বর্জ্যেও করোনাভাইরাস

Send
ড. মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম
প্রকাশিত : ১৬:২৮, জুলাই ১৩, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১৬:২৯, জুলাই ১৩, ২০২০

ড. মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলমবাংলাদেশে ২০১২ সালের পরিসংখ্যান অনুযায়ী এক বছরে ২২.৪ মিলিয়ন টন বর্জ্য উৎপাদিত হয়। এই ট্রেন্ড অনুযায়ী ২০২৫ সালে একদিনে প্রায় ৪৭ হাজার টন বর্জ্য উৎপাদিত হতে পারে। দুঃখের বিষয় হলেও সত্য, ভবিষ্যতে প্রতিজন প্রায় ২২০ কেজি বর্জ্য পরিবেশে যোগ করবে। বর্তমানে উৎপাদিত মোট বর্জ্যের ৩৭ শতাংশ ঢাকা শহরে। সাধারণত বর্জ্য উৎপাদন নির্ভর করে জনসংখ্যার বৃদ্ধি, ঘনত্ব ও বর্জ্যের সঠিক ব্যবস্থাপনার ওপর। জনসংখ্যার পরিসংখ্যানে বাংলাদেশ বিশ্বে নবম ও ঘনত্বের বিবেচনায় দশম। বর্জ্য ব্যবস্থাপনার দৃষ্টিকোণ থেকে বাংলাদেশে ‘জিরো বর্জ্য’ ব্যবস্থাপনার কোনও প্রকার পদক্ষেপ আজ পর্যন্ত দেখা যায়নি। মোটা দাগে বলা যেতে পারে, বিপুল এই জনসংখ্যার দেশে বর্ধিত মানুষের পাশাপাশি বর্জ্যের বড় বড় স্তূপও পরিলক্ষিত হচ্ছে।
হাউজহোল্ড, শিল্পকারখানা ও হাসপাতালগুলো প্রতিনিয়ত বর্জ্য উৎপাদন করে যাচ্ছে। যদিও এই প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে মানুষের বসবাস ও জীবন যাপনের জন্য সরাসরি সংযোগ রয়েছে। তবুও বর্জ্য উৎপাদন ও ব্যবস্থাপনায় পরিবেশের ডিগ্রেডেশনের বিষয়টি নজরে নেওয়া হয়নি। যাই হোক, হাউজহোল্ড বায়ো-ডিগ্রেডেবল ও নন-বায়ো-ডিগ্রেডেবল উভয় প্রকার বর্জ্য উৎপাদন করে থাকে। শিল্প-কারখানাগুলো হ্যাজারডাস ও নন-হ্যাজারডাস উভয় প্রকার বর্জ্য পরিবেশে প্রতিনিয়ত যোগ করছে। বাংলাদেশে সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতাল এবং ক্লিনিকগুলো থেকেও যত্রতত্র হ্যাজারডাস ও নন-বায়োডিগ্রেডেবল বর্জ্য উৎপাদিত হচ্ছে। মোদ্দাকথা হলো নন-বায়োডিগ্রেডেবল ও হ্যাজারডাস বর্জ্যগুলো পরিবেশের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর ও সংক্রামক রোগ ছড়াতে সাহায্য করে। হাসপাতাল হতে নির্গত বায়োমেডিক্যাল বর্জ্যের প্রায় ২০ শতাংশই সংক্রামক রোগ ছড়াতে সাহায্য করে। মানুষ ও অন্যান্য প্রাণীর রক্ত, রক্ত ভেজা ব্যান্ডেজ, সার্জিক্যাল মাস্ক, গ্লাভস, মানুষ ও অ্যানিমেলের টিস্যু প্রভৃতি ‘সংক্রামক বর্জ্য’ নামে পরিচিত। কেমিক্যালস, পুরাতন মেয়াদ উত্তীর্ণ ওষুধ, কেমোথেরাপি এজেন্টস, সার্প্স, নিডেলস, সিরিঞ্জ, স্কালপেল, লেনসেটস, ডিস ও গ্লাসওয়্যারগুলো হ্যাজারডাস বর্জ্য নামে পরিচিত। আবার কিছু রেডিওঅ্যাক্টিভ ও মিউনিসিপাল সলিড বর্জ্যও হাসপাতাল হতে প্রতিনিয়ত পরিবেশে যোগ হচ্ছে। 

হাসপাতাল হতে নির্গত এসব সংক্রামক বর্জ্য ভাইরাস, ব্যাকটেরিয়া ও ছত্রাক জাতীয় রোগ মানুষের শরীরে ছড়াতে সাহায্য করে। এসব তথ্য অনুযায়ী বলা যেতে পারে, বায়োমেডিক্যাল বর্জ্যগুলোর মধ্যে সংক্রামক বর্জ্য সার্স কোভিড-২ ভাইরাস মানুষের শরীরে ছড়িয়ে করোনায় আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা লাগামহীনভাবে বাড়িয়ে দিতে সক্ষম।  সম্প্রতি এক গবেষণায় পাওয়া যায়, সার্স কোভিড-২ ভাইরাস, বর্জ্যে ২ ঘণ্টা হতে ৯ দিন পর্যন্ত বেঁচে থাকতে পারে। এই প্রাণঘাতী করোনাভাইরাসের বর্জ্যে বেঁচে থাকা নির্ভর করে বর্জ্যের চরিত্র, তাপমাত্রা, আর্দ্রতা ও ভাইরাসটির প্রজাতির ওপর। আবার উচ্চ তাপমাত্রা, কম বা বেশি পিএইচ ও দীর্ঘসময় সূর্যের আলোয় ভাইরাসটির স্থায়িত্ব পরিবেশে কিছুটা কমে যায়। গবেষণার তথ্য অনুযায়ী বলা যেতে পারে, সার্স কোভিড-২ ভাইরাসটি বাতাসে ৮ মিনিট, শক্ত সারফেসে ৮ ঘণ্টা ও মেটাল/প্লাস্টিক জাতীয় বর্জ্যে ৪৮ হতে ৭২ ঘণ্টা পর্যন্ত বেঁচে থাকতে পারে। উপরোক্ত পরিসংখ্যানই বলে দিচ্ছে, সংক্রামক হ্যাজারডাস ও অন্যান্য বর্জ্যও করোনাভাইরাস ছড়াতে পারে, যদি বর্জ্যগুলো বিজ্ঞানসম্মতভাবে ব্যবস্থাপনা করা না হয়।

উল্লেখ্য, ২০১৬ সালের পরিসংখ্যান অনুযায়ী বাংলাদেশে প্রায় ৫ হাজার ৮১৬টি হাসপাতাল রয়েছে। বর্তমানে এই হিসাব ঊর্ধ্বমুখী হওয়ায় বর্জ্য উৎপাদনও অনেকটা লাগামহীনভাবে বেড়ে যাওয়ায় করোনাসহ অনেক সংক্রামক রোগের প্রাদুর্ভাবে মানুষের স্বাস্থ্যঝুঁকি অনাকাঙ্ক্ষিত হারে বেড়েই চলছে।

সম্প্রতি দেখা যায়, স্বাস্থ্যকর্মীদের অনেকেই করোনাভাইরাসে আক্রান্ত, এমনকি মৃত্যুবরণও করেছে। হাসপাতাল হতে নির্গত সংক্রামক ও হ্যাজারডাস বর্জ্যগুলো, এই সংক্রামক ভাইরাসটি ছড়িয়ে সারা পৃথিবীতে আতঙ্ক সৃষ্টি করছে। যার দরুন পৃথিবীর বহু দেশ বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিয়ে উদ্বিগ্ন। বাংলাদেশ এর ব্যতিক্রম নয়। আবার অনেক দেশ বর্জ্যের সঠিক ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে তাদের শহরকে ‘জিরো বর্জ্যের’ শহর হিসেবে ইতিমধ্যে ঘোষণা করেছে। বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় এসব সফল দেশের দৃষ্টিতে বর্জ্য ‘সম্পদ’ হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে। যদিও বাংলাদেশে ‘পরিবেশ সংরক্ষণ আইন ১৯৯৫’ সেকশন ২(১) অনুযায়ী বর্জ্য সংরক্ষণ, স্থানান্তর ও ডিসপোজালের কথা উল্লেখ রয়েছে। এই আইনে বর্জ্যকে সম্পদে পরিণত করার সুস্পষ্ট ব্যাখ্যার যথেষ্ট ঘাটতি রয়েছে।

করোনাভাইরাসের সংক্রমণ রোধসহ অন্যান্য সংক্রামক রোগের প্রাদুর্ভাব কমানোর জন্য বর্জ্য ব্যবস্থাপনা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। বর্জ্য ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে ইংরেজিতে তিনটি ‘আর’ এর সমন্বয়ে গঠিত তিনটি শব্দ যেমন, রিডিউস, রিইউস ও রিসাইক্যাল একসময় ব্যাপক জনপ্রিয় ছিল। পরবর্তীতে আরও দুটি ‘আর’ বেড়ে বর্জ্য ব্যবস্থাপনায়  যুক্ত হলো: রিকভারি ও রিস্টোরিং, যা বর্জ্যে আবদ্ধ শহরকে ‘জিরো’ বর্জ্যে পরিণত করা সম্ভব। বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় ৫টি ‘আর’-এর ব্যাখ্যা নিম্নরূপে করা যেতে পারে—১) রিডিউস: প্রতিদিন জীবনের প্রয়োজনে বর্জ্য উৎপাদন কমানো; ২) রিইউস: পুনরায় ব্যবহারের জন্য মেরামত/রিকন্ডিশনিং ডিভাইস/পার্টস তৈরি; ৩) রিসাইক্যাল: পুরনো জিনিস ব্যবহার করে নতুন জিনিস তৈরি; ৪) রিকভারি: যখন পুরনো জিনিসের মাধ্যমে নতুন জিনিস তৈরি সম্ভব নয়, তখন শক্তি উৎপাদনে প্ল্যান্টে ব্যবহৃত হতে পারে; ৫) রিস্টোরিং: রিকোভারি প্রসেসে অব্যবহৃত বর্জ্যগুলো পরিবেশে ফেলে না রেখে মাটিচাপা দিয়ে সংরক্ষণ করা যেতে পারে।

অন্যদিকে হাসপাতাল থেকে সংক্রামক বর্জ্য নির্গত হওয়ায় ‘ইনসিনারেশন’ পদ্ধতি উপরোক্ত বর্জ্য ব্যবস্থাপনার সঙ্গে যোগ করা যেতে পারে। বর্জ্য ব্যবস্থাপনার পদ্ধতিগুলো ব্যবহারের আগে বর্জ্যের বৈশিষ্ট্যের ওপর ভিত্তি করে বর্জ্য পৃথকীকরণ অত্যন্ত জরুরি। বর্জ্য পৃথকীকরণের জন্য প্রতিটি প্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল ও কলকারখানাতে বিভিন্ন ধরনের বর্জ্য ফেলার ‘বক্স’ স্থাপন করে ট্যাগিং করা যেতে পারে। ফলে মানুষ বক্সের ওপরের নির্দেশনা অনুযায়ী বর্জ্য বক্সের ভেতরে রাখবে। মানুষ যদি সচেতন হয়, তাহলে অতি সহজেই বর্জ্য আলাদা হয়ে প্রতিটি বক্সে থাকবে এবং দিনের শেষে সমজাতীয় বর্জ্য সংগ্রহ করা যাবে। ফলে বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় ‘জিরো বর্জ্য’ পরিণত করার পদ্ধতিগুলো অনুসরণ করতে অনেকটা সহজ হবে। যেহেতু সংক্রামক বর্জ্যের মাধ্যমে করোনাভাইরাস ছড়ায়, সেহেতু বায়োমেডিক্যাল বর্জ্যগুলো বর্জ্যের বক্স থেকে বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য কমপক্ষে নয়দিন পর সংগ্রহ করতে হবে। বর্জ্যের বক্সগুলো মানুষের অফিস, চলাচল ও বসবাসের জায়গা থেকে কমপক্ষে ৬ ফুট দূরে স্থাপন করতে হবে।

যদিও কলকারখানা থেকে উৎপাদিত তরল ও সলিড বর্জ্যগুলো আবাসিক এলাকায় রাস্তার পাশে যত্রতত্র পড়ে থাকতে দেখা যায়। আবার তরল বর্জ্যগুলো স্যুয়ারেজ লাইনের মাধ্যমে নদীনালা ও পুকুরের পানিতে কোনও প্রকার ট্রিটমেন্ট ছাড়া প্রতিনিয়ত লাগামহীনভাবে নিঃসৃত হচ্ছে। যদিও এসব বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য প্রতিটি কলকারখানা ‘পরিবেশ সংরক্ষণ আইন’ অনুযায়ী শর্ত সাপেক্ষে পণ্য উৎপাদনের অনুমতি পেয়ে থাকে। এসব বর্জ্যে বিভিন্ন ধরনের হ্যাজারডাস উপাদান যেমন—ক্রেমিয়াম, আর্সেনিক, লেড ও ক্যাডমিয়ামসহ বিষাক্ত কেমিক্যাল রয়েছে, যা খাদ্যশৃঙ্খলের মাধ্যমে মানবদেহে প্রবেশ করে। ফলে মানুষ শ্বাসকষ্টসহ ফুসফুসে ক্যানসার ও মারাত্মক মরণব্যাধিতে ভোগে। বর্জ্যের মাধ্যমে অদৃশ্য প্রাণঘাতী করোনাসহ অন্যান্য সংক্রামক ব্যাধির প্রাদুর্ভাব বেড়ে মানুষকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিচ্ছে।

সম্প্রতি জেকেজি ও রিজেন্ট হাসপাতাল করোনা আক্রান্ত ব্যক্তিদের নমুনা সংগ্রহ করে কোনও প্রকার পরীক্ষা ছাড়াই দীর্ঘদিন ধরে মানুষের পজিটিভ/নেগেটিভ সার্টিফিকেট দিয়ে আসছিল। তথ্য অনুযায়ী জানা যায়, কোনও প্রকার পরীক্ষা ছাড়াই নমুনা বর্জ্যে ফেলে দেওয়া হতো, যেখানে প্রাণঘাতী করোনাভাইরাসের বর্জ্যের মাধ্যমে অন্য মানুষের শরীরে স্থানান্তরিত হওয়ার সম্ভাবনা থেকে যায়। এক্ষেত্রে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা মানুষের একটি নৈতিকতার বিষয়। যদিও বর্জ্য ব্যবস্থাপনার বিষয়ে স্থানীয় সরকার অঙ্গীকারবদ্ধ। এই দৃষ্টিকোণ থেকে সরকারি, ব্যক্তিগত ও প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে বর্জ্য ব্যবস্থাপনার বিষয়ে সচেতনতা বৃদ্ধি ও আইনের পরিমার্জনসহ যথাযথ প্রয়োগ অতীব জরুরি। কলকারখানা, হাসপাতাল, সরকারি ও বেসরকারি সকল প্রতিষ্ঠানগুলোকে পাঁচটি “আর” অনুযায়ী বর্জ্য সঠিকভাবে ব্যবস্থাপনা করা উচিত। উল্লেখ্য, বর্জ্য ব্যবস্থাপনার পাঁচটি “আর” অনুযায়ী থিমেটিক এরিয়া নির্দিষ্ট করে স্থানীয় সরকার ও বর্জ্য বিশেষজ্ঞদের সহায়তায় কোলাবোরেটিভ প্রকল্পের মাধ্যমে ‘জিরো বর্জ্যের’ অঞ্চল গঠনে এগিয়ে আসা উচিত। পরিশেষে বলা যেতে পারে, জিরো বর্জ্যের অঞ্চল প্রাণঘাতী করোনাভাইরাসের মহামারি কমাতে অগ্রণী ভূমিকা রাখবে।

লেখক: সহযোগী অধ্যাপক, পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগ, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, গাজীপুর।

[email protected]

/এসএএস/এমএমজে/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ