X
বুধবার, ০১ ডিসেম্বর ২০২১, ১৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৮

সেকশনস

আমাদের আয়শা আপা

আপডেট : ০৫ জানুয়ারি ২০২১, ২৩:৫০

মুহম্মদ জাফর ইকবাল জানুয়ারির ২ তারিখ ভোরবেলা খবরটি দেখে একেবারে স্তব্ধ হয়ে গেলাম। ভেবেছিলাম রাক্ষুসী ২০২০ সালটি আমাদের সব প্রিয়জনকে নিয়ে বুঝি শান্ত হয়েছে, নতুন বছরেও যে সেটি এসে হানা দেবে বুঝতে পারিনি। বছরের একেবারে শুরুতেই আমাদের আয়শা আপা যাকে এই দেশের সবাই ‘নারী নেত্রী আয়শা খানম’ হিসেবে চিনে, তাকে নিয়ে গেল। আমরা অনেকদিন থেকেই জানি তাঁর শরীর ভালো না, ক্যান্সার শরীরে বাসা বেঁধেছে, তিনি মাঝে মাঝেই হাসপাতালে যাচ্ছেন এবং আসছেন। মাত্র কয়েক সপ্তাহ আগে কী কারণ জানা নেই, তাঁর সাথে আমাদের কথা বলার ইচ্ছা করল। আমার স্ত্রী ফোন করেছে, তিনি ফোন ধরেছেন, অনেকক্ষণ তাঁর সাথে কথা হয়েছে, তিনি তাঁর স্বভাবসুলভ ভঙ্গীতে কথা বলেছেন। এতো বড় একজন মানুষ কিন্তু তাঁর সাথে আমার খুব একটা সহজ সম্পর্ক ছিল। আমার সাথে সবসময় কৌতুক করতেন, পরিহাস করতেন! আমার স্ত্রীর সাথে তাঁর আরও বেশি ঘনিষ্ঠতা ছিল। বিশ্ববিদ্যালয়ের মেয়েদের কিংবা মহিলা শিক্ষকদের অসংখ্য সমস্যা নিয়ে আমার স্ত্রী মহিলা পরিষদের সাহায্য নিয়েছে এবং আমরা সবসময় মহিলা পরিষদ বলতেই অন্য সবার মতো আয়শা খানম এবং আমাদের আয়শা আপাকে বুঝেছি। (আমি জানি এধরনের লেখালেখিতে একজন গুরুত্বপূর্ণ মানুষকে তার সঠিক নাম এবং পরিচয় দিয়ে সম্বোধন করা উচিত, কিন্তু তাঁকে সবসময় যেভাবে আপনজন হিসেবে আয়শা আপা বলে এসেছি সেভাবে না লিখে পারছি না, পাঠকেরা নিশ্চয়ই ক্ষমা করে দেবেন।)

আমি কতবার কত বিচিত্র কারণে যে আয়শা আপার সাহায্য নিয়েছি সেটি বলে শেষ করতে পারব না। একটা উদাহরণ দিলে বোঝা যাবে। একবার একটি মেয়ে অনেক কষ্ট করে তার কোনও এক বান্ধবীর সাহায্য নিয়ে আমাকে একটি চিঠি পাঠাল। চিঠিতে লেখা সে লেখাপড়ায় খুবই ভালো কিন্তু তার পরিবার হঠাৎ করে পুরোপুরি মৌলবাদী হয়ে শুধু যে তাকে বোরকা পরিয়ে আপাদমস্তক ঢেকে ফেলিয়েছে তা নয়, তার লেখাপড়াও বন্ধ করে দেবে বলে ঠিক করেছে। সে এখন কীভাবে তার লেখাপড়া চালিয়ে যাবে, আমার কাছে সেটি জানতে চেয়ে মোটামুটি একটা হৃদয়বিদারক চিঠি লিখেছে। এরকম সময় যা করতে হয় আমি তাই করলাম, আয়শা আপাকে ফোন করে তাঁর সাহায্য চাইলাম। আয়শা আপা বললেন পরিবার আসলেই যদি তাঁর পড়াশোনা বন্ধ করে দেয় তাহলে তাকে মহিলা পরিষদের হোস্টেলে এনে রেখে পড়াশোনা করানো যাবে, আপাতত সে নিজেই পরিবারকে বোঝানোর চেষ্টা করুক। আমি মেয়েটিকে সেটাই বললাম, সে পরের পরীক্ষায় এমন ভালো করার চেষ্টা করুক যেন নেহায়েৎ পাষণ্ড না হলে কেউ তার লেখাপড়া বন্ধ করার কথা চিন্তাও করতে না পারে। আর যদি সত্যি বন্ধ করে ফেলা হয় আমরা তার পড়ার ব্যবস্থা করে দেব! মেয়েটি কোমর বেঁধে লেগে গেল, সত্যি সত্যি মেয়েটির অসাধারণ ভালো ফলাফল দেখে তার পরিবার শেষ পর্যন্ত লেখাপড়া বন্ধ করেনি।

ইউনিভার্সিটির ডিগ্রি নিয়ে, বিসিএস পাস করে সরকারি চাকরি নিয়ে, পছন্দের ছেলেটিকে বিয়ে করে সে এখন স্বামী-পুত্র নিয়ে চমৎকার একটা জীবন যাপন করছে, সব কিছু সম্ভব হয়েছে শুধু আয়শা আপা সাহস দিয়েছেন দেখে।

আরেকবার আমার স্ত্রী প্রফেসর ইয়াসমীন হকের খুব কাছের একজন তরুণী শিক্ষক হঠাৎ করে রহস্যময়ভাবে মারা গিয়েছেন, অনেক বুঝিয়েও তার পরিবারের সদস্যদের পোস্ট মর্টেম করানোর জন্য রাজী করানো গেল না, তাহলে রহস্যের একটুখানি হলেও কিনারা হতো। মেয়েটিকে কবর দেওয়ার কিছুক্ষণ পর হঠাৎ করে পরিবারের বোধোদয় হলো, তারা বুঝতে পারল খুব ভুল হয়ে গেছে, পোস্ট মর্টেম করা প্রয়োজন ছিল। আবার আয়শা আপার কাছে ছুটে যাওয়া হলো, আয়শা আপা তাঁর মহিলা পরিষদের শক্তিশালী টিম লাগিয়ে দীর্ঘ আইনি জটিলতার ভেতর দিয়ে গিয়ে তার দেহটিকে কবর থেকে তুলে পোস্ট মর্টেম করে দেওয়ার ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন। শুধু এটিই নয় যখনই বিশ্ববিদ্যালয়ে ধর্ষণের মতো কোনও ভয়াবহ ঘটনা ঘটে যেতো, তখন আমরা সবাই সবার আগে আয়শা আপার কাছে ছুটে যেতাম। আমরা জানতাম বিশাল মহীরুহের মতো তিনি এই দেশের সব নির্যাতিতা মেয়েদের বুক আগলে রক্ষা করতেন।

শুরুতে বলেছিলাম যে আয়শা আপার সাথে আমার একটা সহজ সম্পর্ক ছিল, তার একটা কারণও আছে। ১৯৯৮-৯৯ সালের দিকে জার্মানি থেকে বাঙালিদের একটা সংগঠন নারী নেত্রী আয়শা খানম, সঙ্গীত শিল্পী ফরিদা পারভীনের সাথে আমাকেও সেখানকার একটা সেমিনারে আমন্ত্রণ জানিয়েছে। তখন আয়শা আপার সাথে আমার পরিচয় হয়েছে, একসাথে ভিসা নিতে জার্মান অ্যাম্বেসিতে গিয়েছি। দুইজন পাশাপাশি বসে ফর্ম পূরণ করে জমা দেওয়ার পর আবিষ্কার করা হলো আমি ফর্মের ভেতর পুরুষ/মহিলা অংশে নিজেকে ‘মহিলা’ হিসেবে টিক দিয়ে বসে আছি! মনে আছে আমি তখনই আয়শা আপাকে বলেছিলাম, “আপনি নিশ্চয়ই অসম্ভব প্রভাবশালী একজন নারী নেত্রী, তাই শুধু পাশে বসে ফর্ম ফিলআপ করার সময় আপনার প্রভাবে আমি জলজ্যান্ত পুরুষ হয়ে নিজেকে নারী হিসেবে ঘোষণা করে বসে আছি!”

জার্মানিতে গিয়ে বেশ কয়েকদিন আয়শা আপাকে খুব কাছে থেকে দেখার সুযোগ পেয়েছি। আমি জানতাম তিনি তরুণ বয়সে ছাত্র রাজনীতি করেছেন, জার্মানিতে গিয়ে আমি তার সেই পরিচয় টের পেতে শুরু করলাম। আয়োজকরা আমাদের নানা শহরে নিয়ে যেতো, সেখানে ফরিদা পারভীনের অপূর্ব লালনগীতির আগে আমাকে আর আয়শা আপাকে কিছু বলতে হতো। আমি কী বলতাম এতদিন পরে আর মনে নেই, কিন্তু মনে আছে, দর্শকদের সাথে আমি মুগ্ধ হয়ে আয়শা আপার বক্তব্য শুনতাম। রাজনীতির পুরো বিষয়টি নিয়ে তাঁর খুব স্বচ্ছ একটা ধারণা ছিল। মনে আছে, আয়োজকরা মাঝে মাঝেই আমাদেরকে স্থানীয় রেডিও স্টেশনে নিয়ে যেতো, সেখানে আমাদের ইন্টারভিউ দিতে হতো। দেশে থাকলে দেশের সমস্যা নিয়ে গলা ফাটিয়ে চেচামেচি করি কিন্তু বিদেশের মাটিতে ভুলেও দেশ সম্পর্কে একটিও খারাপ মন্তব্য করি না।

এই দিনগুলোর কথা মনে হলে এখন মাঝে মাঝে আমার একটু খারাপ লাগে, কারণ আমি অনেক সময়েই আমার নিজের ইচ্ছাটুকু জোর করে আয়শা আপার উপর চাপিয়ে দিয়েছিলাম, তিনি সেগুলো সস্নেহে সহ্য করেছেন। যেমন: গটিনজেন বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়ে তাঁকে টেনে ওয়েবার এবং গাউসের ভাস্কর্য দেখিয়েছি, রীতিমত জোর করে এই বিজ্ঞানী এবং গণিতবিদের গল্প শুনিয়েছি, দীর্ঘ পথ হাঁটিয়ে তাঁকে ম্যাক্স প্লাংকের মতো বড় বিজ্ঞানীদের সমাধী দেখানোর জন্যে সমাধীক্ষত্রে নিয়ে গেছি। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধে লুকিয়ে থাকা বালিকা অ্যানি ফ্রাংকের ডায়েরির কথা কে না জানো। যে বার্গেন বেলসেন কনসেনট্রেশন ক্যাম্পে সে মারা গিয়েছিল সেটা দেখার জন্যে তাকে নিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ড্রাইভ করে গিয়েছি, অ্যানি ফ্রাংকের গণ কবরটি দেখে এসেছি। আমার এইসব বিচিত্র কৌতূহল তিনি সহ্য করেছেন। অনেক দিন এক সাথে থাকার জন্যে আয়শা আপার সাথে খুব সহজ একটা সম্পর্ক হয়েছিল। ঢাকা ফিরে এসে তাঁর পুরো পরিবারের সাথে আমাদের পুরো পরিবারের একটি ঘনিষ্ঠতা হয়েছিল। মনে আছে, আয়শা আপার স্বামী মর্ত্তুজা ভাইয়ের এলাকার একটা স্কুল স্থাপনের অনুষ্ঠানে যোগ দেওয়ার জন্যে আমি তাঁর সাথে নেত্রকোনা গিয়েছিলাম। সেখানে অনুষ্ঠানের যে ছবিটি তোলা হয়েছিল সেই ছবিটি বড় করে আমার বাসায় টানানো আছে। প্রচণ্ড বৃষ্টির মাঝে নেত্রকোনায় একটা গাড়ি দুর্ঘটনায় যখন একেবারে হঠাৎ করে মর্ত্তুজা ভাই মারা গেলেন আমরা একেবারে স্বজন হারানোর ব্যথায় কাতর হয়েছিলাম। দেখতে পেলাম হঠাৎ করে আয়শা আপা একা হয়ে গেলেন, তার সমস্ত সময় তিনি তখন এই দেশের নারীদের পেছনে দিতে শুরু করলেন।

আমাদের দৈনন্দিন জীবনে আমি ছাত্র শিক্ষকদের দেখি, মাঝে মাঝে কবি সাহিত্যিক বুদ্ধিজীবীদেরও দেখি কিন্তু কাছে থেকে একজন নেতা বা নেত্রীকে দেখার সুযোগ পাই না। আয়শা আপা আমাকে সেই সুযোগটি করে দিয়েছিলেন। তারা কীভাবে কথা বলে, সিদ্ধান্ত নেয়, নেতৃত্ব দেয় আমি সেটা দেখতে পেরেছিলাম। সেই তরুণ বয়সে রাজনীতি করেছেন, মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিয়েছেন, সেই সময়ে একজন কমবয়সী তরুণীর জন্য বিষয়টি কতো বিপদসংকুল ছিল আমরা কী এখন সেটি কখনও অনুভব করতে পারবো?

সারাটি জীবন মেয়েদের অধিকার নিয়ে কাজ করেছেন। আমার কিংবা আমার স্ত্রীর যখনই কোনও মেয়েকে আলাদাভাবে সাহায্য করতে হয়েছে কিংবা কারো পাশে দাঁড়াতে হয়েছে, তখন যদি কোনও সাহায্যের প্রয়োজন হয়েছে আমরা সবসময় জেনে এসেছি যে, আমাদের পাশে আয়শা আপা আছেন। তাঁকে বললেই কোনও না কোনও ব্যবস্থা হয়ে যাবে। হঠাৎ করে আমারা একা হয়ে গেলাম।

একেবারেই একা।

         

লেখক: শিক্ষাবিদ ও কথাসাহিত্যিক।

 

/এসএএস/

সম্পর্কিত

আমরা এখন একা

আমরা এখন একা

এই দুঃখ কোথায় রাখি?

এই দুঃখ কোথায় রাখি?

‘টিকা’ টিপ্পনী

‘টিকা’ টিপ্পনী

শুভ জন্মদিন, নির্মূল কমিটি

শুভ জন্মদিন, নির্মূল কমিটি

অভিবাসী শ্রমিকদের দক্ষতা বৃদ্ধি জরুরি

আপডেট : ৩০ নভেম্বর ২০২১, ১৭:৩০

মো. আখতার হোসেন জীবন ও জীবিকার তাগিদে প্রতি বছর বিশ্বের অগণিত মানুষ নিজ দেশ ছেড়ে পাড়ি জমান বিভিন্ন দেশে। বিশ্ব অর্থনীতিতে অভিবাসন তাই একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। বেশিরভাগ উন্নয়নশীল দেশের মতো বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপটেও অভিবাসনের যথেষ্ট গুরুত্ব রয়েছে। আশির দশকের শুরু থেকেই দেশের কর্মসংস্থান সংকট মোকাবিলায় ও দারিদ্র্য বিমোচনে অভিবাসন উল্লেখযোগ্য অবদান রাখছে। বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রা উপার্জনের দ্বিতীয় বৃহত্তম খাত প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স। কোভিড-১৯ ও লকডাউনের প্রভাবে সারা বিশ্বের অর্থনীতি যখন চরম সংকটের মুখোমুখি, তখন অনিশ্চয়তা ও শঙ্কা ভর করেছে দেশের অভিবাসন খাতেও।  

জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো’র (বিএমইটি) তথ্যমতে, গত বছর প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্সের পরিমাণ দাঁড়ায় ২১,৭৫২.২৭ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। মার্চ-মে মাসে নেতিবাচক প্রবৃদ্ধি হলেও জুন থেকে এর ধারাবাহিক ঊর্ধ্বগতি দেখা গেছে, যা করোনাভাইরাসের অভিঘাত থেকে অর্থনীতিকে পুনরুদ্ধারের ক্ষেত্রে ইতিবাচক ভূমিকা রেখেছে। প্রবাসী শ্রমিকরা মধ্যপ্রাচ্য, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ও উত্তর আফ্রিকার দেশসহ প্রায় মোট ১৬৮টি দেশে বসবাস করছেন। তারা মূলত বিভিন্ন ব্যক্তিমালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানের স্বল্পমেয়াদি চুক্তিভিত্তিক কর্মী হিসেবে কাজ করেন এবং চুক্তি শেষে দেশে ফিরে আসেন।

প্রবাস ফেরত শ্রমিকদের তথ্য সংরক্ষণের কোনও যথাযথ প্রক্রিয়া নেই বলে প্রতি বছর কতজন দেশে ফিরছেন এর সঠিক সংখ্যা বের করা বেশ কঠিন।

তবে, করোনা বৈশ্বিক মহামারি উদ্ভূত পরিস্থিতির কারণে অন্য যেকোনও বছরের তুলনায় গত বছর দেশে ফেরত আসা প্রবাসী শ্রমিকের সংখ্যা তুলনামূলক বেশি। আইওএম’র হিসাব অনুসারে, গত বছরের এপ্রিল থেকে ডিসেম্বর মাসে প্রায় চার লাখ প্রবাসী শ্রমিক কোভিড-১৯ এর কারণে দেশে ফেরত আসেন। কোভিড-১৯-এর বিস্তার ঠেকাতে বেশিরভাগ দেশে লকডাউন ঘোষণা করায় এবং জ্বালানি তেলের দাম ব্যাপকভাবে হ্রাস পাওয়ায় সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্যের বেশ কয়েকটি দেশ অভিবাসী শ্রমিকদের নিজ দেশে পাঠিয়ে দেওয়ার ঘোষণা দেয়।

এই প্রবাস ফেরত শ্রমিকদের একটি বড় অংশ ঋণদায়গ্রস্ত এবং দেশে তারা বেকার অবস্থায় জীবনযাপন করছেন। তাই, বিদেশে যেমন তারা কষ্টে দিনযাপন করছিলেন, দেশে এসেও তারা পড়েছেন এক দুর্দশাপূর্ণ পরিস্থিতিতে। আইওএম’র গবেষণায় দেখা গেছে, দেশে ফেরত আসা ৭৫ শতাংশ প্রবাস শ্রমিক করোনাভাইরাস পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে আবার বিদেশে ফেরত যেতে আগ্রহী।

সেক্ষেত্রে আমাদের দরকার প্রবাস ফেরত এই শ্রমিকদের দক্ষতা উন্নয়নের জন্য একটি কাঠামোভিত্তিক রি-স্কিলিং ও আপস্কিলিং প্রোগ্রামে অন্তর্ভুক্ত করা, যেটি পরবর্তীতে দক্ষতার বিচারের মাপকাঠিতে প্রবাসে চাকরি নিশ্চিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালনে সক্ষম হবে।

দক্ষতার বিচারে বাংলাদেশ থেকে সাধারণত তিন রকমের অভিবাসন হয়– দক্ষ, স্বল্প দক্ষ এবং অদক্ষ। সাধারণত আমাদের দেশের প্রবাসী শ্রমিকরা অবকাঠামো নির্মাণ সংক্রান্ত কাজ, পরিবহন, হোটেল-রেস্টুরেন্টের কাজ, স্বাস্থ্য সেবা, ঘরের কাজসহ স্বল্প দক্ষ ও নিম্ন উৎপাদনশীল কাজে নিয়োজিত থাকায় যেকোনও ধরনের অর্থনৈতিক অভিঘাতে তারা সমস্যার সম্মুখীন হন। করোনায় বেশিরভাগ দেশে এসব কাজের চাহিদা কমে যাওয়ায় অনেক প্রবাসী শ্রমিকই চাকরি হারিয়েছেন।

বিদেশ গমন করা অধিকাংশ শ্রমিকই কোনও প্রশিক্ষণ ছাড়া বিদেশে যান। অথচ ছয় মাস কিংবা এক বছরের একটি প্রশিক্ষণ বিদেশে তাদের পারিশ্রমিক দুই থেকে তিনগুণ বাড়িয়ে দিতে সক্ষম। তাই দেশে ফেরত আসা শ্রমিকরা যাতে ফের বিদেশ গমনের পর অধিক উপার্জন করতে পারেন, সেজন্য বহির্বিশ্বের শ্রমবাজারের চাহিদা অনুযায়ী যেসব খাতে দক্ষ জনবল প্রয়োজন, সেসব খাতে তাদের দক্ষতা বৃদ্ধিতে মনোযোগ দিতে হবে। এক্ষেত্রে মনে রাখা প্রয়োজন, করোনা পরিস্থিতি শ্রমবাজারের রূপ অনেকটাই পাল্টে দিয়েছে। যার মধ্যে রয়েছে প্রযুক্তি নির্ভরতা ও উদ্ভাবন এবং নতুন দক্ষতার সুযোগ সৃষ্টি কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রেও পরিবর্তন নিয়ে এসেছে। কোভিড-১৯ যেমন কাজের ক্ষেত্রকে বিভিন্নভাবে পরিবর্তন করেছে, একইসাথে অনেক নতুন সুযোগও সৃষ্টি করেছে। দেশের অভিবাসী শ্রমিকদের বেশিরভাগেরই ভাষাগত দক্ষতা ও প্রযুক্তি জ্ঞান কম থাকায় তারা বিদেশে কাজ করতে গিয়ে বিভিন্ন রকম সমস্যার সম্মুখীন হন।

এসব ক্ষেত্রে বিদেশ ফেরত শ্রমিকদের দক্ষতা বৃদ্ধির মাধ্যমে শ্রম পরিস্থিতি আরও সুসংহত করা যেতে পারে। এছাড়া, অবকাঠামো নির্মাণ সংক্রান্ত কাজ, অটোমোবাইল ও ডিজিটাল খাতের কাজে বিদেশে অধিক চাহিদা থাকায়, তাদের এসব কাজ সংশ্লিষ্ট প্রশিক্ষণ প্রদান করার ব্যাপারে নজর দেওয়া যেতে পারে। আমাদের নারী প্রবাসী শ্রমিকদের একটি বড় অংশই বিদেশে ঘরের কাজের সঙ্গে সম্পৃক্ত। তাদের যদি ভারতের কেরালা, ফিলিপাইন বা ভিয়েতনামের মতো নার্সিং কোর্স করানো হয়, অথবা দক্ষভাবে গৃহপরিচালনা সংক্রান্ত প্রশিক্ষণ দেওয়া যায়, তবে তা তাদের জন্য যেমন মঙ্গলজনক হবে, তেমনি আমাদের সমতা ও অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনৈতিক কাঠামোও সুনিশ্চিত হবে।

অভিবাসীদের জন্য বৈশ্বিক মহামারি সৃষ্ট চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার জন্য সরকার কয়েক ধাপে নগদ সহায়তাসহ প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করলেও এর মাত্র পাঁচ শতাংশ প্রবাস ফেরত শ্রমিকরা কাজে লাগিয়েছেন। প্রবাসীদের সহায়তার প্রক্রিয়া ও ব্যবস্থাপনায় সুফল পেতে তাই নীতিনির্ধারকদের নতুন করে চিন্তাভাবনা করা জরুরি।  আর্থিক প্রণোদনা প্যাকেজ তৈরির ব্যাপারে ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, শ্রীলঙ্কাকে উদাহরণ বিবেচনা করা যেতে পারে। এসব দেশ, বিদেশ ফেরত শ্রমিকদের নগদ আর্থিক সহায়তা প্রদানসহ তাদের দক্ষ করে তুলতে বিভিন্ন প্রশিক্ষণ প্রদানের উদ্যোগ নিয়েছে। সরকারি বিভিন্ন উদ্যোগের পাশাপাশি বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান একসঙ্গে এগিয়ে আসতে পারে।

করোনাকালীন ও পরবর্তী দেশের অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারে প্রশিক্ষিত দক্ষ জনবলের বিকল্প নেই। তাই, দক্ষ জনশক্তি সৃষ্টি ও নতুন সম্ভাবনাময় বাজার অনুসন্ধান একসঙ্গে দুটোই চালিয়ে যেতে হবে। আর এটা করা সম্ভব হবে বহুমুখী অংশীদারিত্বের মাধ্যমেই।

লেখক: সিনিয়র সচিব, যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়, ‎গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার।

/এসএএস/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

সর্বশেষ

পরিবহন মালিক ও শ্রমিকরা একশ্রেণির নেতার কাছে জিম্মি: জিএম কাদের

পরিবহন মালিক ও শ্রমিকরা একশ্রেণির নেতার কাছে জিম্মি: জিএম কাদের

ডুবোচরে আটকে গেলো ৪ শতাধিক পর্যটকবাহী জাহাজ

ডুবোচরে আটকে গেলো ৪ শতাধিক পর্যটকবাহী জাহাজ

চাকরি হারালেন বিমানের পাইলট অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মাহবুব

চাকরি হারালেন বিমানের পাইলট অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মাহবুব

খালেদা জিয়ার স্বাস্থ্য নিয়ে রাজনীতি করা বিএনপির উদ্দেশ্য: তথ্যমন্ত্রী 

খালেদা জিয়ার স্বাস্থ্য নিয়ে রাজনীতি করা বিএনপির উদ্দেশ্য: তথ্যমন্ত্রী 

জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে এবার থাকছে না ২ বিভাগ!        

জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে এবার থাকছে না ২ বিভাগ!        

ছাত্র ফেডারেশনের নেতাদের ‌‘পিটায়ে শোয়ায়ে’ দিতে বললেন সহকারী প্রক্টর

ছাত্র ফেডারেশনের নেতাদের ‌‘পিটায়ে শোয়ায়ে’ দিতে বললেন সহকারী প্রক্টর

শহীদ মিনারে অধ্যাপক রফিকুল ইসলামের কফিনে শ্রদ্ধা

শহীদ মিনারে অধ্যাপক রফিকুল ইসলামের কফিনে শ্রদ্ধা

‘ছাত্রদের আন্দোলনে ভর করে একটি মহল দেশে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির অপচেষ্টা চালাচ্ছে’

‘ছাত্রদের আন্দোলনে ভর করে একটি মহল দেশে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির অপচেষ্টা চালাচ্ছে’

গরুর গাড়ির সঙ্গে মোটরসাইকেলের ধাক্কায় প্রাণ গেলো মুক্তিযোদ্ধার

গরুর গাড়ির সঙ্গে মোটরসাইকেলের ধাক্কায় প্রাণ গেলো মুক্তিযোদ্ধার

সৌদি আরবে ওমিক্রন ভ্যারিয়েন্ট আক্রান্ত শনাক্ত

সৌদি আরবে ওমিক্রন ভ্যারিয়েন্ট আক্রান্ত শনাক্ত

‘ব্ল্যাকমেইল’ করা হচ্ছে জোকোভিচকে?

‘ব্ল্যাকমেইল’ করা হচ্ছে জোকোভিচকে?

বিএমএ’র চিকিৎসকদের ভূমিকা দুঃখজনক: ড্যাব

বিএমএ’র চিকিৎসকদের ভূমিকা দুঃখজনক: ড্যাব

সর্বশেষসর্বাধিক

লাইভ

© 2021 Bangla Tribune