কালেরও সাধ্য নেই বঙ্গবন্ধুর অমরত্ব কেড়ে নেওয়ার

Send
আনিস আলমগীর
প্রকাশিত : ১৩:১২, আগস্ট ০৪, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১৩:১৪, আগস্ট ০৪, ২০২০

আনিস আলমগীরবহু গুণের অধিকারী না হলে কোনও লোক শীর্ষ স্থান অধিকার করতে পারেন না। ভারতের অর্থনীতির বিশিষ্ট শিক্ষক, লেখক ভবতোষ দত্ত ইসলামিয়া কলেজের শিক্ষক ছিলেন। তিনি তার ‘আট দশক’ নামক স্মৃতিকথার বইতে ১৯৪৬ সালের কলকাতা হিন্দু মুসলিম দাঙ্গার কথা উল্লেখ করে লিখেছেন, দাঙ্গার সময় মুসলমান ছাত্ররাই নাকি বিপদ সংকুল জায়গাগুলো তাদের পার করিয়ে দিতেন। ওই ছাত্রদের নাম বলতে গিয়ে তিনি বিশেষভাবে শেখ মুজিবুর রহমানের নাম উল্লেখ করেছেন। তিনি লিখেছেন, ‘এখানে কৃতজ্ঞচিত্তে স্মরণ করি ইসলামিয়া কলেজের সেইসব মুসলমান ছাত্রদের যাঁরা আমাদের সঙ্গে করে নিয়ে বিপজ্জনক এলাকাটা পার করে দিতেন। এইসব ছাত্রের একজনের নাম ছিল শেখ মুজিবুর রহমান।’ (পৃ. ১৭৭।)
অথচ শেখ মুজিব ছিলেন পাকিস্তান আন্দোলনের একনিষ্ঠ কর্মী। সম্প্রদায়ের দাবি মেটাতে গিয়ে পাকিস্তান আন্দোলনে শরিক হয়েছেন সত্য, তবে দাবি মেটাবার জন্য সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্ট করতে তারা রাজি ছিলেন না। ১৯৪৬ সালে মুসলিম লীগ ব্রিটিশের বিরুদ্ধে পাকিস্তানের দাবিতে ‘ডাইরেক্ট অ্যাকশন ডে’ ঘোষণা করে অথচ হিন্দু-মুসলিম উভয় সম্প্রদায় ভয়াবহ দাঙ্গা করলো ভুল সিদ্ধান্তের বশীভূত হয়ে।

১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গ মেনে নিলে সম্ভবত পূর্ববঙ্গের (বাংলাদেশ) মুসলমানেরা পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার জন্য এত মারমুখী অবস্থান গ্রহণ করতো না। পাকিস্তান সৃষ্টির আন্দোলনে এই অঞ্চলের মুসলমানেরা শুধু অগ্রণী ভূমিকা পালন করেনি, মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ পশ্চিমাঞ্চলে বাংলা ছাড়া কোথাও মুসলিম লীগ সরকার গঠন করতে পারেনি। বুঝাই যায় তাদের কতটা আবেগ পাকিস্তান রাষ্ট্রের সঙ্গে জড়িত এখানকার মুসলমানদের।

বঙ্গভঙ্গের জন্য ১৯০৫ সালে যে কলকাতার বুদ্ধিজীবী সমাজ অবিভক্তবাংলার প্রীতিতে নিজের জান দিতে চাইলেন তারাই ১৯৪৭ সালের বিভক্তিতে পৌরোহিত্য করলেন। শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জী তো প্রকাশ্যে ঘোষণা দিলেন ভারত ভাগ হোক বা না হোক তিনি ও তার হিন্দু মহাসভা বাংলার বিভক্তি দাবি করেন। ১৯৩৭ ও ১৯৪৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে হিন্দুরা বাংলার প্রিমিয়ার হতে পারেননি, কারণ বিধানসভার সদস্যদের মধ্যে সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্য ছিলেন মুসলমান।

১৯৩৭ সালে হিন্দু মহাসভা শেরে বাংলা ফজলুল হকের কৃষক প্রজাপার্টির সঙ্গে কোয়ালিশন সরকার গঠন করেন। তখন শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জী শেরে বাংলার মন্ত্রিসভার মন্ত্রী ছিলেন, কিন্তু ১৯৪৬ সালে শরৎচন্দ্র বসু, কিরণ শঙ্কর রায়, আবুল হাশেম, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী অখণ্ড বাংলা প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হন। কংগ্রেস, হিন্দু মহাসভা- কেউই যুক্ত বাংলার পক্ষে ছিলেন না।

পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর দুর্ভাগ্যজনকভাবে একটা বিষয় লক্ষ করা গেলো যে পশ্চিম পাকিস্তানিরা আচার-আচরণে পূর্ব পাকিস্তানের সঙ্গে ব্রিটিশের মতো ব্যবহার করছিল। ১৯৫৫ সাল থেকে বঙ্গবন্ধু গণপরিষদের সদস্য ছিলেন। তিনি গণপরিষদে এই আচরণের প্রতিবাদ জানিয়েছেন বারবার এবং হুঁশিয়ার করেছেন ভয়াবহ পরিণতির। বঙ্গবন্ধুর ‘কারাগারের রোজনামচা’ বইটিতে তিনি যেই পাকিস্তানের জন্য আন্দোলন করেছেন তার পরিণতি দেখে, তাকেই সেই রাষ্ট্র বারবার কারাবন্দি করার অসন্তোষ, আফসোস ফুটে উঠেছে।

লাহোর প্রস্তাবে এই উপমহাদেশের পূর্ব ও পশ্চিম প্রান্তে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চল নিয়ে দুটি রাষ্ট্র গঠনের প্রস্তাব ছিল, কিন্তু ১৯৪৬ সালের নির্বাচনে পর লেজিসলেটিভ কাউন্সিলের সদস্যদের দিল্লি অধিবেশনে এক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। একমাত্র ধর্ম-বিশ্বাস ছাড়া আর কোনও কিছুতে মিল নেই এমন দুটি জাতির একহাজার মাইল দূরে অবস্থান নিয়ে এক রাষ্ট্র গঠন খুবই কঠিন ব্যাপার। এই বিষয়টি মুসলিম লীগের কিছু নেতা উপলব্ধি করেছিলেন। তাই তারা পাকিস্তান রাষ্ট্রের গঠন ও যাত্রালগ্নেই পরিপূর্ণ আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসনের দাবি উত্থাপন করেছিলেন এবং মুসলিম লীগের সদস্য পদ বিতরণে কঠোরতা দেখে নিজেরা স্বতন্ত্র দল গঠনের কথা চিন্তা করেছিলেন।

তারা ১৫০ মোগলটুলিতে স্বতন্ত্র অফিস স্থাপন করে গণতান্ত্রিক কর্মীশিবির নামে স্বতন্ত্র ব্যানারে সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড শুরু করেছিলেন। এখানে নেতা ছিলেন শামসুল হক, শেখ মুজিব প্রমুখ। ১৯৪৯ সালে ২৩ জুন পুরান ঢাকার রোজ গার্ডেনে গণতান্ত্রিক কর্মী শিবিরের সম্মেলন হয়। সেই সম্মেলনে সভাপতিত্ব করেন আতাউর রহমান খান। মওলানা ভাসানীকে সভাপতি, আতাউর রহমান খানকে সহ-সভাপতি, শামসুল হককে সাধারণ সম্পাদক, শেখ মুজিবুর রহমানকে যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক করে আওয়ামী মুসলিম লীগ গঠন করা হয়।

১৯৫৩ সালে শামসুল হকের শারীরিক মানসিক সমস্যা দেখা দিলে যুগ্মসাধারণ সম্পাদক শেখ মুজিবুর রহমানকে সাধারণ সম্পাদক নিযুক্ত করা হয়। সেই থেকে একটানা ১৯৬৬ সাল পর্যন্ত শেখ মুজিবুর রহমান আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। ১৯৬৬ সালের ইডেন কাউন্সিলে তিনি সভাপতি নির্বাচিত হয়েছিলেন। ইডেন কাউন্সিলকে ছয় দফার কাউন্সিল বলা হয়, কারণ সেই কাউন্সিলে ছয় দফা উত্থাপন করা হয়েছিল এবং ছয় দফা সেই কাউন্সিলে বাঙালির মুক্তির সনদ হিসেবে গৃহীত হয়েছিল।

শেখ মুজিবুর রহমান ছিলেন নিয়মনিষ্ঠ মানুষ। তিনি ১৯৫৩ সাল থেকে ১৯৬৬ সাল পর্যন্ত খুবই শক্তভাবে সংগঠন গড়ে তুলেছিলেন, আর তিনি যখন বুঝলেন বাঙালির মুক্তির সনদ প্রদানের সময় হয়েছে, তখনই তিনি ছয় দফা পেশ করেন। তখন তার রাজনৈতিক গুরু হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী বেঁচে নেই। সোহরাওয়ার্দী পাকিস্তানের সংহতি বিনষ্ট হয় তেমন কিছু করতে উৎসাহ বোধ করতেন না। সুতরাং তিনি তার গুরুর জীবিতকালে স্বায়ত্তশাসনের কথাই শুধু বলতেন, কিন্তু তখন স্বায়ত্তশাসনের কোনও রূপরেখা দেননি। সোহরাওয়ার্দীর মৃত্যুর পরপরই ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট থেকে বের হয়ে শেখ মুজিব আওয়ামী লীগকে পুনর্জীবিত করেন এবং দুই বছরের মাথায় ছয় দফা পেশ করেন।

আইয়ুব খান ছয় দফা নিয়ে অস্ত্রের ভাষায় কথা বলার হুমকি দেন, গৃহযুদ্ধের হুমকি দেন। পাকিস্তানিরা অস্ত্রের ভাষায় কথা বলেছেন, গৃহযুদ্ধ করেছেন কিন্তু প্রতিপক্ষ হিসেবে যেই নেতার মোকাবিলা করেছেন সেই শেখ মুজিব এত দৃঢ় মনোভাবের নেতা ছিলেন যে তাকে সুচ পরিমাণ টলানো সম্ভব ছিল না।

১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর দেশ কাঙ্ক্ষিত বিজয় অর্জন করে, বঙ্গবন্ধু ১০ জানুয়ারি দেশে ফিরে আসেন। তিনি সর্বপ্রথম বাংলাদেশ থেকে ভারতীয় সৈন্য বিদায় করেন। জাপানে এখনও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে বিজয়ী আমেরিকান সৈন্যরা রয়েছে। বিজয়ী সেনারা সহজে জায়গা ছাড়ে না, কিন্তু বঙ্গবন্ধু এই বিষয়টি নিয়ে সতর্ক ছিলেন এবং তার ভারতীয় সেনার বিদায় প্রচেষ্টা সফল করেছিলেন। এই প্রসঙ্গে ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী মহীয়সী নারী ইন্দিরা গান্ধীর কথা উল্লেখ করতে হয়, তিনিও স্বাধীন বাংলাদেশে ভারতীয় সৈন্য রেখে তার মহত্ত্বকে কলুষিত করতে চাননি।

ভারতীয় সৈন্যদের বিদায় জানানোর পাশাপাশি বঙ্গবন্ধু আত্মনির্ভর একটি দেশ পুনর্গঠনের কাজ আরম্ভ করেছিলেন। যেই লোক নতুন দলগঠন করে সেই দল নিয়ে স্বাধীন হওয়া একটি দেশকে ২৩ বছরের মাথায় ভাগ করে নতুন একটি দেশে জন্ম দিতে পারেন; সেই নেতা দেশ পুনর্গঠনে সফল হবেন তা অবধারিত। কিন্তু প্রতিবিপ্লবীদের আঘাতে আঘাতে তার দেশ পুনর্গঠনের কাজ যেমন ব্যাহত হয়েছে তেমনি তিনি সপরিবারে প্রাণ হারিয়েছেন। তাকে খুন করা হয়েছে সত্য কিন্তু তাকে তার জনগণের হৃদয় থেকে মুছে দেওয়া সম্ভব হয়নি। সম্ভবত কালে সাধ্য নেইবঙ্গবন্ধুকে অমরত্বের আসনচ্যুত করার।

লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট, ইরাক ও আফগান যুদ্ধ-সংবাদসংগ্রহের জন্য খ্যাত।

[email protected]

/এসএএস/এমএমজে/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ