X
সোমবার, ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৪
১৩ ফাল্গুন ১৪৩০

কতদূর যেতে পারবে বিএনপি?

আবদুল মান্নান
১১ মে ২০২৩, ১৮:২৯আপডেট : ১১ মে ২০২৩, ১৮:২৯

সরকার প্রধান ও আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা ১৫ দিন বিদেশ সফর শেষ করে গত ৯ তারিখ দেশে ফিরেছেন। তিনি জাপান ও যুক্তরাষ্ট্র সফর শেষে ব্রিটেনের রাজা চার্লস-৩ ও রানির অভিষেক অনুষ্ঠানে যোগ দিয়েছেন। এই সফরগুলো রাষ্ট্রীয় সফর, যদিও যুক্তরাষ্ট্র সফরটি ছিল ওয়াশিংটনে অবস্থিত বিশ্বব্যাংক প্রেসিডেন্টের আমন্ত্রণে। বাংলাদেশ ও বিশ্বব্যাংক তাদের সম্পর্কের পঞ্চাশ বছর পালন উপলক্ষে আয়োজিত বেশ কিছু অনুষ্ঠানে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী যোগ দিয়েছেন।  জাপান সফর ছিল সেই দেশের প্রধানমন্ত্রীর আমন্ত্রণে। নির্বাচনের আর কয়েক মাস বাকি। এই সময় প্রধানমন্ত্রীর ১৫ দিন বিদেশে থাকা বাংলাদেশের জন্য বেশ তাৎপর্যপূর্ণ। তাৎপর্যপূর্ণ কারণ নিয়মিত বিএনপি ও তার ডান-বাম ও ওয়ানম্যান পার্টির নেতারা ঘোষণা করে জানিয়ে দেন কখন শেখ হাসিনার সরকারের পতন হচ্ছে আর কখন তিনি দেশ থেকে পালিয়ে যাচ্ছেন।

প্রতি ঈদের আগে একটা নির্ধারিত সময় থাকে। বিএনপি’র এক সিনিয়র নেতা ঘোষণা করেছিলেন ১০ ডিসেম্বর বেগম খালেদা জিয়া ক্ষমতায় আসছেন। দেশে ফিরছেন তারেক রহমান। অনেকে সাফারি স্যুটের অর্ডারও দিয়ে রেখেছিলেন। ৯ তারিখ রাতে আমার পরিচিত অনেকের ঘুম হয়নি। গেলো ঈদের পর সরকারের পতন ঘটিয়ে শেখ হাসিনাকে দেশছাড়া করার আর একটি সুযোগ এসেছিল। ১৫ দিনের জন্য তাঁর দেশে অনুপস্থিত থাকা কাজে লাগানো যেতো। পারেনি বিএনপি ও তার মিত্ররা। সেই সামর্থ্য তাদের তেমন একটা নেই।

জাপান সফর করার আগে বাংলাদেশ ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক অবস্থান বা ভূমিকা কী হবে তার একটি রূপরেখা ঘোষণা করে। এই ঘোষণার সময়টুকু খুবই গুরুত্বপূর্ণ। গুরুত্বপূর্ণ এই কারণেই, ইতোপূর্বে একটি চতুর্দেশীয় জোট গঠন করা হয়েছে যার নাম ‘কোয়াড’। এই জোটে আছে যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া, জাপান ও ভারত। যদিও এই জোটকে দেখা হয় সহযোগিতার ও কৌশলগত জোট হিসেবে, তথাপি এটা বুঝতে অসুবিধা হয় না এটি মূলত চীনকে কিছুটা কোণঠাসা করার চেষ্টা। এখন এটি পরিষ্কার যে এশিয়া প্রশান্ত অঞ্চলে চীনের প্রভাব দ্রুতগতিতে বৃদ্ধি পাচ্ছে। ২০৫০ সাল নাগাদ চীন যুক্তরাষ্ট্রকে টপকে বিশ্বের এক নম্বর অর্থনীতির দেশ হবে বলে আশা করা হচ্ছে। আফ্রিকা ও এশিয়া অঞ্চলে চীনের প্রভাব বাড়বে দ্রুতগতিতে। ইউরোপে যুদ্ধের কারণে সব চেয়ে লাভবান হয়েছে চীন আর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। দেশটি এখন অর্থনৈতিকভাবে একটি অস্বস্তিকর অবস্থায় আছে। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য থেকে খাবারের দাম বৃদ্ধি পেয়েছে দেড় থেকে দুইগুণ। সরকারিভাবে মুদ্রাস্ফীতি বৃদ্ধি হয়েছে ১০ থেকে ১৫ ভাগ। বেসরকারিভাবে ১৫ হতে ২০ ভাগ। ক’দিন আগে যুক্তরাষ্ট্রে কিছু সময় কাটিয়ে দেশে ফিরেছি। সেখানে থাকাকালে আমার এক বন্ধুর সঙ্গে একটি বড় শহরের সুপার শপে গিয়েছিলাম। সেখানে বাংলাদেশ ভারত ভিয়েতনামের প্রচুর সবজি পাওয়া যায়। কলমি শাক ১৪ ডলার কেজি (এখানে পাউন্ড হিসেবে কিনতে হয়), আর ঢেঁড়স ৮ ডলার। খাসির মাংস ১৪ ডলার থেকে ২০ ডলার। বন্ধুর স্ত্রী বলে ‘ভাই আপনারা দেশে ভালো আছেন। সেখানে দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি পেলে প্রেস ক্লাবের সামনে মাইক বেঁধে সরকার আর শেখ হাসিনার চৌদ্দগোষ্ঠী উদ্ধার করা যায়। এখানে তা করা সম্ভব নয়। তখন বাড়িতে এসে কলকাতার বাংলা সিরিয়াল দেখি। অবসর সময়ে মাসের বাজেটের হিসাব মেলাতে বসি।’

প্রায় দুই বছর আগে শুরু করা বিএনপি আর তার মিত্ররা শেখ হাসিনা হঠাও আন্দোলন শুরু করেছিল। শুরুতে তারা হুঙ্কার ছেড়েছিল আর মাত্র ক’দিনের অপেক্ষা, তারপর শেখ হাসিনা দেশ ছেড়ে পালাচ্ছেন। একজন খুদে নেতা তো আগাম জানিয়ে দিয়েছিলেন শেখ হাসিনা পালানোর জন্য বিমানবন্দরে বিশটি স্যুটকেস পাঠিয়ে দিয়েছেন। একজন সাবেক আওয়ামী লীগ নেতা প্রতিদিন সকালে উঠে ঘোষণা করেন, এই একটু টোকা দিলেই সরকার পড়ে যাবে। এসব টোকাটুকির মধ্যে নির্বাচনের দিন প্রায় সমাগত। আর কয়েক মাস পর নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা হবে। সামনে কোরবানির ঈদ। তারপর বর্ষাকাল। তো বিএনপি ও তার মিত্ররা কেন এখনও সক্ষম হতে পারলো না তাদের সরকার ফেলে দেওয়ার লক্ষ্য অর্জনে? আদৌ কি পারবে তাদের লক্ষ অর্জনে? না পারলে কেন পারবে না? এসব প্রশ্ন সচেতন রাজনৈতিক মহলে ঘোরাফেরা করছে।

বাংলাদেশ তার স্বাধীনতার ৫৩ বছর অতিক্রম করছে। এতদিনে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় একটি শক্ত ভিত গড়ে ওঠার প্রয়োজন ছিল, যা হয়ে ওঠেনি। এর কারণ নানাবিধ। প্রথম কারণ দেশ স্বাধীন হওয়ার সাড়ে তিন বছরের মাথায় জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা করা এবং পরবর্তীকালে ঘাতক দলের সদস্যদের রাষ্ট্রীয়ভাবে পুরস্কৃত করা। তার চেয়ে আরও ভয়াবহ ছিল সব ঘাতককে সাংবিধানিকভাবে দায়মুক্তি দেওয়া, যা ইতিহাসে নজিরবিহীন। আর এই কাজটি করেছিলেন বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা বঙ্গবন্ধুর কৃপাধন্য জেনারেল জিয়া। তার হাত ধরেই বাংলাদেশে হত্যা আর দায়মুক্তির রাজনীতি শুরু। জিয়া ১৯৭৫ সাল থেকে ১৯৮১ সাল পর্যন্ত বন্দুকের জোরে দেশ শাসন করেছেন নিজেই। তিনি নিজেই নিজেকে রাষ্ট্রপতি ঘোষণা করেছেন। একাধারে তিনি রাষ্ট্রপতি, সেনাপ্রধান ও প্রধান সামরিক আইন প্রশাসকের দায়িত্ব পালন করেছেন। অবসরের পর তিনি নিজেই নিজেকে পেছনের তারিখ দিয়ে পদোন্নতি দিয়েছেন। ত্রিশ লক্ষ শহীদের রক্তে লিখিত দেশের সংবিধানকে নিজের ব্যক্তিস্বার্থে সংশোধন করেছেন। সংবিধান পরিবর্তন করে ‘জাতীর মুক্তির জন্য ঐতিহাসিক সংগ্রামের মাধ্যমে’ অস্বীকার করে ‘জাতীয় স্বাধীনতার জন্য ঐতিহাসিক যুদ্ধ’ সংবিধানে প্রতিস্থাপন করেছেন। সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত রাষ্ট্রের চার মূলনীতি থেকে ‘ধর্মনিরপেক্ষতা’ বাদ দিয়ে বাংলাদেশকে একটি সাম্প্রদায়িক রাষ্ট্রে পরিণত করেছেন। যেসব দল ও ব্যক্তি বাংলাদেশের জন্মের বিরোধিতা করেছিল তাদের শুধু দেশে রাজনীতি করার দ্বারই উন্মুক্ত করেননি, তাদের রাষ্ট্রের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে পদায়ন করেছেন। এটি অবিশ্বাস্য, যে ব্যক্তি বাংলাদেশের বিরোধিতা করতে পাকিস্তানের পক্ষে জাতিসংঘে সাফাই গাইতে গিয়েছিলেন সেই শাহ আজিজকে জিয়া দেশের প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব দিয়েছেন। পরবর্তীকালে দেশের রাজনীতি কখনও আর উঠে দাঁড়াতে পারেনি, বরং খারাপের চেয়ে খারাপ হয়েছে। জিয়ার স্ত্রী বেগম জিয়ার আমলে রাজনীতিতে সন্ত্রাস, জঙ্গিবাদ, অস্ত্র চোরাচালানের লাগামহীনভাবে অনুপ্রবেশ ঘটেছে। রাজনীতি সঠিক পথে চলতে ব্যর্থ হয়েছে। এই ব্যর্থতার দায় একান্তভাবে রাজনৈতিক দলগুলোর তো বটেই, তবে তার সিংহভাগ দায়দায়িত্ব বিএনপিকেই নিতে হবে। কারণ, এই দলটি দীর্ঘদিন দেশ শাসন করেছে। এই দীর্ঘদিনে বিএনপিই একটি সুষ্ঠু ধারার রাজনৈতিক দল হয়ে উঠতে পারতো, যা হয়নি আর এই না হওয়ার পেছনে একমাত্র কারণ দলটির ক্ষমতাকেন্দ্রিক রাজনীতি করার অদম্য স্পৃহা। রাজনীতি করলে সব সময় যে ক্ষমতায় থাকতে হবে সেই বিশ্বাসের ওপর বিএনপি কখনও উঠতে পারেনি। দেশের বৃহত্তম ও প্রাচীনতম রাজনৈতিক দল বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ এক চরম বৈরী রাজনৈতিক পরিবেশে ১৯৪৯ সালে জন্ম নিয়েছিল। জন্ম থেকে শুরু করে এই দলটি নানা চড়াই উতরাই পাড়ি দিয়েছে। নিষিদ্ধ হয়েছে একাধিকবার। দলের নেতানেত্রীরা কারাগারে কাটিয়েছে বছরের পর বছর। বঙ্গবন্ধু পাকিস্তানের তেইশ বছরে প্রায় তের বছর কারাগারে কাটিয়েছেন। মৃত্যুর মুখোমুখি হয়েছেন অন্তত দুবার, কিন্তু কখনও তিনি জনগণের রাজনীতি হতে দূরে সরে আসেননি বা আপস করেননি। তিনি পরাজিত হয়েছেন শুধু একবার, তাও নিজের দলের ভিতরের ষড়যন্ত্রকারীদের কাছে। পরাজিত হয়েছেন বটে আত্মসমর্পণ করেননি।

জন্ম যেখানে যেভাবেই হোক না কেন সব ভুল শুধরে অতীত থেকে শিক্ষা নিয়ে বিএনপি হয়ে উঠতে পারতো একটি সুষ্ঠু ধারার রাজনৈতিক দল, যদি তারা তেমন রাজনীতি করতো। তা  করতে কখনও তারা প্রস্তুত ছিল না। কারণ, তেমনটা করলে কখনও কখনও রাজনীতি বা ক্ষমতা হতে ছিটকে যেতে হয়। দলটি না যতটা রাজনৈতিক দল তারচেয়েও এটি হয়ে উঠেছে একটি সৌখিন রাজনীতিবিদ ও কুলীনদের ক্লাব। এই ক্লাবে সদস্য হয়েছেন বাম ডানের রাজনীতিবিদ, সাম্প্রদায়িক অপশক্তি, কালো টাকার মালিক, অসৎ ব্যবসায়ী, দুর্নীতিবাজ সামরিক-বেসামরিক আমলা আর ক্ষমতালোভী পেশাদার, যাদের একমাত্র উদ্দেশ্য ক্ষমতার কাছাকাছি থেকে ক্ষমতার উচ্ছিষ্ট ভোগ করা। দলটি কোনও একটি রাজনৈতিক দর্শনের ওপর কখনও দাঁড়ানোর চেষ্টা করেনি। পারেনি জনগণের কাছে আসতে। যে সুযোগ পেয়েছিল তা কাজে লাগাতে ব্যর্থ হয়েছে তারা। দেশে বাম ঘরানার রাজনৈতিক দলগুলো হয়ে উঠতে পারতো সঠিক অর্থে জনগণের রাজনৈতিক দল, কিন্তু তা তারা পারেনি। তাদের সেই সুযোগ করে দিয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু দেশ স্বাধীন হওয়ার পর। বর্তমান প্রজন্মের অনেকে হয়তো জানেন না পাকিস্তানের তেইশ বছরে পাকিস্তানে কমিউনিস্ট পার্টি নিষিদ্ধ ছিল। মার্কস-অ্যাঞ্জেলসের  নাম নেওয়া ছিল হারাম। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর দেশে বামপন্থিদের রাজনীতি করার দ্বার উন্মুক্ত করে দিয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু। অথচ বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করার পর ঘাতকদের সঙ্গে তারাও উল্লাস প্রকাশ করেছিল। যোগ দিয়েছিল জিয়ার অপরাজনীতির সঙ্গে। যোগ দিয়েছিল তার মন্ত্রিসভায়। বর্তমানে তাদের একটি অংশ আবার সমবেত হয়েছে ‘শেখ হাসিনা হঠাও’ কর্মসূচিতে।

২০০৬ সালে ক্ষমতা থেকে বিতাড়িত হওয়ার পর হতেই বিএনপি মরিয়া যেকোনও উপায়ে তাদের হারানো সাম্রাজ্য ফিরে পেতে। তবে তা কীভাবে হবে তা তাদের কাছে পরিষ্কার নয়, যার ফলে তারা নানা ষড়যন্ত্র ও অপরাজনীতির মধ্যে পথ খুঁজে কানাগলিতে হারিয়ে গেছে। একটি রাজনৈতিক দলের ভবিষ্যৎ নির্ভর করে তার নেতৃত্বের ওপর। রাজনৈতিক দলের নেতৃত্বকে একটি জাহাজের ক্যাপ্টেনের সাথে তুলনা করা হয়। পথ চলতে আসবে অনেক ঝড়ঝঞ্ঝা। উঠবে তুফান। তা মোকাবিলা করে যে ক্যাপ্টেন জাহাজকে বন্দরে নিরাপদে নিয়ে আসতে পারেন তিনি সফল, তাতেই তার দক্ষতা ও বিচক্ষণতার পরিচয় মেলে। রাজনীতিতে এর স্বাক্ষর রেখেছেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব ও তাঁর কন্যা শেখ হাসিনা। বঙ্গবন্ধু নিহত হওয়ার পর আওয়ামী লীগ শুধু নিষিদ্ধই হয়নি, ছত্রভঙ্গও হয়ে গিয়েছিল। সেই ছত্রভঙ্গ আওয়ামী লীগকে একুশ বছর পর আবার ক্ষমতায় ফিরিয়ে এনেছিলেন বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা।

১৯৯৬ সালে যখন শেখ হাসিনা প্রথম সরকার গঠন করেন তখন তিনি রাষ্ট্র পরিচালনায় ছিলেন একজন শিক্ষানবিশ। পুরো প্রশাসন ছিল পূর্বের জিয়া ও এরশাদ সরকারের আমলে গড়ে ওঠা। পরিবেশ ছিল অত্যন্ত বৈরী। তা মোকাবিলা করে শেখ হাসিনা অত্যন্ত সফলভাবে রাষ্ট্র পরিচালনা করেছেন। সংবিধানকে তার পূর্বের অবস্থায় ফিরিয়ে নিয়ে গিয়েছেন। বঙ্গবন্ধুর ও জাতীয় চার নেতার খুনিদের বিচারের আওতায় এনেছেন। তাঁর আমলে দেশের অবকাঠামোগত উন্নয়নে নতুন মাত্রা যোগ হয়েছিল। সার্বিক অর্থনৈতিক ও সামাজিক খাতে পরিবর্তন আসতে শুরু করেছিল। তার মেয়াদ শেষ হলে তিনি শান্তিপূর্ণভাবে পরবর্তী সরকারের কাছ ক্ষমতা হস্তান্তর করেছিলেন। ২০০১ সালে বেগম খালেদা জিয়া নির্বাচিত হয়ে সরকার গঠন করলে দেশ আবার পূর্বের অপরাজনীতির ধারায় ফিরে গিয়েছিল।

২০০৮-এর পর পদ্মায় অনেক পানি গড়িয়েছে। বিএনপি নামক দলটি এখন চোরাগলির অন্ধকারে পথ খুঁজতে গিয়ে অনেকটা ক্লান্ত। ২০১৪ সালের নির্বাচনে অংশ নিলে দলটি রাজনৈতিকভাবে লাভবান হতো। তা তারা না করে নির্বাচন বানচাল করতে ভয়াবহ সন্ত্রাসের পথ বেছে নিয়েছিল। তারা এই নির্বাচনে অংশ নিয়ে হারতে চায়নি। রাজনীতিতে সবসময় জয়ী হতে হবে এমন চিন্তাধারা অপরিপক্ব চিন্তা। অথচ গণতান্ত্রিক রীতিনীতি মেনে সেই নির্বাচনে অংশ নিলে বিএনপি’র পক্ষে একটি সম্মানজনক সংখ্যক আসনে বিজয় লাভ করা অসম্ভব ছিল না। ২০০১ সালের নির্বাচনে অনেক অনিশ্চয়তার মধ্যেও আওয়ামী লীগ অংশ নিয়েছিল। তাতে তারা ক্ষমতায় যেতে পারেনি তা সত্য, কিন্তু তারা গণতান্ত্রিক ধারায় থেকে গিয়েছিল।

২০১৪ সালের নির্বাচনে অংশ না নেওয়া ছিল বিএনপি’র জন্য একটি আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত, যা তারা পরবর্তীকালে কিছুটা উপলব্ধি করেছে। সম্ভবত সেই উপলব্ধি থেকে তারা ২০১৮ সালের নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। এটি যদিও তাদের সঠিক সিদ্ধান্ত ছিল, কিন্তু তাদের ভুলটা ছিল নিজ নামে অংশ না নিয়ে ড. কামাল হোসেনকে নেতা মেনে কয়েকটি দলকে সঙ্গে নিয়ে জোটবদ্ধ হয়ে নির্বাচন করা। ড. কামাল হোসেন একজন আন্তর্জাতিক মানের প্রথিতযশা আইনজীবী তাতে কোনও সন্দেহ নেই, কিন্তু তিনি রাজনৈতিক নেতা নন। তাঁর রাজনীতিতে বেড়ে ওঠা বঙ্গবন্ধুর ছায়াতলে আর বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর তাঁর রাজনীতিও শেষ। তিনি হচ্ছেন বাংলাদেশের রাজনীতির একজন ট্র্যাজিক হিরো। তারপরও বিএনপি’র পক্ষে এই নির্বাচনে সম্মানজনক আসনে বিজয় লাভ করা অসম্ভব ছিল না। কিন্তু বাদ সাধলো বিএনপি’র ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক জিয়া। সে লন্ডনে বসে প্রত্যেক আসনে দুই থেকে তিন জনের কাছে নিলামে মনোনয়নপত্র বিক্রি করেছে, যার ফলে যা হওয়ার তাই হয়েছে। বিএনপি মাত্র সাতটি আসনে বিজয় লাভ করতে সক্ষম হয়েছে।

আওয়ামী লীগ ১৯৭৯ সালে জিয়ার অধীনে জাতীয় নির্বাচনে অংশ নিয়ে মাত্র ৩৯টি আসন নিয়ে সংসদে গিয়েছিল। তাতে তাদের কোনও ক্ষতি হয়নি। তখন শেখ হাসিনাও দেশে ছিলেন না। তারা এই ৩৯টি আসন নিয়ে সংসদে গিয়েছে, তাদের ভূমিকা রেখেছে। ১৯৮৬ সালে এরশাদের অধীনে নির্বাচন করে ৭৬টি আসনে বিজয় লাভ করে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ সংসদে গিয়েছে। কথা বলেছে। ১৯৯৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে অনুষ্ঠিত বিএনপি’র সাজানো নির্বাচন ছাড়া আওয়ামী লীগ জন্ম থেকে কখনও নির্বাচন বর্জন করেনি। সবসময় গণতান্ত্রিক ধারার সঙ্গে থেকেছে। তাতে তাদের লাভ হয়েছে। পরিচয় মিলেছে নেতৃত্বের দূরদর্শিতার, যা বিএনপির মধ্যে সম্পূর্ণ অনুপস্থিত। দুর্নীতির দায়ে দণ্ডিত হয়ে বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম জিয়া কারারুদ্ধ হলে দলের চেয়ারম্যান হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন তারই দণ্ডপ্রাপ্ত সন্তান তারেক জিয়া, যদিও এমন কোনও পদ বিএনপির গঠনতন্ত্রে নেই। অন্যদিকে বিএনপি’র গঠনতন্ত্রে আছে কেউ যদি ফৌজদারি মামলায় সাজাপ্রাপ্ত হন তিনি দলের সদস্যপদ হারাবেন। তারেক জিয়ার জন্য বিএনপি তাদের গঠনতন্ত্র পরিবর্তন করেছে।  তারেক শুধু অস্ত্র চোরাচালান মামলায় দণ্ডিত হননি, তিনি আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত একজন গডফাদার। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে তার প্রবেশ নিষিদ্ধ। তারেক বর্তমানে রাজনৈতিক আশ্রয়ে বাংলাদেশের নাগরিকত্ব পরিত্যাগ করে লন্ডনে সপরিবারে বসবাস করে। তবে তার বাংলাদেশবিরোধী কর্মকাণ্ড থেমে নেই। তার সঙ্গে পাকিস্তানের সামরিক গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই’র একটি নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে।

সাম্প্রতিককালে ইসরায়েলের কুখ্যাত গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদের সঙ্গে তার সম্পর্ক স্থাপিত হয়েছে। তারেকের ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণ যেকোনও বিবেকবান মানুষকে বিরক্ত করবে।

যখন ড. খোন্দকার মোশাররফ হোসেন বা ড. মঈন খানের মতো উচ্চশিক্ষিত মানুষ অথবা মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিনের মতো একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা তারেক জিয়ার বন্দনা গাইতে গাইতে অস্থির হয়ে যান, তখন তা দেখে যে কারও মনে তাদের জন্য সমবেদনা জন্ম দেবে। দলে বেশ কিছু রাজনীতিবিদ আছেন যাদের দলের নেতৃত্ব দেওয়ার মতো যোগ্যতা আছে। তারেক জিয়ার মতো একজন ব্যক্তিকে নেতা মেনে বিএনপি কতদূর যেতে পারবে তা তাদের ভেবে দেখতে হবে। একটি জাহাজ যতই আধুনিক সুযোগ সুবিধা থাকুক না কেন, তার কর্মক্ষমতা নির্ভর করে তার ক্যাপ্টেনের ওপর। তিনিই সেই জাহাজকে নিয়ে যেতে পারেন তার সঠিক গন্তব্যে। রাজনৈতিক দলতো বটেই, যেকোনও সংগঠনের ক্ষেত্রে একই কথা প্রযোজ্য। সামনের নির্বাচনকে সামনে রেখে বিএনপি এই বিষয়গুলো মাথায় রেখে পরিকল্পনা করলে ভালো করবে। কোনও আন্দোলনের মাথায় জন্ম থেকে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকার ক্ষমতাচ্যুত হয়নি, হয়েছে ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে। ইতিহাস তার সাক্ষী। এবারও তার ব্যত্যয় হওয়ার কোনও কারণ নেই।

আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র সব সময় চলমান। তা গতি পায় দলের ভেতর থেকে ইন্ধন এলে। সে ইন্ধন কি আসা থেমে গেছে? সার্বিক অবস্থা দেখে তা তো মনে হয় না।

লেখক: বিশ্লেষক ও গবেষক

/এসএএস/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

বাংলা ট্রিবিউনের সর্বশেষ
গণপিটুনিতে রেনু হত্যা: চার বছরেও শেষ হয়নি বিচার
গণপিটুনিতে রেনু হত্যা: চার বছরেও শেষ হয়নি বিচার
ফজল হাসানের সম্পাদনায় ‘বেন ওকরির শ্রেষ্ঠগল্প’
অমর একুশে গ্রন্থমেলা ২০২৪ফজল হাসানের সম্পাদনায় ‘বেন ওকরির শ্রেষ্ঠগল্প’
নিউইয়র্ক আন্তর্জাতিক বাংলা বইমেলা শুরু ২৪ মে
নিউইয়র্ক আন্তর্জাতিক বাংলা বইমেলা শুরু ২৪ মে
জাতিসংঘ পরিবেশ সম্মেলনে যোগ দিতে কেনিয়া যাচ্ছেন সাবের হোসেন চৌধুরী
জাতিসংঘ পরিবেশ সম্মেলনে যোগ দিতে কেনিয়া যাচ্ছেন সাবের হোসেন চৌধুরী
সর্বশেষসর্বাধিক

লাইভ