রূপা পারেনি, আমরা কি পারবো?

Send
তুষার আবদুল্লাহ
প্রকাশিত : ১১:৩৮, সেপ্টেম্বর ০২, ২০১৭ | সর্বশেষ আপডেট : ১৩:৪৯, সেপ্টেম্বর ০৪, ২০১৭

তুষার আবদুল্লাহবার্তাকক্ষে বসে দেখছি সারাদেশ থেকে পশু কোরবানির ছবি আসছে। সৃষ্টিকর্তার নৈকট্য লাভের পাশপাশি, মনের মাঝে লুকিয়ে থাকা পাশবিকতা, পশু প্রবৃত্তি বিসর্জন দেওয়াতেই কোরবানির সার্থকতা। ধর্ম সেই কথাই বলে। বিসর্জন সব ধর্মেই আছে নিজেদের মতো করে। উদ্দেশ্য একই স্রষ্টাকে তুষ্ট করা এবং অন্দরের পশু প্রবৃত্তিকে বিসর্জন দেওয়া। এই যে বারবার ‘পশু’ শব্দটি ব্যবহার করছি, বলছি মন থেকে পশুর মতো আচরণ তাড়াতেই কোরবানি— এই ভাবনায় আজকাল দ্বিধায় পড়ে যাই। আত্মজিজ্ঞাসার মুখোমুখি হতে হয়— আমাদের পতন কি পশুত্বকেও ছাড়িয়ে যায়নি? বলছি পাশবিকতাকে দূরে ঠেলতে কোরবানির অনুশীলনের কথা। কিন্তু আমরা যে পাশবিকতারই অনুসরণ করছি। কোরবানি হয়ে গেছে আনুষ্ঠানিকতা মাত্র। আসানবাড়ির রূপাকে চলন্ত বাসে গণধর্ষণ এবং হত্যা প্রমাণ করে, আমরা কোরবানির অনুশীলনের মধ্যে নেই। আছি পাশবিকতার উল্লাসে। কুমিল্লার তনু, ঢাকার কুড়িলের গারো মেয়েটি এবং আরও আগে দিনাজপুরের ইয়াসমিন সেই সাক্ষ্যই দেয়। আরও কত সাক্ষী হয়তো গণমাধ্যমে জায়গা পায়নি বা আমাদের স্মৃতির সড়কে হারিয়ে গেছে।
আমরা ঈদ উদযাপন করছি। ঈদগাহে নামাজ আদায় হয়েছে। বিনিময় হয়েছে শুভেচ্ছা। বাড়ি ফিরে পরিবারের সঙ্গে মিষ্টিমুখ পর্বও হয়তো শেষ। রাতে হবে ভুরিভোজ। রূপা তার মা’কে চমকে দিতে চেয়েছিল। বেতন বাড়ার কথা মাকে জানিয়ে চমকে দেওয়ার ইচ্ছে ছিল ওর। এই চমকের সঙ্গে যোগ হতো মায়ের শাড়ি, পরিবারের অন্য সদস্যদের জন্য উপহার। আজ সকালের মিষ্টান্নটিও হয়তো তৈরি হতো রূপার হাতে। মাকে চমকে দিতে পারেনি রূপা। উল্টো আমরা চমকে উঠলাম। এটাও মনে হয় ভুল বলা হলো। আমরা চমকে উঠব কেন? এমন নারকীয় আচরণ, প্রবৃত্তি কি এই প্রথম দেখতে পেলাম? বরং বলতে পারি, আমাদের হজম সহায়ক হয়ে উঠছি আমরা। অনেক উল্লাসের মাঝে রূপার চিৎকার আমাদের কানে এসে পৌঁছে না। ভোগের অন্ধত্ব দেখতে দেয় না রূপার পরিবারের অসহায়ত্বকে। প্রতিবাদ আমরা করি না, করব না— সেই কথা বলছি না। এই প্রতিবাদ করার মধ্যেও ব্যক্তি ও সংগঠনের ‘ফায়দা’ লুকায়িত। ফায়দার গুণ বুঝে প্রতিবাদের আয়ু বাড়ে কমে। তারপর এক সময় চুপ হয়ে যাওয়া।
আনন্দ দিনে রূপা’র কথা তুলে নিজের ও পাঠকের সস্তা আবেগ উসকে দিতে চাচ্ছি না। লেখার সেই উদ্দেশ্য-বিধেয় নেই। কেন যেন আজকাল কোনও উদযাপনেই জৈব বা অর্গানিক আনন্দ পাই না। উচ্চফলনশীল আস্ফালনের আনন্দ। সকল সুখই দৃশ্যমান। ভেতরে দুঃখ, ঘৃণা, পরাজয় পুষে রেখে বিজয়ের হাসি হাসতে শিখেছি আমরা। আমাদের আনন্দে আর্দ্রতা নেই, শুষ্ক। পরাজয়ের এক মরুভূমিতে দিকহারা মুসাফির যেন আমরা। মধুপুর অরণ্যে সেদিনের সন্ধ্যায় আমাদের আরেকটি পরাজয়ের উপাখ্যান রচিত হয়েছে। আমরা সেই উপাখ্যানের পাতা ছিঁড়ে কোথায় লুকাবো। পাতা ছিঁড়ে কোনও উপাখ্যান লুকিয়ে ফেলা বা মিথ্যে করা যায় না। তার বিপরীতে রচনা করতে হয় বিজয়ের উপাখ্যান। আমরা যদি তনু হত্যার বিচার করতে পারি, দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে পারি কালক্ষেপণ না করে, সেখান থেকেই আমাদের বিজয়ের উপাখ্যান রচনার শুরু হতে পারে। তবে এ কথাও বলে রাখা দরকার— যতক্ষণ সমাজে শুভবুদ্ধির চর্চা শুরু না হবে, জবাবদিহিতা ও সুশাসন নিশ্চিত না হবে, ততক্ষণ এই আমার রচনাও কেবল আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে আটকে থাকবে। আনন্দ দিনে রূপার মা চমকে উঠতে পারেননি। আমাদের তারুণ্য কি চমকে দিতে পারে না আমাদের, এই অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে প্রতিরোধের ঘোষণা দিয়ে?
লেখক: বার্তা প্রধান, সময় টিভি

/এসএএস/টিআর/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ