ফ্রন্ট আছে তবে ‘যুক্ত’ নেই

Send
মাসুদা ভাট্টি
প্রকাশিত : ১২:৫২, অক্টোবর ১৪, ২০১৮ | সর্বশেষ আপডেট : ১৪:১০, অক্টোবর ১৪, ২০১৮

মাসুদা ভাট্টিনির্বাচন এলেই রাজনীতি নানাবিধ মোড় নিতে শুরু করে কিন্তু এবার যেন এসব ‘মোড়ামুড়ি’ একেবারে লাগামহীন হয়ে পড়েছে। বিশেষ করে বিএনপি’র শীর্ষ দুই নেতা বেগম খালেদা জিয়া ও তারেক জিয়া আদালতের রায়ে দণ্ডিত হওয়ার পরে রাজনীতি সত্যিকার অর্থেই নতুন মাত্রা ও চেহারা নিয়েছে। সর্বশেষ, বেশ অনেক দিন ধরে চলে আসা জাতীয় ঐক্য প্রক্রিয়া বহুবিধ আলোচনা ও ঘটনার জন্ম দিয়ে শেষাবধি আত্মপ্রকাশ করেছে বটে ‘ঐক্য ফ্রন্ট’ নাম দিয়ে, কিন্তু সেখানে যুক্তফ্রন্টের মূল দল ডা. বদরুদ্দোজা চৌধুরীর রাজনৈতিক দল বিকল্প ধারাকে বাদ দেওয়া হয়েছে। তার মানে হচ্ছে ঐক্য হলো বটে, কিন্তু তা আর যুক্ত থাকলো না। কিন্তু তারপরও আগামী দিনে এদেশে রাজনীতি বেশ ঘটনা-দুর্ঘটনার জন্ম দেবে, তাতে কোনোই সন্দেহ নেই, কিন্তু সে ঘটনা-দুর্ঘটনা সম্পর্কে এখনই যে আঁচ পাওয়া যাচ্ছে তা বিশ্লেষণের দাবি রাখে।
কেন যুক্ত থাকা গেলো না?

এই লেখাটি যখন লিখছি তখনই মাত্র শেষ হয়েছে সদ্য গঠিত জাতীয় ঐক্য ফ্রন্টের সংবাদ সম্মেলন, যাকে উপস্থিত নেতৃবৃন্দ ইতিহাস সৃষ্টি হলো বলে দাবি করেন। একটি অত্যন্ত অগোছালো এবং হৈ চৈ হট্টোগোলের মধ্য দিয়ে একটি ‘ইতিহাস’ সৃষ্টি হলো তাতে কোনও সন্দেহ নেই। ড. কামালের কয়েক লাইনের বক্তব্য ছিল এতে, কিন্তু তাকে সত্যিই অসুস্থ মনে হচ্ছিলো। তিনি কথা বলতে পারছিলেন না। মাহমুদুর রহমান মান্না যথারীতি তার রাগী রাগী চেহারা ও গলার আওয়াজ দিয়ে এই সংবাদ সম্মেলন থেকেই পারলে সরকারকে নামিয়ে ফেলেন। খন্দকার মোশাররফ হোসেন এখনও ৫টি দাবির কথাই বললেন, যদিও পাশ থেকে তাকে সংশোধন করে বলা হলো দাবি আসলে ৭টি। কিন্তু সবচেয়ে অদ্ভুত কাজটি করেছেন আ স ম আব্দুর রব, যিনি প্রকাশ্যেই সাংবাদিকদের জানালেন, যুক্তফ্রন্টের অন্যতম নেতা ডা. বদরুদ্দোজা চৌধুরী অসুস্থ, তাই তিনি আসতে পারেননি। কিন্তু সেই সময়ই বারিধারায় নিজ বাসভবনে বদরুদ্দোজা চৌধুরী আরেকটি প্রেস কনফারেন্সের আয়োজন করেছেন এবং সেখান থেকে একাত্তর টেলিভিশন লাইভও দেখাচ্ছিলো। ফলে প্রেস ক্লাবে জাতীয় ঐক্য ফ্রন্টের আত্মপ্রকাশের সংবাদ সম্মেলন ও বিকল্প ধারার নেতৃবৃন্দের সংবাদ সম্মেলন একই সঙ্গে মানুষ দেখতে পাচ্ছিলো। প্রেস ক্লাবের অনুষ্ঠান চলাকালেই বারিধারায় ডা. বি. চৌধুরীকেও বসে থাকতে দেখা গেলো প্রেস কনফারেন্সে এবং তিনি বক্তব্যও রাখলেন। এর আগে দুপুরবেলা তিনি পূর্ব নির্ধারিত আমন্ত্রণ অনুযায়ী ড. কামাল হোসেনের বাড়িতে গিয়েছিলেন মাহি বি চৌধুরীসহ, কিন্তু সেখানে নাকি দরজা খোলার মতোও কেউ উপস্থিত ছিলেন না। বি. চৌধুরী পুত্র মাহি বি. চৌধুরী সাংবাদিকদের জানালেন, তিনি ও তার দলের পক্ষ থেকে একাধিকবার জানানো হয়েছিল ড. কামাল হোসেনকে যে তারা তার বাসভবনের কাছাকাছি পৌঁছে গেছেন। কী হলো যে আগের দিন যে আমন্ত্রণ ড. কামাল হোসেন স্বয়ং দিলেন ডা. বি চৌধুরীকে,২৪ ঘণ্টা পার না হতেই তা থেকে সরে গেলেন ড. কামাল হোসেন? দিনভর কী কী ঘটলো যে একটি ঐক্য প্রক্রিয়া থেকে কোনও কিছু না জানিয়েই ডা. বি চৌধুরীর মতো একজন সম্মানিত ব্যক্তিকে সরিয়ে দেওয়া হলো?

বিকল্প ধারার নেতৃবৃন্দের বক্তব্য থেকে যা উদ্ধার করা গেলো তা হলো, স্বাধীনতাবিরোধী এবং যুদ্ধাপরাধীরা যেখানে থাকবে সেখানে কোনও ঐক্যে দলটি যাবে না। এ ব্যাপারে প্রথম থেকেই তাদের বক্তব্য ছিল স্পষ্ট। কিন্তু ড. কামাল হোসেন প্রথম প্রথম এ ব্যাপারে কথা বললেও শেষ পর্যন্ত তিনি তার বক্তব্যে অনড় থাকতে পারেননি, বোঝাই যাচ্ছে। ঐক্য ফ্রন্টের বাকিদের এ ব্যাপারে কোনও সমস্যা নেই, সমস্যা ছিলও না। ড. কামাল হোসেনও বঙ্গবন্ধু, মুক্তিযুদ্ধের প্রতি তার কথিত অবস্থান থেকে বেশ আগেই বেরিয়েছেন বলে লোকে ধারণা করতে শুরু করেছিল, কারণ তার ঘরের ভেতর বসে তার জামাতা যুদ্ধাপরাধী রাজাকারদের বাঁচাতে সর্বশক্তি নিয়োগ করেছিলেন। ড. কামাল হোসেন তার ঘর যেমন সামলাতে পারেননি (বা চাননি) তেমনই তিনি বাইরেরটাও সামলাতে পারবেন না, বলাই বাহুল্য। এমনও অনেকে বলে থাকেন যে ড. কামাল হোসেনকে তারেক রহমানের কাছাকাছি নিয়ে আসার পেছনেও তার জামাতা-প্রবর দিবারাত্র পরিশ্রম করেছেন। দেখা যাক, ড. কামাল হোসেন এতদিন বঙ্গবন্ধুর নামে, স্বাধীনতার পক্ষে রাজনীতি করে যে সুশীল পরিচিতি অর্জন করেছিলেন, এখন তার সম্পূর্ণ বিপরীত অবস্থানে গিয়ে যুদ্ধাপরাধী, স্বাধীনতাবিরোধী ও বঙ্গবন্ধু ও তার রাজনীতিকে গ্রেনেড হামলা করে নিশ্চিহ্ন করে দেনেওয়ালাদের শিবিরে গিয়ে কী অর্জন করেন। লোকে অবশ্য বলে থাকে যে নিয়ত গুণে নাকি বরকত, যার শুরুটাই এরকম নেতিবাচক ও গোপনে একজনকে বাদ দিয়ে আরও গোপনে চুক্তিবদ্ধ হওয়ার মতো ঘটনা দিয়ে, তার শেষটা কী ভালো হতে পারে?

২১ আগস্ট হামলার রায় ও নতুন বাস্তবতা

দীর্ঘ ১৪ বছর পর একুশে আগস্ট গ্রেনেড হামলার রায় ঘোষিত হলো। রায় জানা গেলেও আদালতের পর্যবেক্ষণ পুরোপুরি জানা যায়নি এখনও, কিন্তু আদালতের পর্যবেক্ষণের একটি বাক্য সংবাদমাধ্যমে এসেছে। তা হলো– রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা থাকবে কিন্তু এভাবে কোনও রাজনৈতিক পক্ষকে নিশ্চিহ্ন করে দেওয়ার চেষ্টা হবে কেন? আদালত এ কথাটি ২১ আগস্টের রায় সম্পর্কে বললেও বাংলাদেশের রাজনীতিতে ১৯৭৫ সালের পর থেকে আমরা এই সত্য জানি এবং প্রতিটি ঘটনা দিয়েই এর সত্যতা ব্যাখ্যা করা সম্ভব। সরকার হিসেবে বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার বাংলাদেশের ক্ষতি করেছে কী উপকার করেছে সে বিষয়ে বিস্তর আলোচনা হতে পারে। কিন্তু রাষ্ট্রক্ষমতায় গিয়ে বিএনপি-জামায়াত জোট দেশের রাজনীতির যে বড় ক্ষতিটি করেছে তা কোনও কিছু দিয়েই উপশম করার নয়। অনেকেই হয়তো দ্বিমত পোষণ করতে পারেন যে রাজনীতিতে কি সারা জনম এরকম বৈরিতা থাকবে? নাকি থাকা উচিত? কোনও আদর্শ রাজনৈতিক পরিবেশে আমরা এরকম প্রশ্ন তুলতে পারি; কিন্তু বাংলাদেশের রাজনীতিতে এরকম আদর্শ পরিবেশ তৈরির সুযোগ ১৯৭৫ সালে একবার নষ্ট করা হয়েছে এবং তারপর হয়েছে ২০১৪ সালের ২১ আগস্ট। এখন এই হামলার রায় ঘোষিত হলেও যে আদর্শ পরিবেশের কথা আমরা কল্পনা করি, তা থেকে আমরা যে যোজন-দূরে অবস্থান করছি সেটাই আসলে বাস্তবতা।

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট সপরিবারে বঙ্গবন্ধুকে হত্যা এদেশের রাজনীতির কেবল নয়, এদেশের রাষ্ট্র-চরিত্রও বদলে ফেলা হয়। এই ভয়ঙ্কর ঘটনা এবং বাংলাদেশের রাষ্ট্র চরিত্র পরিবর্তন অর্ডিন্যান্স জারি করে ও বহুদলীয় গণতন্ত্রের নামে যিনি ঘটিয়েছেন তিনি বিএনপি’র প্রতিষ্ঠাতা জেনারেল জিয়াউর রহমান। ২০০৪ সালে এসে রাষ্ট্রক্ষমতায় গিয়ে আবারও বঙ্গবন্ধুর রাজনীতিকে হত্যা করার চেষ্টা চালায় জিয়াউর রহমানের পুত্র তারেক জিয়া। আদালতের রায়ে আমরা এই সত্য জানলেও বিএনপি নামক রাজনৈতিক দলটি সে সত্যকে স্বীকার তো দূরের কথা, তার জন্য অনুতপ্তও নয় বলে ঘোষণা দিয়েছে। মামলার রায় ঘোষণার পর থেকে এ পর্যন্ত বিএনপি আগের চেয়েও বড় গলায় নিজেদের দোষ ঢাকার জন্য কখনও আদালতের রায়কে অস্বীকার করছে, কখনও বলছে সরকারকে বিডিআর হত্যাকাণ্ডসহ নানাবিধ ঘটনায় জড়িয়ে বক্তব্য দিচ্ছে। বিভিন্ন মহল থেকে একজন দণ্ডিত ব্যক্তির দলীয় প্রধান হিসেবে থাকা নিয়ে প্রশ্ন তোলার পরও বিএনপি এক প্রকার গায়ের জোরেই বলছে তারেক রহমানই বিএনপি’র নেতৃত্বে থাকবেন। কিন্তু ভেতরে ভেতরে যে দলটি বেশ ক্ষয়ে-বয়ে গেছে তার প্রমাণ হলো, তড়িঘড়ি করে নিজেদের অবস্থানের মর্যাদা না দিয়েই–যে ড. কামাল হোসেনকে একসময় রাষ্ট্রদ্রোহী বলে মেনে নিয়েছিল সেই তাকেই নেতা মেনে একটি আধা-খেচরা জাতীয় ঐক্য সম্পন্ন করেছে। কিন্তু তা দিয়ে কি শেষ রক্ষা হবে?

এতদিন পাঁচটি দাবির কথা বলা হলেও আজকে প্রেসক্লাবের অত্যন্ত এলোমেলো প্রেস কনফারেন্সে ঐক্য ফ্রন্টের নেতারা বলছেন দাবি আসলে ৭টি, যার অন্যতম হচ্ছে সরকারের পদত্যাগ; নির্দলীয়, নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচন; বেগম জিয়ার মুক্তি; সকল নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে করা মামলা প্রত্যাহার। এরমধ্যে তারেক রহমানের বিরুদ্ধে ২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলা মামলার রায়ও সম্পৃক্ত কিনা তা জানা না গেলেও বিএনপি নিশ্চয়ই এটাই চাইবে। সামনের দিনগুলোতে নিশ্চয়ই এই দাবিনামা আরও বিস্তারিত জানা যাবে। কারণ, এই ঐক্য ফ্রন্টকে তো এই দাবিনামা নিয়ে আন্দোলনে নামতে হবে। এত দ্রুত সময়ের মধ্যে এত দাবি আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে ঐক্য ফ্রন্ট কতটা সফলতা লাভ করে তা সময়ই বলে দেবে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, জনগণ কি বিএনপি’র এই আইনের প্রতি অশ্রদ্ধা এবং ক্রমাগত সত্য থেকে বিচ্যুত হয়ে আওয়ামী লীগের ওপর দোষ চাপানোটা পছন্দ করছে? রাজনীতিতে দেয়ালের লিখন পড়তে পারাটা খুব জরুরি বলে ধরা হয়। সেটা যারাই দ্রুততম সময়ের মধ্যে পড়তে ও সে অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নিতে পারবে তারাই আখেরে জয়ী হবে।

লেখক: নির্বাহী সম্পাদক, দৈনিক আমাদের অর্থনীতি

 

[email protected]

/এসএএস/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ