আমরা অপরাধ প্রবণতাকে উসকে দিচ্ছি না তো?

Send
জোবাইদা নাসরীন
প্রকাশিত : ১৪:৪৮, ডিসেম্বর ০৯, ২০১৮ | সর্বশেষ আপডেট : ১৪:৫০, ডিসেম্বর ০৯, ২০১৮

জোবাইদা নাসরীনক’দিন ধরেই যেখানে যাচ্ছি, সেখানে একটি কথা শুনতে পাচ্ছি, শিক্ষকরা সাবধান! সত্যি বলতে কী, নিজে শিক্ষক হিসেবেও এখন এক ধরনের চাপ বোধ করছি। কীভাবে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলবো সেটিও এখন ভাবাচ্ছে আমাকে। একজন শিক্ষার্থীর মৃত্যু শিক্ষককে কাঁদায়, কাঁপায়, সেটি যেকোনও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেই ঘটুক না কেন। কোনও শিক্ষকই কোনও শিক্ষার্থীর মৃত্যু কামনা করে না; বরং সন্তানের মতোই স্নেহ করেন।
অরিত্রী আত্মহত্যা করেছে। আত্মহত্যায় প্ররোচনার অভিযোগে তিন শিক্ষকের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে এবং একজন শিক্ষক এখন কারাগারে। বাকিরা পালিয়ে  বেড়াচ্ছেন বলে জানা গেছে। নির্বাচনের আগে শিক্ষার্থীদের পথে নেমে আসা সরকারি দলের ভোটের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে সেই ভয়জনিত তাগাদায় দ্রুতই অ্যাকশন নিয়েছে সরকার, এমনটা অনেকেই মনে করেন। তাই আলোচনা-সমালোচনা সবই আরও দ্রুত আলোচনার টেবিলে চায়ের সঙ্গে সঙ্গে থাকছে। সবার চোখে-মুখে অস্বস্তির ছাপ।
অরিত্রী আমাদের এত কাছের হওয়ার কারণ– সে একটি ‘আদৃত বনেদি’ স্কুলের ছাত্রী ছিল। আমি নিশ্চতভাবেই বলতে পারি, এই স্কুলে তাদের অতি আদরের সন্তানকে ভর্তি করানোর চেষ্টা জীবনের বড় পরিশ্রমগুলোর একটি। তিন বছর হতে না হতেই বাচ্চার চোখে-মুখে গোল্ডেন ফাইভের ছায়া দেখতে পাওয়া অভিভাবকরা কী করতে বাকি রাখেন ভিকারুননিসায় তার মেয়েকে ভর্তি করানোর জন্য? কেন কম নম্বর পাওয়া হলো? কেন ফার্স্ট হতে পারছো না? কোনও কোনও অভিভাবক  পরীক্ষা শেষ করার পর বাসায় ফেরত আসা বাচ্চাটির আবারও পরীক্ষা নেন। এসব তো আমরা করছি। ভিকারুননিসায় ভর্তি না হতে পারলে জীবন বৃথা যাবে এই ভেবে অনেকেই তো অন্য স্কুলে পড়া তৃতীয় বা চতুর্থ শ্রেণির বাচ্চাকে ভিকারুননিসায় প্রথম শ্রেণিতে ভর্তি করাতে বলে নিজেকে জয়ী ঘোষণা করি। বাচ্চার বয়স কমানো সার্টিফিকেট জাগাড় করি। তখন কি আমরা একবারও ভাবি, আমরাই বাচ্চাকে অন্যায় এবং মিথ্যার সঙ্গে পরিচয় করাচ্ছি, তৃতীয় শ্রেণিতে পড়া বাচ্চাকে আবারও ক্লাস ওয়ানে ভর্তি করিয়ে তাকে মানসিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছি? তখন কি আমরা একবারও প্রশ্ন তুলছি এই স্কুলের শিক্ষকদের নিয়ে? তাদের আচরণ নিয়ে? না, তুলিনি। কারণ, আমাদের মর্যাদার ওঠানামা চলে ভিকারুননিসায় সন্তান ভর্তি হওয়া না হওয়ার ওপর।

শিক্ষক হিসেবে আমরা প্রচণ্ড চাপ বোধ করছি। কীভাবে আমার শিক্ষার্থীদের সঙ্গে বোঝাপড়া করবো তা নিয়েই চিন্তা। বাংলাদেশের মতো দেশে এত শিক্ষার্থীর মানসিক গঠন আমাদের জানা সম্ভব নয়, যদি অভিভাবকরা আমাদের না জানান। আমরা তো বেত-যুগের মানুষ। আমাদের সময়ের খুব কম মানুষই আছেন যারা শিক্ষকের মার খায়নি। বেঞ্চের ওপর কান ধরে বহুবার দাঁড়িয়ে থেকেছি। বাসায় এসে বলিনি। কারণ, বাবা মায়েরা বলেছেন শিক্ষক যা করবেন ভালোর জন্য করবেন। কিন্তু আমাদের সময়ে এই শাস্তির পরও  কখনও আত্মহত্যার কথা মাথায় আসেনি আমাদের। আমরা শিক্ষকদের কাছে রয়ে-সয়ে শিখেছি, থেকেছি, এখনও তারা আমাদের মনে আছেন বিশাল এক অংশজুড়েই। সে সময় অভিভাবকরা কখনও প্রশ্ন তোলেননি বরং মেরে চামড়া যেন খুলে ফেলে সেটির মৌখিক নির্দেশনা ছিল। এখন আর সেই ‘বেতের বাড়ি’ কিংবা ‘কান ধরে উঠবস’ আমাদের নষ্টালজিয়াতেই জিইয়ে আছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শারীরিক শাস্তির যুগ আমরা পার করেছি। শিক্ষক সম্পর্কে রোমান্টিক ‘দেবতা’র মিথ থেকে নিজেদের বের করতে পারাও এই যুগের অন্যতম অর্জনগুলোর একটি।

অরিত্রীর মৃত্যু এবং এর পরবর্তী ঘটনাগুলো বিশ্লেষণ করলে আমরা কী দেখতে পাই? বেশিরভাগ মিডিয়া এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলো এই ঘটনা নিয়ে কিছুটা একেপেশে অবস্থান করছে বলে মনে হচ্ছে। এই একপক্ষ নেওয়া অবস্থান কী কী ধরনের সমস্যা তৈরি করতে পারে আমরা সেই বিষয়গুলো নিয়ে ভাবছি না। আমরা ভাবছি না যে স্কুলের পরীক্ষা হলে নিয়ম থাকা সত্ত্বেও মোবাইল ফোন নিয়ে গেল। শুধু স্কুল নয়, বিশ্ববিদ্যালয়েও আমরা পরীক্ষার আগে শিক্ষার্থীদের মোবাইল জমা দিতে বলি। আমরা একদিকে প্রশ্নফাঁসের বিরুদ্ধে কথা বলবো আবার অন্যদিকে পরীক্ষা হলে মোবাইল নিয়ে যাওয়াকে অপরাধ হিসেবে দেখবো না, সেটি কীভাবে সম্ভব?

প্রতিবছর এসএসসি এবং এইচএসসি পরীক্ষার পর দুই চারজন শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করেন, যার কারণ পরিবারিক বকাঝকা। অরিত্রীর বাবা-মাও অরিত্রী বেঁচে থাকা অবস্থায় এই ঘটনার জন্য তাকে বকাঝকা করেননি, এটিও তো হওয়ার কথা নয়। বরং এটিই বাস্তবতার নিরিখে স্বাভাবিক। অরিত্রী আত্মহত্যা না করলে তার বাবা মা অরিত্রীকে সেদিন স্কুল থেকে ফিরে গিয়ে বকাঝকা করতেন না? সকল অভিভাবকই হয়তো তা-ই করবেন। বাবা মায়ের ওপর অভিমান করে আত্মহত্যার ঘটনা সব দেশেই কম বেশি ঘটছে। সেক্ষেত্রে আমরা কী অভিভাবকদের আত্মহত্যার প্ররোচনার জন্য অভিযুক্ত করি?

না, করি না। কারণ, বাবা মায়েরা বকা দেবেন আমরা তা মেনে নিই। তাহলে যে শিক্ষক মোবাইলসহ শিক্ষার্থীকে ধরেছেন বলে, নিয়ম ভাঙার অপরাধ দায়ের করার কারণে অভিযুক্ত হলেন, তাহলে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিয়মের বালাই থাকা উচিত হবে না। এরপর থেকে স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীরা নিয়ম না মানলেও শিক্ষকরা কোনও পদক্ষেপ নিতে পারবেন না,  আমাদের অন্ধ হতে হবে। সবার মধ্যে গ্রেফতার হওয়ার ভয়, সামাজিকভাবে হেয় হওয়ার ভয় কাজ করবে। আমরা যখন পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁস নিয়ে আন্দোলন করছি তখন পরীক্ষায় অসদুপায় অবলম্বন করাকে নিরুৎসাহিত করাই তো উচিত। আর এই বিষয়ে কঠিন নিয়ম থাকাও স্বাভাবিক।

শিক্ষা মন্ত্রণালয় বলছে টিসি দেওয়ার নিয়ম নেই। কিন্তু বাংলাদেশের অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেই টিসির চল রয়েছে। তাহলে শিক্ষা মন্ত্রণালয় এতদিন ধরে সেটি বদলালো না কেন? আমরা তো শিক্ষার্থীদের অন্যায়কে প্রশ্রয় দিতে পারবো না। ভিকারুননিসার এই ঘটনায় আমরা আমাদের শিক্ষার্থীদের কী বার্তা দিচ্ছি? আমরা তাদের অপরাধ প্রবণতাকে উসকে দিচ্ছি না তো? শিক্ষার্থী-শিক্ষক সম্পর্ককে একটি অস্বস্তিকর সম্পর্কে নিয়ে যাচ্ছি না তো? যদি এমনই হয় তাহলে পুরো শিক্ষাব্যবস্থাপনার সামাজিক এবং মনস্তাত্ত্বিক গুরুত্ব দুটোই হারিয়ে যাবে।

লেখক: শিক্ষক, নৃবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

 

/এসএএস/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ