X
শনিবার, ২০ এপ্রিল ২০২৪
৬ বৈশাখ ১৪৩১

পুতিনের যবনিকা

কাজী আনিস আহমেদ
১৭ মার্চ ২০২২, ১৮:৪০আপডেট : ১৭ মার্চ ২০২২, ২০:০১

কাজী আনিস আহমেদ

২৪ ফেব্রুয়ারি ভোরে রুশ সেনারা যেদিন ইউক্রেনের মাটিতে অভিযান শুরু করে, সেদিন পুতিন কিন্তু নিজেরও শেষ অধ্যায়ের পরোয়ানায় সই করে দিয়েছেন। দুঃখের বিষয়, ইউক্রেনীয়দের জন্য পরিসমাপ্তিটা যত জলদি জলদি দরকার তত জলদি আসবে না। তাদের বিশাল ক্ষতিতে পড়তে হবে। যা থেকে বাদ যাবে না খোদ রাশিয়াও।

বিজ্ঞজনেরা খুব তাড়াতাড়ি বলে দিয়েছেন, পুতিনকে নির্ঘাত ভীমরতিতে ধরেছে। একইসঙ্গে তথাকথিত গ্লোবাল লেফট ও গ্লোবাল সাউথ-এর পণ্ডিতরা তোতাপাখির মতো রুশ প্রপাগান্ডাই আওড়ে বেড়াচ্ছেন: তারা (ইউক্রেন) নিজেরাই এ দুর্দশা ডেকে এনেছে (ন্যাটোর সখ্যকে ইঙ্গিত করে)— তারা সত্যিকার অর্থে কোনও জাতি নয়; ইত্যাদি।

এটা ঠিক যে বার্লিন দেয়ালের পতনের পর পশ্চিমা বিশ্ব ওয়ারশ প্যাক্টের দেশগুলোর খোলনলচের ভেতরে ঘুঁটে বেড়াচ্ছিল। কিন্তু তারা ইউক্রেনকে ন্যাটোতে নিয়ে আসার প্রক্রিয়াগত কোনও কাজকর্ম কখনও শুরু করেনি। এখন যদি আমরা ‘প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের’ প্রসঙ্গ টেনে আনতে চাই (প্রতিশ্রুতিটা লিখিত হোক আর অলিখিত)— তবে এটাও বলতে হবে যে ইউক্রেনও কিন্তু রুশ নিরাপত্তার চাদরে মাথা গোঁজার বিনিময়ে পারমাণবিক অস্ত্র থেকে সরে দাঁড়িয়েছিল। 

অধিকন্তু, ন্যাটোর বিস্তারের ভয়ে ২০০৮ সালে জর্জিয়ায় ও ২০১৪ সালে ইউক্রেনে হামলা করেছিল রাশিয়া। দুই দেশেরই কিছু ভূখণ্ড অবৈধভাবে ধরে রেখেছেন পুতিন। পশ্চিমাদের পিছু হটার জন্য এগুলোই যথেষ্ট ছিল, তারা তা করেছেও। যে কারণে নিকট অতীতে নতুন করে আর তেমন কিছু ঘটতে দেখা যায়নি। তাই, আগ্রাসনের জন্য ঠিক এ সময়টাকে বেছে নেওয়াটাকে বলা যায়, পুতিনের গোয়ার্তুমির এ যুদ্ধের গ্রহণযোগ্য কোনও অজুহাত নেই।

এরচেয়েও বেশি বিরক্তিকর যে ইউক্রেন জাতি হিসেবে যথেষ্ট বৈধতা পায়নি, কারণ  ইউক্রেন দীর্ঘদিন রাশিয়ার অংশ ছিল। সেই বিবেচনায় তো অনেক রাষ্ট্রেরই রাতারাতি সার্বভৌমত্ব হারিয়ে বসার কথা! 

আপাতত ইউক্রেনিয়ানদের দুর্দশার কারণেই এই যুদ্ধ থামানো দরকার। কিন্তু এখানে আদর্শজনিত একটা পয়েন্ট ওত পেতে বসে আছে—সার্বভৌমত্ব। যার কারণে এ যুদ্ধ কিছুটা ভিন্ন। ইরাকে আমেরিকার যুদ্ধের মতো এটাও একটা অহেতুক যুদ্ধ। কিন্তু প্রথম থেকেই পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছিল যে ইরাকে আমেরিকার যুদ্ধটা কোনও কিছু দখল করার তাগিদে শুরু হয়নি। তথাপি, যুদ্ধে মারা যাওয়া লাখ লাখ ইরাকি ও দুর্দশায় ভুগতে থাকা আরও কোটি কয়েক মানুষের জন্য ওই যুক্তি কোনও স্বস্তিদায়ক ব্যাপার নয়। তবে আমেরিকান সেনারা কিন্তু এখন আর ইরাকে নেই। বিপরীতে রাশিয়া কিন্তু ইউক্রেনে থেকে যাওয়ারই চিন্তা করছে। জর্জিয়া ও ইউক্রেনের একটা অংশে তারা ইতোমধ্যে তাদের অভিপ্রায় প্রমাণ করেছে। 

পুতিন যেভাবে সার্বভৌমত্বের নীতিটাকেই ঝাঁকি দিয়ে দিয়েছেন, তারপরও খুব জোর একটা মধ্যম শক্ত দেশ হিসেবে বাংলাদেশিরা কোন যুক্তিতে তাকে সমর্থন করেন না, আমার কাছে আদৌ বোধগম্য নয়।

একজন বাংলাদেশি  হিসেবে আমি নিজেকে খানিকটা বিব্রতকর অবস্থায় দেখতে পাচ্ছি। একাত্তরে আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় গণহত্যাকারী পাকিস্তানি জেনারেলদের অস্ত্র দিয়ে আমেরিকা শুরু থেকেই ভুল পক্ষ নিয়েছিল। তখন আবার তৎকালীন সোভিয়েত ছিল আমাদের পাশে। তারপরও আমি কোনও সার্বভৌম দেশে এমন বর্বরোচিত আচরণ সহ্য করতে পারি না। কারণ, এটা আমার দেশের জন্যেও একটা বিপজ্জনক প্রিসিডেন্স তৈরি করে।

বস্তুত, পশ্চিমাদের কূটনীতির বাহাস পুতিনকে খেপিয়ে তুলেছে, এমনটা মনে করাও হবে ডাহা ভুল। যদি তাকে (পুতিনকে) কোনও কিছু সত্যিই উসকানি দিয়ে থাকে তবে সেটা হলো জর্জিয়া, ক্রিমিয়া ও সিরিয়ায় আগেকার হামলাগুলোর সময় তাদের মিনমিনে প্রতিক্রিয়া।

আবার এটা ভুলে গেলেও চলবে না যে রাশিয়ার অনেকেই কিন্তু এই জঘন্য যুদ্ধ নিয়ে এক ধরনের আতঙ্কে আছে। যুদ্ধটা শুরুর পর থেকেই হাজারো রুশ দেশ ছেড়েছে। তারা নিজেদের পুতিনের যুদ্ধের হিস্যা মনে করে না। সামনে যে অর্থনৈতিক বিপর্যয়টা আসছে, তারা সেটার কারণে ভুগতে চায় না। তারা আবার সেই আয়রন কারটেইন (স্নায়ুযুদ্ধের সময় ইউরোপজুড়ে থাকা রাজনৈতিক সীমারেখা)-এর আড়ালে পড়তে চায় না। তারা এমন কোনও অবস্থায় পড়তে চায় না, যা কিনা সামরিক শাসনেরই নামান্তর। 

কিন্তু পুতিন কী করে এত বড় ভুল অঙ্ক কষলেন? মসনদে বসা অনেক ক্ষমতাশালীর মতো সম্ভবত বয়স ও দীর্ঘমেয়াদের শাসনকাল তাকেও অসহিষ্ণু বানিয়ে ছেড়েছে। যে কারণে বেশ দুর্বল গোয়েন্দা তথ্য আসছে তার কাছে। যার কারণে একক কোনও প্রেক্ষাপট থেকে চোখ ফেরানোর ব্যাপারে রীতিমতো অন্ধ হয়ে আছেন পুতিন। তিনি ভুলে গিয়েছিলেন যে বাইডেন কিন্তু বুশ, ওবামা বা ট্রাম্প নন (তিন জনই ছিলেন পররাষ্ট্রনীতিতে তিন রকম বিপর্যয়ের কারণ— তবে তা ভিন্ন পরিস্থিতিতেই)। পররাষ্ট্র নীতিতে সময়ের পরীক্ষায় উত্তীর্ণদের মধ্যে আজকের বিশ্বনেতাদের মধ্যে বাইডেনই কিন্তু সবচেয়ে পরিপক্ব। ইরাক ও আফগানিস্তান থেকে পুরোপুরি সরে আসার কারণে এখন ‘কঠিন’ সিদ্ধান্তের জন্য বাইডেনের হাতে ব্যান্ডউইথও আছে পর্যাপ্ত। এমনকি সেটা অসামরিক কোনও পদক্ষেপ হলেও।

ন্যাটোর কাছ ইউক্রেনের আরও বেশি পেশিশক্তি চাওয়া—সেটা সামরিকই হোক— তা আমাদের বোধগম্য। কিন্তু পশ্চিমারা যদি ওই পথ ধরে, তবে পরিস্থিতি আরও খারাপের দিকে যাওয়ার জন্য তাদেরকেই  দোষারোপ করা হবে! এদিকে রাশিয়ার জ্বালানির ওপর জার্মানির নির্ভরতার কারণে এটা বোঝা যাচ্ছে না যে, এ অবরোধ কত দূর গড়াবে ও কত দ্রুত কাজ করবে। তবে এখনই অবরোধের যে রূপ আমরা কার্যকর দেখছি, তা কয়েক সপ্তাহ আগেও ছিল কল্পনাতীত। 

এখানে ট্র্যাজেডিটা হলো, নিজের মানুষকে যতই মূল্য দিতে হোক না কেন, পুতিন কিন্তু পিছু হটছেন না। একজন একনায়ক শাসকের কাছে এটাই হলো ‘পদগর্ব’। সামনের দিনগুলোতে যে কিয়েভে ট্যাংকের বহর চলতে শুরু করবে, তা এক প্রকার নিশ্চিত। ইউক্রেনের বেশিরভাগ ভূখণ্ডের সামরিক নিয়ন্ত্রণও হয়তো নিয়ে নিতে পারবে রাশিয়া। তবে এই জয়ের এমন চড়া মূল্য অবশ্যম্ভাবী হয়ে দাঁড়াবে যে তা পুতিনের যবনিকা টেনে আনতে পারে। 

পুতিন আজীবন একটা অভিলাষের তাড়নাতেই আছেন—সম্মান। বার্লিন দেয়ালের পতনের পর তিনি ও তার জাতি যে লজ্জাকর পরিস্থিতিতে ছিল, সেটাই মূলত তাকে গড়েপিটে নিয়েছে। তিনি রাশিয়াকে কাঙ্ক্ষিত এক প্রতিপত্তি ও ক্ষমতার স্তরে নিয়ে যেতে পেরেছেন। অথচ নিয়তির কী পরিহাস! তার অহেতুক বাগাড়ম্বর আবার রাশিয়াকে রাতারাতি কতটা নিচে নামিয়ে দিলো, দারিদ্র্যেও নিমজ্জিত করবে নিশ্চিত।

রাশিয়ার জনগণ একা চাইলেই কিন্তু ওপরের দিকে কোনও পরিবর্তন আনতে পারবে না। তবে তারাই আবার রাশিয়ার একমাত্র সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী নয়। এটা সবাই জানে যে দেশটির জাতীয় নিরাপত্তা, প্রতিরক্ষা ও নেতাদের নিয়ে গঠিত ‘সিলোভিকি’ এখানে বড় একটা ফ্যাক্টর। পুতিন এই মুহূর্তে এটা দেখতে পাচ্ছেন না যে অর্থনৈতিক বিপর্যয় একটি দমনমূলক রাষ্ট্রেও অভ্যুত্থান ডেকে আনতে পারে। ওই ‘সিলোভিকি’ যে তাদের যার যার অবস্থানের প্রভাব-প্রতিপত্তি নিয়ে অন্ধের মতো বসে থাকবে এমন সম্ভাবনাও ক্ষীণ। 

বৈদেশিক তহবিলের অর্ধেকটা আটকে পড়ায় ঋণখেলাপি হওয়ার দ্বারপ্রান্তে আছে রাশিয়া। অর্থনীতি যতই কুঁকড়ে আসবে, ততই কমবে ট্রেজারি। পর্যায়ক্রমে সরকারকে পেনশন ও বেতন দিতে হিমশিম খেতে হবে। শেষবার যখন এমনটা হয়েছিল, সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে টুকরো টুকরো হয়েছিল। সিলোভিকি কি ঘটনা অতদূর গড়াতে দেবে? এমন সম্ভাবনাও নগণ্য।

আর এমন বেপরোয়া আচরণ করে যেতে থাকলে পুতিন তার বাধ্যতামূলক অবসরটাকেই ত্বরান্বিত করবেন। এ অবস্থায় পরমাণু বোমার সুইচের দিকে হাত বাড়ানো কিংবা ন্যাটোর ওপর হামলার ছক কষা—পুতিনের কাছের লোকরাই ভাবতে পারে, এটা অনেক বেশি বেশি হয়ে যাচ্ছে।

ইতোমধ্যে পুতিন তার গোটাকতক গোয়েন্দা প্রধানকে চাকরিচ্যুত করেছেন। অভিযোগ? তারা নাকি পরিকল্পনা অনুযায়ী কাজ করেনি। সেটা পরিকল্পনা, নাকি ইউক্রেন নিয়ে তার ব্যক্তিগত ফ্যান্টাসি? এই রাষ্ট্রযন্ত্র ওরফে রাশিয়ায় অন্যরাও কি চাকরিচ্যুত হওয়ার অপেক্ষা করবেন? নাকি একটা পর্যায়ে তারা আর পুতিনের মূর্খতার বলি হতে নারাজি জানাবেন?

আপাতত, আশা করতে পারি যে আজ হোক বা কাল, রাশিয়ার এলিট কাতারের কয়েকজন সাহসী ও বুঝদার লোক এগিয়ে আসবেন। বিশ্বে ন্যায়বিচার-প্রত্যাশীদের একটা কোরাস শোনা যাচ্ছে—যারা কিনা অচিরেই পুতিনকে হেগের আদালতে দেখতে চান । এটা অবশ্য অলীক কল্পনা (পুতিনের বেলায় এমনটা হলে, বুশের বেলায় নয় কেন?)। অবশ্য যদি পুতিনের উত্তরসূরির ভেতর খানিকটা রসবোধ থেকে থাকে, তবে তিনি পুতিনকে সোচির (রুশ রিসোর্ট) একখানা ডাচায় (ছোট কটেজ) আটকে রাখবেন। আর এটাকেই তিনি ভয় পান, তিনি এমন শাস্তিরই যোগ্য—মৃত্যুর চেয়েও যা বেশি যন্ত্রণার।

তবে আবার এমনটা ভাবলে চলবে না যে পশ্চিমপন্থী কোনও রিফর্মর পুতিনের বিকল্প হবেন। এটা বরং ভালোই। আমরা যা চাই ও যা অতিসত্বর দরকার—এহেন বোধবুদ্ধিহীন ধ্বংসযজ্ঞের সমাপ্তি। প্রথমত, একটি যুদ্ধবিরতি এবং তারপর এমন একটি আপস—যা কিনা বস্তুত কাউকেই খুশি করবে না। তথাপি, যা এনে দেবে একটা স্থায়ী শান্তির বাতাবরণ। 

লেখক: প্রকাশক, বাংলা ট্রিবিউন; সহ-পরিচালক, ঢাকা লিট ফেস্ট। 

/এফএ/এসএএস/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

বাংলা ট্রিবিউনের সর্বশেষ
দাবদাহে ট্রাফিক পুলিশ সদস্যদের তরল খাদ্য দিচ্ছে ডিএমপি
দাবদাহে ট্রাফিক পুলিশ সদস্যদের তরল খাদ্য দিচ্ছে ডিএমপি
জাপানি ছবির দৃশ্য নিয়ে কানের অফিসিয়াল পোস্টার
কান উৎসব ২০২৪জাপানি ছবির দৃশ্য নিয়ে কানের অফিসিয়াল পোস্টার
ড্যান্ডি সেবন থেকে পথশিশুদের বাঁচাবে কারা?
ড্যান্ডি সেবন থেকে পথশিশুদের বাঁচাবে কারা?
লখনউর কাছে হারলো চেন্নাই
লখনউর কাছে হারলো চেন্নাই
সর্বশেষসর্বাধিক

লাইভ