিয়ে ঢাকার ডেটলাইন বসানোটাও ঠিক নৈতিক নয়। সব মিলিয়ে কেন জানি মনে হচ্ছে, ‘খয়রাতি’ শব্দটির প্রয়োগের মাধ্যমে আনন্দবাজারই আসলে খয়রাতি সাংবাদিকতা করলো। এটা আমাকে ব্যথিত করেছে।
আনন্দবাজারের কাছে আমরা সাংবাদিকতার উৎকর্ষ প্রত্যাশা করি, জাতীয়তাবাদের এমন চটকদারি নয়।
তবে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রবল প্রতিবাদের ঢেউ কিছুটা হলেও নড়াতে পেরেছে আনন্দবাজারের টনক। ২৩ জুন তারা একটি ‘ভ্রম সংশোধন’ ছেপেছে। সাংবাদিকরা দেবতা নয়, ভুল তাদের হতেই পারে। ভুল সংশোধনও সাংবাদিকতারই অংশ। আনন্দবাজারের মতো পত্রিকা বাংলাদেশের ইস্যুতে ভ্রম সংশোধন করে পেশাদারিত্বের পরিচয় দিয়েছে। তবে ভ্রম সংশোধনীতে তারা যথেষ্ট উদার হতে পরেনি, ‘লাদাখের পরে ঢাকাকে পাশে টানছে বেইজিং’ শীর্ষক খবরে খয়রাতি শব্দের ব্যবহারে অনেক পাঠক আহত হয়েছেন বলে জানিয়েছেন। অনিচ্ছাকৃত এই ভুলের জন্য আমরা দুঃখিত ও নিঃশর্ত ক্ষমাপ্রার্থী।’ আনন্দবাজার ক্ষমা চেয়েছে, দুঃখ প্রকাশ করেছে। কিন্তু নিজেদের ভুলটা বুঝতে পারেনি। ‘অনেক পাঠক আহত হয়েছেন’ বলেই তারা দুঃখিত। অনেক পাঠক না হয়ে যদি কম পাঠক আহত হতেন বা কেউ যদি আহত না হতেন; তাহলে হয়তো তারা তাদের ভুলটি বুঝতেই পারতো না।
আগেই লিখেছি, বাংলাদেশে যেমন অনেক ভারতবিদ্বেষী মানুষ আছে। ভারতেও নিশ্চয়ই প্রচুর বাংলাদেশবিদ্বেষী মানুষ আছে। কিন্তু আমি খুবই সৌভাগ্যবান, ঢাকার ভারতীয় দূতাবাসের এক কর্মচারী ছাড়া আর কোনও বাংলাদেশবিদ্বেষী ভারতীয়ের সঙ্গে আমার দেখা হয়নি। অবশ্য ২০১৭ সালের আগে আমি ভারত যাইনি।
তবে ২০১৭ সালের পর নানা কারণে পাঁচবার যেতে হয়েছে। দিল্লি প্রেস ক্লাব, সিআর পার্ক, কলকাতা প্রেস ক্লাব, কলকাতার পথেঘাটে, বোলপুরে আমি অসংখ্য মানুষের দেখা পেয়েছি; যাদের হৃদয়ে বাংলাদেশের জন্য, বাংলা ভাষার জন্য গভীর মমতা। তারা বারবার আমার ভুল ভেঙে দিয়েছেন। কলকাতা নিয়ে অনেক গল্প শুনেছি, কিন্তু বাস্তবে তার কোনও মিল পাইনি। যে উষ্ণতায় তারা বরণ করে নেন, ঘণ্টার পর ঘণ্টা, রাতের পর রাত কেটে যায় আড্ডায়; তাদের হৃদয়ে বিদ্বেষের জায়গা বড্ড কম। মান্না, লতা, হেমন্ত, ভুপেন যখন আমাদের আড্ডায় ঢুকে পড়েন; সীমানা মুছে যায়। এটা ঠিক কূটনৈতিক বিবেচনায় বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের নানা মাত্রা আছে। কখনও বন্ধু, কখনও শত্রু। একাত্তরের অকৃত্রিম বন্ধু ভারতের সঙ্গে এখনও আমাদের অনেক অমীমাংসিত ইস্যু। সীমান্ত হত্যা আমাদের কাঁদায়, তিস্তাসহ সব অভিন্ন পানির ন্যায্য হিস্যা নিয়ে আমরা বঞ্চিত হচ্ছি বছরের পর বছর। ইদানীং এনআরসি নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। কিন্তু সরকারের সঙ্গে সরকারের অমীমাংসিত ইস্যু যেন জনগণের সঙ্গে জনগণের সংযোগে বিঘ্ন না ঘটায়। প্রতিবছর বাংলাদেশের লাখো মানুষ, চিকিৎসা, শপিং, বেড়ানো, স্বজনদের সঙ্গে সাক্ষাৎসহ নানা কারণে ভারতে যায়। বাস্তবতা হলো বৃহৎ প্রতিবেশী ভারতকে আমাদের এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। তাই জনগণের সঙ্গে জনগণের যোগাযোগটা খুবই জরুরি। গণমাধ্যমের দায়িত্ব হলো, সেই উষ্ণতাকে আরও একটু ওম দেওয়া, উত্তেজনার আগুন জ্বালানো নয়।
আনন্দবাজারে ‘অনিচ্ছাকৃত’ ভুলের জন্য বিপাকে পড়েছেন বাংলাদেশের দু্ই সাংবাদিক। সাধারণ মানুষ কুদ্দুস আফ্রাদ আর অঞ্জন রায়ের চৌদ্দ ‘গোষ্ঠী উদ্ধার’ করে ফেলছেন। বিশেষ করে অঞ্জন রায়কে টার্গেট করে বাংলাদেশের একটি মহল উসকানি দিতে মাঠে নেমে পড়েছে। এর দায় অবশ্যই আনন্দবাজারের অবিমৃশ্যকারিতার। কুদ্দুস আফ্রাদ ও অঞ্জন রায়কে আমি তিন দশক ধরে চিনি।
তাদের দেশপ্রেম নিয়ে আমার কোনও সংশয় নেই। এখন তাদের যেভাবে ভিলেন বানানো হলো, তার কী পূরণ করবে আনন্দবাজার?
ভারতবিরোধিতা বাংলাদেশে একটা জনপ্রিয় প্রবণতা। ভারতের বিরুদ্ধে জ্বালাময়ী স্ট্যাটাস না দিলে যার পেটের ভাত হজম হয় না, তিনিও ভারতের ডাক্তার ছাড়া ভরসা পান না। চিকিৎসা বা শপিং বা ঘুরতে ভারত গেলেই আর ভারতের বিরুদ্ধে কিছু বলা যাবে না, ব্যাপারটা এমন নয়। আমরা ভারতে যাই বৈধভাবে এবং কেনাকাটা ও চিকিৎসা করাই পকেটের পয়সায়। তবে ভারতের পক্ষে বা বিপক্ষে আগে থেকেই এমন অবস্থান ঠিক করে রাখাটা অন্ধত্বের লক্ষণ। আপনি কথা বলবেন, অবস্থান নেবেন আপনার নিজের বিবেক দ্বারা নির্দেশিত হয়ে। আপনি থাকবেন ন্যায্যতার পক্ষে; কখনও সেটা ভারতের পক্ষে মনে হতে পারে, কখনও বিপক্ষে মনে হতে পারে।
বাংলাদেশ-ভারতের সম্পর্কের সবচেয়ে বড় সমস্যা ভারতের মানসিকতায়। এ ব্যাপারে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কথাটি বলেছিলেন সুষমা স্বরাজ ভারতের সংসদে। মুজিব-ইন্দিরা চুক্তির অনুমোদন দেওয়ার সময় তিনি বলেছিলেন, সম্পর্ক উন্নয়ন করতে হলে বাংলাদেশের এলডার ব্রাদার হতে হবে, বিগ ব্রাদার নয়। এটাই মূল কথা। আবার এটাই মূল সমস্যা। আনন্দবাজারের মতো অনেকেই মানসিকতায় বিগ ব্রাদারই রয়ে গেছেন; এলডার ব্রাদার হতে পারেননি, চেষ্টাও করেননি। আমি অনেকবার বলেছি, বড় ছোট বিষয় নয়। বাংলাদেশ এবং ভারত দুটি স্বাধীন রাষ্ট্র।
কেউ বড় কেউ ছোট নয়। সব আলোচনা হবে সমানে সমানে, সমতার ভিত্তিতে, মর্যাদার আলোকে। ভারতের গণমাধ্যম ‘খয়রাতি’ মানসিকতা বদলাতে না পারলে দূরত্ব ঘুচবে না।

লেখক: হেড অব নিউজ, এটিএন নিউজ

/এমএমজে/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ