বেগমগঞ্জের ভয়াবহতা এবং একজন সেলিব্রেটির বিয়ে

Send
নাজনীন মুন্নী
প্রকাশিত : ১৭:১৭, অক্টোবর ১০, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১৭:১৮, অক্টোবর ১০, ২০২০

নাজনীন মুন্নীবেগমগঞ্জের নারীটি ধর্ষণের শিকার হয়েছে কখন জানেন? যে সময় থেকে সে একা থাকা শুরু করেছে। বয়সে বড়রা তো বটেই, তার চেয়ে ১০ থেকে ১৫ বছরের ছোটরাও ভাবতে শুরু করেছিল–এই নারীকে ‘ভোগ’ করা সম্ভব! ঘটনার শুরু সেখানেই।
কোনও নারীর একা থাকা মানেই খারাপ, সে সবার। তাকে ‘খারাপ মেয়ে’ তকমা দেওয়া যায়। ধর্ষণের হুমকি দেওয়া যায়, রাত-দুপুরে দলবেঁধে ঘরে ঢুকে যাওয়া যায়। নারীর ‘সতী’ থাকতে হলে ঘরে একজন পুরুষ রাখতেই হবে। পুরুষ হলো ‘সতীত্বে’র সাইনবোর্ড। তো ধরেন, সেই সাইনবোর্ড নিজে খারাপ মানুষ। একজন সংসারী মানুষ হওয়া দায়িত্ববান, ভালোবাসার আস্থা তৈরি করে মায়া দিয়ে পরিবারকে জড়িয়ে রাখা–এসবে তার কিছু যায় আসে না।
এমন মানুষের সঙ্গে কতদিন থাকবেন? ধরা যাক, আপনাকে সে নির্যাতন করে, আপনার চাওয়া না চাওয়ার কোনও মূল্য নেই তার কাছে। আপনি বুঝতে পারেন হাজার মেয়ের সঙ্গে একসঙ্গে সম্পর্ক; তারপরও ‘সতী’ থাকার জন্য এই সাইনবোর্ড কি ঝুলিয়ে রাখবেন? কতদিন?



আপনি সাহসী হলেন, ভাবলেন এরচেয়ে একা জীবন ভালো। কিন্তু তখন থেকে শুরু হবে আপনার মূল যুদ্ধ। আপনি কারও সঙ্গে মিশতে পারবেন না, যেকোনও আনন্দ-উৎসব হয়ে যাবে নিষিদ্ধ। কারণ আপনার সাইনবোর্ড নেই, আপনি খারাপ। আপনি একা থাকেন, তাই চরিত্রের দোষ আছে।




কোথায় যাবেন আপনি? ভাবলেন বিয়ে করবেন আবার। এবার হয়তো একজন মানুষ পাবেন বর হিসেবে। আপনাকে নিয়ে কথা বলা বন্ধ হবে। কিন্তু বিয়ে করার পর নিশ্চিন্তে থাকবেন কি? বিয়ের দিন থেকে নাম হবে ‘পুরুষ খেকো’! যাদের কষ্ট হচ্ছিল একা থাকা নিয়ে, যারা চরিত্রহীন বলছিল, তারাই রামদা নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে প্রশ্ন করবে–কেন বিয়ে করলেন? 

পুরুষ একসঙ্গে চারটা বিয়ে কিংবা পঞ্চাশটা উপপত্নী রাখতে পারবেন, কিন্তু মেয়ে হয়ে কেউ দ্বিতীয়বার বিয়ে করতে পারবেন না? 

তাহলে কী করবে? একাও থাকতে পারবে না, দ্বিতীয়বার বিয়ে করতে পারবে না। 

যারা এত কথা বলেন, তারা আসলে কী চায়? একজন মানুষ কার সঙ্গে জীবন কাটাবে, কেমন হবে সেই জীবনসঙ্গী–তার মতো করে কেন সে বাছাই করতে পারবে না? 
আমার তো মনে হয় সতীদাহ প্রথা চালু করতে পারলে এক শ্রেণির মানুষ আরাম পেতেন। ছাড়াছাড়ি হলে বা বিধবা হলে পুড়িয়ে মেরে ফেলো। একটা মেয়ের জীবন-যাপন কিংবা তার বেঁচে থাকা নিয়ে এত মাথা ব্যথা কেন অনেকের? আবার তাদের মধ্যে অনেকেই বলছেন ধর্ষণ কমার কথা! যে মানুষটি কোনও মেয়েকে সম্মান করা শুরুই করতে পারে না; সে তার চূড়ান্ত অসম্মান নিয়ে বিদ্রোহী হবে–এমনটা আমি ভাবি না অন্তত। 

জানেন তো, ধর্ষণের চিন্তা মাথা থেকেই শুরু হয়। বিশ্বাস করুন, বেঁচে থাকতে যা যা লাগে একজন নারীরও ঠিক তাই-ই লাগে। নিজের মতো বেঁচে থাকার অধিকার আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন দিয়েছে সবাইকে। কারও নিজের মতো বেঁচে থাকার স্বাধীনতা আপনার কথার ছুরি চালিয়ে নষ্ট করবেন না। এই আপনি, আপনাদের কথার ভয়ে মানুষ বেঁচে থাকা ভুলে যাচ্ছে। মানুষকে বাঁচতে দিন, তার মতো করে। 

লেখক: সাংবাদিক ও উপস্থাপক

 

/এসএএস/এমএমজে/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ