X
সকল বিভাগ
সেকশনস
সকল বিভাগ

আশ্বাস বিশ্বাস পাবে তো?

আপডেট : ২৮ জানুয়ারি ২০২২, ১৭:৪৯

রেজানুর রহমান অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে সিলেট শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্বেগজনক পরিস্থিতির কিছুটা হলেও উন্নতি হয়েছে। শিক্ষার্থীরা শেষ পর্যন্ত আমরণ অনশন ভেঙেছেন। এ জন্য বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ, জনপ্রিয় লেখক মুহম্মদ জাফর ইকবাল ও তাঁর স্ত্রী ইয়াসমিন হককে সাধুবাদ জানাই। দুজনই বিশ্ববিদ্যালয়টির সাবেক শিক্ষক। সরকারের উচ্চ পর্যায়ের সম্মতি পেয়ে রাতেই সড়ক পথে ঢাকা থেকে সিলেটের উদ্দেশে রওনা দেন তাঁরা। ভোরে সিলেটে পৌঁছান। ইতোমধ্যে বিভিন্ন প্রচারমাধ্যম বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে খবর ছড়িয়ে যায় প্রিয় শিক্ষক মুহম্মদ জাফর ইকবাল বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে আসছেন। আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি অনশনরত শিক্ষার্থীরাও অপেক্ষার প্রহর গুনতে থাকেন। সবার মাঝে আশার আলো দেখা দেয়। এবার হয়তো কিছু একটা হবে।

শেষ রাতে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে পৌঁছান মুহম্মদ জাফর ইকবাল ও তাঁর স্ত্রী ইয়াসমিন হক। সরাসরি চলে যান অনশনরত শিক্ষার্থীদের কাছে। এসময় আবেগঘন পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়। প্রিয় শিক্ষক ও শিক্ষিকাকে কাছে পেয়ে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের অনেকে আনন্দে ও ভরসায় হাউমাউ করে কেঁদে ফেলেন। একটানা ৮ দিন আমরণ অনশনে ছিলেন শিক্ষার্থীরা। অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন অনেকে। এরমধ্যে অনেকেই তাদের সঙ্গে দেখা করতে এসেছিলেন। বিশ্ববিদ্যালয়টির শিক্ষকরাও দলবেঁধে এসে শিক্ষার্থীদের অনশন ভাঙার অনুরোধ করেছেন। আওয়ামী লীগের স্থানীয় নেতৃবৃন্দও শিক্ষার্থীদের আমরণ অনশন ভাঙার অনুরোধ করার পরও কোনও কাজ হয়নি। শিক্ষার্থীরা কারও প্রতিই আস্থার পাশাপাশি বিশ্বাস খুঁজে পাচ্ছিলেন না। অবশেষে আস্থা ও বিশ্বাস জোগালেন প্রিয় শিক্ষক মুহম্মদ জাফর ইকবাল। আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের অনেকেই মুহম্মদ জাফর ইকবাল ও ইয়াসমিন হককে কাছে পেয়ে আনন্দে জড়িয়ে ধরে হাউমাউ করে কেঁদেছেন। মনে হচ্ছিলো বাবা-মাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদছেন তারা। শিক্ষক-শিক্ষিকা তো এক অর্থে বাবা-মা। তাহলে অনশনের এই দীর্ঘযাত্রায় সম্মানিত আর কোনও শিক্ষক-শিক্ষিকা ছাত্রছাত্রীদের পাশে দাঁড়াতে পারলেন না কেন?

‘শিক্ষক-শিক্ষিকা ছাত্রছাত্রীদের কাছে পিতা-মাতার সমান’। এই সত্যটি অন্যরা কেন প্রমাণ করলেন না?

সিলেট শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ঘটনা সত্যিকার অর্থে দেশে শিক্ষক-শিক্ষার্থীর সম্পর্কের ক্ষেত্রে অনেক প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। বিশেষ করে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিতর্কিত ভিসির পক্ষ নিয়ে দেশের অন্য ৩৪টি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসির একযোগে পদত্যাগের হুমকি শিক্ষক-শিক্ষার্থীর মধুর সম্পর্ককে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। শিক্ষার্থীরা শিক্ষকদের কাছে সন্তানতুল্য। তারা ভুল করলেও বাবা-মায়ের আসনে অধিষ্ঠিত সম্মানিত শিক্ষকদের বোধকরি এমন কাজ করা উচিত নয়, যাতে গুরু-শিষ্যের সম্পর্ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

আবারও ধন্যবাদ জানাই প্রিয় শিক্ষক, লেখক মুহম্মদ জাফর ইকবালকে। শাহজালালের শিক্ষার্থীরা যখন আমরণ অনশনের ডাক দেয় তখনই ভেবেছিলাম শিক্ষক-কর্মকর্তা এমনকি সরকারের মধ্যেও কি এমন কেউ নেই, যিনি বা যারা এসে শিক্ষার্থীদের বুঝিয়ে অনশন ভাঙাতে পারেন। মাননীয় শিক্ষামন্ত্রীর আরও আন্তরিক ভূমিকা আশা করেছিলাম। ঢাকা থেকে সিলেটে আসা তার জন্য বোধকরি কঠিন ব্যাপার ছিল না। বরং তিনি সিলেটে যাননি। অনশনরত শিক্ষার্থী যারা মারাত্মক অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিল তাদের চিকিৎসা বন্ধ করে দেওয়ার ঘোষণা শুনে ভয় পেয়েছি। পাছে না শিক্ষার্থীদের কারও জীবনের ক্ষতি হয় এই আশঙ্কা হচ্ছিলো। বারবার মনে হচ্ছিলো প্রিয় শিক্ষক মুহম্মদ জাফর ইকবালের কথা। তিনি কেন নিশ্চুপ! অবশ্য ইতোমধ্যে তাঁর একটি লেখা পড়েছি বিভিন্ন প্রচারমাধ্যমে। শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের পক্ষেই বলেছেন তিনি। কিন্তু তিনিও কি শিক্ষার্থীদের পাশে গিয়ে দাঁড়াতে পারেন না? নিজেকে এই প্রশ্ন করেছি বহুবার। অবশেষে এলো সেই সুসংবাদ। মুহম্মদ জাফর ইকবাল সস্ত্রীক ক্যাম্পাসে গেলেন। তাঁর ওপর ভরসা করে শিক্ষার্থীরা অনশন ভেঙেছে। তবে তারা আন্দোলন চালিয়ে যাবে বলে ঘোষণা দিয়েছে।

এখন প্রশ্ন হলো, প্রিয় শিক্ষক মুহম্মদ জাফর ইকবাল এই যে শিক্ষার্থীদের আশ্বাস দিয়ে অনশন ভঙ্গ করালেন তার ভবিষ্যৎ কী? আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের অন্যতম দাবি হলো শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান ভিসির পদত্যাগ। তারা বর্তমান ভিসিকে আর ক্যাম্পাসে দেখতে চায় না। শিক্ষামন্ত্রী বলেছেন, শিক্ষার্থীদের সব দাবি মেনে নেওয়া হবে। সব দাবির মধ্যে ভিসির পদত্যাগ কী গুরুত্ব পাবে? বিভিন্ন পত্রিকা বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ইতোমধ্যে পরস্পরবিরোধী খবর ও তথ্য প্রচার হতে শুরু করেছে। দেশের প্রথম সারির দুটি দৈনিক পত্রিকার শিরোনাম একেবারেই বিপরীতমুখী বার্তা ছড়িয়েছে। একটি পত্রিকা লিখেছে, ‘ঝুলেই থাকছে ভিসির পদত্যাগ’। আরেকটি পত্রিকা লিখেছে, ‘ভিসিকে রেখেই সমাধান’। অন্য একটি পত্রিকা খবরের শিরোনাম করেছে ‘শাবি উপাচার্যকে সরানো হচ্ছে।’ একটি পত্রিকায় মুহম্মদ জাফর ইকবালের বরাত দিয়ে খবরের শিরোনাম করা হয়েছে। জাফর ইকবাল বলেছেন, ‘এভাবে যিনি পদ আঁকড়ে থাকেন তিনি দানব’। স্পষ্টতই বোঝা যায় তিনি শাহজালালের বর্তমান ভিসিকে উদ্দেশ করেই কথাটা বলেছেন। যদি তা-ই হয় তাহলে দানব কেন একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের নেতৃত্ব দেবেন?

দানব, মানব প্রসঙ্গের চেয়ে বড় কথা হলো আশ্বাসের বিশ্বাস। যে আশ্বাস দিয়ে শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের অনশন ভঙ্গ করানো হয়েছে তা যেন বিশ্বাসে পরিণত হয়। একই সঙ্গে শিক্ষক-শিক্ষার্থীর মধুর সম্পর্ক অর্থাৎ গুরু-শিষ্যের সম্পর্ক জোরদার করা জরুরি। মুহম্মদ জাফর ইকবালকে কেন আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা গুরুত্ব দিলো? কেন তাঁর কথা শুনলো? মুহম্মদ জাফর ইকবাল নিশ্চয়ই ফেরেস্তা নন। তিনিও মানুষ। সবচেয়ে বড় কথা তিনি শিক্ষক হিসেবে শিক্ষার্থীদের বন্ধু হতে পেরেছেন বন্ধুত্বে। আস্থায় বিশ্বাস সৃষ্টি হয়। বিশ্বাস পোক্ত হয়। আর তাই শিক্ষাঙ্গনে শিক্ষক-শিক্ষার্থীর বন্ধুত্ব আরও বেগবান হোক, এটাই সময়ের দাবি।

লেখাটি যখন শেষ করবো ভাবছি তখনই একটি সূত্র জানালো, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান ভিসিকে বাধ্যতামূলক ছুটিতে পাঠানোর প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। আশ্বাস তাহলে সত্যি সত্যি বিশ্বাসে রূপ নিচ্ছে। শুভ সংবাদ।

লেখক: কথাসাহিত্যিক, নাট্যকার, সম্পাদক- আনন্দ আলো

/এসএএস/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

উত্ত্যক্তের প্রতিবাদ করায় চুরির অপবাদে নারীকে লাঠিপেটা
উত্ত্যক্তের প্রতিবাদ করায় চুরির অপবাদে নারীকে লাঠিপেটা
সাপের বিষ থেকে বাঁচতে ট্যাবলেট, কলকাতায় মিলছে সাফল্য
সাপের বিষ থেকে বাঁচতে ট্যাবলেট, কলকাতায় মিলছে সাফল্য
ষষ্ঠ ওয়ালটন প্রেসিডেন্ট কাপ গলফ টুর্নামেন্টের পুরস্কার বিতরণ
ষষ্ঠ ওয়ালটন প্রেসিডেন্ট কাপ গলফ টুর্নামেন্টের পুরস্কার বিতরণ
সুন্দরবনে মাছ ধরা ও পর্যটক প্রবেশে তিন মাসের নিষেধাজ্ঞা
সুন্দরবনে মাছ ধরা ও পর্যটক প্রবেশে তিন মাসের নিষেধাজ্ঞা
সর্বশেষসর্বাধিক

লাইভ