এইখানে এক নদী ছিল

Send
রেজানুর রহমান
প্রকাশিত : ১৪:৪৩, অক্টোবর ২০, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১৪:৪৪, অক্টোবর ২০, ২০২০

রেজানুর রহমানবাংলাদেশকে নদীর দেশ বলা হয়। সে কারণেই একাত্তর সালে মহান স্বাধীনতা যুদ্ধ চলাকালে মুক্তি পাগল বাঙালির মুখে শ্লোগান উঠেছিল, ‘তোমার আমার ঠিকানা, পদ্মা, মেঘনা, যমুনা’। সেই নদী মরে যাচ্ছে। পদ্মা, মেঘনা, যমুনার ক্ষেত্রে হয়তো একথা খাটে না। কিন্তু অন্য নদীর ক্ষেত্রে কথাটা খুবই সত্য। বেশি না ১০ বছর আগে যে নদী ছিল খরস্রোতা, সেই নদীর অস্তিত্ব এখন নেই বললে চলে। অনেক নদী হয়ে উঠেছে শুধুই ইতিহাসের অংশ। গল্পের মতো–এইখানে এক নদী ছিল। এখন নাই! কী সাংঘাতিক কথা। এক একটি খরস্রোতা নদী হঠাৎ হাওয়া যাচ্ছে! নদী মরে যাচ্ছে। নদীর মরে যাওয়ার বিষয়টিকে এখন হয়তো আমাদের কাছে কিছুই মনে হচ্ছে না। কিন্তু যতই দিন যাবে আমরা হাড়ে হাড়ে টের পাবো যে এক একটি নদীর মরে যাওয়ার ক্ষেত্রে প্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশ প্রাকৃতিকগতভাবে কতটা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। ভাবুন তো একবার, এই দেশে নদী নাই। শুধুই সমতল ভূমি। ঝড়, বন্যায় দেশটা কীভাবে নিজেকে রক্ষা করবে? নদী মরে যাওয়া মানেই কিন্তু একটি দেশেরও মরে যাওয়া। তা কি আমরা টের পাচ্ছি? নাকি টের পেয়েও গুরুত্ব দিচ্ছি না?

প্রসঙ্গক্রমে একটি প্রচলিত গল্প শোনাই। গভীর রাতে চোর এক গেরস্তবাড়িতে চুরি করতে ঢুকেছে। গেরস্ত চোরের উপস্থিতি টের পেলেও অলসতার কারণে কোনও টুঁ শব্দ করছে না। টুঁ শব্দ করলেই তার ঘুম ভেঙে যাবে, এই কারণে ঘুমিয়ে ঘুমিয়েই চোরের চুরি করা দেখলো। পরের দিন ঘটনা তদন্তে এসে পুলিশ তাকে জিজ্ঞেস করলো–চোর কী আপনার সামনেই চুরি করলো? গেরস্তের উত্তর–হ্যাঁ। পুলিশ অবাক হয়ে প্রশ্ন করলো–আপনি চোরকে কিছুই বললেন না? গেরস্ত বিরক্ত হয়ে বললো, আরে ভাই আমি তো অপেক্ষা করছিলাম চোর কী করে তা দেখার জন্য...

দেশজুড়ে নদী মারা যাবার ঘটনার সঙ্গে এই গল্পের কোথায় যেন একটা মিল খুঁজে পাচ্ছি! প্রতি মাসে, প্রতি বছরে দেশের কোথাও না কোথাও নদী দখল হয়ে যাচ্ছে, নদী ভরাট করে বসত বাড়ি, কলকারখানাসহ নানা ধরনের প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠছে। কোথাও কোথাও প্রতিরোধ গড়ে উঠলেও কার্যত প্রতিরোধগুলো শেষ পর্যন্ত গতি পাচ্ছে না। রাজধানী ঢাকা শহরের কথাই যদি বলি। একদা ঢাকার বুকে ৬৪টি ছোট বড় খাল ছিল। ধোলাই খাল তার অন্যতম উদাহরণ। এখন এলাকার নামে আছে ধোলাইখাল। কিন্তু বাস্তবে খালটির কোনোই অস্তিত্ব নেই। মতিঝিল এলাকায় বাংলাদেশ ব্যাংকের পেছনে একদা একটি বড় খালে নৌকা যাতায়াত করতো। এখন সেই খালের অস্তিত্বই নাই। ঢাকার পান্থপথ এলাকার বিস্তৃত জায়গাজুড়ে ছিল শুধু পানি আর পানি। এখন এই গল্প বললে অনেকেই তা বিশ্বাস করতে চাইবে না। পাঠ্যপুস্তকে পড়ানো হয়, ঢাকা বুড়িগঙ্গার তীরে অবস্থিত। দখল ও দূষণে সেই বুড়িগঙ্গার কাহিল অবস্থা। 

মনে পড়ে ৩০ বছর আগের কথা। তখন আমি দৈনিক ইত্তেফাকের রিপোর্টার। পবিত্র রমজান মাস। কামরাঙ্গীরচর এলাকায় একটি জনসভার রিপোর্ট সংগ্রহ করতে গিয়েছিলাম। ফেরার পথে নৌকায় বুড়িগঙ্গা পার হওয়ার সময়ই ইফতারের সময় হয়ে যায়। তখনকার দিনে বোতলজাত পানির সরবরাহ ছিল না। বুড়িগঙ্গার পানি মুখে দিয়েই ইফতার সেরেছিলাম। আজকের দিনে এই গল্প কি বিশ্বাসযোগ্য? কিছুদিন আগে নৌকায় বুড়িগঙ্গা পার হয়েছি। বুড়িগঙ্গার পানির দুর্গন্ধে টেকা দায় হয়ে দাঁড়িয়েছিল। প্রতিদিনই এভাবেই নাক চেপে ধরে মানুষজন বুড়িগঙ্গা পার হচ্ছে। একটি নদীর জন্য কষ্ট পাচ্ছে অনেকে। কিন্তু মুখ ফুটে প্রতিবাদ করছেন না কেউই। বুড়িগঙ্গা পার হতে গিয়ে দেখলাম নদী তীরে ভাসছে প্লাস্টিক ও পয়োবর্জ্য। প্রকাশ্যে ধোয়া হচ্ছে নোংরা পলিথিন। বুড়িগঙ্গায় মিশে মিশে কালো পানি দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে। এই পানিতেই গোসল সেরে নিচ্ছে অনেকে। নোংরা পলিথিন পরিষ্কার করছিল যারা তাদেরকে জিজ্ঞেস করলাম, নদীর পানিতে এইভাবে নোংরা ছড়াচ্ছেন কেন? মনে হলো প্রশ্নটি করে মারাত্মক কোনও অন্যায় করে ফেলেছি। শ্রমিকদের একজন তুচ্ছ-তাচ্ছিল্যের ভঙ্গিতে বললো, আপনি কে? জ্ঞান দিয়েন না। নিজের কাজে যান!

প্রিয় পাঠক, বিনীতভাবেই বলছি কাউকে জ্ঞান দেওয়ার যোগ্যতা আমার নেই। দেশের একজন সাধারণ নাগরিক হিসেবে কিছু প্রশ্নের উত্তর খুঁজে পাচ্ছি না। ঢাকার ৬৪টি খাল কোথায় গেলো? খাল ভরাট করে আকাশচুম্বী ইমারত, মিল ফ্যাক্টরি যারা বানালো তারা কি আইন মেনেই কাজগুলো করেছে? যদি তারা আইন না মেনেই থাকে, তাহলে তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নিতে অন্তরায় কোথায়? ইদানীং সামান্য বৃষ্টিতে ঢাকার রাস্তাঘাট তলিয়ে যায়। এর কি কোনও প্রতিকার নেই? ঢাকাকে তিলোত্তমা নগরী হিসেবে সাজানোর কতই না পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। কিন্তু সব পরিকল্পনাই ভেস্তে যাবে যদি না রাজধানী ঢাকার খালগুলো দখলমুক্ত না হয়। 

শুধু ঢাকার কথাই বা বলছি কেন? দেশের সর্বত্র একই অবস্থা! অতি সম্প্রতি সামান্য বৃষ্টিতেই রংপুর শহর ডুবে গিয়েছিল। বলা হচ্ছে গত ১০০ বছরেও রংপুর শহর এমন জলাবদ্ধতার কবলে পড়েনি। কিন্তু এর কারণ কী? পানি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ঢাকার মতো রংপুর শহরেও একাধিক খাল ও নদী অবৈধভাবে ভরাট করে বিভিন্ন স্থাপনা দাঁড় করানো হয়েছে। ফলে বৃষ্টির পানির প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হয়ে শহরকে জলমগ্ন করে তুলেছিল। অচিরেই যদি এই শহরের খাল ও নদী অবৈধ দখলদারের হাত থেকে মুক্ত করা না যায় তাহলে অতি বর্ষায় রংপুর শহর আবারও জলমগ্ন হয়ে উঠবে। বিশেষজ্ঞদের মতে, রংপুরের মতো দেশের অনেক শহরের পরিস্থিতি ভালো নয়। খাল, নদী দখল ও দূষণের মাত্রা বেড়ে যাওয়ায় খাল, নদী মরে যাচ্ছে। ফলে দিনে দিনে দেশের প্রাকৃতিক ভারসাম্য নাজুক হয়ে যাচ্ছে! 

পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে প্লাস্টিক ও পয়োবর্জ‌্যের কারণে দেশের অধিকাংশ নদী দূষণে আক্রান্ত। অতি সম্প্রতি কক্সবাজারের সমুদ্র সৈকতে প্লাস্টিক বর্জ্যের পাহাড় জমা হয়েছিল বলে প্রচার মাধ্যমে খবর বেরিয়েছে। পলিথিন ব্যবহার নিষিদ্ধ থাকলেও প্রকাশ্যে পলিথিনের ব্যবহার চলছে। কাঁচাবাজার, জৌলুসপূর্ণ বিপণি বিতানসহ সর্বত্র পলিথিন ব্যবহার করা হচ্ছে। কেউ যদি বাজারে গিয়ে মাছ মাংস সহ শাক সবজির ৫/৭টি আইটেম কেনে তাহলে প্রতি আইটেমে একটি করে পলিথিন ব্যাগ ধরিয়ে দেওয়া হয়। গ্রাহক বাসায় ফিরে এই পলিথিন ব্যাগ ডাস্টবিনে ফেলে দেন। তারপর এই ব্যাগ চলে যায় খাল বিল অথবা নদীর পানিতে। অথবা ডোবা নালা ভরাটের কাজে ব্যবহৃত হয়। এর ফলে নদীর পানি দূষিত তো হচ্ছেই, পাশাপাশি নদীর তলদেশে ক্ষতিকর পলি জমে নদীতে পানির ধারণক্ষমতা কমে যাচ্ছে। ফলে অল্প বৃষ্টিতেই নদীর দুই কূল উপচে অকাল বন্যার সৃষ্টি করছে। পাশাপাশি গ্রামাঞ্চলে যত্রতত্র দূষিত পলিথিন ফেলে দেওয়ার ফলে জমির মাটির উর্বরতা দিনে দিনে কমে যাচ্ছে। সরকারিভাবে সিদ্ধান্ত আছে পলিথিনের ব্যবহার কমানোর। পাটজাত ব্যাগের ব্যবহার বাড়ানোর নির্দেশও আছে। কিন্তু কেউ কি মানছে তা? 

সম্প্রতি এক গবেষণায় দেখা গেছে নদী থেকে ৩০০ ধরনের প্লাস্টিক বর্জ্য যেমন কোমল পানীয়ের বোতল, থালা, প্রসাধন সামগ্রীর মোড়ক, পলিথিন ব্যাগ ভেসে ভেসে এক সময় বঙ্গোপসাগরে গিয়ে পড়ছে। ফলে নদীর পাশাপাশি সাগরও দূষিত হচ্ছে! ভবিষ্যতে এর ভয়াবহতা আমাদের কোথায় নিয়ে দাঁড় করাবে তা কি আমরা অনুধাবন করতে পারছি?

কথায় আছে সময়ের এক ফোঁড়ে যে কাজ হয় অসময়ের ১০০ ফোঁড়েও সে কাজ হয় না। তাই জরুরি কথাটি আবারও মনে করিয়ে দিতে চাই। সময় থাকতেই উদ্যোগ নিন। নদীকে বাঁচান। নদী না বাঁচলে দেশটাও কি শেষ পর্যন্ত বাঁচবে? 

লেখক: কথাসাহিত্যিক, নাট্যকার, সম্পাদক আনন্দ আলো

/এসএএস/এমএমজে/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ