২০২০-এ বঙ্গবন্ধুর জীবন থেকে কী শিক্ষা নেবে ছাত্রলীগ

Send
স্বদেশ রায়
প্রকাশিত : ২০:১৩, আগস্ট ১৪, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ২০:৪৬, আগস্ট ১৪, ২০২০

স্বদেশ রায়ছাত্রলীগের জন্যে ১৫ আগস্ট কখনোই শুধু শোক পালনের জন্যে নয়। ১৫ আগস্ট ছাত্রলীগের জন্যে অবশ্যই হৃদয়ের গভীর থেকে শপথ নেওয়ার একটি দিন। বঙ্গবন্ধুর পবিত্র রক্তকে স্মরণে নিয়ে এদিন ছাত্রলীগের প্রতিটি কর্মীকে, নেতাকে দেশ ও জাতির জন্যে কল্যাণকর কাজে আত্মনিয়োগের শপথ নেওয়ার দিন। তাদের জন্যে ১৫ আগস্ট পালন হবে মূলত এ দিনটিতে দাঁড়িয়ে তারা যেন আগামী ১৫ আগস্ট অবধি দেশ ও জাতির জন্যে কী কী কাজ করবে, নিজেকে কীভাবে সংশোধন করবে তার একটি রূপরেখা দেয়। আর সেটাই যেন সারা বছর ধরে পালন করে।
বঙ্গবন্ধুর প্রতি শ্রদ্ধা জানানোর সব থেকে বড় উপায় হচ্ছে বঙ্গবন্ধুকে নিজের জীবনে ধারণ করা। বঙ্গবন্ধুর জীবনের সহস্র দিক আছে, যা বঙ্গবন্ধুর প্রতিটি পদক্ষেপ, প্রতিটি কাজের ভেতর দিয়ে প্রকাশিত হয়েছে। সেগুলোকে উপলব্ধি করে নিজ জীবনে ধারণ করাই বঙ্গবন্ধুর প্রতি সর্বোচ্চ শ্রদ্ধা জানানোর পথ। যেমন প্রথমে উপলব্ধি করা প্রয়োজন–কেন বঙ্গবন্ধুর জন্ম হয়েছিল আমাদের মাঝে। সাধারণ মানুষের থেকে সহস্রগুণ বা অসীম আকারের একটি মানুষের কেন জন্ম হয় একটি নরগোষ্ঠীতে বা মানব সমাজে? যুগে যুগে কেন এমনই কয়েকজন মানুষের জন্ম হয়? বাস্তবে আজও এর কোনও উত্তর খুঁজে পাওয়া যায়নি–কেন কয়েকজন এমন অতি মানবের জন্ম হয় মানব সমাজে। তবে তাদের জন্মের ভেতর দিয়ে কী ঘটে তা অবশ্য হাজার হাজার বছর ধরে আলোচিত হয়। এই অতিমানবদের কাজের ভেতর দিয়ে, চিন্তার ভেতর দিয়ে তাদের চরিত্রের গুণাবলির ভেতর দিয়েই বদলে যায় প্রথমে তিনি যে নরগোষ্ঠীতে বা যে সভ্যতায় জন্ম নেন ওই নরগোষ্ঠী বা ওই সভ্যতা। তারপরে তাঁরা ধীরে ধীরে হাজার বছর ব্যাপ্তি নিয়ে হয়ে ওঠেন সারা পৃথিবীর পরিবর্তনের নেতা। আমাদের বাঙালি জাতিগোষ্ঠীর  বা নৃগোষ্ঠীর সৌভাগ্য, আমাদের মধ্যে বঙ্গবন্ধুর মতো একজন অতিমানবের জন্ম হয়েছিল। পৃথিবীর সব নরগোষ্ঠীর এ সৌভাগ্য নেই।

বঙ্গবন্ধুর মতো অতিমানবদের জীবনই কিন্তু তাদের লেখা সব থেকে বড় বই। সেখান থেকেই সব থেকে বেশি পাঠ নিতে হয়। ছাত্রলীগ অর্থাৎ সেসব তরুণ-তরুণী যারা বঙ্গবন্ধুর আদর্শের অনুসারী হতে চায়। তাদের জন্যে তাই প্রথম পাঠ বঙ্গবন্ধুর জীবন। এখন প্রশ্ন আসতে পারে বঙ্গবন্ধুর জীবনের তো সহস্র দিক। এর থেকে প্রথম পাঠ হিসেবে কী গ্রহণ করবো? বঙ্গবন্ধুর আদর্শের অনুসারী হতে হলে প্রথমে নিজের জীবনে বঙ্গবন্ধুর জীবনকে প্রবাহিত করতে হবে। বঙ্গবন্ধুর জীবন নিজের জীবনে প্রবাহিত করা বাস্তবে একটি কঠিন বিপ্লব। বঙ্গবন্ধু রাষ্ট্র বিপ্লব ঘটিয়েছেন, সমাজ বিপ্লব ঘটিয়েছেন। তিনি পাকিস্তান নামক রাষ্ট্রে বিপ্লব ঘটিয়ে বাংলাদেশ সৃষ্টি করেছেন। তিনি পশ্চাৎপদ পাকিস্তানি চিন্তার সমাজে বিপ্লব ঘটিয়ে আধুনিক বাঙালি জাতির সমাজ সৃষ্টি করেছিলেন। আর এসব বিপ্লবের প্রতি পদক্ষেপে তিনি তাঁর নিজের জীবনে ঘটিয়েছেন বিপ্লব। নিজেকে প্রতিমুহূর্তে পরিবর্তন করা, নিজেকে ধীরে ধীরে উত্তরণ ঘটানো এবং এই উত্তরণ ঘটানোর ধারাকে প্রবহমান রাখাই ছিল তাঁর জীবন। বাস্তবে মানব সমাজের বিপ্লবকে বুঝতে হলে বঙ্গবন্ধু নিজ জীবনে যে বিপ্লব ঘটিয়েছিলেন সেটাকে আগে গভীরভাবে বোঝা দরকার। বঙ্গবন্ধুর জীবনের দিকে তাকালে আমরা রবীন্দ্রনাথের সারা জীবনের চিন্তার উত্তরণের যে ধারা তাঁর সাহিত্য ও দর্শনের ভেতর পাই, তেমনি প্রবহমান ধারা দেখা যায় বঙ্গবন্ধুর জীবনে। বঙ্গবন্ধুর আদর্শের অনুসারী হতে হলে প্রথমেই নিজের জীবনকে পরিবর্তনের প্রবহমান ধারায় আনতে হবে। অর্থাৎ প্রতিদিন নিজেকে ভালো করতে হবে, প্রতিদিনই চর্চার ভেতর দিয়ে নিজেকে উন্নত করতে হবে, প্রতিদিনই আত্মত্যাগের ভেতর দিয়ে নিজেকে মহতের পথে নিয়ে যেতে  হবে। বঙ্গবন্ধুর ৫৫ বছরের জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত খেয়াল করলে দেখা যাবে, তিনি প্রতি মুহূর্তে কাজের মাধ্যমে, চিন্তার মাধ্যমে নিজেকে এগিয়ে নিচ্ছেন, উচ্চতা থেকে আরও উচ্চতায় নিচ্ছেন নিজেকে। নিজের জীবনে এই বিপ্লব ঘটানোই হচ্ছে মানব জীবনের মূল ধর্ম। বঙ্গবন্ধু আমাদের ব্যক্তিজীবনে এই ধর্ম পালন শিখিয়ে গেছেন। নিজের জীবনে যদি প্রতিমুহূর্তে পরিবর্তন ঘটানো যায় তাহলে সে জীবন দিয়ে অবশ্যই পাশের মানুষের, দেশের মানুষের, সর্বোপরি পৃথিবীর মানুষের কল্যাণ করা যায়।  সে জীবনের মাধ্যমে প্রতিমুহূর্তে ঝুঁকি নেওয়া যায়। যেমন জীবনের প্রতিমুহূর্তে ঝুঁকি নিয়েছেন বঙ্গবন্ধু।

ছাত্রলীগের কর্মীরা বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত আত্মজীবনীসহ নানান বই পড়লে দেখতে পাবে, বঙ্গবন্ধু ১৯৪৬-এর ক্যালকাটা কিলিংয়ের সেই ভয়াবহ রাত্রে কিন্তু মোটেই ভয় পাচ্ছেন না। তিনি ওই রাতে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে একের পর এক মানুষকে উদ্ধার করছেন। তিনি ক্যালকাটা কিলিংয়ের পরে ছুটে চলে গেছেন বিহারের সেই দাঙ্গা উপদ্রুত এলাকায়। তখন ভারত জোড়া বড় বড় সব পৃথিবী বিখ্যাত নেতা। তারপরেও কিন্তু কাজের মাধ্যমে তাদের সঙ্গে, তাদের পাশে তরুণ শেখ মুজিবুর রহমান, একজন ছাত্র শেখ মুজিবুর রহমান স্থান করে নিচ্ছেন। এই ঝুঁকি নেওয়া, এই দায়িত্ব পালন, এই নিজেকে দুর্যোগে অনিবার্য করে তোলার ভেতর দিয়েই তিনি নিজেকে পরিবর্তন করছেন। বিপ্লব ঘটিয়েছিলেন নিজ জীবনে। বঙ্গবন্ধুর জীবন থেকে এই দুর্যোগে নিজকে দুর্যোগ প্রতিরোধে অনিবার্য করে তোলার শিক্ষা ছাত্রলীগকে নিতে হবে।

২০২০ সাল শুধু বাংলাদেশে নয়, সারা পৃথিবীতে একটি ভয়াবহ দুর্যোগের সময়। পৃথিবীজুড়ে এই দুর্যোগ বা বিশ্বমহামারিতে ছাত্রলীগকে বঙ্গবন্ধুর আদর্শের অনুসারী হতে হলে অবশ্যই বঙ্গবন্ধু যেমন তরুণবেলা থেকে যেকোনও দুর্যোগের সম্মুখ সারির যোদ্ধা হিসেবে কাজ করেছেন তেমনি ছাত্রলীগের প্রতিটি কর্মীকে এই ২০২০-এর বিশ্বমহামারির সম্মুখ সারির যোদ্ধা হতে হবে। ডাক্তার, নার্স ,মেডিকেল সহকারী, অন্যদিকে সাংবাদিক, পুলিশ, র‌্যাব ও সেনাবাহিনীর মতো ছাত্রলীগকেও এই বিশ্বমহামারিতে সম্মুখ সারির যোদ্ধা হতে হবে। এখানে সম্মুখ সারির যোদ্ধা হিসেবে ছাত্রলীগের অনেক কিছু করার আছে। কোভিড-১৯-এ তরুণদের মৃত্যুর ঝুঁকি নেই বললেই চলে। তাই ছাত্রলীগকে এই কোভিড-১৯-এ দেশের সাধারণ মানুষের, সিনিয়র সিটিজেনদের সাহায্যর জন্যে ফ্রন্টলাইনের যোদ্ধার মতো প্রতিটি শহরের প্রতিটি ওয়ার্ডে বাহিনী তৈরি করতে হবে। সিটি করপোরেশন আছে, পুলিশ আছে, তারপরেও মানুষের সহযোগিতায় তাদের এগিয়ে যেতে হবে। চীনের কমিউনিস্ট পার্টির কর্মীরা বা তাদের তরুণ ছেলেমেয়েরা যেমন প্রতিটি বাড়িতে বাড়িতে গিয়ে তাদের কী প্রয়োজন, সিনিয়র সিটিজেনদের কী সাহায্য প্রয়োজন সেগুলো জোগান দিয়েছে। ছাত্রলীগের ছেলেমেয়েদেরও তেমনি গ্রুপ সৃষ্টি  করে এ কাজ করতে হবে। কারণ, আমরা প্রতিদিন স্বাভাবিক কাজে ফিরে যাচ্ছি ঠিকই কিন্তু এটাও ঠিক পঞ্চাশোর্ধ্ব যত নাগরিক অসুস্থ, ষাটোর্ধ্ব যত সিনিয়র সিটিজেন তাদের পক্ষে এখনই স্বাভাবিক জীবনে আসা সম্ভব হচ্ছে না। তাছাড়া এই শহরে অনেক সিনিয়র সিটিজেন আছেন, যাদের কাছে তাদের সন্তানরা নেই। এদের দায়িত্ব যেন ছাত্রলীগের ছেলেমেয়েরা কাঁধে তুলে নিতে পারে। তাদের কখন কী প্রয়োজন, তাদের কী চিকিৎসা প্রয়োজন সে জন্যে ডাক্তারের সঙ্গে যোগাযোগ করা, এমন কাজগুলো তারা করে দিতে পারে। আর এগুলো করাই তাদের জন্যে প্রয়োজন ২০২০ সালে বঙ্গবন্ধুর আদর্শ অনুসরণ।

এরপরে কোভিড ১৯ থেকে মুক্তি ও টিকা আবিষ্কারের পরে টিকা প্রয়োগ প্রভৃতির জন্যে সারা পৃথিবী কোভিড-১৯ পরীক্ষার কুইক টেস্ট পদ্ধতিতে যাচ্ছে। ইতোমধ্যে বিল গেটস বলেছেন, আমেরিকা ৪৮ ঘণ্টা সময় নিয়ে যে টেস্ট করছে তা শুধু অর্থের অপচয় মাত্র। প্রতিবেশী দেশ ভারতের ভাইরোলজিস্টদের অনেকে মনে করছেন, এখন প্রয়োজন কুইক টেস্ট। পৃথিবী যদি কোভিড-১৯-এর কুইক টেস্টে যায় তাহলে বাংলাদেশও তার বাইরে থাকবে না। আর সে সময়ে এই ১৭ কোটি মানুষের টেস্টের জন্যে প্রয়োজন হবে অনেক বড় জনবল। কুইক টেস্ট পদ্ধতিতে রক্ত সংগ্রহসহ নানান কাজ ছাত্রলীগের ছেলেমেয়েরা করতে পারবে। সেজন্যে প্রয়োজনে তারা সাত দশ দিনের একটি ট্রেনিং নিয়ে নেবে। তাদের পূর্বসূরিরা যদি দেশকে মুক্ত করার জন্যে দ্রুত গেরিলা ট্রেনিং নিয়ে পেশাদার পাকিস্তানি সৈন্যের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে পারে  তাহলে তারা কেন দেশের মানুষকে রক্ষা করার জন্যে এটুকু মেডিক্যাল ট্রেনিং নিয়ে কাজ করতে পারবে না। আর যেকোনও যুদ্ধকালীন অবস্থায় তরুণ-তরুণীরা যেকোনও ধরনের ট্রেনিং নিয়ে দেশের প্রয়োজনে, মানুষের প্রয়োজনে এগিয়ে আসে। তাই বিশ্বমহামারিকালে বাংলাদেশের তরুণ-তরুণীদেরও এ কাজে নেমে আসতে হবে। আর ছাত্রলীগ যেহেতু বঙ্গবন্ধুর আদর্শকে ধারণ করে, তাই তাদের প্রথমে এ কাজে নেমে পথ দেখাতে হবে।

এরপরে আছে অর্থনৈতিক মন্দা। কোভিডের কারণে ইতোমধ্যে অর্থনৈতিক মন্দা শুরু হয়ে গেছে। দেশের নানান শ্রেণির মানুষের নানান ধরনের অসুবিধা শুরু হয়ে গেছে। এ অবস্থায় সরকারকে এটা মোকাবিলা করার জন্যে সবার আগে প্রয়োজন সঠিক তথ্য। বাস্তবে দেশের কোনও শ্রেণির মানুষ কী কী সমস্যায় পড়েছে, তাদের কতজনের কোন স্থানে অবস্থান- এমনি সব তথ্য এখন সরকারের প্রয়োজন। আর এই সঠিক তথ্য হলেই সরকার সমস্যা থেকে উত্তরণের সঠিক পথ খুঁজে পাবে। এক্ষেত্রে ছাত্রলীগ অনেক বড় ভূমিকা পালন করতে পারে। তারা নানান বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির, পরিসংখ্যানেরসহ এই কাজের সঙ্গে সঙ্গতি আছে এমন শিক্ষকদের নিয়ে গড়ে তুলতে পারে দেশব্যাপী অর্থনৈতিক মন্দার চিত্র জরিপের কর্মী বাহিনী। তাদের স্বল্প সময়ের মধ্যে শিক্ষকদের মাধ্যমে ট্রেনিং নেওয়ার ব্যবস্থা করতে পারে। এরপরে এই বিশাল কর্মী বাহিনী দিয়ে গোটা বাংলাদেশের প্রকৃত তথ্য তারা তুলে আনতে  পারবে একেবারে বাস্তবভূমিতে গিয়ে। মানুষের কাছে গিয়ে। ছাত্রলীগের তরুণরা এ প্রজন্মের সন্তান, তারা জানে আজকের পৃথিবীতে সব থেকে বড় সম্পদ হচ্ছে প্রকৃত তথ্য। সরকার যদি তার দেশের একেবারে প্রত্যন্ত এলাকা থেকে শুরু করে শহরের প্রতিটি গলির প্রকৃত তথ্য পায় তাহলে এই বিশ্বমহামারিকালের অর্থনৈতিক মন্দা কাটিয়ে উঠতে তার আর কোনও অসুবিধা থাকবে না। কারণ, কোনও মন্দা কাটানোর মূল বিষয় কিন্তু অর্থ নয়। মূল বিষয় হচ্ছে সঠিক তথ্য ও সঠিক পরিকল্পনা। সরকার সঠিক তথ্য পেলে নিশ্চয়ই সঠিক পরিকল্পনা গ্রহণ করতে পারবে। আর উপরোল্লিখিত কাজটি মোটেই একটি বড় যুদ্ধকালীন কাজের থেকে কম নয়। তাই এই ২০২০-এর বিশ্বমহামারিকালে ছাত্রলীগ হতে পারে এর থেকে উত্তরণের বড় যোদ্ধা। আর বঙ্গবন্ধুর আদর্শ, তাঁর নীতি, তার জীবনাচরণ বলে দেয় তাঁকে অনুসরণ করতে হলে এই ২০২০ সালের তরুণ-তরুণীদের এমন কাজগুলোই এখন দেশের জন্যে করতে হবে। 

লেখক: রাষ্ট্রীয় পদকপ্রাপ্ত সাংবাদিক

/এসএএস/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ