ভরসায় তারুণ্য

Send
তুষার আবদুল্লাহ
প্রকাশিত : ১৭:৫৬, আগস্ট ১৭, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১৭:৫৮, আগস্ট ১৭, ২০২০

তুষার আবদুল্লাহসবচেয়ে স্বচ্ছন্দে থাকি কৈশোর, তারুণ্যের সঙ্গে। ওরা পুরাতন নয়। প্রতিদিন আনকোরা রোদ ওঠে ওদের স্বপ্নের আকাশে। ওরা পৃথিবীকে দেখে বহু কৌণিকভাবে। যেটা গড়পড়তা মধ্য বয়সী ও প্রবীণ মানুষেরা দেখতে পান না। সমাজে বরাবরই অল্পকজন মানুষ থাকেন যারা নব্বইতেও দশ কোণের দিকে তীক্ষ্ণ নজর রাখেন। ব্যাকুল থাকেন নতুন রঙের জন্য। ঢাকায় যতক্ষণ থাকি ততক্ষণ তরুণ আবৃত হয়েই থাকি। এখানকার তরুণদের সঙ্গে গ্রাম বা মফস্বল শহরের তরুণদের তফাত আছে। ঢাকার তরুণরা যতটা স্বার্থের কাছাকাছি থাকে, গ্রামের তরুণেরা অতটা নয়। কৈশোরকেই শহর নানা স্বার্থের হিসাব কষতে বসিয়ে দেয়। কোমলসম্ভার বা সফটওয়্যারের ছাঁচে গড়া তাদের আগামী। তাই তাদের ভাবনা অনেকটাই আত্মকেন্দ্রিক। সেই তুলনায় গ্রামের তরুণেরা এখনও অনেকটা বেহিসাবি। তারা ব্যক্তিকেন্দ্রিক হতে পারেনি। এখনও তাদের স্বপ্ন পরের তরে।
প্রায় আধেক বছর পর ঢাকার বাইরে পা রাখলাম। ঢাকার প্রান্ত পার হতেই প্রকৃতির শারদীয় অভ্যর্থনা। আসমানে মেঘ রোদ্দুরের জারদৌসির বুনন। দুইদিকের জলাশয়, পাট, ধনচের জলজ জমিন, প্রাচীন বৃক্ষের ডালে ডালে কৈশোরের উচ্ছ্লতা। ছেলেতে মেয়েতে নৌকা বেয়ে চলা, ছিপ ফেলে মাছ ধরার কী অনিন্দ্য দৃশ্যকাব্য।


কখনও রোদের মাঝেই বৃষ্টি পড়ছে। বৃষ্টিসুতো। খাল থেকে আসছে পাট পচিয়ে রাখার সৌরভ। তারই মাঝে চাঁদমালা ফুলের হাসি। সেই হাসিতে সাড়া দিতে নেমে পড়ি চায়ের তৃষ্ণা মেটাতে। চায়ের ছুঁতোয় দেখা এলাকার তরুণদের সঙ্গে। কত কথা ওদের। গ্রামের পরিবেশ নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। গ্রামে জমিন ফুঁড়ে বের হচ্ছে বড়লোক। তারা ফসলের জমিন নষ্ট করছে, হত্যা করছি নদী। মন্দ ব্যবসা, মন্দ রাজনীতি বানের জলের মতো ঢুকে পড়ছে। গ্রামের জীবন ষোলআনা সহজ ছিল না কখনও। ১/২ আনা জটিলতা ছিল বরাবরই। এখন সেটা ষোলাআনায় পূর্ণ হওয়ার পথে। গ্রাম, মফস্বলের রাজনীতিটা পোকায় খেয়ে বসে আছে। গ্রামের মানুষদের এখন রাজনীতিতে অধিকার নেই। নষ্ট টাকার মালিকদের হাতের রিমোট এখন রাজনীতি। ভিজিএফ-এর কার্ড গ্রামে গ্রামে না পৌঁছালেও সাম্প্রদায়িকতা তারা ঠিক বিতরণ করে চলেছেন।


তরুণরা নেতাসর্বস্ব রাজনৈতিক ব্যানার দেখতে চান না। তারা ব্যানারে আদর্শিক শ্লোগান ফিরিয়ে আনতে চান। এই মত সকল আদর্শে বিশ্বাসী তরুণদের। তারা বলছেন, রাজনীতি থেকে শ্লোগান উড়ে গেছে। এখনকার মাঠের রাজনীতি মোটরসাইকেল গর্জনের। যে তরুণ সেই মটরসাইকেলের সওয়ার হচ্ছেন তারও পছন্দ নয় এমন রাজনীতি। কিন্তু কচুরিপানার মতো স্রোতের সঙ্গে অনিচ্ছুক ভেসে চলা। এই ভেসে চলা জীবন থেকে ঘুরে দাঁড়াতে চান। কিন্তু স্থানীয়ভাবে, তৃণমূলে নেতৃত্ব তৈরির পরিবেশ নেই এখন আর। ইউনিয়নের চেয়ারম্যানও শহর থেকে বিলাসবহুল গাড়িতে আসেন। তৃণমূলের নেতাদের নিজেদের অধিকার বুঝে নিতে জীবনবাজি রেখে লড়াইতে নামতে হচ্ছে। গ্রামের কোনও একটি তরুণকে মনে হলো না তারা রাজনীতিবিমুখ। রাজনীতি তারা করবেন, কলেজে বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র সংসদ সচল হওয়ার দাবিও তাদের। তারা মনে করেন, দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা এই অনুশীলন কক্ষ পুনরায় চালু হতে গিয়ে কিছু অসঙ্গতি থাকতেই পারে। কিন্তু সেটি সাময়িক। আগের রূপ ফিরে যেতেও কিছু সময় খরচ করার প্রয়োজন আছে। 


একইভাবে তরুণরা মফস্বল শহর, গ্রামে আবার সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোকে সক্রিয় দেখতে চান। কোনও কোনও গ্রামে, শহরে এরই মধ্যে দেখলাম তরুণরা নিজ উদ্যোগে পাঠাগার তৈরি করেছেন। নিজ ভিটা ছেড়ে দিয়েছেন পাঠাগারের জন্য। আবৃত্তি ও নাট্য সংগঠনগুলোতে প্রাণ সঞ্চারে মাঠে নেমে পড়েছে ছেলেমেয়েরা। সংকট শুধু পৃষ্ঠপোষকের। কোথাও কোথাও স্থানীয়
জনপ্রতিনিধিরা পাশে দাঁড়াচ্ছেন। যেমন নবীনগরের পৌর মেয়রকে পাওয়া গেলো। তার পৃষ্ঠপোষকতায় আবৃত্তি চর্চা শুরু হয়েছে তিতাস পাড়ের এই সংস্কৃতি শহরটিতে। নবীনগরেই একজন মা’কে পাওয়া গেলো যিনি নিজের ভিটে বাড়ি দান করে দিয়েছেন ছেলের স্বপ্নের পাঠাগারের জন্য। মুগ্ধ হয়েছি স্বপনের গুঞ্জন পাঠাগার দেখে।


দেখা হলো অনেক তরুণের সঙ্গে, যারা ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে লেখাপড়া বা চাকরি করছেন। কিন্তু সময় পেলেই ছুটে আসছেন, নবীনগরকে নতুনভাবে সাজাতে। নবীনগর ছেড়ে যখন ফিরে আসছিলাম শারদীয়ার রূপ মুগ্ধ হয়ে, মন জুড়ে তখন স্বপ্নের সাম্পান। যেই সাম্পান বয়ে নিয়ে চলছে নবীনগরের তরুণরা। শুধু নবীনগর কেন? দেশের সকল গ্রাম শহর সাজানোর দায়িত্বটি তরুণদের হাতে তুলে দিচ্ছি না কেন আমরা, আমি তো ভরসা পাচ্ছি। বাংলাদেশকে তরুণদের ওপর ভরসা রাখতে হবেই।

 

লেখক: বার্তা প্রধান, সময় টিভি

 

/এসএএস/এমএমজে/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ