X
সোমবার, ১৯ এপ্রিল ২০২১, ৬ বৈশাখ ১৪২৮

সেকশনস

আমাদের আয়শা আপা

আপডেট : ০৫ জানুয়ারি ২০২১, ২৩:৫০

মুহম্মদ জাফর ইকবাল জানুয়ারির ২ তারিখ ভোরবেলা খবরটি দেখে একেবারে স্তব্ধ হয়ে গেলাম। ভেবেছিলাম রাক্ষুসী ২০২০ সালটি আমাদের সব প্রিয়জনকে নিয়ে বুঝি শান্ত হয়েছে, নতুন বছরেও যে সেটি এসে হানা দেবে বুঝতে পারিনি। বছরের একেবারে শুরুতেই আমাদের আয়শা আপা যাকে এই দেশের সবাই ‘নারী নেত্রী আয়শা খানম’ হিসেবে চিনে, তাকে নিয়ে গেল। আমরা অনেকদিন থেকেই জানি তাঁর শরীর ভালো না, ক্যান্সার শরীরে বাসা বেঁধেছে, তিনি মাঝে মাঝেই হাসপাতালে যাচ্ছেন এবং আসছেন। মাত্র কয়েক সপ্তাহ আগে কী কারণ জানা নেই, তাঁর সাথে আমাদের কথা বলার ইচ্ছা করল। আমার স্ত্রী ফোন করেছে, তিনি ফোন ধরেছেন, অনেকক্ষণ তাঁর সাথে কথা হয়েছে, তিনি তাঁর স্বভাবসুলভ ভঙ্গীতে কথা বলেছেন। এতো বড় একজন মানুষ কিন্তু তাঁর সাথে আমার খুব একটা সহজ সম্পর্ক ছিল। আমার সাথে সবসময় কৌতুক করতেন, পরিহাস করতেন! আমার স্ত্রীর সাথে তাঁর আরও বেশি ঘনিষ্ঠতা ছিল। বিশ্ববিদ্যালয়ের মেয়েদের কিংবা মহিলা শিক্ষকদের অসংখ্য সমস্যা নিয়ে আমার স্ত্রী মহিলা পরিষদের সাহায্য নিয়েছে এবং আমরা সবসময় মহিলা পরিষদ বলতেই অন্য সবার মতো আয়শা খানম এবং আমাদের আয়শা আপাকে বুঝেছি। (আমি জানি এধরনের লেখালেখিতে একজন গুরুত্বপূর্ণ মানুষকে তার সঠিক নাম এবং পরিচয় দিয়ে সম্বোধন করা উচিত, কিন্তু তাঁকে সবসময় যেভাবে আপনজন হিসেবে আয়শা আপা বলে এসেছি সেভাবে না লিখে পারছি না, পাঠকেরা নিশ্চয়ই ক্ষমা করে দেবেন।)

আমি কতবার কত বিচিত্র কারণে যে আয়শা আপার সাহায্য নিয়েছি সেটি বলে শেষ করতে পারব না। একটা উদাহরণ দিলে বোঝা যাবে। একবার একটি মেয়ে অনেক কষ্ট করে তার কোনও এক বান্ধবীর সাহায্য নিয়ে আমাকে একটি চিঠি পাঠাল। চিঠিতে লেখা সে লেখাপড়ায় খুবই ভালো কিন্তু তার পরিবার হঠাৎ করে পুরোপুরি মৌলবাদী হয়ে শুধু যে তাকে বোরকা পরিয়ে আপাদমস্তক ঢেকে ফেলিয়েছে তা নয়, তার লেখাপড়াও বন্ধ করে দেবে বলে ঠিক করেছে। সে এখন কীভাবে তার লেখাপড়া চালিয়ে যাবে, আমার কাছে সেটি জানতে চেয়ে মোটামুটি একটা হৃদয়বিদারক চিঠি লিখেছে। এরকম সময় যা করতে হয় আমি তাই করলাম, আয়শা আপাকে ফোন করে তাঁর সাহায্য চাইলাম। আয়শা আপা বললেন পরিবার আসলেই যদি তাঁর পড়াশোনা বন্ধ করে দেয় তাহলে তাকে মহিলা পরিষদের হোস্টেলে এনে রেখে পড়াশোনা করানো যাবে, আপাতত সে নিজেই পরিবারকে বোঝানোর চেষ্টা করুক। আমি মেয়েটিকে সেটাই বললাম, সে পরের পরীক্ষায় এমন ভালো করার চেষ্টা করুক যেন নেহায়েৎ পাষণ্ড না হলে কেউ তার লেখাপড়া বন্ধ করার কথা চিন্তাও করতে না পারে। আর যদি সত্যি বন্ধ করে ফেলা হয় আমরা তার পড়ার ব্যবস্থা করে দেব! মেয়েটি কোমর বেঁধে লেগে গেল, সত্যি সত্যি মেয়েটির অসাধারণ ভালো ফলাফল দেখে তার পরিবার শেষ পর্যন্ত লেখাপড়া বন্ধ করেনি।

ইউনিভার্সিটির ডিগ্রি নিয়ে, বিসিএস পাস করে সরকারি চাকরি নিয়ে, পছন্দের ছেলেটিকে বিয়ে করে সে এখন স্বামী-পুত্র নিয়ে চমৎকার একটা জীবন যাপন করছে, সব কিছু সম্ভব হয়েছে শুধু আয়শা আপা সাহস দিয়েছেন দেখে।

আরেকবার আমার স্ত্রী প্রফেসর ইয়াসমীন হকের খুব কাছের একজন তরুণী শিক্ষক হঠাৎ করে রহস্যময়ভাবে মারা গিয়েছেন, অনেক বুঝিয়েও তার পরিবারের সদস্যদের পোস্ট মর্টেম করানোর জন্য রাজী করানো গেল না, তাহলে রহস্যের একটুখানি হলেও কিনারা হতো। মেয়েটিকে কবর দেওয়ার কিছুক্ষণ পর হঠাৎ করে পরিবারের বোধোদয় হলো, তারা বুঝতে পারল খুব ভুল হয়ে গেছে, পোস্ট মর্টেম করা প্রয়োজন ছিল। আবার আয়শা আপার কাছে ছুটে যাওয়া হলো, আয়শা আপা তাঁর মহিলা পরিষদের শক্তিশালী টিম লাগিয়ে দীর্ঘ আইনি জটিলতার ভেতর দিয়ে গিয়ে তার দেহটিকে কবর থেকে তুলে পোস্ট মর্টেম করে দেওয়ার ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন। শুধু এটিই নয় যখনই বিশ্ববিদ্যালয়ে ধর্ষণের মতো কোনও ভয়াবহ ঘটনা ঘটে যেতো, তখন আমরা সবাই সবার আগে আয়শা আপার কাছে ছুটে যেতাম। আমরা জানতাম বিশাল মহীরুহের মতো তিনি এই দেশের সব নির্যাতিতা মেয়েদের বুক আগলে রক্ষা করতেন।

শুরুতে বলেছিলাম যে আয়শা আপার সাথে আমার একটা সহজ সম্পর্ক ছিল, তার একটা কারণও আছে। ১৯৯৮-৯৯ সালের দিকে জার্মানি থেকে বাঙালিদের একটা সংগঠন নারী নেত্রী আয়শা খানম, সঙ্গীত শিল্পী ফরিদা পারভীনের সাথে আমাকেও সেখানকার একটা সেমিনারে আমন্ত্রণ জানিয়েছে। তখন আয়শা আপার সাথে আমার পরিচয় হয়েছে, একসাথে ভিসা নিতে জার্মান অ্যাম্বেসিতে গিয়েছি। দুইজন পাশাপাশি বসে ফর্ম পূরণ করে জমা দেওয়ার পর আবিষ্কার করা হলো আমি ফর্মের ভেতর পুরুষ/মহিলা অংশে নিজেকে ‘মহিলা’ হিসেবে টিক দিয়ে বসে আছি! মনে আছে আমি তখনই আয়শা আপাকে বলেছিলাম, “আপনি নিশ্চয়ই অসম্ভব প্রভাবশালী একজন নারী নেত্রী, তাই শুধু পাশে বসে ফর্ম ফিলআপ করার সময় আপনার প্রভাবে আমি জলজ্যান্ত পুরুষ হয়ে নিজেকে নারী হিসেবে ঘোষণা করে বসে আছি!”

জার্মানিতে গিয়ে বেশ কয়েকদিন আয়শা আপাকে খুব কাছে থেকে দেখার সুযোগ পেয়েছি। আমি জানতাম তিনি তরুণ বয়সে ছাত্র রাজনীতি করেছেন, জার্মানিতে গিয়ে আমি তার সেই পরিচয় টের পেতে শুরু করলাম। আয়োজকরা আমাদের নানা শহরে নিয়ে যেতো, সেখানে ফরিদা পারভীনের অপূর্ব লালনগীতির আগে আমাকে আর আয়শা আপাকে কিছু বলতে হতো। আমি কী বলতাম এতদিন পরে আর মনে নেই, কিন্তু মনে আছে, দর্শকদের সাথে আমি মুগ্ধ হয়ে আয়শা আপার বক্তব্য শুনতাম। রাজনীতির পুরো বিষয়টি নিয়ে তাঁর খুব স্বচ্ছ একটা ধারণা ছিল। মনে আছে, আয়োজকরা মাঝে মাঝেই আমাদেরকে স্থানীয় রেডিও স্টেশনে নিয়ে যেতো, সেখানে আমাদের ইন্টারভিউ দিতে হতো। দেশে থাকলে দেশের সমস্যা নিয়ে গলা ফাটিয়ে চেচামেচি করি কিন্তু বিদেশের মাটিতে ভুলেও দেশ সম্পর্কে একটিও খারাপ মন্তব্য করি না।

এই দিনগুলোর কথা মনে হলে এখন মাঝে মাঝে আমার একটু খারাপ লাগে, কারণ আমি অনেক সময়েই আমার নিজের ইচ্ছাটুকু জোর করে আয়শা আপার উপর চাপিয়ে দিয়েছিলাম, তিনি সেগুলো সস্নেহে সহ্য করেছেন। যেমন: গটিনজেন বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়ে তাঁকে টেনে ওয়েবার এবং গাউসের ভাস্কর্য দেখিয়েছি, রীতিমত জোর করে এই বিজ্ঞানী এবং গণিতবিদের গল্প শুনিয়েছি, দীর্ঘ পথ হাঁটিয়ে তাঁকে ম্যাক্স প্লাংকের মতো বড় বিজ্ঞানীদের সমাধী দেখানোর জন্যে সমাধীক্ষত্রে নিয়ে গেছি। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধে লুকিয়ে থাকা বালিকা অ্যানি ফ্রাংকের ডায়েরির কথা কে না জানো। যে বার্গেন বেলসেন কনসেনট্রেশন ক্যাম্পে সে মারা গিয়েছিল সেটা দেখার জন্যে তাকে নিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ড্রাইভ করে গিয়েছি, অ্যানি ফ্রাংকের গণ কবরটি দেখে এসেছি। আমার এইসব বিচিত্র কৌতূহল তিনি সহ্য করেছেন। অনেক দিন এক সাথে থাকার জন্যে আয়শা আপার সাথে খুব সহজ একটা সম্পর্ক হয়েছিল। ঢাকা ফিরে এসে তাঁর পুরো পরিবারের সাথে আমাদের পুরো পরিবারের একটি ঘনিষ্ঠতা হয়েছিল। মনে আছে, আয়শা আপার স্বামী মর্ত্তুজা ভাইয়ের এলাকার একটা স্কুল স্থাপনের অনুষ্ঠানে যোগ দেওয়ার জন্যে আমি তাঁর সাথে নেত্রকোনা গিয়েছিলাম। সেখানে অনুষ্ঠানের যে ছবিটি তোলা হয়েছিল সেই ছবিটি বড় করে আমার বাসায় টানানো আছে। প্রচণ্ড বৃষ্টির মাঝে নেত্রকোনায় একটা গাড়ি দুর্ঘটনায় যখন একেবারে হঠাৎ করে মর্ত্তুজা ভাই মারা গেলেন আমরা একেবারে স্বজন হারানোর ব্যথায় কাতর হয়েছিলাম। দেখতে পেলাম হঠাৎ করে আয়শা আপা একা হয়ে গেলেন, তার সমস্ত সময় তিনি তখন এই দেশের নারীদের পেছনে দিতে শুরু করলেন।

আমাদের দৈনন্দিন জীবনে আমি ছাত্র শিক্ষকদের দেখি, মাঝে মাঝে কবি সাহিত্যিক বুদ্ধিজীবীদেরও দেখি কিন্তু কাছে থেকে একজন নেতা বা নেত্রীকে দেখার সুযোগ পাই না। আয়শা আপা আমাকে সেই সুযোগটি করে দিয়েছিলেন। তারা কীভাবে কথা বলে, সিদ্ধান্ত নেয়, নেতৃত্ব দেয় আমি সেটা দেখতে পেরেছিলাম। সেই তরুণ বয়সে রাজনীতি করেছেন, মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিয়েছেন, সেই সময়ে একজন কমবয়সী তরুণীর জন্য বিষয়টি কতো বিপদসংকুল ছিল আমরা কী এখন সেটি কখনও অনুভব করতে পারবো?

সারাটি জীবন মেয়েদের অধিকার নিয়ে কাজ করেছেন। আমার কিংবা আমার স্ত্রীর যখনই কোনও মেয়েকে আলাদাভাবে সাহায্য করতে হয়েছে কিংবা কারো পাশে দাঁড়াতে হয়েছে, তখন যদি কোনও সাহায্যের প্রয়োজন হয়েছে আমরা সবসময় জেনে এসেছি যে, আমাদের পাশে আয়শা আপা আছেন। তাঁকে বললেই কোনও না কোনও ব্যবস্থা হয়ে যাবে। হঠাৎ করে আমারা একা হয়ে গেলাম।

একেবারেই একা।

         

লেখক: শিক্ষাবিদ ও কথাসাহিত্যিক।

 

/এসএএস/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

সম্পর্কিত

‘টিকা’ টিপ্পনী

‘টিকা’ টিপ্পনী

শুভ জন্মদিন, নির্মূল কমিটি

শুভ জন্মদিন, নির্মূল কমিটি

২০২০, আমাদের মুক্তি দাও

২০২০, আমাদের মুক্তি দাও

সীমা এবং সীমা লঙ্ঘন

সীমা এবং সীমা লঙ্ঘন

ম্রো পল্লি এবং পাঁচতারা হোটেল

ম্রো পল্লি এবং পাঁচতারা হোটেল

আর কতকাল?

আর কতকাল?

“পরশ্রীপুলক”

“পরশ্রীপুলক”

আমাদের গ্লানি, আমাদের কালিমা

আমাদের গ্লানি, আমাদের কালিমা

চার কোটি বাঙালি—মানুষ একজন

চার কোটি বাঙালি—মানুষ একজন

একজন তারিক আলী

একজন তারিক আলী

লেখাপড়ার সুখ-দুঃখ এবং অপমান

লেখাপড়ার সুখ-দুঃখ এবং অপমান

অভিশপ্ত আগস্ট

অভিশপ্ত আগস্ট

সর্বশেষ

রিয়ালকে শিরোপার পথে আটকে দিলো গেটাফে

রিয়ালকে শিরোপার পথে আটকে দিলো গেটাফে

লাইভে ক্ষমা চাইলেন নুর

লাইভে ক্ষমা চাইলেন নুর

‘আগামী ৪৮ ঘন্টা জ্বর না আসলে খালেদা জিয়া শঙ্কামুক্ত হবেন’

‘আগামী ৪৮ ঘন্টা জ্বর না আসলে খালেদা জিয়া শঙ্কামুক্ত হবেন’

টর্নেডো ইনিংসে দিল্লির নায়ক ধাওয়ান

টর্নেডো ইনিংসে দিল্লির নায়ক ধাওয়ান

সোয়া কোটি মানুষের জন্য মোটে ২৬টি আইসিইউ বেড!

সোয়া কোটি মানুষের জন্য মোটে ২৬টি আইসিইউ বেড!

ভিপি নুরের বিরুদ্ধে তথ্য-প্রযুক্তি আইনে মামলা

ভিপি নুরের বিরুদ্ধে তথ্য-প্রযুক্তি আইনে মামলা

লন্ডনে তালা ভেঙে অর্থমন্ত্রী মুস্তফা কামালের জামাতার লাশ উদ্ধার

লন্ডনে তালা ভেঙে অর্থমন্ত্রী মুস্তফা কামালের জামাতার লাশ উদ্ধার

ডিবি কার্যালয়ে মামুনুল হক

ডিবি কার্যালয়ে মামুনুল হক

করোনায় বিপর্যস্ত ভারত, মোদিকে মনমোহনের ৫ পরামর্শ

করোনায় বিপর্যস্ত ভারত, মোদিকে মনমোহনের ৫ পরামর্শ

ট্রাকের চাকায় পিষ্ট হয়ে ভিক্ষুক নিহত

ট্রাকের চাকায় পিষ্ট হয়ে ভিক্ষুক নিহত

আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর টার্গেটে আরও দুই ডজন হেফাজত নেতা

আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর টার্গেটে আরও দুই ডজন হেফাজত নেতা

ভার্চুয়াল কোর্টে জামিন পেয়ে কারামুক্ত ৯ হাজার আসামি

ভার্চুয়াল কোর্টে জামিন পেয়ে কারামুক্ত ৯ হাজার আসামি

সর্বশেষসর্বাধিক

লাইভ

Bangla Tribune is one of the most revered online newspapers in Bangladesh, due to its reputation of neutral coverage and incisive analysis.
© 2021 Bangla Tribune