X
বৃহস্পতিবার, ০৭ জুলাই ২০২২
২৩ আষাঢ় ১৪২৯

এই শ্রাবণে অশ্রুর আগস্টে বিষণ্ন ভাবনাগুলো

আপডেট : ১৬ আগস্ট ২০২১, ২২:৩২

নাসির আহমেদ মানুষের জীবনে সুসময়-দুঃসময় দুই-ই থাকে। সময়ের আবর্তে আলো-অন্ধকার আর সুখ-দুঃখের এই উত্থান-পতন। যে কারণে পর্বতপ্রমাণ বিষাদ বেদনার ভারেও স্তব্ধ হয়ে যায় না জীবন। নিরন্তর বহমান বলেই এই বিশ্বসংসার আজও টিকে আছে। আমাদের জাতীয় জীবনের এক চরম বেদনাবিধুর বিপর্যয়ের মাস আগস্ট। স্বাধীনতার মহান স্থপতি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে নির্মমভাবে হত্যার কালো স্মৃতিবিজড়িত এই মাস। সদ্য স্বাধীন এই বাংলাদেশকে দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্রকারীরা উল্টো পথে নিয়ে যেতে চেয়েছিল, যে পথ স্বাধীনতা বিরোধীদের পছন্দ, যে পথ আন্তর্জাতিক পরাশক্তির পছন্দ, যে পথ সাম্প্রদায়িকতার পুঁজিবাদীদের শোষণ প্রক্রিয়ায় চলার পথ। বঙ্গবন্ধুর মতো মহান নেতাকে হত্যা করেও বাংলাদেশকে তার মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও প্রগতিশীল রাষ্ট্রচিন্তার পথ থেকে চিরতরে সরানো যায়নি। দীর্ঘ প্রতীক্ষার পরে হলেও বাংলাদেশ তার মুক্তিযুদ্ধের সড়ক ধরেই চলার সুযোগ ফিরে পেয়েছে।

কিন্তু তারপরও ১৫ আগস্ট এমন এক অমোচনীয় ক্ষত, যা কোনও কিছুতেই মুছে ফেলা যাবে না। শ্রাবণের অঝর ধারার বৃষ্টিভেজা ১৯৭৫ সালের সেই ১৫ আগস্ট যেন চিরদিনের কান্নার স্মৃতি হয়ে আছে বাংলার মানুষের জীবনে। এই মাস যেন কেবলই বিপর্যয়ের মাস। বাংলাদেশের অগ্রযাত্রার পথে যত বাধা তার সবকিছুই যেন এই আগস্ট থেকে সৃষ্ট। সে প্রসঙ্গে আলোচনা করার আগে এ তথ্যও ভুলে যাবার নয় যে আগস্ট বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এবং জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের মহাপ্রয়াণেরও স্মৃতিবিজড়িত মাস।

পঁচাত্তরের ১৫ আগস্ট বাংলাদেশের যে চরিত্র হনন ঘটেছিল, তারই ধারাবাহিকতায় ১৭ ও ২১ আগস্ট ঘটে যাওয়া জঙ্গিবাদ আর রাজনৈতিক নৃশংসতার কালো স্মৃতিবিজড়িত দুটি দিনও বিস্মরণ সম্ভব নয়। বাংলাদেশের নিকট ইতিহাসের ভয়াবহ বিপর্যয় ও কলঙ্কের স্মৃতি জড়িয়ে আছে আগস্টের ওই তারিখ দুটির সঙ্গে।

সে বিষয়টি বিস্তারের আগে স্মরণীয় বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন নেছা মুজিব ও তাদের জ্যেষ্ঠপুত্র বীর মুক্তিযোদ্ধা শেখ কামালের জন্মদিন। শোকের মাস আগস্টেই গভীর ভালোবাসা আর পরম শ্রদ্ধায় বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক আদর্শের অনুসারীরা পালন করেছেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রিয় সহধর্মিণী বঙ্গমাতা বেগম ফজিলাতুন নেছা মুজিব (৮ আগস্ট) ও শেখ কামালের (৫ আগস্ট) জন্মদিন। আবার সেই আগস্টেই ঘাতকচক্রের হাতে অকালে জীবন প্রদীপ নিভে গেলো আগস্টের জাতক মা এবং পুত্রের!

বঙ্গবন্ধুর জীবনের সব সংগ্রামে-সংকটে বঙ্গমাতার ধৈর্য, নিষ্ঠা আর সহনশীলতা যে কী বিশাল অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করেছে, তার কোনও তুলনা নেই। খোকা থেকে শেখ মুজিব, শেখ মুজিব থেকে বঙ্গবন্ধু এবং বঙ্গবন্ধু থেকে বাঙালির মুক্তি সংগ্রামের অবিসংবাদিত নেতা জাতির পিতা হয়ে ওঠার পেছনে বঙ্গমাতার অপরিসীম ত্যাগ আর সহযোগিতার কথা আজ সর্বজনবিদিত। বঙ্গবন্ধুর ছাত্রজীবন থেকেই বঙ্গমাতা সুদূরপ্রসারী ভূমিকা পালন করেছেন। সে কথা গভীর ভালোবাসা আর শ্রদ্ধার সঙ্গে বঙ্গবন্ধু তার অসমাপ্ত আত্মজীবনীতে বারবার উল্লেখ করেছেন।

ষাটের দশকে যখন বঙ্গবন্ধু আওয়ামী লীগের নেতৃত্বের শীর্ষতম অবস্থানে, স্বাধিকারের সংগ্রাম যখন স্বাধীনতার পথে যাত্রা করেছে, জেনারেল আইয়ুব সরকারের কোপানলে পড়েছেন ছয় দফা ঘোষণার মধ্য দিয়ে, তখন জেল-জুলুম-নির্যাতনের মাত্রা আরও বেড়ে যায়। মায়ের পাশাপাশি সেই চরম সংকটময় দিনগুলোতে নেতাকর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ ও রাজপথের আন্দোলন সংগঠনে শেখ কামালও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। এক কথায় বলতে গেলে বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক জীবনের সংগ্রামে সংকটে তাঁরা ছিলেন বিরাট অনুপ্রেরণার উৎস। জন্ম মাস আগস্টেই মা এবং পুত্রকে সেই কাল রাতে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গেই শাহাদাতবরণ করতে হলো। তাই আগস্ট এলে বাঙালির মন বিপন্নতার বোধে আক্রান্ত না হয়ে পারে না।

কোন পর্যায়ের নৃশংসতার বোধ থাকলে স্বাধীনতার মহান স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যার পাশাপাশি তাঁর স্বজন-পরিজন, নারী-শিশুসহ ১৬ জন মানুষকে এমন নির্মমভাবে হত্যা করা যায়, তা অবশ্যই ভাবনার বিষয়।

কেন এমন নৃশংসতা? কেনই বা তাকে হত্যার জন্য ওই সময়টাই বেছে নেওয়া হয়েছিল, যখন তিনি বাংলাদেশকে একটি নতুন প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনার পথে নিয়ে যাচ্ছিলেন। সমাজতান্ত্রিক অর্থব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে তিনি এ দেশে কৃষক-শ্রমিক মেহনতী মানুষ, তথা দরিদ্র মানুষের সরকার কায়েম করতে চলেছিলেন, ডাক দিয়েছিলেন দ্বিতীয় বিপ্লবের।

এই নৃশংসতা আর হত্যার সময়-পরিকল্পনার আলোকে অনুসন্ধান করলে বেরিয়ে আসে বঙ্গবন্ধু এবং তার স্বজন-পরিজনদের প্রতি ভয়ংকর ক্রোধের কারণও। ১৫ আগস্টের হত্যাকাণ্ড নিয়ে গত চার দশকে অনেক অনুসন্ধানী গবেষণা হয়েছে, তাতে দেশের অভ্যন্তরের স্বাধীনতাবিরোধী চক্রের ভূমিকা যেমন স্পষ্ট, তেমনি আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রের মুখোশও অনেকখানিই উন্মোচিত হয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সরকারের তৎকালীন বহু গোপন নথিপত্র এবং বিধিমাফিক ঢাকাস্থ মার্কিন দূতাবাসের অনেক গোপন প্রতিবেদন ইতোমধ্যে উন্মুক্ত হয়েছে। তাতে ১৫ আগস্টের নৃশংস হত্যাকাণ্ডের পেছনে কীভাবে কারা যুক্ত ছিল এবং হত্যার মূল উদ্দেশ্য অনেকটাই উন্মোচিত।

কেন বঙ্গবন্ধুর সরকার যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশটির পুনর্গঠন শান্তিপূর্ণভাবে করতে পারছিলেন না, স্বাধীনতা অর্জনের প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই দেশের অভ্যন্তরে নানামুখী সন্ত্রাস এবং নৈরাজ্যের কেন এত ডামাডোল বেজে উঠেছিল, তার কারণও অনেকটাই এখন স্পষ্ট। সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার নামে জাসদের জন্ম হলো, কেন সিরাজ সিকদার, তোহা প্রমুখ অতি বাম রাজনীতিকেরা নানারকম বাহিনী সৃষ্টি করে সারাদেশে ‘শ্রেণিশত্রু’ খতমের নামে গলাকাটার রাজনীতি শুরু করেছিল? এসব ঘটনার পেছনে সুদূরপ্রসারী আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্র যে ছিল, তাও বেরিয়ে আসছে ক্রমান্বয়ে!

অকাল প্রয়াত সাংবাদিক মিজানুর রহমান খানের গবেষণামূলক একটি গ্রন্থে স্বাধীনতার স্থপতি বঙ্গবন্ধুকে হত্যার নীলনকশা ঢাকায় এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও সিআইএ’র প্রত্যক্ষ মদতে প্রণীত হয়েছিল, তার বহু তথ্য পাওয়া যায়, যা পড়লে চমকে উঠতে হয়। বইটিতে দালিলিক তথ্য-প্রমাণসহ এসব ষড়যন্ত্র তুলে ধরা হয়েছে। মার্কিন সাংবাদিক লরেন্স লিফশুলজের গ্রন্থেও এ সংক্রান্ত বহু তথ্য প্রকাশিত হয়েছে।

আজ সময় এসেছে বঙ্গবন্ধু হত্যার পূর্বাপর ঘটনাপ্রবাহ বিশ্লেষণ করে একটি ট্রুথ কমিশন গঠনের মধ্য দিয়ে এই হত্যার নেপথ্য কুশীলবদের মুখোশ জাতির সামনে উন্মোচন করার।

ভবিষ্যৎ প্রজন্মেরও জানা দরকার হাজার বছরের পরাধীন জাতিকে যিনি প্রথম একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের অধিকারী করলেন, কী ছিল তার স্বপ্ন এবং জীবন সাধনা? জানতে হবে এ দেশের স্বাধীনতার মহান স্থপতির ৫৫ বছরের স্বল্প পরিসর জীবনের চরম ত্যাগ স্বীকার আর অসামান্য অবদানের ইতিহাস। আর কেনই বা এমন মহান ত্যাগী নেতাকে সপরিবার হত্যা করতে হলো এমন নির্মমভাবে!

সুখের কথা, ইতোমধ্যে প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু হত্যার নেপথ্যে কুশীলবদের খুঁজে বের করার জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে নির্দেশ দিয়েছেন, আইনমন্ত্রীর বক্তব্য থেকেও স্পষ্ট হয়েছে যে এ সংক্রান্ত দলনিরপেক্ষ তদন্ত কমিটি গঠন করা হবে।

বিভাজনের যে কালো রেখা বাংলাদেশ রাষ্ট্রের ঐক্যবদ্ধ অস্তিত্বের মর্মমূলে পঁচাত্তরের পনেরোই আগস্টের হত্যাকাণ্ডের মধ্য দিয়ে এঁকে দেওয়া হয়েছে, সেই কলঙ্ক থেকে যতদিন বাঙালির মুক্তি না ঘটবে, ততদিন ১৫ আগস্ট অবিস্মরণীয় বেদনাবহ স্মৃতির পাশাপাশি প্রতিরোধের দুর্জয় শক্তি নিয়েও জাগ্রত থাকবে বাঙালির জাতিসত্তায়। অনেকে বলবেন ১৫ আগস্টের খুনিদের বিচারের মধ্য দিয়ে কলঙ্ক মুছে গেছে। এটা আংশিক সত্য, পূর্ণ সত্য নয়। কারণ, পনেরো আগস্টের পরে স্বাধীনতাবিরোধী অপশক্তির যে পুনরুত্থান ঘটেছে, তা থেকে দেশ আজও  মুক্ত নয়। আর সে কারণে বঙ্গবন্ধু হত্যার অভিঘাত ভয়াবহ ক্ষতের সৃষ্টি করেছে আমাদের জাতীয় অস্তিত্বের মর্মমূলে।

১৫ আগস্টের ভয়ংকর হত্যাকাণ্ডের মধ্য দিয়ে শুধু একজন রাষ্ট্রপতিকে হত্যা কিংবা আওয়ামী লীগের মতো একটি রাজনৈতিক দলকেই ক্ষমতাচ্যুত করা হয়নি, হত্যা করা হয়েছে মুক্তিযুদ্ধে ৩০ লক্ষ শহীদের রক্তে অর্জিত একটি ধর্মনিরপেক্ষ, সমাজতান্ত্রিক দর্শনের প্রগতিশীল রাষ্ট্রের স্বাপ্নিক অস্তিত্বকে। বরং হত্যাকারীরা ফিরিয়ে আনতে চেয়েছিল মৃত পাকিস্তানের সেই সামরিক ধর্মান্ধতা কবলিত অপরাজনীতি, যা গণতন্ত্র এবং সাধারণ মানুষের চিরশত্রু। সে কারণে ১৫ আগস্ট ভোরেই ঘাতকরা বাংলাদেশ বেতার দখল করে মুহূর্তের মধ্যে নাম পাল্টে দিয়ে ‘রেডিও বাংলাদেশ’ এবং ‘জয় বাংলা’র স্থলে ‘বাংলাদেশ জিন্দাবাদ’ ধ্বনি দিয়ে পিপলস রিপাবলিক অব বাংলাদেশকে নাম বদল করে ‘ইসলামিক রিপাবলিক অব বাংলাদেশ’ ঘোষণা করেছিল। যদিও তারা শেষ পর্যন্ত টিকেনি।

পাকিস্তানি সামরিক গোয়েন্দা সংস্থার এ দেশীয় এজেন্ট এবং আন্তর্জাতিক পরাশক্তির প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ মদতে সেদিন যারা বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করেছিল এবং যারা এই হত্যার ষড়যন্ত্রে জড়িত, তারা একটি ক্যামোফ্লাজ তৈরি করেছিল। তা হলো, তাদের মধ্যে সরাসরি মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী কিছু লোকও ছিল। ফলে স্বাধীনতাবিরোধী চক্র যে তাকে হত্যা করেছে, এ নিয়েও বিভ্রান্তির কুয়াশা সৃষ্টির একটা অপচেষ্টা ১৯৭৫ থেকে আজও পর্যন্ত চলছে। এর কারণ এই হত্যা-পরিকল্পনায় জড়িত এবং হত্যার সরাসরি বেনিফিসিয়ারি খন্দকার মোশতাক বঙ্গবন্ধু সরকারের একজন প্রবীণ মন্ত্রী। হত্যা চক্রান্তের সঙ্গে জড়িত ছিলেন জেনারেল জিয়াউর রহমানও। তাই ঘাতকরা বিভ্রান্তি সৃষ্টির সুযোগ পেয়েছিল। খন্দকার মোশতাক যে পাকিস্তান এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রত্যক্ষ দালাল ছিল, সেটি মুক্তিযুদ্ধ চলাকালেই কলকাতায় ধরা পড়েছিল। তারপরও বঙ্গবন্ধুর সরল বিশ্বাসে মন্ত্রিপরিষদেও সে ঠাঁই পেয়েছিল। মোশতাক যেমন মুজিবনগর সরকারের অংশী, মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক, তেমনি এক সময়ের পাকিস্তান সামরিক গোয়েন্দা বিভাগের সদস্য জিয়াউর রহমানও মুক্তিযোদ্ধা, সেক্টর কমান্ডার। তারা দুজনই বঙ্গবন্ধু হত্যাকারীদের পৃষ্ঠপোষক এবং সমর্থক।

জিয়া-মোশতাকের কার্যকলাপ থেকেই বঙ্গবন্ধুর খুনিদের সঙ্গে তাদের প্রত্যক্ষ সহযোগিতা দৃশ্যমান। ১৫ আগস্টের হত্যাকারীদের তারা সমর্থন করেছেন, ৩ নভেম্বর জেলহত্যার পর প্রাইজ পোস্টিং দিয়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশ মিশনে এসব ঘাতককে পুনর্বাসিত করেছিলেন। বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পরে অল্প সময় খন্দকার মোশতাক প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব পালন করার সুযোগ পেয়েছিলেন। জিয়া সেনাবাহিনীর প্রধান হিসেবে পদোন্নতি নিয়ে হয়েছিলেন সেনাবাহিনী প্রধান।

১৫ আগস্টের হত্যাকারীদের বিচার বন্ধ করতে জারি করা ইনডেমনিটি অধ্যাদেশটি সংবিধানে লিপিবদ্ধও করেছিলেন জিয়াউর রহমান।

মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী জিয়ার মতো অনেকেরই স্খলন পরবর্তীকালে আমরা লক্ষ করেছি। যে কারণে জামায়াতে ইসলামীর সমর্থক মুক্তিযোদ্ধাদের (!) সমাবেশ-সম্মেলনও দেশবাসীকে দেখতে হয়েছে! অথচ একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে জামায়াত শুধু বিরোধিতাই করেনি, পাক বাহিনীর সশস্ত্র সহায়ক শক্তি হয়ে আলবদর বাহিনী গঠন করে তারা অস্ত্রহাতে যুদ্ধ করেছে, মুক্তিযোদ্ধাদের রক্তে বাংলার মাটি সিক্ত করেছে।

বঙ্গবন্ধু হত্যার পূর্বাপর ঘটনার দিকে তাকালে দেখা যাবে, ঘাতকচক্র তাকে তখনই হত্যার সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করে ফেলেছে, যখন তিনি সমাজতান্ত্রিক অর্থনৈতিক সমাজকাঠামোয় বাংলাদেশকে নিয়ে যেতে শুরু করেন, অর্থাৎ কৃষক এবং শ্রমিকের রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশকে গড়ে তোলার জন্য তিনি বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগ গঠনের মধ্য দিয়ে প্রশাসন এবং অর্থনীতি নতুন বিন্যাসে পুনর্গঠন  করছিলেন।

পুঁজিপতি, ভূস্বামী, সামরিক-বেসামরিক আমলা থেকে শুরু করে ঔপনিবেশিক শাসন শোষণের দর্শনে বিশ্বাসীরা বঙ্গবন্ধুর এই কৃষক-শ্রমিকের ক্ষমতায়ন বা রাষ্ট্র প্রশাসন ব্যবস্থা মেনে নিতে পারেননি। আর মার্কিন পরাশক্তি তো আগে থেকেই বিরূপ ছিল বঙ্গবন্ধুর ওপর। কারণ, সোভিয়েত এবং ভারতের সমর্থনপুষ্ট হয়ে মুক্তিযুদ্ধ করেছিলেন বঙ্গবন্ধুর আদর্শে অনুপ্রাণিত বাংলার সংগ্রামী জনতা। যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশ পুনর্গঠনেও সোভিয়েত ইউনিয়নের নানামুখী সহযোগিতা গ্রহণ করেছিলেন বঙ্গবন্ধুর সরকার। এমনকি বঙ্গবন্ধু সরকার সংবিধানে  চার নীতির স্তম্ভের অন্যতম স্তম্ভ করেছিলেন সমাজতন্ত্র।

যে কারণে রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ যেমন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেনরি কিসিঞ্জারের চোখের বালি ছিল, নেতা হিসেবে বিশ্বের দুজন মানুষকে তিনি চরম শত্রু বিবেচনা করতেন, একজন চিলির প্রেসিডেন্ট আলেন্দে এবং বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী স্বাধীনতার স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। এই দুই নেতা খুব কাছাকাছি সময়ে আততায়ীর হাতে নির্মমভাবে নিহত হন।

এ প্রসঙ্গে উল্লেখ করতে হয়, কিশোর বয়স থেকেই শ্রেণিচেতনা বঙ্গবন্ধুর মধ্যে জাগ্রত ছিল। কৈশোরে তিনি রুশ বিপ্লবের অভিঘাতে সৃষ্ট বিশ্ববাস্তবতা উপলব্ধি করতে সক্ষম হয়েছিলেন। ১৯১৭ সালে বলশেভিক বিপ্লব সফল হলে সমগ্র পৃথিবীতে এমনকি এই উপমহাদেশেও তার প্রবল প্রভাব সৃষ্টি হয়। কাজী নজরুল ইসলামের মতো কবি কমিউনিস্ট দর্শনে উজ্জীবিত হয়ে শ্রেণি-সংগ্রামের কবিতা লিখেছেন, শ্রমজীবী দরিদ্র মানুষের মুক্তির বাণী তার কাব্যে গানে ছড়িয়ে দিয়েছেন।

বঙ্গবন্ধু তার কৈশোরেই দেখেছেন শোষণ-বঞ্চনায় দরিদ্র কৃষক শ্রমিকের দুঃখ দুর্ভোগ। তাদের ক্ষমতায়িত করবার স্বপ্ন তার মনে দোলা দিয়েছিল রাজনীতিতে আসার আগেই। যে কারণে শীতার্ত মানুষকে নিজের গায়ের চাদর খুলে দান করে দেওয়া, পিতার গোলার ধান দরিদ্র মানুষের মধ্যে বিতরণ করা- এসবের পেছনে তার মূল প্রেরণা ছিল শোষণমুক্ত সমতার সমাজ গঠনের আকাঙ্ক্ষা। যে কারণে পাকিস্তানি দুঃশাসনের বিরুদ্ধে তার মূল অভিযোগ ছিল অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিক বৈষম্য। শোষণহীন সমাজ গঠন করে বাংলার দুঃখী মানুষের মুখে হাসি ফোটানো, অন্ন-বস্ত্র-বাসস্থানসহ তাদের মৌলিক অধিকারগুলো আদায় করে বাংলার মানুষকে মর্যাদাবান জাতি হিসেবে গড়ে তোলাই ছিল তার আজীবন সাধনা।

১৯৭২ থেকে ১৯৭৫ সাল। মাত্র তিনটি বছর। এরইমধ্যে তিনি এ সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছেন দেশে নতুন অর্থ ব্যবস্থা তথা নতুন প্রশাসনিক কাঠামো বিনির্মাণ করবেন। বঙ্গবন্ধু বুঝেছিলেন, ঔপনিবেশিক প্রশাসনিক কাঠামোতে দরিদ্র মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তন সম্ভব নয়। তাই তিনি নয়া ব্যবস্থা তথা দ্বিতীয় বিপ্লবের ডাক দিয়েছিলেন। কিন্তু গরিব দুঃখী মানুষের জন্য অর্থনৈতিক সমতার সমাজ গঠনের আকাঙ্ক্ষা বঙ্গবন্ধু বাস্তবায়ন করে যেতে পারেননি। তার আগেই তাঁকেও ঠিক আলেন্দের মতোই প্রাণ দিতে হলো।

বঙ্গবন্ধুকে হত্যার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ প্রবেশ করে আবার সেই পাকিস্তানি রাজনৈতিক দর্শন কবলিত অন্ধকার পথে। বঙ্গবন্ধু নিষিদ্ধ করেছিলেন ধর্মের রাজনীতি, কিন্তু আবারও চালু হলো সেটি। তার বিষফল আজ ভোগ করছে এই দেশ। জঙ্গিবাদ মৌলবাদ আজ বাংলাদেশকে ভয়ংকর ঝুঁকির মুখে ঠেলছে। দেশকে বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা হিসেবে গড়ে তোলার ক্ষেত্রে প্রধান অন্তরায় উঠেছে এই ধর্মান্ধতার সংঘর্ষ এবং ষড়যন্ত্রের রাজনীতি।

জাতির পিতার সুযোগ্য কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশকে অর্থনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে যেভাবে এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছেন, তার সেই অগ্রযাত্রার পথে প্রধান বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে পশ্চাৎপদতার অন্ধ রাজনীতি, যার কবর মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে রচনা করেছিলেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।

এই লেখার শুরুতেই ১৭ আগস্টের কথা, ২১ আগস্টের কথা উল্লেখ করেছিলাম। ১৫ আগস্টের হত্যাকাণ্ড না ঘটলে এ দেশে মৌলবাদ জঙ্গিবাদ আর তালেবানি রাজনীতির সমর্থক গোষ্ঠী সৃষ্টি হতে পারতো না। বিএনপি-জামায়াতের শাসনামলে সারাদেশে একযোগে ৬৩ জেলায় বোমার বিস্ফোরণ ঘটিয়ে জঙ্গিরা জানান দিয়েছিল তাদের শক্তিমত্তা। জঙ্গি বাংলাভাইদের ব্যাপক উত্থান ঘটেছিল ২০০১ থেকে ২০০৬ সালের মধ্যে! ২০০১ সালে নির্বাচনের আগে চারদলীয় জোটের জনসভা থেকেই ছাত্রশিবির-ছাত্রদল যৌথভাবে স্লোগান তুলেছিল: ‘আমরা হবো তালেবান/বাংলা হবে আফগান’। সেই স্লোগানের ফল আমরা দেখেছি চারদলীয় জোটের শাসনামলে! ওই আমলে আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনাসহ দলের শীর্ষ নেতাদের একযোগে হত্যার লক্ষ্যে রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস দেখেছিলেন দেশবাসী বঙ্গবন্ধু এভিনিউস্থ দলীয় কার্যালয়ের সামনের সন্ত্রাসবিরোধী সমাবেশে। ২০০৪ সালের ২১ আগস্টের ভয়াবহ সেই গ্রেনেড হামলার নৃশংসতার শোকাবহ কলঙ্কিত স্মৃতি কোনও দিন মুছে যাবে না দেশবাসীর মন থেকে। এর সবকিছুর মূলে ওই ১৫ আগস্ট।

নববর্ষে বোমা হামলা বলুন, হলি আর্টিজান হামলা বলুন, দেশের বিভিন্ন স্থানে বিদেশি নাগরিক, ধর্মযাজক, পুরোহিত হত্যার মাধ্যমে দেশকে বিপদে ফেলার ষড়যন্ত্র আর গোপন তালিবানি সন্ত্রাসের রাজনীতিই বলুন, সবকিছুর মূলেই বাংলাদেশের পথ হারানো ১৯৭৫ সালের আগস্ট ট্র্যাজেডি। ১৫ আগস্ট হত্যাকাণ্ড না হলে বাংলাদেশে কখনও জঙ্গিবাদ, মৌলবাদ বাসা বাঁধতে পারতো না।

১৫ আগস্ট অতিক্রান্ত। একাধিক শোক আর লজ্জার ঘটনা বেদনার কাঁটা হয়ে বিঁধে থাকবে আমাদের মর্মলোকে। বঙ্গবন্ধু হত্যার প্রত্যক্ষ ঘাতকদের বিচার হয়েছে, একদিন নেপথ্য ষড়যন্ত্রকারীদের মুখোশ উন্মোচিত হবে। কিন্তু যে ভয়ংকর ক্ষতি হয়ে গেছে দেশের, সেই ক্ষত মোছা যাবে না কোনোদিন। জানি না বিভাজিত জাতি কবে আবার ঐক্যবদ্ধ হতে পারবে। দেশে বহু পথ বহু দলমতের রাজনৈতিক বিরোধিতা থাকবে, কিন্তু লাখো শহীদের রক্তস্নাত মুক্তিযুদ্ধ, স্বাধীনতা ও বঙ্গবন্ধু- এই অবিতর্কিত বিষয়টিকে একই অবস্থান থেকে দেখার মতো রাজনীতি কবে দেশে সূচিত হবে জানি না। সেই পরিবর্তিত রাজনীতি ছাড়া দেশের ঐক্যবদ্ধ উন্নয়নের পথে যাত্রা সুদূরপরাহত।

বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর মৃত্যুর কয়েক মাস আগে তার জন্মদিন উপলক্ষে লিখেছিলেন বিখ্যাত প্রবন্ধ ‘সভ্যতার সংকট’। যে ইংরেজদের শিক্ষা-সংস্কৃতি, সাহিত্য আর ভদ্রতা-নম্রতা, সৌজন্যবোধ যৌবনে তাকে মুগ্ধ করেছিল, জীবন সায়াহ্নে সেই ইংরেজ তথা ব্রিটিশ শাসকদের ঔদ্ধত্য, ভারতবর্ষকে শাসনে-শোষণে জর্জরিত করা আর দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে তাদের উন্মাদনায় হতাশ রবীন্দ্রনাথ আক্ষেপ করে লিখেছিলেন:

‘ভাগ্যচক্রের পরিবর্তনের দ্বারা একদিন না একদিন ইংরেজকে এই ভারত সাম্রাজ্য ত্যাগ করে যেতে হবে। কিন্তু কোন ভারতবর্ষকে সে পিছনে ত্যাগ করে যাবে? কী লক্ষ্মীছাড়া দীনতার আবর্জনাকে?’

বিশ্বকবির এই আক্ষেপকে একটু ঘুরিয়ে আমরাও প্রশ্ন করতে পারি, ১৯৭৫ সালে সপরিবার বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর ৪৬ বছর চলে গেছে। ঘাতকদের বিচার হয়েছে। কিন্তু ১৫ আগস্ট বাংলাদেশের মর্মমূলে যে কলঙ্কের ক্ষত সৃষ্টি করে গেছে, সেই কলঙ্কিত আবর্জনা কি আমরা এখনও সাফ করতে পেরেছি! নাকি কোনও দিন পারবো? আমাদের জীবনে কি তা দেখে যেতে পারবো? এটাই হচ্ছে ১৫ আগস্টের ট্র্যাজিক ঘটনার সবচেয়ে ভয়ংকর ক্ষত।

লেখক: কবি ও সিনিয়র সাংবাদিক। সাবেক পরিচালক (বার্তা), বাংলাদেশ টেলিভিশন।

/এসএএস/এমওএফ/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

বাংলা ট্রিবিউনের সর্বশেষ
পুতিনের সাহায্য চাইলো শ্রীলঙ্কা
পুতিনের সাহায্য চাইলো শ্রীলঙ্কা
জেলের জালে ৩১ কেজির বাগাড়
জেলের জালে ৩১ কেজির বাগাড়
ঈদে বাড়ি ফেরার পথে মোটরসাইকেল আরোহী নিহত
ঈদে বাড়ি ফেরার পথে মোটরসাইকেল আরোহী নিহত
সমর্থন হারালেও লড়াই জারি রাখার প্রতিশ্রুতি বরিস জনসনের
সমর্থন হারালেও লড়াই জারি রাখার প্রতিশ্রুতি বরিস জনসনের
সর্বশেষসর্বাধিক

লাইভ