ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কি বুড়িয়ে গেছে?

Send
তপন মাহমুদ
প্রকাশিত : ১৫:২০, জুলাই ০৩, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১৫:২১, জুলাই ০৩, ২০২০

তপন মাহমুদপ্রতিষ্ঠান কি মানুষের মতো কিছু? না মনে হয়। আবার কিছু মিল আছে। মানুষের মতো তার অস্তিত্ব আছে। অবয়ব আছে। সে জায়গা দখল করে। সে আবার মানুষকেও জায়গা দেয়। অনেক মানুষ মিলে একটা প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠে। কিন্তু মানুষের মতো কি তার মন আছে? মস্তিষ্ক আছে? আছে মনে হয়। প্রতিষ্ঠান চলার একটা নিয়ম-নীতি আছে। সে নিয়ম হয়তো মানুষ তৈরি করে। আর এসব নিয়ম-নীতির ফলেই একটা প্রতিষ্ঠানের স্বাতন্ত্র্য তৈরি হয়।
ব্যক্তির মতোই প্রতিষ্ঠানেরও একটা ব্যক্তিত্ব গড়ে ওঠে, যাকে আমরা বলতে পারি ‘প্রাতিষ্ঠানিকত্ব’! এটা দিয়েই প্রতিষ্ঠানের গড়ন ও ধরন বোঝা যায়! সে কেমন করে চলবে? উদাহরণ হিসেবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে ধরা যাক। দীর্ঘ ইতিহাসের পথ ধরে স্বাধীন বাংলাদেশে নব জন্মলাভ করলো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। ‘পরাধীন দেশের স্বাধীন বিশ্ববিদ্যালয়’ থেকে হয়ে উঠলো ‘স্বাধীন দেশের স্বাধীন বিশ্ববিদ্যালয়’। যদিও ট্র্যাজেডি হলো, চরিত্র বদলে সে আবার ‘স্বাধীন দেশের পরাধীন বিশ্ববিদ্যালয়’। যদিও বলে রাখা ভালো, এক্ষেত্রেও মানুষের সঙ্গে প্রতিষ্ঠানের একটা মিল আছে, দু’জনই চরিত্র বদলাতে সক্ষমই নয়, পারঙ্গমও বটে! তো, এই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ১৯৭৩ সালের অধ্যাদেশ অনুযায়ী প্রতিষ্ঠান হিসেবে একটা বিশেষ বৈশিষ্ট্য লাভ করছিল। সেটি ছিল স্বায়ত্তশাসন। অর্থাৎ দেশের সংবিধানের প্রতি দায়বদ্ধ থেকে নিজস্ব শাসন কাঠামোয় ও নিয়ম-নীতিতে চলবে। এর উপাচার্য নিয়োগ থেকে শুরু করে অন্যান্য সব পরিচালনা পদ্ধতি হবে স্বাধীন। গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত সিন্ডিকেট, সিনেট এসব কর্মপদ্ধতি ঠিক করবে ও পরিচালনা করবে। আর এসবের মধ্য দিয়ে একটা বিশ্বমানের বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে উঠবে।
প্রতিষ্ঠানের নিয়ম-নীতি বা প্রক্রিয়ার বাস্তবায়ন দেখেই তার মেজাজ বোঝা যায়। বোঝা যায়, প্রতিষ্ঠানটি তার লক্ষ্য অনুযায়ী সুস্বাস্থ্য নিয়ে সামনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে কিনা। যেমন, একটা স্বায়ত্তশাসিত বিশ্ববিদ্যালয়ের সুস্বাস্থ্য নির্ভর করে তার প্রশাসনিক স্বাধীনতা আছে কিনা তার ওপর। আরও কয়েকটি বিষয় এক্ষেত্রে নির্ধারক, যেমন- বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনাকারীদের নির্বাচনে গণতন্ত্রের চর্চা, দল-মত নির্বিশেষে মত প্রকাশের স্বাধীনতা, বিভিন্ন দায়িত্বশীল পদে নিয়ম মেনে, যোগ্যতার মানদণ্ডে নিয়োগ প্রক্রিয়া, শিক্ষক নিয়োগ স্বচ্ছতা, অনিয়মমুক্ত ভর্তি প্রক্রিয়া, কার্যকর ছাত্র সংসদ, ছাত্র সংসদ নির্বাচনে গণতন্ত্র ও স্বচ্ছতা, শিক্ষার্থীদের গণতান্ত্রিকভাবে সংগঠন করার অধিকার ও মত প্রকাশের স্বাধীনতা, শিক্ষা কার্যক্রমে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি, শিক্ষকদের গবেষণা করার পর্যাপ্ত সুযোগ ও স্বাধীনতা ইত্যাদি।
উপরের বৈশিষ্ট্যগুলো যত সংকুচিত হবে, একটা প্রতিষ্ঠান শারীরিক ও মানসিকভাবে (অবকাঠামো ও চেতনাগত জায়গায়) ততই  দুর্বল হতে থাকবে। সেই বিবেচনায়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্যের হাল আসলে কতটা ভালো, প্রতিষ্ঠান হিসেবে কতটা সুস্থ তার মূল্যায়নের ভার পাঠকের ওপরেই না হয় থাক। আমার বিবেচনায়, খুব অল্প বয়সেই বুড়িয়ে যাচ্ছে বা গেছে আমাদের অনেকরই প্রিয় ও গুরুত্বপূর্ণ এই প্রতিষ্ঠানটি।
এ ধরনের আলোচনায় সব সময় একটা পক্ষ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অতীত ঐতিহ্যের ঢাল নিয়ে হাজির হয়ে যান। কিন্তু সেই ঢাল আমাদের কি বাঁচাতে পারবে শুধু তর্কের যুদ্ধে নিজেকে বোদ্ধা (?) প্রমাণ করা ছাড়া? অবশ্যই বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও মুক্তির ইতিহাসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গৌরবময় ভূমিকা আছে। কিন্তু স্বাধীনতা লাভের পর, এ  বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল কাজ ছিল বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষায় নেতৃত্বস্থানীয় ভূমিকা পালন করা। বিশ্ব আসরে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করা। কিন্তু বিশ্ব দূর, এশিয়ার সেরা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর তালিকায় নিজেকে নিয়ে যেতে ব্যর্থ হয়েছে। গুণগত শিক্ষার মানে স্বাধীনতা পূর্ববর্তী সময়ের চেয়ে পিছিয়ে পড়েছে কিনা, তা নিয়েও অনেক আলোচনা আছে। আমরা নিশ্চয়ই জানি বা অনেক দেখেছি স্বাস্থ্যের প্রতি যত্নবান না থাকার ফলে, স্বাস্থ্যবান অনেক মানুষও হঠাৎ করেই দুর্বল হয়ে পড়েন।
‘অতিকায় হস্তি লোপ পাইয়াছে, তেলাপোকা টিকিয়া আছে’। তো তেলাপোকা হইয়া টিকিয়া থাকার গৌরব কোথায়? পরিবেশবাদীরা হয়তো বলবেন, জীববৈচিত্র্যে সবারই গুরুত্ব আছে। কিন্তু এমন কি দুর্যোগ দেখা দিলো যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কেও অভিযোজন করে টিকে থাকতে হবে? সেটা আশাও করি না। সচলতায় বেঁচে থাকা যাবে হয়তো, কিন্তু জাতিগত স্বার্থ কি? আমাদের ভুলে গেলে চলবে না, জনগণের হাড়ভাঙা পরিশ্রমের টাকায় এরকম পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো চলে। তাই প্রতিটা টাকার সঠিক ব্যবহার হওয়া খুবই জরুরি। কারণ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বাস্থ্যের অবনতি হলে, তার প্রভাব পুরো জাতির ওপরেই পড়ে। একটা অসুস্থ প্রতিষ্ঠানের পক্ষে তো স্বাস্থ্যবান মানুষ বা জনশক্তি গড়ে তোলা সম্ভব নয়।
মানুষের থেকে প্রতিষ্ঠানের আয়ু বেশি। কারণ ব্যক্তি একা। আর প্রতিষ্ঠান অনেক মানুষের সমন্বয়ে কাজ করে। সবার আয়ু, সামর্থ্য যোগ হয় এখানে। কিন্তু ঝামেলাও আবার এখানেই। মানুষই ব্যক্তিস্বার্থ প্রতিষ্ঠানের স্বাতন্ত্র্যে আঘাত হানে। ক্ষতিগ্রস্ত হয় প্রতিষ্ঠান। তার স্বাস্থ্যের অবনতি ঘটে। ভাবার বোধ হয় সময় এসেছে, শতবর্ষে পা দেওয়া ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কি বুড়িয়ে গেছে বা যাচ্ছে? তার কি নবজন্ম দরকার?

লেখক: সহকারী অধ্যাপক, সাংবাদিকতা ও গণমাধ্যম অধ্যয়ন বিভাগ, স্টামফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ।

/এসএএস/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ