গণমাধ্যমেও ‘করোনা উপসর্গ’!

Send
হাসান ইমাম
প্রকাশিত : ১৬:১৫, মে ০৬, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১৬:৪৩, মে ০৬, ২০২০

হাসান ইমামযার গলা নেই তার গলা টিপে ধরারও ফন্দি আঁটতে ওস্তাদি হীরক রাজার করায়ত্ত। তাই তার রাজত্বে যেকোনও কিছুর মুক্তাবস্থা বা বন্দিদশা সাদা চোখে ধরা পড়ে না সবসময়; বুঝে নিতে হয়। বোঝার এই ক্ষমতা মানুষের সহজাত। আর তাই মানুষ বশীকরণে প্রাণান্ত প্রচেষ্টা ছিল হীরক রাজার।
হীরক রাজার কাল অবশ্য গত। চাইলেও মগজ ধোলাইয়ের যন্তরমন্তর ঘরে কাউকে পুরে দেওয়া যায় না এখন; তবে একটা ‘তবে’ আছে। এই ‘তবে’ থেকে রাষ্ট্রের তাবৎ তেলেসমাতির ইঙ্গিত মেলে। এই ইঙ্গিত থেকে যা বোঝার বুঝে নিতে হয়। যেমন, মুক্ত গণমাধ্যম সূচক। গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিয়ে সোচ্চার প্যারিসভিত্তিক রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডারের (আরএসএফ) করা এই সূচকে বাংলাদেশের ক্রমাগত পিছিয়ে পড়া তাই ‘ইঙ্গিতবাহী’।
আরএসএফের সূচক অনুযায়ী গত বছরের ১৫০তম অবস্থান থেকে এবার এক ধাপ পিছিয়েছে তো বটেই, সেনা নিয়ন্ত্রিত মিয়ানমারও আছে বাংলাদেশের চেয়ে ভালো অবস্থানে। উপরন্তু দক্ষিণ এশিয়ার ৯টি দেশের তলানিতে ঠেকেছে বাংলাদেশ।

এই বৈশ্বিক মহামারির সময়েও ত্রাণ নিয়ে নয়-ছয়ের খবর প্রকাশ করায় দেশব্যাপী কত সংবাদকর্মীর ওপর ক্ষমতাসীন দলের লোকজন ‘ক্ষমতা’ দেখিয়েছেন, তা কর গুনে শেষ হয় না। অথচ এসবের প্রতিকার পাওয়ার উদাহরণ শূন্য। 

আরএসএসও তাই পৃথক এক প্রতিবেদনে এ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। সম্প্রতি বাংলাদেশে আক্রান্ত সাংবাদিকদের নাম ও ছবি প্রকাশ করে তারা বলেছে, বিচারের নামে হয়রানি করা হচ্ছে সাংবাদিকদের। 

গত ২৩ এপ্রিল একটি বেসরকারি টিভি চ্যানেলের প্রতিবেদক সজল ভূঁইয়া নরসিংদীতে অভাবী মানুষদের জন্য বরাদ্দ চাল নিয়ে অনিয়মের তথ্য সংগ্রহ করতে গিয়ে মারধরের শিকার হন। অচেতন অবস্থায় তিনি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। ঢাকার দুই সিটি নির্বাচনের দিনও একাধিক সাংবাদিক শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত ও নিগৃহীত হন। 

আরএসএফের ভাষ্য, এক না-পসন্দ সংবাদে রুষ্ট হয়ে সংশ্লিষ্ট সংবাদমাধ্যমের সম্পাদকসহ সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মামলা ঠুকে দেওয়ার হিড়িক পড়েছে বাংলাদেশে। কয়েক দিন আগেই ত্রাণ চুরি সংক্রান্ত সংবাদ প্রকাশের জেরে নিউজপোর্টাল বিডিনিউজটোয়েন্টিফোর ডটকমের প্রধান সম্পাদক তৌফিক ইমরোজ খালিদী ও জাগো নিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক মহিউদ্দিন সরকারসহ চার সাংবাদিকের বিরুদ্ধে মামলা করা হলো। বাদী ঠাকুরগাঁওয়ের বালিয়াডাঙ্গি উপজেলার এক স্বেচ্ছাসেবক লীগ নেতা। 

স্বাভাবিকভাবে প্রশ্ন ওঠে, ক্ষমতাসীন দলের এই নেতা সোজা আইন-আদালত করতে গেলেন কেন, যখন নাকি থানা-পুলিশের নামে জনমনে একধরনের ‘ভীতি’ কাজ করে। আরও নানা উপায়ে তো এর প্রতিকার চাওয়ার সুযোগ আছে। বিশ্বব্যাপী রেওয়াজও তা-ই। প্রকাশিত কোনও প্রতিবেদনে তথ্যগত ভুল বা অসঙ্গতি থাকলে সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি/পক্ষ প্রতিবাদ জানাবেন। সংশ্লিষ্ট সংবাদমাধ্যম তা আমলে নিয়ে প্রকাশ বা প্রচার করবে। যদি তা না করে তাহলে প্রেস কাউন্সিলে যাওয়ার সুযোগ আছে। দেওয়া যেতে পারে আইনি নোটিশও। সেসব পথ না মাড়িয়ে সরাসরি ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের মতো ‘কালাকানুনে’ মামলা ঠুকে দেওয়াকেই ওই নেতা সহজ ও অব্যর্থ মনে করেছেন। কারণ, এই আইনের ‘মাজেজা’ সম্পর্কে তিনিও অবগত। চাইলেই সংবাদমাধ্যমের ওপর যে কারও চড়াও হওয়ার এমন বন্দোবস্ত যে অবারিত!

অথচ আগের অনেক ঘটনার মতো পাক্ষিক সাময়িকী পক্ষকাল-এর সম্পাদক শফিকুল ইসলাম কাজলের ‘গুম’ হওয়া নিয়ে রাষ্ট্র ছিল নিরুত্তর। একজন আস্ত, উপস্থিত মানুষ ‘নাই’ হয়ে যান মুহূর্তে, অথচ কর্তৃপক্ষ যেন নিদায়। আজকেরই খবর, বেনাপোল বন্দর থানার সাদিপুর সীমান্ত থেকে উদ্ধার করা সাংবাদিক শফিকুল ইসলাম কাজলকে বিজিবি সদস্যরা বন্দর থানায় হস্তান্তর করেছে। সময় সাক্ষী, ভুক্তভোগী কত না পরিবার-স্বজন তাদের প্রিয়জনের মরদেহ ফিরে পাওয়ার সান্ত্বনাটুকুও শেষতক পান না! বছরের পর বছর এমন ‘ভোজবাজি’র অভ্যস্ত দর্শকে পরিণত দেশবাসী। নিউজপোর্টাল বাংলা ট্রিবিউনের কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি আরিফুর রহমানকে রাতের অন্ধকারে রীতিমতো ‘কমান্ডো’ কায়দায় ধরে নিয়ে দণ্ড দেওয়ার ঘটনায় তাই শুকরিয়া আদায় জরুরি হয়ে পড়ে! অন্তত তার খোঁজ তো আছে, আপডেটহীন ‘নিখোঁজ সংবাদ’ হননি তিনি। যদিও পরে আদালতে ন্যায়বিচার পেয়েছেন সংবাদের এই মানুষটি। এভাবে সংবাদের মানুষদের ‘সাইজ’ করার উদাহরণ ভূরি ভূরি।

অর্থাৎ করোনাক্রান্ত সময়ের আগে থেকেই ভিন্ন ভিন্ন ‘ভাইরাসে’র সংক্রমণে গণমাধ্যম কাহিল। গলাব্যথা, জ্বর, সর্দি-কাশি তার পুরনো ব্যামো। এর সঙ্গে করোনা সংক্রমণের উপসর্গের মিল থাকলেও আদতে তা সম্পর্কহীন। নানা ছুতোনাতায়, কত না ফন্দিফিকিরে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা খর্ব করায় রাষ্ট্রযন্ত্রের সক্রিয়তা চোখে পড়ার মতো। জব্দ করতে জবরদস্ত আইন প্রণয়ন, দেশপ্রেমের ধোঁয়া তুলে বা ‘চেতনাবিরোধী’ বলে দাগিয়ে দিয়ে বেকায়দায় ফেলার চেষ্টাও নতুন নয়। আছে ডিক্লারেশন বাতিলের মতো কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার ঘটনাও। বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের (ডব্লিউইএফ) বিচারে গণমাধ্যমে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সূচকে ১৪১ দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১২৩তম।

মালিকপক্ষের অবিমৃষ্যকারিতায় কোনও কোনও গণমাধ্যমের মুখ থুবড়ে পড়ার সাক্ষীও বাংলাদেশ। এই সংকটেও একাধিক সংবাদমাধ্যমের কর্মী ছাঁটাই কীসের অশনি সংকেত? নিয়মিত বেতন-ভাতা না পেয়ে কত শত সংবাদকর্মী যে মানবেতর জীবন কাটাচ্ছেন, তার খোঁজ কে রাখে? এতকিছুর পরও ‘স্তুতিমাধ্যম’ হয়ে ওঠার নিলাজ উদাহরণও যে খুব কম, তা কিন্তু বুকে হাত দিয়ে বলা যায় না। তবু মোটা দাগে গণমাধ্যম যে আছে গণমাধ্যমের জায়গাতেই, তা বুক ফুলিয়ে বলা যায়, এখনও, এই অকালেও।

মারণ-মহামারির সময়ে সবাই যখন কার্যত ঘরবন্দি, সাংবাদিকরা কিন্তু তখন রাজপথে, তথ্য সংগ্রহে ছুটে বেড়াচ্ছেন মাঠে-ময়দানে। প্রাণের ঝুঁকি নিয়ে তারা অন্যদের ঝুঁকিমুক্ত রাখতে অবিরাম জুগিয়ে যাচ্ছেন তথ্য, সঠিক তথ্য। এই কথায় সিলমোহর দৈনিক সময়ের আলো পত্রিকার প্রধান প্রতিবেদক হুমায়ুন কবীর খোকনের অকাল মৃত্যু। সাতক্ষীরার তালা উপজেলার এক সাংবাদিকেরও মৃত্যু হয়েছে ‘করোনা উপসর্গে’। আক্রান্ত হয়েছেন বেশ কয়েকজন। 

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের রমরমায় গুজব ও ঘটনার মধ্যকার ভেদরেখা যখন প্রায় বিলীন, তখন বস্তুনিষ্ঠ তথ্যের প্রথম ও শেষ ভরসার জায়গাটিও যে সংবাদমাধ্যম– সেই কথাটি নতুন করে প্রতিষ্ঠা পেলো, এই করোনাকালে। আর এ কথাটিও আরেক দফায় প্রমাণিত, কোনও প্রতিদানের আশায় নয়, পেশাগত দায়িত্বের প্রশ্নে সাংবাদিকরা অবিচল, আপসহীন–কী সময়, কী অসময়ে।

লেখক: সাংবাদিক

[email protected]

/এসএএস/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ