X
শনিবার, ১৩ এপ্রিল ২০২৪
২৯ চৈত্র ১৪৩০

রুপা হক ও বাংলাদেশবিরোধী অপপ্রচার

কাজী আনিস আহমেদ
২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ১৮:২৮আপডেট : ০১ মার্চ ২০২০, ১৭:১৭

কাজী আনিস আহমেদ রুপা হক বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত ব্রিটিশ আইনপ্রণেতা। এই মাসের গোড়ার দিকে বাংলাদেশ প্রশাসনের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে দেশকে ‘দুর্বৃত্ত রাষ্ট্র’ হিসেবে অভিহিত করেছেন তিনি। গত ৪ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাজ্যের পার্লামেন্ট হাউজ অব কমনসে লেবার পার্টির মানবাধিকার বিষয়ক এক অনুষ্ঠানে বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতিকে ‘ভয়াবহ নিপীড়নমূলক’ বলে আখ্যা দিয়েছেন তিনি। এখানকার পরিস্থিতিকে ফিলিস্তিন ও কাশ্মিরের মতো অঞ্চলের সঙ্গে তুলনা করেছেন। যদিও বর্ণবাদী রাষ্ট্রের সঙ্গে তুলনীয় কোনও পরিস্থিতির অস্তিত্ব বাংলাদেশে নেই।
লক্ষণীয় যে, একই মাসে আরেক মার্কিন সিনেটর চার্লস গ্রাসলিও মানবাধিকার প্রশ্নে বাংলাদেশের সমালোচনা করেছেন। তিনি সুদান ও সোমালিয়ার মানবাধিকার পরিস্থিতির সঙ্গে বাংলাদেশের তুলনা করেছেন। এই ধারার মন্তব্য বাংলাদেশ নিয়ে তাদের অজ্ঞতার গভীরতাকেই স্পষ্ট করে তুলেছে।
রুপা হকের মন্তব্যগুলো খুবই বিস্ময়কর। কারণ, নিজেকে তিনি ‘সমগ্র বিশ্বে ছড়িয়ে থাকা বাংলাদেশি অভিবাসীদের’ একজন প্রতিনিধি হিসেবে বর্ণনা করে থাকেন। তাহলে কেন বাংলাদেশ ও আওয়ামী লীগ প্রশাসনের প্রতি তার বিশেষ বিদ্বেষ?

এবারই প্রথম নয়, আগেও রুপা আওয়ামী লীগকে সমালোচনার লক্ষ্যবস্তু বানিয়েছেন। ২০১৮ সালের ১৭ ডিসেম্বর পলিটিক্সহোম নামের অনলাইনের জন্য লেখা এক নিবন্ধে বলেছিলেন, তিনি বাংলাদেশের ‘আদর্শ ভাবমূর্তি’র মধ্যে বেড়ে উঠেছিলেন। পরে তিনি ‘বর্তমান প্রশাসনের অধীনে দেশের খারাপ দিকটি’ আবিষ্কার করেন। তবে তার কল্পিত বাংলাদেশ কোনও শ্রুতিমধুর কবিতা ছিল না। এখানকার রক্তাক্ত অভ্যুত্থান এবং সামরিক একনায়কতন্ত্রের দিনগুলোর কথা বাংলাদেশিরা জানেন।

তিনি যুক্তি দিয়ে বলেছেন, ‘সর্বশেষ সরকার (বিএনপি) তুলনামূলক খারাপ ছিল’ বলার মধ্য দিয়ে যারা এই সরকারের পক্ষ নেবেন, তাদের বোঝা উচিত, ‘একটি অন্যায় আরেকটি অন্যায়ের বৈধতা নিশ্চিত করতে পারে না’, ওই বিবৃতিতে কিছু তাত্ত্বিক সত্য থাকতে পারে, তবে এটা একটি চাতুরিপূর্ণ বাজে বক্তব্য।

বিএনপি কেবল তুলনামূলক খারাপই ছিল না, মানবাধিকার প্রশ্নে তাদের অবস্থান আরও ভয়ঙ্কর ছিল। বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জেনারেল জিয়া বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব ও তার পরিবারের হত্যাকারীদের পুরস্কৃত করেছিলেন। ১৯৭১ সালের গণহত্যায় জড়িত জামায়াতে ইসলামীর মতো একটি রাজনৈতিক দলকে রাজনীতিতে পুনর্বাসন করেছেন। ১৯৯০ ও ২০০০ দশকের গোড়ার দিকে প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালনের সময় জিয়ার স্ত্রী ও উত্তরসূরি খালেদা জিয়াও জামায়াতকে আরও কাছে টেনেছেন।

রুপা হক কীভাবে বিএনপির শেষ মেয়াদে ইসলামি চরমপন্থীর উত্থানকে এড়িয়ে যেতে পারেন? বিএনপির রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতায় বাংলা ভাইয়ের মতো সন্ত্রাসীরা মুক্তভাবে উন্মত্ততা চালিয়ে গেছে। সে সময়ে বোমা হামলায় জর্জরিত হয়েছিল বাংলাদেশ। ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট আওয়ামী লীগের র‍্যালিতে বড় ধরনের বোমা হামলায় অন্তত ২৪ জন নিহত এবং তিন শতাধিক মানুষ পঙ্গু হন। তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেতা শেখ হাসিনা অল্পের জন্য প্রাণে বেঁচে যান।

পরে বিরোধী দলে থাকা অবস্থায় ২০১৩ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত বাসে পেট্রোলবোমা হামলাসহ সহিংস আন্দোলন চালায় বিএনপি। এতে শত শত মানুষ প্রাণ হারায়। নারী ও শিশুসহ আহত হয় হাজার হাজার মানুষ। তাদের মতো কোনও রাজনৈতিক দল এ পর্যন্ত নির্বিচারে এমনভাবে বেসামরিক মানুষকে লক্ষ্যবস্তু বানায়নি।

তবু রুপা হক প্রতিটি ক্ষেত্রে আওয়ামী লীগের প্রতি সমালোচনামূলক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়েছেন বলে মনে হচ্ছে। তিনি বাংলাদেশের লেবার ফ্রেন্ডসের অংশ হিসেবে দেশ সফর করেছিলেন, তবে সে সময় তার দৃষ্টিতে প্রতিনিধিদল ‘সরকারের পক্ষ নিয়েছে’–উল্লেখ করে এর সমালোচনা করেন।

এমনকি রুপা হক জাতির পিতা হিসেবে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বীকৃতি নিয়েও প্রচ্ছন্নভাবে প্রশ্ন তুলেছেন। এটা কোনও সাধারণ মতামতের ব্যাপার নয়: দেশ-বিদেশের সব ইতিহাসবিদ ও রাজনীতি বিশ্লেষক জাতির পিতা হিসেবে তার স্বীকৃতিকে অনুমোদন করেছেন। এটা অস্বীকার করা মানে একটা সুনির্দিষ্ট রাজনৈতিক পক্ষে অবস্থান নেওয়া; প্রধানত বিএনপি ও স্বাধীনতাবিরোধী দলগুলো যা প্রচার করে।

তাহলে কেন একজন ব্রিটিশ এমপি বাংলাদেশের একটি বিশেষ রাজনৈতিক ধারার পক্ষে অবস্থান নেবেন? কোনও শাসক দলের সরকারি বিবৃতিকে সবসময় সন্দেহ করা উচিত। তবে এই প্রক্রিয়ায় অন্য একটি পক্ষপাতমূলক অবস্থান গ্রহণ করার মধ্যে কৃতিত্বের কিছু নেই। 

বাংলাদেশ তার নিজস্ব অসাম্প্রদায়িক চরিত্র হারাচ্ছে বলে মায়াকান্না করে রুপা হক আসলে নিজের পক্ষপাতী চরিত্রকেই আরও প্রকট করে তোলেন।

সংবিধান থেকে ‘ধর্মনিরপেক্ষতা’কে ঝেটিয়ে বিদায় করার যথাযথ সমালোচনা করেছেন রুপা, তবে এটা যে বিএনপির কাজ ছিল তা তিনি এড়িয়ে গেছেন। রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিল করতে দলটি যে ধর্মের কার্ড খেলেছে, সে বিষয়েও তিনি পরিষ্কারভাবে কিছু বলেননি। দেশের সংবিধানের চার মূলনীতির একটি ধর্মনিরপেক্ষতা, এক্ষেত্রে যা ঘটেছে তা হলো ২০০৯ সালে ক্ষমতায় এসে একে সংবিধানে পুনঃসংযোজন করেছে আওয়ামী লীগ। যাইহোক, সংখ্যালঘুর অধিকার ও ধর্মনিরপেক্ষতার সমর্থনে আওয়ামী লীগের দীর্ঘকালীন রেকর্ড সম্পর্কে অদ্ভুতভাবে নীরব রুপা হক।

আমি বলছি না যে মানবাধিকার প্রশ্নে বাংলাদেশের তুলনামূলকভাবে আরও ভালো অবস্থানে যাওয়ার সুযোগ নেই। দীর্ঘদিন ধরে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আছে। তাই আগের পরিস্থিতি কতটা খারাপ ছিল সেটার চেয়ে তারা নিজেদের সময়ে কী করেছে, তা নিয়ে তাদের সমালোচনার মুখোমুখি করার সুযোগ রয়েছে।

আমি এটাও বলি না যে দুনিয়ার যেকোনও স্থানের মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে পশ্চিমা সরকারগুলোর মন্তব্য করার কিছু নেই। গোটা বিশ্ব যতক্ষণ পর্যন্ত উদ্ধার পাওয়ার জন্য তাদের দ্বারস্থ হবে, ততক্ষণ পর্যন্ত তাদের প্রশ্ন তোলার দায়িত্ববোধকেও মেনে নিতে হবে।

মিয়ানমারের অপরাধের জন্য বাংলাদেশ পশ্চিমা শক্তির কাছে সুবিচার দাবি করে আসছে। অতএব মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে নিজেদের বিরুদ্ধে সমালোচনাও বাংলাদেশকে শুনতে হবে। তবে পক্ষপাতমূলক অত্যুক্তির মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করার চেষ্টা করলে এখানকার মানবাধিকার সমুন্নত হবে না।

তেমনটা করা হলে, আন্তর্জাতিক পরিসরে বাংলাদেশের মতো ইতিবাচক ভূমিকা রাখা দেশকে ‘দুর্বৃত্ত রাষ্ট্র’ হিসেবে আখ্যা দেওয়া ব্যক্তিকেই আমাদের পক্ষপাতী সমালোচক বলে মনে হয়। মনে হয় যেন তিনিই দুর্বৃত্তে রূপান্তরিত হচ্ছেন।

লেখক: প্রকাশক, বাংলা ট্রিবিউন ও ঢাকা ট্রিবিউন

/বিএ/এসএএস/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

বাংলা ট্রিবিউনের সর্বশেষ
পোড়া ক্ষত কেড়ে নিয়েছে ঈদের আনন্দ
পোড়া ক্ষত কেড়ে নিয়েছে ঈদের আনন্দ
কীভাবে চলবে সদরঘাটে নিহত রিপনের সংসার?
কীভাবে চলবে সদরঘাটে নিহত রিপনের সংসার?
চায়ের দোকানে আ.লীগ ও যুবলীগের দুই নেতাকে গুলি
চায়ের দোকানে আ.লীগ ও যুবলীগের দুই নেতাকে গুলি
সৈকতে জনসমুদ্র!
সৈকতে জনসমুদ্র!
সর্বশেষসর্বাধিক

লাইভ