X
বৃহস্পতিবার, ২২ ফেব্রুয়ারি ২০২৪
৯ ফাল্গুন ১৪৩০

লাইব্রেরি চাই যত্রতত্র সর্বত্র

মাসুমা সিদ্দিকা
১২ অক্টোবর ২০২৩, ২১:৩৮আপডেট : ১২ অক্টোবর ২০২৩, ২১:৩৮

প্রতিটি মা-বাবার জীবনেই তাদের সন্তানেরা একটি বিশেষ জায়গা জুড়ে থাকে, তাদের সুষ্ঠু শারীরিক ও মানসিক বিকাশের জন্য প্রতিনিয়তই তারা চেষ্টা করে যান। ভাবতে থাকেন কীভাবে আরও বেশি উন্নত পরিবেশে তাদের সন্তানদের সুষ্ঠু বিকাশ সম্ভব হয়। আর সব বাচ্চাদের মানসিক বিকাশের পথে বইয়ের চেয়ে সহায়ক অন্য কিছু হতে পারে না।

বর্তমান যুগে আমাদের ছেলেমেয়েরা ইলেকট্রনিক্স ডিভাইসে আসক্ত হয়ে পড়েছে। স্কুলে যতক্ষণ থাকে শুধু ততক্ষণই যেন এই আসক্তি থেকে কিছুটা মুক্ত হয় তারা। সেটাও নেহায়েত বাধ্য হয়ে, স্বেচ্ছায় নয়, কিন্তু এই ইলেকট্রনিক্স ডিভাইসের বদলে আমরা তাদের হাতে বই তুলে দিতে পারি। কিন্তু নানা যৌক্তিক কারণে বা অজুহাতে বাঙালির বই কেনা নিয়ে নিরাসক্তির কথা তো আজ থেকে বহু আগেই সৈয়দ মুজতবা আলী ‘বই কেনা’ প্রবন্ধে লিখে গিয়েছেন-  এক ভদ্রমহিলা তাঁর স্বামীর একটা বই থাকায় তিনি আর দ্বিতীয় একটা বই কিনতে চাননি। বাঙালির বই কেনার টাকার অভাব থাকলেও সিনেমা দেখার টিকিট কাটা বা খেলার মাঠে দর্শক হিসেবে টিকিট কাটার টাকার তেমন একটা অভাব থাকে না- এটাও তিনি এই প্রবন্ধেই বলে গেছেন।

তবে দুর্মূল্যের এই বাজারে অনেক অভিভাবকের পক্ষেই পাঠ্য বইয়ের বাইরে তথাকথিত ‘আউট বই’ কিনে দেওয়া আর্থিকভাবেও হয়তো দুরূহ। এই ক্ষেত্রে বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের, বিশেষত স্কুল পর্যায়ের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের লাইব্রেরিকে আরও সক্রিয় করা প্রয়োজন।

এমনকি একটা লাইব্রেরিবিহীন কোনও স্কুলকে কর্তৃপক্ষের অনুমোদনই দেওয়া উচিত না। আর মফস্বল শহর বা গ্রাম-অঞ্চল তো দূরের কথা, এমনকি ঢাকা শহরেও বা বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পর্যাপ্ত লাইব্রেরি নেই এটা বলাই বাহুল্য। আবার কোনও কোনও ক্ষেত্রে লাইব্রেরি থাকলেও লাইব্রেরিয়ান বা যথাযথ অবকাঠামো বা স্কুল কর্তৃপক্ষের উদাসীনতায় লাইব্রেরি ব্যবহার না হয়ে স্কুলের আর দশটা আসবাব বা অবকাঠামোর মতো অবহেলায় পড়ে থাকে।

যদি শিশুরা পর্যাপ্ত সময় লাইব্রেরিতে গিয়ে কাটাতে পারতো তাহলে বোধকরি শারীরিক বিভিন্ন ক্ষতি থেকে তারা মুক্ত হতে পারতো। একটি শিশু যখন একটি বই হাতে নেয় সে তখন একটি গঠনমূলক পরিবেশে প্রবেশ করে, সে স্বপ্ন দেখতে শেখে, চিন্তা করতে শেখে, যেখানে কোনও ক্ষতির সম্ভাবনা তো থাকেই না, উল্টো তার বিকাশে ও শিক্ষা গ্রহণে সহায়ক হয় এই বই। লাইব্রেরিতে প্রবেশের সঙ্গে সঙ্গেই সে যেন এক চিন্তাশক্তির অবারিত জায়গায় প্রবেশ করে। আর তাই আমাদের প্রত্যেক এলাকায় লাইব্রেরি গড়ে তোলা প্রয়োজন।

যখন অস্ট্রেলিয়ার সিডনিতে ছিলাম তখন প্রায় নিয়মিত আমার ছেলেকে নিয়ে ওখানকার কমিউনিটির লাইব্রেরিতে যেতাম; যেখানে বাচ্চাদের জন্য মজার সব ইভেন্ট, শিক্ষামূলক আলোচনা, গল্প, কবিতা, চিত্রাংকন ইত্যাদির আয়োজন করা হতো। এতে বাচ্চারা যেমন খেলতে খেলতে অনেক কিছু শিখতে পারতো লাইব্রেরি থেকে, তেমনি নিজেদের পছন্দমত বই নিয়ে খেলার পাশাপাশি পড়েও ফেলতো। কীভাবে যে খেলতে খেলতে ওরা পড়া শিখে উঠছে সেটা এক আজব ব্যাপার। ওদের কাছে পড়াটা ছিল নেশার মতো, অনেক আনন্দের একটা ব্যাপার।

নেড়েচেড়ে দেখতে দেখতে বইয়ের পাতায় হারিয়ে যেতে পারতো ওরা! শুধু কি খেলা? ওখানে বাচ্চাদের জন্য আলাদা অনুষ্ঠানের ব্যবস্থা, বিভিন্ন প্রতিযোগিতারও আয়োজন করা হতো। আরও থাকতো বাচ্চাদের পাশাপাশি বড়দেরও বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণের সুযোগ। এভাবেই লাইব্রেরি শুধু জ্ঞান বিতরণের স্থান হতো না, বরং চিত্ত বিনোদনের এক অবারিত মাধ্যম হয়ে উঠেছিল। যদিও অস্ট্রেলিয়ার মতো আর্থিকভাবে সমৃদ্ধ দেশের মডেল আমাদের স্বল্পোন্নত দেশের পক্ষে অনুসরণ করা অসম্ভব সেটা মেনে নিতে হবে। কিন্তু স্বল্প পরিসরে সবার সুবিধামতো কিছু দূর পর পর লাইব্রেরির ব্যবস্থা তো করাই যায়।

আমাদের দেশে বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্রের মতো আরও অনেক প্রতিষ্ঠান যদি এগিয়ে আসতো তবে আমি নিশ্চিত করে বলতে পারতাম যে দেশের অনেক মানুষই তখন বই পড়ার প্রতি আগ্রহী হয়ে উঠতো। কিন্তু এই সংখ্যাটা একদমই সীমিত। আর এই বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্র যদিও শহরে খুব ভালো একটি ভূমিকা রেখে চলেছে জনগণের বই পড়ানোর প্রতি আগ্রহ তৈরিতে, কিন্তু মফস্বলে তাদের কার্যক্রম তেমনভাবে নেই বলে সেখানকার ছেলেমেয়েরাসহ আপামর জনসাধারণ এর সুবিধা থেকে বঞ্চিত হয়। তাই এরকম যদি অনেক প্রতিষ্ঠান সর্বত্র তাদের লাইব্রেরি স্থাপন করেন হোক সেটা ভ্রাম্যমাণ কিংবা স্থিতিশীল তবে সেটা অবশ্যই অনেক কার্যকর ভূমিকা পালন করবে বলেই আমি বিশ্বাস করি।

সাধুবাদ জানাতে চাই বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্রকে, যেখানে তারা ভ্রাম্যমাণ লাইব্রেরির ব্যবস্থা করে করোনাকালে যেমন বাচ্চাদের বিভিন্ন কার্যক্রমে অন্তর্ভুক্ত করে তাদের বেশ খানিকটা বিনোদনের ব্যবস্থা করেছিল, পাশাপাশি তারা অনলাইনে নিজেদের পছন্দমতো বই সংগ্রহ করে তাদের জ্ঞানের তৃষ্ণা মেটাবারও চেষ্টা করে গেছে। আমার জানামতে ঢাকা শহরের বেশিরভাগ এলাকাতে তাদের ভ্রাম্যমাণ লাইব্রেরি সপ্তাহের একটি বিশেষ দিনে বিশেষ সময়ে হাজির হয়, যেখানে ছেলেমেয়েরা বাৎসরিক নামমাত্র ফি দিয়ে তাদের পছন্দের বই সংগ্রহ করতে পারে।

আমাদের দেশে বই কেনার অভ্যাস খুব বেশি পরিলক্ষিত হয় না, যতটা তাদের শপিং সেন্টারে কেনাকাটা করতে কিংবা খাবারের দোকানগুলোতে উপচে পড়া ভিড় দেখতে পাওয়া যায়। বইয়ের সঙ্গ মানুষকে এক অনাবিল আনন্দের জগতে নিয়ে যেতে পারে; যেখানে তাদের মন খারাপ সময়টাকে নিমিষেই ভালো করে তুলতে কিংবা আনন্দময় মনটাকেও এই বই পড়া দ্বিগুণ আনন্দ দিয়ে ভরে তুলতে পারে। তাই বইয়ের মতো এত বিশ্বস্ত আর ভালো বন্ধু কিছুই হতে পারে না। আর সেই আনন্দকে যদি সর্বজনীন করতে হয় বা অন্তত আরও বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর মধ্যে ছড়িয়ে দিতে হয় তাহলে আমাদের মতো স্বল্পোন্নত দেশে প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগে আরও অনেক বেশি লাইব্রেরি স্থাপন করার কোনও বিকল্প নেই। একটি জাতির ভবিষ্যৎ গঠনে লাইব্রেরি অনেক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। অনেকে হয়তো বলবেন ভালো রেজাল্ট সর্বস্ব লেখাপড়ার আমাদের এই দেশে লাইব্রেরি স্থাপন করেই বা কতটুকু লাভ হবে, পরীক্ষায় ভালো করতে গিয়ে প্রাণপাত করা শিশুরা তার কতটুকু সুবিধা পাবে- এই আশঙ্কাকে উড়িয়ে দেওয়া যায় না। কিন্তু লাইব্রেরির সংখ্যা বাড়লে এবং তা যথাযথভাবে সমৃদ্ধ করা গেলে অবশ্যই পাঠকের সংখ্যাও বাড়বে সেটাই স্বাভাবিক।

লেখক: রন্ধনশিল্পী ও কলামিস্ট

/এসএএস/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

বাংলা ট্রিবিউনের সর্বশেষ
গাইবান্ধা পুরাতন জজ কোর্টের জায়গা লিজের বৈধতা নিয়ে রাজনীতিকদের বিবৃতি
গাইবান্ধা পুরাতন জজ কোর্টের জায়গা লিজের বৈধতা নিয়ে রাজনীতিকদের বিবৃতি
রাতে সড়কে ওঁৎ পেতে থাকে তারা, অস্ত্রের ভয় দেখিয়ে করতো ছিনতাই
রাতে সড়কে ওঁৎ পেতে থাকে তারা, অস্ত্রের ভয় দেখিয়ে করতো ছিনতাই
জীবনমান উন্নয়নে বাজেটে বরাদ্দের দাবি উর্দুভাষী অধিকার আন্দোলনের
জীবনমান উন্নয়নে বাজেটে বরাদ্দের দাবি উর্দুভাষী অধিকার আন্দোলনের
কারিগরিসহ উচ্চশিক্ষা চুক্তিতে রাজি বাংলাদেশ-রাশিয়া
কারিগরিসহ উচ্চশিক্ষা চুক্তিতে রাজি বাংলাদেশ-রাশিয়া
সর্বশেষসর্বাধিক

লাইভ