শ্রীজাত প্রসঙ্গ এবং বাংলাদেশের সাহিত্যিকদের বিবেক

Send
শারমিন শামস্
প্রকাশিত : ১৩:৪৩, মার্চ ২৩, ২০১৭ | সর্বশেষ আপডেট : ১৩:৫৩, মার্চ ২৩, ২০১৭

শারমিন শামস্ভারতে কবি শ্রীজাত বন্দ্যোপাধ্যায়ের একটি কবিতার বিরুদ্ধে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত হানার অভিযোগে মামলা হওয়ার পর, পশ্চিমবঙ্গের প্রখ্যাত দুই কথাসাহিত্যিক বিষয়টির তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছেন। শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায় এবং জয় গোস্বামী। তাদের প্রতিবাদের ভাষা অত্যন্ত স্পষ্ট, তীব্র ও কঠিন। কোনও কিছু রেখে ঢেকে লুকিয়ে ছাপিয়ে নিরপেক্ষতার খোলস টোলস পরাবার কোনও চেষ্টা তারা কেউ করেননি। স্পষ্ট ও তীক্ষ্ণ ভাষায় তারা জানিয়ে দিয়েছেন, কবির কলম এবং তার কবিতার পথ রোধ করার ফল কখনও শুভ হবে না। তারা আরো বলেছেন, একটি বিশেষ ধর্মকে খুশি করে ন্যায়সঙ্গত সমাজ প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব না। আরেকটি বড় বিষয়, এই দুই সাহিত্যিক পরিষ্কার করে জানিয়েছেন যে, তাদের দুজনেরই শ্রীজাতের ‘অভিশাপ’ কবিতাটা খুব ভালো লেগেছে।
ব্যক্তিগত জীবনে শীর্ষেন্দু ধর্মে অনুরাগী একজন মানুষ। সেই ধার্মিক সাহিত্যিক কিন্তু ধর্মের অন্ধত্ব আর গোঁড়ামিকে সমর্থন দেননি। উল্টো তিনি তীব্র ভাষায় এই অন্ধত্বের প্রতিবাদ জানিয়েছেন। আনন্দবাজার পত্রিকায় শীর্ষেন্দু লিখেছেন, ‘খুবই দুর্ভাগ্যজনক ঘটনা। তার কারণ, কবি-সাহিত্যিকদের বাক-স্বাধীনতা দিতে হবে। প্রতিটি মানুষের বাক-স্বাধীনতা দিতে হবে। কবিতাটি ধর্মীয় ভাবাবেগে আঘাত দিয়েছে বলে এফআইআর হয়েছে শুনেছি। কিন্তু ধর্ম তো ভাবাবেগের বিষয় নয়! এটা চর্চা থেকে আসে। এর জন্য পরমতসহিষ্ণুতার প্রয়োজন। ধৈর্যের দরকার। আমি এর কিছুটা চর্চা করি বলে বুঝতে পারি। ধর্ম এমন নয় যে কবিতার ঘায়ে মূর্ছা যাবে! যারা ধর্ম করেন, রাজনীতি করেন, তাঁদের ধৈর্য ধরতে হবে। যদি কবিতার প্রতিবাদ করতেই হয় তা হলে তাঁরা কবিতা বা প্রবন্ধ লিখে তার প্রতিবাদ করুন। এতে পুলিশ বা আদালত কী করবে? এটা আমার কাছে গ্রহণযোগ্য বলে মনে হচ্ছে না।’

আমি বহুদিন এরকম অসাধারণ কোনও বিবৃতি পড়ি নাই। বিশেষ করে এমন একজন ব্যক্তির কাছ থেকে, যিনি রীতিমত ধর্মচর্চা করেন এবং একই সঙ্গে তুমুল জনপ্রিয় সাহিত্যিক। ধর্মচর্চার করলেই একজন প্রকৃত শিক্ষিত আলোকিত ব্যক্তির চক্ষুদ্বয় যে অন্ধ হয়ে যায় না, এবং একই সাথে চাইলেই তিনি যে সাদাকে সাদা আর কালোকে কালো বলতেও পিছিয়ে না এসে আরো এগিয়ে যেতে পারেন, শীর্ষেন্দুর বক্তব্য তারই প্রমাণ। আমার প্রিয় এই কথাসাহিত্যিককে আবারো সালাম।

এদিকে প্রিয় কবি জয় গোস্বামী একই পত্রিকায় লিখেছেন, ‘শ্রীজাতর ‘অভিশাপ’ কবিতাটি আমার খুব ভালো লাগল। শ্রীজাত শুধু যে আমারই প্রিয় কবি তা নয়, তিনি অনেকেরই প্রিয় কবি। শ্রীজাতর কবিতার মূল বৈশিষ্ট্য হলো যে তিনি খুব স্পষ্ট করে তাঁর মনের কথা কবিতায় বলেন। সাহিত্যের মূল লক্ষ্য হল লেখায় মনের কথা বলা। কবিতায় মনের কথা বলেছেন বলে উগ্র হিন্দুত্ববাদীরা যদি তাঁর বিরুদ্ধে এফআইআর করে, তা হলে আমি তার তীব্র প্রতিবাদ করছি।আমার মনে হয় না এই কবিতায় ধর্মীয় ভাবাবেগে আঘাত করা হয়েছে। বরং এই কবিতায় একটি কুৎসিত উক্তির বিরোধিতা করা হয়েছে। আমিও এই ধরনের কুৎসিত উক্তির বিরোধী। যে উক্তির পরিপ্রেক্ষিতে এই কবিতা, সেই কবিতার বিরোধিতা করার আগে তো যিনি এই ধরনের উক্তি করেছেন তাঁর বিরুদ্ধেই প্রতিবাদ জানাতে হবে। যিনি আগে এই ধরনের উক্তি করেছেন তিনি আসলে তাঁর নিজের ধর্মকেই কলুষিত করেছেন। শ্রীজাত সমাজসচেতন কবি। তাঁর ‘অন্ধকার লেখাগুচ্ছ’-এ এই প্রমাণ আছে। বিশেষ একটি ধর্মের দ্বারা সমাজ তৈরি হয় না, সমাজের একটি নিজস্ব ধর্ম আছে। অনেক ধর্মের মানুষ মিলে এই সমাজ। তাই সকলকে সম্মান করতে হবে। আমি বুঝতে পারছি না যে এই কবিতার বিরুদ্ধে আক্রমণ হচ্ছে কেন! এই উক্তির বিরুদ্ধেই তো আক্রমণ হওয়া উচিত!’

জয় গোস্বামীর বক্তব্য খুবই তাৎপর্যপূর্ণ। একটা বিশেষ ধর্মকে মাথায় তুলে নাচার বিপক্ষে তিনি সরাসরি অবস্থান নিয়েছেন, এটি জেনেও যে সেটি সংখ্যাগুরু এবং ক্ষমতাবানের ধর্ম। তবু।  শ্রীজাত ও তার কবিতার বিরুদ্ধে পাশের দেশ ভারতের এই নিন্দাজনক ঘটনার পর যে বেদনা মনকে দুর্বল করে দিচ্ছিল, শ্রীজাতের পাশে দুই প্রিয় লেখকের শক্তিশালী অবস্থান মনের সেই কালিমা দূর করে দিয়েছে অনেকটাই। এ তো শুধু শ্রীজাতের পাশে দাঁড়ানো নয়, এটি কবির কলম, সাহিত্যজগৎ এবং মত প্রকাশের সুসভ্য স্বাধীনতার পাশে দাঁড়ানো।

আমার মনে পড়লো তসলিমা নাসরিনের কথা। ‘লজ্জা’ বইটা লেখার অভিযোগে তাকে মৌলবাদীদের তোপের মুখেই শুধু পড়তে হয়নি, ঘটনার শেষ হয়েছে তাকে দেশ ছাড়া করার মধ্য দিয়ে। এরপর জীবনের নানারকম ঘাত প্রতিঘাত, দুঃসহ সময় পার করে করে তিনি পথ চলেছেন, এখনও চলছেন এবং নিজের মাতৃভূমিতে ফেরার অধিকার থেকে তসলিমা, একজন লেখক, একজন নারী অধিকার কর্মী, তিনি সম্পূর্ণ বঞ্চিত। আমি জানি না, তসলিমা নাসরীনকে হত্যার হুমকি, তাকে দেশ ছাড়া করা এবং সর্বোপরি তাকে দীর্ঘদিন ধরে দেশের বাইরে নির্বাসিত করে রাখার বিরুদ্ধে আমার দেশের বড়, জনপ্রিয়, প্রখ্যাত, সর্বজনশ্রদ্ধেয়, গুণী কোনও কথাশিল্পী কোনোদিন মুখ খুলেছেন কিনা। তসলিমার বিরুদ্ধে মৌলবাদীদের হুংকার তো ব্যক্তি তসলিমার বিরুদ্ধে নয়। এই হুমকি, এই বিরুদ্ধতা, এই কোপ সমস্ত মুক্তচিন্তকের বিরুদ্ধে, প্রগতিশীল সুস্থ সাহিত্যের বিপক্ষে। তাহলে যারা আমার দেশে সাহিত্যচর্চা করেন, তারা কেউ কোনোদিন তসলিমা নাসরিনের পক্ষে দাঁড়ালেন না কেন? এই দীর্ঘ দিন তসলিমা নাসরিনকে নির্বাসিত জীবন থেকে দেশে ফিরিয়ে আনার জন্য কোনও ক্ষমতাসীন সরকারের কাছে দাবি তুললেন না কেন কেউ?

লেখক, প্রাবন্ধিক, কবি, শিক্ষক, চিন্তক হুমায়ুন আজাদকে হত্যার উদ্দেশে কোপানো হলো, তারপর তিনি হঠাৎ মারা গেলেন, যা নিয়ে এখনও সন্দেহ ঘুরপাক খায়। এইসব ঘটনার পর লেখকের কলমের স্বাধীনতার পক্ষে জোর কণ্ঠস্বর তুলে ধরতে দেখেছি কি আমাদের বিদগ্ধ সাহিত্যজনদের কাউকে? যে সময় 'পাক সার জমিন সাদ বাদ' লেখার কারণে হুমায়ুন আজাদকে মৌলবাদীদের কোপের তলে পড়তে হয়েছিল, যদি সেই সময়টাতেই, লেখক, সাহিত্যিক, বুদ্ধিজীবী, প্রকাশকদের পক্ষ থেকে তীব্র প্রতিবাদ আর প্রতিরোধ গড়ে উঠতো, তবে পরবর্তীকালে মত প্রকাশের স্বাধীনতার বিরুদ্ধে মাথা চাড়া দিয়ে ওঠা ধর্মান্ধদের সরকার এত আদর তোয়াজ করে পার পেয়ে যেত না। কিন্তু তা হয়নি। যা হয়েছে তা হলো-  হুমায়ুন আজাদ, তসলিমা নাসরিনের বই নিষিদ্ধকরণ, তসলিমার নির্বাসন এবং তারপরের কাহিনি তো আরও বীভৎস। একের পর এক লেখক, ব্লগার, প্রকাশক হত্যা, হত্যাচেষ্টার ঘটনা। বইমেলায় একাধিক প্রকাশনীর স্টল বন্ধ করার ঘটনাও ঘটেছে।

কারাগারে আটকে রাখা হয়েছে প্রকাশককে। মত প্রকাশের অপরাধে বইমেলায় শ্রাবণ প্রকাশনীকে নিষিদ্ধ করার মতো ন্যাক্কারজনক ব্যাপারও হয়েছে। তারপর শেষঅব্দি পুলিশ বাহিনীকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে বই পড়ে দেখবার- কোথাও কোনও বই কারও মনে আঘাত দিয়ে ফেলে কিনা। সত্যি! বড় বিচিত্র এই দেশ। এই রাজনীতি। ততধিক বিচিত্র এই লেখক বুদ্ধিজীবী সমাজ। সহযাত্রী লেখক, কবি, প্রকাশকের চরমতম দুঃসময়েও কাউকে টু শব্দটি করতে দেখিনা আমরা আমজনতা। বড় আন্দোলন গড়ে তোলা তো সুদূরের ব্যাপার। পাঠ্যপুস্তকের সাম্প্রদায়িকীকরণের যে তোড়জোড় উঠেছে, সে ব্যাপারেও তারা চুপ। একদম মুখে কুলুপ এঁটে আছেন।

যে একাত্তর আমাদের জীবনে এসেছিল, পঁচিশে মার্চের কালরাত্রিতে সবার আগে যারা জীবন দিয়েছিলেন, তারা আমাদের পরম শ্রদ্ধেয় লেখক, সাহিত্যিক, সাংবাদিক, চিকিৎসক, বুদ্ধিজীবীরা। পুরো নয় মাস মুক্তিযুদ্ধে আমাদের বুদ্ধিজীবীরা তাদের প্রত্যক্ষ সমর্থন ও সহযোগিতা দিয়ে গেছেন মুক্তিবাহিনীকে। তার ফলস্বরূপ নৃশংস মৃত্যুকে বরণ করে গেছেন ১৪ ডিসেম্বরে। বিজয়ের মাত্র দুইদিন আগে।

মাতৃভূমির স্বাধীনতা তারা দেখে যেতে পারেননি। কিন্তু আমরা জেনেছি, তারাই ছিলেন আমাদের শ্রেষ্ঠ সন্তান। হায়, আজ এই আকালের দিনে, কোথায় পাব আমরা আবারো সেইসব শ্রেষ্ঠ মানুষদের, যারা অন্যায়ের দিকে তুলে ধরতে জানেন সাহসী আঙুল, যারা প্রতিবাদ করতে পারেন, যারা মিথ্যা আর শঠতার বিরুদ্ধে রুখে উঠতে জানেন, প্রতিবাদ আর প্রতিরোধের আগুন ঝরে যাদের কলমে, কবিতায়, গল্পে, উপন্যাসে, কলামে।

লেখক: প্রামাণ্য চলচ্চিত্র নির্মাতা

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ