জনশক্তি খাত: নেপালের কাছে বাজার হারাবে বাংলাদেশ?

Send
সৈয়দ ইশতিয়াক রেজা
প্রকাশিত : ১৬:২৪, জুলাই ১৫, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১৬:২৬, জুলাই ১৫, ২০২০

সৈয়দ ইশতিয়াক রেজাবছর দুয়েক আগে পোল্যান্ডের রাজধানী ওয়ার্শ-তে এক বাংলাদেশির ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানে কথা হচ্ছিল সেখানকার শ্রমবাজার নিয়ে। কারণ তার আশেপাশে আমরা বেশ কিছু মঙ্গোলীয় চেহারার মানুষ দেখছিলাম বিভিন্ন কাজ করছে। আমার সঙ্গে ছিলেন দেশের আরও দুজন প্রথিতযশা সম্পাদক। সেই ব্যবসায়ী বললেন এরা নেপালের নাগরিক। এও জানালেন, বড় সংখ্যায়, বৈধ পথে এরা ঢুকছে ইউরোপের দেশগুলোতে। নিউ ইয়র্কের যে জ্যাকসন হাইটস-এ পথ চলতে ধাক্কা লাগে কোনও না কোনও বাংলাদেশির সঙ্গে, সেখানে এখন চোখে পড়ছে অনেক নেপালিকে। কাতারের দোহা, আরব আমিরাতের দুবাই, শারজাহ বা আবুধাবিতেও এখন নেপালি শ্রমিকের বড় উপস্থিতি।

এই প্রসঙ্গ তোলার কারণ হলো এই করোনাকালে বিদেশে আমাদের যে ভাবমূর্তি সৃষ্টি হয়েছে সে প্রসঙ্গে দু’একজনের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে। করোনাভাইরাস মহামারির মধ্যে কোরানা টেস্ট নিয়ে দুর্নীতি ও অনিয়ম, বিমানবন্দরে দুর্বল ব্যবস্থাপনা এবং করোনা সংক্রমণ প্রলম্বিত হওয়ার জের ধরে এই পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। ভুয়া কোভিড-১৯ নেগেটিভ রিপোর্ট বিক্রি হয়েছে এবং সেই রিপোর্ট নিয়ে আবার কিছু প্রবাসী বিদেশে গিয়ে কোভিড পজিটিভ হয়েছেন, তাদের বিদেশের বিমানবন্দরে অবতরণ করতে অনুমতি না দেওয়ায় আবার দেশে ফেরত আসতে হয়েছে। ঢাকা থেকে নেগেটিভ সনদ নিয়ে যাওয়া যাত্রীদের মধ্যে গন্তব্যে পৌঁছানোর পর পরীক্ষা করে করোনাভাইরাস পজিটিভ যাত্রী পাওয়ায় ঢাকার সঙ্গে ফ্লাইট চলাচল বন্ধের তালিকায় যোগ হয়েছে ইতালি। এর আগে জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া এবং চীনও ঢাকার সঙ্গে বিমান যোগাযোগ বন্ধ করে দিয়েছিল একই কারণে। আর ইউরোপীয় ইউনিয়ন বলে দিয়েছে শেনজেন ভিসা থাকলেও এই জোনে যারা ঢুকতে পারবে না যেসব দেশের নাগরিক, তাদের মধ্যে বাংলাদেশেও রয়েছে।
বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দার কবলে সব দেশ। এমন সময়ে ভুয়া রিপোর্টের কারণে বাংলাদেশের ভাবমূর্তিতে বিরূপ প্রভাব পড়ায় এর ফল ভোগ করবেন প্রবাসী শ্রমিকরা। যারা করোনার সময়ে ফিরেছেন, তারা এখন যেতে পারছেন না। অভিবাসীদের ক্ষেত্রে এটা বড় রকম হয়রানির অবস্থা তৈরি করছে। যেন আমরা বিচ্ছিন্ন হতে চলেছি সারা বিশ্ব থেকে।
করোনাকে মোকাবিলা করে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো তার অর্থনীতিকে সচল করার চেষ্টা করছে। বিদেশ থেকে কর্মী নেওয়ার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ এখন অসম প্রতিযোগিতায় পড়তে যাচ্ছে আগামী দিনগুলোতে। নেপাল, ভিয়েতনাম, ফিলিপিন্স আমাদের চেয়ে বেশি সফল হয়েছে করোনা সংক্রমণ ঠেকাতে। ফলে সেসব দেশের নাগরিকদের গ্রহণযোগ্যতা আমাদের চেয়ে বেশি থাকবে, এটাই বাজারের ধর্ম। তার মধ্যে যোগ হয়েছে এই ভুয়া করোনা নেগেটিভ সনদের বড় অভিযোগ।
এই করোনাকালে সবকিছু যখন আমাদের নিম্নমুখী, তখনও উচ্চহারে রেমিট্যান্স পাঠানো বজায় রেখেছেন প্রবাসী শ্রমিকরা। আমাদের ১৮ বিলিয়ন ডলারের রেমিট্যান্স আয় বজায় থাকবে কিনা সেই শঙ্কা দেখা দিয়েছে। প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের দেওয়া তথ্য মতে, বিশ্বের ১৬৯টি দেশে বাংলাদেশের ১ কোটি ২০ লাখের মতো শ্রমিক রয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৭৫ শতাংশই মধ্যপ্রাচ্যের ছয়টি দেশে থাকে। চলতি ২০১৯-২০২০ অর্থবছর শেষ হওয়ার আগেই দেখা গেছে প্রবাসী বাংলাদেশিরা এক হাজার ৭০৬ কোটি ডলার বা ১৭ দশমিক শূন্য ৬ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স হিসেবে প্রিয় মাতৃভূমিতে প্রেরণ করেছেন। বলা হচ্ছে, এটি বাংলাদেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ রেমিট্যান্স আহরণ। ১১ জুন কেন্দ্রীয় ব্যাংক এ তথ্য দিয়েছে। এমনটি হওয়ার পেছনে ২ শতাংশ প্রণোদনা প্রদানকেই যুক্তিযুক্ত মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
যে পোশাক খাত নিয়ে এত আয়োজন, রাষ্ট্রের তার প্রকৃত মূল্য সংযোজন কত, তা নিয়ে প্রশ্ন থাকলেও প্রণোদনা আর নীতি সুবিধার বন্যা কেবল তার জন্যই। এর সামান্যও নেই বিদেশের শ্রমবজারে যারা এই ব্যবসা করেন, তাদের জন্য। শ্রমিকদের বিদেশে পাঠানো নিয়ে অত্যাচারের যেসব কাহিনি আছে, সেগুলো সমাধান করার পাশাপাশি এই খাতকে নীতি সুবিধা দিয়ে একটা কাঠামোর মাঝে আনার দাবিটা অনেক দিনের।
মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে লকডাউনের পর যে শ্রমিকরা তাদের চাকরি হারিয়েছেন তারা সেসব ফেরত পাবেন কিনা, আবার যাদের চাকরি আছে তারা টিকে থাকতে পারবেন কিনা, সে সংশয়ের মাঝেই এই নতুন উৎপাত ভুয়া করোনা রিপোর্ট সার্টিফিকেট। করোনা রিপোর্টের বিশ্বমান অর্জন করতেই হবে, বিমানবন্দরের করোনা ব্যবস্থাপনা গ্রহণযোগ্য জায়গায় নিতেই হবে, এর কোনও বিকল্প নেই।
আমাদের ভাবতে হবে করোনাভাইরাস পরবর্তী পরিস্থিতিতে শ্রমবাজারের প্রকৃতি নিয়েও। সনাতনি নির্মাণ শ্রমিকের চাহিদা কমে আসবে। তবে স্বাস্থ্য সুরক্ষা ও পরিচ্ছন্নতা খাতে ভালো পরিমাণ শ্রমিকের চাহিদা তৈরি হবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। হাসপাতাল ও ক্লিনিকে নার্সের চাহিদা সৃষ্টি হবে। কিন্তু আমাদের নার্সিং সনদের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে বাইরের দেশে প্রশ্ন আছে। সারাদেশে সরকারি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে নার্সরা পাস করে বেকার জীবন কাটায়। এখানকার মানোন্নয়নে বাইরে একটা বাজার সৃষ্টি হতে পারে। মেডিক্যাল টেকনোলজিস্টের চাহিদাও সৃষ্টি হবে বলে আশা করা হচ্ছে। কিন্তু সবই নির্ভর করবে আমরা করোনা সংক্রমণ নেপাল, ভুটান, শ্রীলংকা বা ভিয়েতনামের মতো পর্যায়ে নামাতে পারছি কিনা বা ভুয়া রিপোর্ট দেওয়া বন্ধ করতে পেরেছে কিনা তার ওপর।
দক্ষ ও অদক্ষ বাংলাদেশি শ্রমিকদের মূল প্রতিদ্বন্দ্বী দেশগুলো হলো, ভারত, পাকিস্তান, ফিলিপাইন, শ্রীলংকা, ইন্দোনেশিয়া, সুদান এবং প্যালেস্টাইন, নেপাল ও ভিয়েতনাম। বিশেষ করে নেপাল শুধু মধ্যপ্রাচ্য নয়, উন্নত দেশগুলোতেও দক্ষ কর্মীর অভিবাসে আমাদের পেছনে ফেলছে। করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাব থেকে ভিয়েতনাম, নেপাল ও শ্রীলংকা সুরক্ষিত থাকায় তারা বিশ্ব শ্রমবাজার আয়ত্তে নিতে শুরু করেছে। যত দ্রুত সম্ভব অভিবাসীকর্মী প্রেরণে বাংলাদেশের ভাবনাটা জানা খুব প্রয়োজন।
লেখক: সাংবাদিক

 
/এমএমজে/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ