কোভিড-১৯ এবং বিদেশি বিনিয়োগ: পুঙ্খানুপুঙ্খ সুবিবেচনা আবশ্যক

Send
মো. সামীর সাত্তার
প্রকাশিত : ১৭:২১, মে ২৮, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১৯:৪৫, মে ২৮, ২০২০

মো. সামীর সাত্তারপরিবর্তনশীল অর্থনীতিতে, বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অনেকাংশে ‘প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ’ যা ইংরেজিতে ‘Foreign Direct Investment (FDI)’- এর ওপর নির্ভরশীল। জাতিসংঘের বাণিজ্য ও উন্নয়ন সংস্থা (আঙ্কটাড/UNCTAD) কর্তৃক প্রস্তুতকৃত ২০১৯ সালের বিশ্ব বিনিয়োগ প্রতিবেদন (“আঙ্কটাড প্রতিবেদন”) অনুসারে ২০১৮ সালে বাংলাদেশের FDI ৬৮ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ৩.৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে পৌঁছায়। যা সাম্প্রতিক সময়ে একটি রেকর্ড। FDI-এর এই রেকর্ড গড়তে উল্লেখযোগ্য অবদান রেখেছে বিদ্যুৎ উৎপাদন খাত ও শ্রম খাত। তাছাড়াও জাপান টোব্যাকো কর্তৃক ইউনাইটেড ঢাকা টোব্যাকোকে ১.৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের বিনিময়ে অধিগ্রহণ ছিল অন্যতম। তবে কোভিড-১৯ বৈশ্বিক মহামারির প্রাদুর্ভাবের কারণে বাংলাদেশের বেশিরভাগ শিল্পখাতই ব্যবসা-বাণিজ্যে অসচ্ছল হয়ে পড়ছে, বিশেষ করে তৈরি পোশাক খাত। কোভিড-১৯ বৈশ্বিক মহামারি সকলকে ঘরে থাকতে বাধ্য করেছে, লক্ষ লক্ষ মানুষের জীবনকে হুমকির মুখে ফেলে দিয়েছে। ফলশ্রুতিতে বাংলাদেশ একটি অর্থনৈতিক মন্দার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।

এই মহামারি সংকটের মধ্যেও এ থেকে উদ্ভূত আর্থিক মন্দার প্রভাবকে দমন করতে বিভিন্ন দেশ FDI আকৃষ্ট করার লক্ষে কিছু অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক এবং আইনগত পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে এবং করছে। FDI আকৃষ্ট করতে এবং বৈদেশিক মুদ্রা উপার্জনের ধারাবাহিকতা বজায় রাখার লক্ষে, অনেক দেশ বিভিন্ন ব্যবসায়ের আসন্ন সুযোগগুলো (বিশেষ করে যে ব্যবসাগুলো ক্রমশ চীন থেকে স্থানান্তর হচ্ছে) কাজে লাগানোর উদ্দেশ্যে নানারকম কৌশল গ্রহণ করছে। কেননা, এটা এখন আর গোপনীয় কোনও বিষয় নয় যে অনেক দেশ তাদের ব্যবসা-বাণিজ্য চীনের বাইরে বিশ্বের অন্যান্য অঞ্চলে স্থানান্তর করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ইতোমধ্যে ভারত ও ভিয়েতনামের মতো দেশগুলো এই পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে প্রণোদনা প্রদানের মাধ্যমে তাদের দেশে ব্যবসায়ের প্রতি উক্ত দেশগুলোসহ  অন্যান্য দেশকে আকৃষ্ট করার উদ্যোগ নেওয়া শুরু করেছে। উদাহরণস্বরূপ, ভারত তার প্রচলিত আইনসমূহে (বিশেষ করে শ্রম, ভূমি ও কর সম্পর্কিত আইন) উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আনতে উক্ত দেশগুলোর সঙ্গে সংলাপ শুরু করেছে। ভিয়েতনামও কোনও অংশে পিছিয়ে নেই। বিশ্ব মিডিয়ায় ফলাও করে প্রচার করা হচ্ছে যে, ভিয়েতনাম কোভিড-১৯ মহামারি নিয়ন্ত্রণে যে কর্মসূচি গ্রহণ করেছে তাতে তারা সফল হয়েছে। তাদের গৃহীত কর্মসূচি বিশ্বের অন্যতম সেরাদের মধ্যে একটি। এই বিষয়গুলো বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আস্থা অর্জনে সহায়তা করছে। যদিও এই কোভিড-১৯ মহামারির কারণে অন্যান্য দেশের মতো এই দেশগুলোও অর্থনৈতিক মন্দার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। তা সত্ত্বেও FDI-তে আকৃষ্ট করার কৌশলগত পদক্ষেপগুলো কোভিড-১৯ এবং কোভিড-১৯ পরবর্তী সময়ে তাদের অর্থনীতিকে এগিয়ে নিতে সহায়তা করবে।

FDI প্রলুব্ধকরণের প্রয়োজনীয়তার পাশাপাশি সুযোগসন্ধানী বিদেশি বিনিয়োগকারী কর্তৃক অধিগ্রহণের ঝুঁকি এড়াতে অনেক দেশ খুব সতর্ক অবস্থান নিয়েছে। এই দেশগুলোর জন্য এখন সবচেয়ে বেশি নজরদারির বিষয় হচ্ছে দেশীয় ব্যবসা/কোম্পানিগুলোকে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের দ্বারা স্বল্পমূল্যে অধিগ্রহণ থেকে রক্ষা করা। তাছাড়াও এসব দেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে বিদেশি বিনিয়োগের ক্ষেত্রে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে সেই খাতগুলো রক্ষা করা, যে খাতগুলো বিদেশি বিনিয়োগকারীদের নিয়ন্ত্রণে গেলে জাতীয় সুরক্ষার জন্য হুমকিস্বরূপ হতে পারে। এ কারণে অনেক দেশই FDI সম্পর্কিত কঠোর নীতি-নির্দেশিকা জারি করছে। উদাহরণস্বরূপ, ২০২০ সালের মার্চ মাসে ইউরোপিয়ান কমিশন তাদের দেশীয় ব্যবসা/কোম্পানিগুলোকে, বিশেষ করে স্বাস্থ্যসেবা এবং গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো খাতগুলো, সুবিধাবাদী ক্রেতাদের করাল গ্রাস থেকে রক্ষা করার লক্ষ্যে নির্দেশিকা জারি করেছে। উক্ত নির্দেশিকার মাধ্যমে সদস্য দেশগুলোকে, যাদের এরূপ FDI সম্পর্কিত নীতি-নির্দেশিকা বিষয়ক প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেই, তা প্রবর্তন করাসহ শিল্প ও কৌশলগত খাতে FDI-এর বিরূপ প্রভাব থেকে রক্ষার গুরুত্ব তুলে ধরার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে নির্দেশনা দিয়েছে। ইউরোপিয়ান কমিশন সদস্য দেশগুলোকে FDI সম্পর্কিত নীতি প্রবর্তনের সময় বিদেশি বিনিয়োগ কোনও কারণে জাতীয় নিরাপত্তা ও জনশৃঙ্খলা অব্যাহত রাখতে ঝুঁকি তৈরি করবে কিনা তা মূল্যায়ন করার আহ্বান জানিয়েছে। যুক্তরাজ্যও FDI-এর ক্ষেত্রে তার আইনগত কাঠামো পরিবর্তনের বিষয়ে বিবেচনা করছে। পরিবর্তনগুলো কার্যকর হলে, যুক্তরাজ্য সরকারের বৈদেশিক বিনিয়োগ যাচাই-বাছাই করার ক্ষমতা এবং প্রতিদ্বন্দ্বী দেশ কর্তৃক যুক্তরাজ্যে অবস্থিত সম্পদের মালিকানা অর্জনের ফলে জাতীয় সুরক্ষা বা নিরাপত্তা সম্পর্কিত ঝুঁকি তৈরি হবে কিনা তা বিবেচনা করার ক্ষমতা বাড়বে। যুক্তরাজ্য সরকারের এই ক্ষমতাগুলোর বিস্তৃতি ব্যাপক এবং সর্বক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে।

অস্ট্রেলিয়ায়ও অনুরূপ পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। দেশটি FDI সম্পর্কিত কঠোর নীতি-নির্দেশিকা জারি এবং সেরূপ কার্যপ্রণালী গ্রহণ করেছে। যার ফলে, ব্যবসার মূল্যমান বা প্রকৃতি নির্বিশেষে সমস্ত বা যেকোনও প্রস্তাবিত FDI-এর ক্ষেত্রে তাদের বিদেশি বিনিয়োগ পর্যালোচনা বোর্ডের পুর্বানুমোদনের প্রয়োজন হবে। অধিকন্তু, বন্দর, বিদ্যুৎ, গ্যাস ও পানিসম্পদের মতো ‘গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোগত সম্পদে’ও FDI-এর ক্ষেত্রে বিদেশি বিনিয়োগ পর্যালোচনা বোর্ডের অনুমোদনের প্রয়োজন হবে। আমাদের প্রতিবেশী দেশ ভারতও তার দেশীয় অর্থনীতি ও দেশীয় কোম্পানিগুলোকে সুবিধাবাদীদের দখল বা অধিগ্রহণ থেকে রক্ষার জন্য কঠোর সুরক্ষামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। উদাহরণস্বরূপ, বর্তমান কোভিড-১৯ মহামারিজনিত কারণে ভারতীয় কোম্পানিগুলোর অধিগ্রহণ রোধে ভারত সরকার বিদেশি বিনিয়োগ নীতি সংশোধন করেছে। এর ফলে ভারতের সীমান্তবর্তী কোনও দেশ ভারতে বিনিয়োগ করতে চাইলে ভারত সরকারের অনুমোদন লাগবে। পূর্বে, এই সীমাবদ্ধতা কেবল বাংলাদেশ এবং পাকিস্তানের জন্য প্রযোজ্য ছিল। নতুন বিদেশি বিনিয়োগ নীতি প্রবর্তনের ফলে চীনসহ অন্যান্য সীমান্তবর্তী দেশগুলোকেও সমস্ত প্রকার বিনিয়োগের ক্ষেত্রে (পরিমাণ নির্বিশেষে) ভারত সরকারের কাছ থেকে পূর্বানুমোদন নিতে হবে। আরও উল্লেখ্য, যদি কোনও প্রতিষ্ঠানসমূহের মালিক এসব সীমান্তবর্তী দেশ থেকে হয়ে থাকে তাহলে এই অনুমোদনের প্রয়োজন হবে। অধিকন্তু, এই নতুন বিদেশি বিনিয়োগ নীতির অধীনে সুরক্ষামূলক ব্যবস্থার অংশ হিসাবে বিদেশি বিনিয়োগকারী কর্তৃক ভারতে পোর্টফোলিও বিনিয়োগও সীমাবদ্ধ করা হয়েছে।

যদিও এই কঠোর সতর্কতামূলক ব্যবস্থার প্রতিকূল প্রভাব রয়েছে এবং এই সকল নীতির কারণে স্বাগতিক দেশগুলোর ওপর যাচাই বাছাই করার বাড়তি চাপ আরোপ করা হয়েছে, তারপরও এই মহামারির সময়ে স্থানীয় ব্যবসায়ীদের স্বল্পমূল্যে অধিগ্রহণ থেকে রক্ষা করা এবং কৌশলগত ও গুরুত্বপূর্ণ খাতগুলোতে FDI-কে নিয়ন্ত্রণ করার লক্ষে বহু দেশ এই জাতীয় কঠোর নীতি বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। যেহেতু বাংলাদেশও অন্যান্য দেশের মতো এই বৈশ্বিক মন্দার মধ্যে পতিত হয়েছে, অনেক বিদেশি বিনিয়োগকারী এই সুযোগ কাজে লাগানোর জন্য অপেক্ষা করছে।

আঙ্কটাড প্রতিবেদন অনুযায়ী দেখা গিয়েছে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশ বিদেশি বিনিয়োগের জন্য একটি পছন্দের গন্তব্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। সুতরাং, যদি অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশ সরকারও উপরোক্ত সুরক্ষামূলক নীতিগুলো বাস্তবায়ন করতে পারে (যদি ইতোমধ্যে না করা হয়ে থাকে) তাহলে এই পদক্ষেপগুলো হবে কোভিড-১৯ চলাকালীন এবং কোভিড-১৯ পরবর্তী সময়ের জন্য উপযোগী পদক্ষেপ, যা আমাদের দেশীয় অর্থনীতি ও বাণিজ্যকে সহায়তা করবে। আরও উল্লেখ্য, এসব নীতি বাংলাদেশ সরকার দ্বারা প্রণীত হলে বাংলাদেশের কৌশলগত ও গুরুত্বপূর্ণ খাতগুলোতে FDI-কে এমনভাবে নিয়ন্ত্রণ করা যাবে, যার ফলে উক্ত FDI বাংলাদেশের জাতীয় নিরাপত্তা, সুরক্ষা ও জনস্বার্থের ওপর কোনও প্রভাব ফেলতে পারবে না। আমাদের জন্য এখন গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো FDI প্রলুব্ধকরণ এবং এর যথাযথ নিয়ন্ত্রণের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করা। সমগ্র বিশ্ব বর্তমানে বৃহত্তম অর্থনৈতিক মন্দার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, বাংলাদেশও এর ব্যতিক্রম নয়। আমদানি ও রফতানি উভয় বাধাগ্রস্ত হচ্ছে এবং বিভিন্ন খাতে বিনিয়োগের অনিশ্চয়তা অর্থনীতিকে থমকে দিচ্ছে। উল্লেখযোগ্য খাতগুলো, যেমন- তৈরি পোশাক, চামড়া শিল্প, ওষুধ শিল্প, কৃষি-শিল্পজাত পণ্য এবং বিদেশি রেমিট্যান্স এসব ক্ষেত্রে অর্থনৈতিক মন্দার প্রভাব পরছে। অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও কোভিড-১৯ মহামারির পরে বিনিয়োগ পরিস্থিতির পরিবর্তন আসবে এবং আগত দিনগুলোতে বাংলাদেশের অর্থনীতি যে ক্ষতির মুখোমুখি হবে তা হ্রাস করতে FDI প্রলুব্ধ করার প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। এর পাশাপাশি বাংলাদেশ সরকারের সুবিধাবাদী অধিগ্রহণ রোধ করার জন্য সুরক্ষামূলক পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। এর জন্য বাংলাদেশ সরকারের সংশ্লিষ্ট দফতরগুলোকে (বিশেষ করে বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ এবং বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ) একযোগে কাজ করতে হবে এবং FDI প্রলুব্ধকরণসহ সার্বিকভাবে পুঙ্খানুপুঙ্খ সুবিবেচনামূলক পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। 

লেখক: আইনজীবী, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট এবং সাত্তার এন্ড কোং  ল’ ফার্মের প্রধান।

 

/এসএএস/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ