সেকশনস

একটি ‘স্পেশাল’ বিজয়

আপডেট : ০৩ এপ্রিল ২০১৭, ১৪:৪৭

জেসমিন চৌধুরী শ্রীলঙ্কার মাটিতে শ্রীলঙ্কান দলের বিপক্ষে টাইগারদের দাপটে যখন আমরা উত্তেজনায় ফেটে পড়ছি, সেই একই সময়ে আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ বিজয়ের খবর আমরা অনেকে রাখিনি- বাংলাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানসিক প্রতিবন্ধী টিনেজ মেয়েদের একটি দল অস্ট্রিয়ায় স্পেশাল অলিম্পিকে ইরানি পুরুষদলকে হারিয়ে ফ্লোর হকিতে স্বর্ণপদক ছিনিয়ে এনেছে। আমরা অলিম্পিকের কথা জানি, শারীরিক প্রতিবন্ধীদের জন্য আয়োজিত প্যারালিম্পিকের কথাও জানি, কিন্তু ‘স্পেশাল অলিম্পিক’ বলে যে একটা ব্যাপার আছে, তা আমরা অনেকেই জানি না।
প্রথমেই স্পেশাল অলিম্পিকের ইতিহাস সম্পর্কে কিছু বলতে চাই। বুদ্ধি প্রতিবন্ধী শিশু এবং প্রাপ্তবয়স্কদের শারীরিক কসরতের প্রতিভাকে তুলে ধরার জন্য ১৯৬৮ সালে আমেরিকার শিকাগোতে প্রথম গ্রিষ্মকালীন আন্তর্জাতিক স্পেশাল অলিম্পিক অনুষ্ঠিত হয়। তারপর থেকে বিভিন্ন প্রতিযোগিতা, প্রশিক্ষণ এবং অন্যান্য ইভেন্টের মাধ্যমে সারাবছর ব্যাপী বিশ্বজুড়ে স্পেশাল অলিম্পিক চলতে থাকলেও অলিম্পিক বা প্যারালিম্পকের মতোই প্রতি দু’বছর অন্তর, পর্যায়ক্রমে শীত এবং গ্রীষ্মকালে, আন্তর্জাতিক স্পেশাল অলিম্পিক প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে। এই প্রক্রিয়া যেমন বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী মানুষদের শারীরিক সুস্থতা ও মনোবল প্রদর্শনে উৎসাহ জোগায়, তেমনি একটি আনন্দময় প্রাণবন্ত পরিবেশে নিজেদের প্রতিভা ও দক্ষতা বিশ্বের সামনে তুলে ধরার সুযোগ করে দেয়। সারাবছর ধরে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ থেকে লক্ষ লক্ষ স্বেচ্ছাসেবী, প্রশিক্ষক ও খেলোয়াড়রা এতে অংশগ্রহণ করলেও এখনও বিশ্বের সকল বুদ্ধি প্রতিবন্ধীর কাছে এর পরিধি বিস্তৃত হয়নি বলে মনে করা হয়। 
বলছিলাম স্পেশাল অলিম্পিকে আমাদের সুবিধা-বঞ্চিত বুদ্ধি-প্রতিবন্ধী টিনেজ মেয়েদের অর্জনের কথা। মাত্র ছয়মাস আগে গঠিত বাংলাদেশের প্রথম অল-গার্লস ‘ইউনিফাইড’ দলটি গত ২৩ মার্চ বৃহস্পতিবারে অস্ট্রিয়ায় অনুষ্ঠিত স্পেশাল অলিম্পিক চ্যাম্পিয়নশিপে স্বর্ণপদক ছিনিয়ে আনার মাধ্যমে এক গৌরবের ইতিহাস সৃষ্টি করে। বাংলাদেশ জাতীয় ক্রিকেট দলের অর্জনকে কোনোভাবে খাটো করার চেষ্টা না করেই বলছি, মিশ্র হকিতে আমাদের মেয়েদের স্বর্ণপদক বিজয় কোনও অংশেই আমাদের ক্রিকেট সাফল্যের চেয়ে ক্ষুদ্রতর বা কম গৌরবের নয়, বরং বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে এই বিজয় অনেক বেশি আনন্দের, অনেক বেশি অহংকারের।  

এই খবরটা ছোট পরিসরে কিছু পত্রিকায় এলেও এ নিয়ে তেমন হৈচৈ হয়নি দেখে আমি বিস্মিত হয়েছি। ধর্মীয় ও সামাজিক অনুশাসন এবং বিধিনিষেধ আমাদের দেশে নারীর ক্ষমতায়নের মাত্রাকে সীমিত করে রাখলেও ক্রীড়ার ক্ষেত্রে এর শিথিলতা আমার দৃষ্টিতে অত্যন্ত স্বস্তিকর এবং উৎসাহব্যঞ্জক। কিছুদিন আগে আন্তর্জাতিক ফুটবলের ক্ষেত্রেও আমরা মেয়েদের একই ধরনের সাফল্য লক্ষ্য করেছি। ক্রিকেটের ব্যাটিংয়ে ছক্কা মারার জন্য খুঁজে নেওয়া একটুখানি অরক্ষিত ফাঁকা জায়গার মতো খেলাকে ব্যবহার করে এগিয়ে যাচ্ছে আমাদের মেয়েরা, ছক্কা মারছে বিভিন্ন ক্ষেত্রে। এই প্রথমবারের মতো স্পেশাল অলিম্পিকে বাংলাদেশ থেকে পুরুষ দলের পাশাপাশি মেয়েদের একটি ইউনিফাইড হকি টিম পাঠানো হয়। তারা চূড়ান্ত ম্যাচটি খেলেছে নিজেদের থেকে একফুট লম্বা এবং দ্বিগুণ ওজনের পুরষদের বিরুদ্ধে। দলের রুমা খানমকে যখন জিজ্ঞেস করা হয় নিজেদের চেয়ে অনেক শক্তিশালী ও আকারে বড় পুরুষদের সঙ্গে খেলতে ভয় লেগেছিল কিনা, সে আত্মবিশ্বাসের সাথে নির্বিকারে উত্তর দেয়, ‘নাহ’।  

যে দেশে শারীরিক বা বুদ্ধি প্রতিবন্ধীদের চারদেয়ালের ভেতরে লুকিয়ে রাখা হয়, যে দেশে এদেরকে আর দশজনের মতো মানুষ বলেই বিবেচনা করা হয় না, যে দেশে তাদের শিক্ষা বা কর্মসংস্থানের সুব্যবস্থা নেই, সে দেশের জন্য এটা একটা আকাশ ফাটিয়ে প্রচার করার মতো বিরাট খবর। আমাদের যাদের দেহমন সব ঠিকঠাক আছে, তাদের অনেকেই যখন জুজুর ভয়ে ঘরের কোণায় বসে আছি, তখন নিজের অনেক সীমাবদ্ধতাকে পায়ের নিচে গুড়িয়ে দিয়ে এই মেয়েগুলো আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দাঁড়িয়ে প্রথম বাড়িতেই ছক্কা মেরে তাক লাগিয়ে দিয়েছে বিশ্বকে। এমন মেয়েই তো চাই। বুদ্ধি কম হোক, বুকভরা সাহস আর মনোবল নিয়ে ঘরে ঘরে জন্ম হোক এমন মেয়েদের।   

শুধু প্রতিবন্ধকতা আর সামাজিক অনুশাসনই নয়, এই মেয়েগুলোকে লড়তে হয়েছে বা এখনও হয় সীমাহীন দারিদ্রের সাথেও।  প্লেনে উঠাতো দূরের কথা, এরা আগে কখনও কোনও এয়ারপোর্টের চৌহদ্দির মধ্যে পা রাখেনি। এদের ভিসার ব্যবস্থা করার সময় মা-বাবার সাক্ষর সংগ্রহ করা ছিল একটা জটিল কাজ কারণ তাদের অনেকেই পড়ালেখা জানেন না। এদের ঘরে টিভি নেই, ইন্টারনেট নেই, নেই টেলিফোন। বহির্বিশ্বের সঙ্গে নেই কোনও ধরনের যোগাযোগ, কাজেই এই বিজয়ের খবরও তাদের পরিবারের কাছে সঙ্গে সঙ্গে পৌঁছুতে পারেনি। এই বিষয়ে ইএসপিএন রিপোর্টে বলা হয়েছে, অস্ট্রিয়ায় বাংলাদেশের প্রথম নারী হকি দলের স্বর্ণপদক জয় যে কতবড় বিজয় তা কিছুটা ধারণা করবার মতো কোনও পরিমাপকও এই মেয়েদের বাড়ির মানুষদের কাছে নেই’।

বাড়ির মানুষদের কথা বাদ দিলাম, আমাদের যাদের টেলিভিশন রেডিও ইন্টারনেট রয়েছে, আমরা যারা পত্রিকা পড়ি, বিশ্বের খবর রাখি, তারা কী বুঝতে পারছি আমাদের দেশের জন্য এই মেয়েগুলো ঠিক কী করেছে? এই বিজয় শুধু একটি ক্রীড়া-বিজয় নয়, এই বিজয় সীমাবদ্ধতার বিরুদ্ধে অপরিসীম সাহস আর চেতনার বিজয়, পুরুষের বিপরীতে নারীর বিজয়, ঐশ্বর্যের বিপরীতে দারিদ্রের বিজয়।  এরা আমাদেরকে দেখিয়ে দিয়েছে, প্রচণ্ড মনোবল আর পরিশ্রমের কাছে কোনও কিছুই অজেয় নয়।

ইংরেজিতে মানসিক প্রতিবন্ধীদের সম্পর্কে কথা বলার সময় একটা সুন্দর বিশেষণীয় টার্ম ব্যবহার করা হয়- ‘স্পেশাল-নিড’। স্পেশাল অলিম্পিক কথাটা সম্ভবত এই টার্মটি থেকেই এসেছে। আমি বিলেতে দীর্ঘদিন স্কুলে স্পেশাল-নিড বাচ্চাদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করেছি। এদের সুখ-দুঃখ, আশা-আকাঙ্ক্ষা এবং স্বপ্ন আর সব বাচ্চাদের মতই, পার্থক্য শুধু তাদের ক্ষমতায়। কিন্তু  এদের মধ্যেও জেগে ওঠার মতো অনেক প্রতিভার বীজ লুকিয়ে থাকে যা সঠিকভাবে লালিত হলে এরাও অনেক অসম্ভবকে সম্ভব করে তুলতে পারে। 

আমাদের 'স্পেশাল-নিড' মেয়েদের প্রতিভাকে বিশ্বের সামনে তুলে ধরার জন্য আমি সংশ্লিষ্ট সকলকে জানাই আন্তরিক কৃতজ্ঞতা ও ভালোবাসা। আমার কাছে এই মেয়েগুলো এবং তাদের এই অভূতপূর্ব বিজয় একটি ব্যক্তিগত কারণে আরও অনেক বেশি ‘স্পেশাল’।  আমার নিজের মানসিক প্রতিবন্ধী বড়বোনকে চার দেয়ালের ভেতরে নিয়ন্ত্রিত জীবনে বাঁচতে দেখে এসেছি সবসময়, তার ভেতরের প্রতিভার বিকাশ ছিল আমাদের কাছে অলীক কল্পনার মতো। এজন্যই বোধ হয় এই মেয়েগুলোর বিজয় আমার মন আনন্দে আর বুক গর্বে ভরে দেওয়ার পাশাপাশি আমার চোখও অশ্রুতে ভরে দিয়েছে। আমি মনে প্রাণে চাই প্রতিভার অগ্রযাত্রা, সাহসী নারীদের অগ্রযাত্রা, মানুষের অগ্রযাত্রা অব্যাহত থাকুক।  এর মধ্যেই আমাদের সার্বিক অগ্রগতির সম্ভাবনা লুকিয়ে আছে।  

লেখক: অভিবাসী শিক্ষক ও অনুবাদক  

 

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

সর্বশেষ

লেখক মুশতাক আহমেদের দাফন সম্পন্ন

লেখক মুশতাক আহমেদের দাফন সম্পন্ন

ইয়াবা পরিবহনের অভিযোগে বাসচালকসহ গ্রেফতার ২

ইয়াবা পরিবহনের অভিযোগে বাসচালকসহ গ্রেফতার ২

ভারতে ফেসবুক ইউটিউব টুইটারকে যেসব শর্ত মানতে হবে

ভারতে ফেসবুক ইউটিউব টুইটারকে যেসব শর্ত মানতে হবে

ধানমন্ডিতে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়া তরুণীকে ছাদ থেকে ফেলে হত্যার অভিযোগ

ধানমন্ডিতে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়া তরুণীকে ছাদ থেকে ফেলে হত্যার অভিযোগ

প্রেমের টানে সংসার ছাড়া স্বামীকে ঘরে ফেরালো পুলিশ!

প্রেমের টানে সংসার ছাড়া স্বামীকে ঘরে ফেরালো পুলিশ!

রংপুরের বিভিন্ন উপজেলায় এক কেজি ধান-চালও কেনা যায়নি!

রংপুরের বিভিন্ন উপজেলায় এক কেজি ধান-চালও কেনা যায়নি!

করোনায় হিলি ইমিগ্রেশন দিয়ে যাত্রী পারাপার বন্ধ, রাজস্ব ঘাটতি ৫ কোটি

করোনায় হিলি ইমিগ্রেশন দিয়ে যাত্রী পারাপার বন্ধ, রাজস্ব ঘাটতি ৫ কোটি

দেবিদ্বারে গণসংযোগে হামলা, গুলিবিদ্ধসহ আহত ৫

দেবিদ্বারে গণসংযোগে হামলা, গুলিবিদ্ধসহ আহত ৫

কুমিল্লায় ওরশের মেলায় দুই পক্ষের সংঘর্ষে ৩ জনকে ছুরিকাঘাত

কুমিল্লায় ওরশের মেলায় দুই পক্ষের সংঘর্ষে ৩ জনকে ছুরিকাঘাত

পঞ্চম ধাপে ২৯ পৌরসভায় ভোট রবিবার

পঞ্চম ধাপে ২৯ পৌরসভায় ভোট রবিবার

লেখক মুশতাকের মৃত্যুতে ১৩ রাষ্ট্রদূতের উদ্বেগ

লেখক মুশতাকের মৃত্যুতে ১৩ রাষ্ট্রদূতের উদ্বেগ

করোনা শনাক্তের সংখ্যা ১১ কোটি ৩৭ লাখ ছাড়িয়েছে

করোনা শনাক্তের সংখ্যা ১১ কোটি ৩৭ লাখ ছাড়িয়েছে

সর্বশেষসর্বাধিক

লাইভ


[email protected]
© 2021 Bangla Tribune
Bangla Tribune is one of the most revered online newspapers in Bangladesh, due to its reputation of neutral coverage and incisive analysis.