X
বুধবার, ২৯ জুন ২০২২
১৫ আষাঢ় ১৪২৯

মাহবুব তালুকদারের ‘এজেন্ডা’ কী?

আপডেট : ১৪ জানুয়ারি ২০২২, ১৯:২১

আমীন আল রশীদ প্রধান নির্বাচন কমিশনার কে এম নুরুল হুদা তাঁর সহকর্মী নির্বাচন কমিশনার মাহবুব তালুকদারের বিরুদ্ধে একটি গুরুতর অভিযোগ করেছেন যে তিনি এজেন্ডা বাস্তবায়নের জন্য মিথ্যা কথা বলেন।

৬ জানুয়ারি রাজধানীর সোনারগাঁও হোটেলে এক কর্মশালা শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে সিইসি বলেন, ‘মাহবুব তালুকদার মিথ্যাচার করেন। তিনি উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বক্তব্য দেন। হয়তো তাঁর কোনও এজেন্ডা আছে, সেটা বাস্তবায়নের জন্য তিনি এমন বক্তব্য দেন। একেকটা সময় একেকটা শব্দ চয়ন করেন। ছেড়ে দেন মিডিয়ায় প্রচার করার জন্য। এই কথাগুলো অপ্রাসঙ্গিক। অপ্রচারমূলক কথা। নির্বাচন কমিশনকে অপবাদ দেওয়া কথা।’

এর আগের দিন, অর্থাৎ ৫ জানুয়ারি পঞ্চম ধাপের ইউপি নির্বাচন পর্যবেক্ষণ শেষে নির্বাচন কমিশনার মাহবুব তালুকদার বলেন, ‘সন্ত্রাস ও সংঘর্ষ যেন ইউপি নির্বাচনের অনুষঙ্গ হয়ে উঠেছে। এখন ভোটযুদ্ধে যুদ্ধ আছে, ভোট নেই। ইউপি নির্বাচনে এখন উৎসবের বাদ্যের বদলে বিষাদের করুণ সুর বাজছে। নির্বাচন ও সন্ত্রাস একসঙ্গে চলতে পারে না।’ মূলত তাঁর এই বক্তব্যের বিষয়ে সাংবাদিকরা প্রতিক্রিয়া জানতে চাইলে সিইসি তাঁর সহকর্মী মাহবুব তালুকদারের বিরুদ্ধে মিথ্যাচার ও এজেন্ডা বাস্তবায়নের এই অভিযোগ আনেন।

একটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ ব্যক্তি তাঁর একজন সহকর্মীর বিরুদ্ধে যে ‘মিথ্যাচার’ ও ‘এজেন্ডা’ বাস্তবায়নের অভিযোগ এনেছেন, সেখানে অনেক প্রশ্ন আছে। পাঠকের মনে থাকার কথা, গত ২ মার্চ ‘জাতীয় ভোটার দিবসের’ অনুষ্ঠানে নির্বাচন কমিশনার মাহবুব তালুকদার বলেন, ‘বহুদলীয় গণতন্ত্রের জন্য নির্বাচনের যে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড ও ভারসাম্য রক্ষিত হওয়ার প্রয়োজন ছিল, তা হচ্ছে না। এককেন্দ্রীয় নির্বাচনে স্থানীয় নির্বাচনের তেমন গুরুত্ব নেই, নির্বাচনে মনোনয়ন লাভই এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। স্থানীয় নির্বাচনেও হানাহানি, মারামারি, কেন্দ্র দখল, ইভিএম ভাঙচুর ইত্যাদি মিলে এখন একটা অনিয়মের মডেল তৈরি হয়েছে।’ তখনও মাহবুব তালুকদারের এই বক্তব্যকে ‘ব্যক্তিগত স্বার্থ’ ও ‘উদ্দেশ্যপ্রণোদিত’ বলে মন্তব্য করেছিলেন সিইসি।

স্মরণ করা যেতে পারে, এর আগেও তিনি বিভিন্ন বিষয়ে একাধিকবার ‘নোট অব ডিসেন্ট’ দিয়েছেন। সিটি নির্বাচনে এমপিদের প্রচারণা, জাতীয় নির্বাচনে ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন বা ইভিএম ব্যবহারে আপত্তি জানিয়েছিলেন। এমনকি কমিশন বৈঠক থেকে বেরিয়েও গেছেন।

কিন্তু মাহবুব তালুকদারের বিরুদ্ধে ব্যক্তিগত স্বার্থের যে অভিযোগ করছেন স্বয়ং সিইসি, সেটি খুব ভয়ংকর এ কারণে, সাংবিধানিক পদে থেকে কেউ যেমন ক্ষমতাসীন দলের স্বার্থ রক্ষা করতে পারেন না, তেমনি বিরোধী দলেরও না। তারা দেশের স্বার্থ রক্ষা করার শপথ নিয়ে চেয়ারে বসেন। ফলে প্রশ্ন হলো, বর্তমান নির্বাচন কমিশন কতখানি দেশের স্বার্থ রক্ষা করতে পারছে আর কতখানি দলের?

বর্তমান নির্বাচন কমিশনের মেয়াদ শেষ হচ্ছে আগামী ১৪ ফেব্রুয়ারি। কিন্তু এই কমিশন গঠনের পর থেকেই নানাবিধ কর্মকাণ্ডে প্রতিষ্ঠানটি আলোচনা-সমালোচনা ও বিতর্কের মুখে পড়েছে। বিশেষ করে নির্বাচন কমিশনার মাহবুব তালুকদার শুরু থেকেই তাঁর বাকি চার সহকর্মীর সঙ্গে নিজের সুস্পষ্ট পার্থক্য তৈরি করে করেছেন। তাঁর কথাবার্তা এবং নির্বাচনের নানা বিষয় নিয়ে তার অবস্থান ছিল অন্যদের চেয়ে ভিন্ন এমনকি বিপরীতমুখী, যা নির্বাচন কমিশনকে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও ভাবমূর্তি প্রশ্নের মুখে ফেলেছে। সঙ্গত কারণে তাকে নিয়ে বিব্রত হয়েছেন তাঁর বাকি চার সহকর্মী, বিশেষ করে প্রধান নির্বাচন কমিশনার—সে কথা তিনি নিজেও বিভিন্ন সময়ে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে বলেছেন।

শুরুতে মাহবুব তালুকদারের এই অবস্থানকে গণতান্ত্রিক বা ভিন্নমতের সৌন্দর্য হিসেবে দেখা হলেও ধীরে ধীরে এটি স্পষ্ট হয়েছে যে, নির্বাচন কমিশনের মতো অতি গুরুত্বপূর্ণ একটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের ভেতরেই আসলে ঐকমত্য নেই। অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ এবং সর্বজনগ্রাহ্য নির্বাচন পরিচালনার জন্য কমিশনারদের মধ্যে যে ধরনের ঐক্য এবং দৃঢ়তা থাকার কথা, সেটি বর্তমান কমিশনে অনুপস্থিত ছিল—সেটি মাহবুব তালুকদারের কথায় বারবার প্রমাণিত হয়েছে।

কিন্তু যখনই এই বিষয়গুলো সামনে এসেছে, তখনই প্রধান নির্বাচন কমিশনার তাঁর বিরুদ্ধে মিথ্যাচার এবং এজেন্ডা বাস্তবায়নের অভিযোগ এনেছেন। প্রশ্ন হলো, মাহবুব তালুকদারের এজেন্ডা আসলে কী?

সর্বজনগ্রাহ্য তথা গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠানের আকাঙ্ক্ষা থেকে যদি মাহবুব তালুকদার ওই কথাগুলো বলে থাকেন, তাহলে বলতে হবে, তাঁর এজেন্ডা ভালো এবং জনবান্ধব তথা গণতন্ত্রের জন্য সহায়ক। কিন্তু এর বাইরে তাঁর আর কী এজেন্ডা থাকতে পারে? তাঁর বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময়ে যে অভিযোগ আনার চেষ্টা হয়েছে বা ইঙ্গিত করা হয়েছে যে তিনি ‘বিএনপির লোক’ বা পরোক্ষভাবে আওয়ামী লীগের বিরোধী শক্তির পক্ষে কাজ করছেন এবং এটিই যদি তার এজেন্ডা হয়, তাহলে এটিও গুরুতর অভিযোগ। কারণ, নির্বাচন কমিশনের মতো একটি সাংবিধানিক ও পবিত্র জায়গায় বসে কোনও ব্যক্তি বিশেষ কোনও দলের পক্ষে তা বিশেষ কোনও দলের প্রতি অনুরক্ত হয়ে দায়িত্ব পালন করতে পারেন না। এমনকি ক্ষমতাসীন দলের পক্ষেও না। কারণ, নির্বাচন কমিশনের দায়িত্ব হচ্ছে ভোটের জন্য এমন পরিবেশ সৃষ্টি করা যাতে সব প্রার্থী প্রচারের জন্য সমান সুযোগ পান; স্থানীয় প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী নির্বাচন কমিশনের কথার বাইরে একচুলও নড়ার সাহস পাবে না; রিটার্নিং ও প্রিজাইডিং কর্মকর্তারা কোনও দলের বা বিশেষ কোনও প্রার্থীর পক্ষে কাজ করবেন না বা করার সাহস দেখাবেন না; প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের এজেন্টরা নির্ভয়ে কেন্দ্রে থাকতে পারবেন এবং সর্বোপরি ভোটাররা নির্ভয়ে ও আনন্দচিত্তে ভোটকেন্দ্রে গিয়ে গোপন বুথে কোনও ধরনের বাধাবিপত্তি ছাড়াই ঢুকে পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দিয়ে নিরাপদে বাড়িতে পৌঁছাতে পারবেন। ভোটের পরেও পরাজিত প্রার্থী বা তার কর্মী-সমর্থকরা হামলা-মামলার শিকার হবেন না। এই বিষয়গুলো নিশ্চিত করাই গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের মানদণ্ড।

এখন প্রশ্ন হলো, বর্তমান নির্বাচন কমিশনের গত পাঁচ বছরে যত জাতীয় এবং স্থানীয় সরকার নির্বাচন হয়েছে, সেখানে এই শর্ত বা মানদণ্ডগুলো কতটা রক্ষিত বা অনুসরণীয় হয়েছে? যদি না হয়, তাহলে তার বিরুদ্ধে যদি কোনও নির্বাচন কমিশনার অবস্থান নেন, সমালোচনা করেন, তাহলে তাকে সাধুবাদ দেওয়াই কি সঙ্গত নয়?

মনে রাখা দরকার, নির্বাচন কমিশনার হলেও তিনি নিজেও একজন ভোটার। অর্থাৎ কোনও দলের প্রতি তারও পক্ষপাত থাকাই স্বাভাবিক। সুতরাং, তর্কের খাতিরে যদি এটি ধরেও নেওয়া হয় যে, জনাব তালুকদার বিএনপিকে ভালোবাসেন বা জাতীয় নির্বাচনে ভোট দেওয়ার সুযোগ থাকলে তিনি বিএনপির প্রার্থীকেই ভোট দেবেন, তারপরও সুষ্ঠু নির্বাচনের স্বার্থে যদি তিনি কোনও পদ্ধতি, কর্মকাণ্ড বা নীতির সমালোচনা করেন—তাহলে সেটি কি তার অপরাধ? এটিকে কি মিথ্যাচার কিংবা তার এজেন্ডা বলে এড়িয়ে যাওয়া যাবে?

প্রধান নির্বাচন কমিশনার তাঁর সহকর্মী মাহবুব তালুকদারের বিরুদ্ধে যে ‘এজেন্ডা বাস্তবায়নে’র অভিযোগ এনেছেন, সেটি অভিযোগ হিসেবে অত্যন্ত গুরুতর। কারণ, অভিযোগটি কোনও রাজনৈতিক দল কিংবা নেতার তরফে আসেনি। অভিযোগটি করেছেন তিনি যে সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানে দায়িত্ব পালন করছেন, তার শীর্ষ ব্যক্তি।

অতএব, এই অভিযোগকে নিতান্তই পলিটিক্যাল সুইপিং কমেন্ট হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বরং অভিযোগটি আমলে নিয়ে তদন্ত হওয়া দরকার যে, আসলেই তাঁর ‘এজেন্ডা’ কী? কারণ একটি সাংবিধানিক পদে থাকা শীর্ষ ব্যক্তি তাঁর একজন সহকর্মীর বিরুদ্ধে মিথ্যাচার এবং এজেন্ডা বাস্তবায়নের অভিযোগ আনবেন এবং এটি নিয়ে রাষ্ট্র নীরব থাকবে—সেটি হতে পারে না।

আগামী ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি নতুন পাঁচ জন ব্যক্তি নির্বাচন কমিশনের দায়িত্ব গ্রহণ করবেন, যাদের মধ্যে একজন হবেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার। তাঁদের অধীনেই হবে আগামী অর্থাৎ দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। সুতরাং, যে কমিশনটি পুরো মেয়াদকালে নিজেদের মধ্যে অনৈক্য আর নির্বাচনি ব্যবস্থায় নানা রকম অপ্রীতিকর ও অগণতান্ত্রিক কর্মকাণ্ডের কারণে বিতর্কিত হয়েছে, নতুন কমিশনেও তার যেন পুনরাবৃত্তি না ঘটে, বরং দক্ষ, সৎ, যোগ্য, আন্তরিক, দলনিরপেক্ষ এবং সাহসী—এরকম পাঁচ জন লোকের নেতৃত্বে আগামী পাঁচ বছর নির্বাচন কমিশনের মতো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানটি পরিচালিত হবে—এটিই জনগণের প্রত্যাশা।

বর্তমান সিইসি তাঁর সহকর্মী মাহবুব তালুকদারের বিরুদ্ধে যে এজেন্ডা বাস্তবায়নের অভিযোগ করছেন, ভবিষ্যতে তার ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া কী হবে— তা এখনই আন্দাজ করা না গেলেও একটি অবাধ, সুষ্ঠু এবং সর্বজনগ্রাহ্য নির্বাচনের পরিবেশ সৃষ্টি করাই নির্বাচন কমিশনের প্রধান এজেন্ডা হওয়া উচিত। কিন্তু সেই এজেন্ডা বাস্তবায়নে বর্তমান কমিশন কতটা সফল, তার নির্মোহ বিশ্লেষণও জরুরি।

 

লেখক: কারেন্ট অ্যাফেয়ার্স এডিটর, নেক্সাস টেলিভিশন।

/এসএএস/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

বাংলা ট্রিবিউনের সর্বশেষ
প্রেমিকার ছোটবোনকে হত্যা, যুবকের আমৃত্যু কারাদণ্ড
প্রেমিকার ছোটবোনকে হত্যা, যুবকের আমৃত্যু কারাদণ্ড
দুর্বৃত্তের গুলিতে হত্যা মামলার আসামি নিহত
দুর্বৃত্তের গুলিতে হত্যা মামলার আসামি নিহত
মমতাজের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা স্থগিত
মমতাজের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা স্থগিত
ইউপি সদস্যকে ডেকে নিয়ে গুলি করে হত্যা
ইউপি সদস্যকে ডেকে নিয়ে গুলি করে হত্যা
সর্বশেষসর্বাধিক

লাইভ